সায়েন্স ফিকশন || সিনেস্থেশিয়া

Abu_Dipen20170424074345.jpg

|| দীপেন ভট্টাচার্য ||

১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি রথখোলা মোড়ের কাছে নবাবপুর রোডের ওপর আমার একটা চেম্বার ছিল। নিচে ড্রেন পাইপের দোকান, সেটার সাথে একটা সরু গলি, দু’জন মানুষও পাশাপাশি হাঁটতে পারে না, সেই গলির সাথেই লাগোয়া সিঁড়ি দিয়ে উঠে আসতে হতো দোতলার একটা লম্বা বারান্দায়। বারান্দায় পরপর কয়েকটা দরজা। একটা দরজার ওপরে লেখা: ডা. আবদুল মতিন, এমবিবিএস, সাইকিয়াট্রিস্ট। সন্ধ্যা ছটায় আমি চেম্বারে যেতাম, চার ঘণ্টা বসতাম, রোগীর দেখা খুব একটা মিলত না, মনোরোগী হওয়া সামাজিকভাবে গৃহীত হতো না বলে পরিবার থেকে মনোচিকিৎসকের কাছে যাওয়াটাকে নিরুৎসাহিত করা হতো।

সেদিনটা খুব গরম পড়েছিল, জুন মাস হবে। বর্ষার দেখা নেই, গুমোট সন্ধ্যায় সাহানা নামে এক নারী আমার চেম্বারে আসে, বয়স হয়তো ত্রিশ বা পঁয়ত্রিশ। আমার চেম্বারের একটা ছোট জানালা দিয়ে পাশের বাড়ির ছাদ দেখা যায়, সেখানে কাপড় শুকানোর জন্য মেলা থাকত। হয়তো সেদিকে তাকিয়ে আনমনাভাবেই সাহানা বলেছিল, ‘আমি শব্দের সঙ্গে রঙ দেখতে পাই।’

এ রকম অদ্ভুত ব্যাপার আমি আগে শুনিনি, রাস্তার গোলমেলে আওয়াজ সাহানার মনে রূপান্তরিত হয় একধরনের ধূসর আলোর ওঠানামায়, কাকের কর্কশ ডাকের রং হয়ে যায় গাঢ় বেগুনি, মানুষের কথা বর্ণালীর প্রতিটি রং ছুঁয়ে যায়। সাহানা ভেবেছিল এটা একধরনের মনোবিকলতা, এরপর সে তার ১৯৭১ সালের কাহিনী বলে।

১৯৭১ সালের জুলাই মাসে সাহানা খুলনা শহরের উত্তরে ভৈরব নদীর পাড়ে গ্রামে তার পৈতৃক বাড়িতে ছিল। সাহানার কন্যাসন্তান রেবার বয়স যখন তিন বছরের মতো। তার স্বামী আবু মুর্তজা এপ্রিল মাসেই মুক্তিবাহিনীতে যোগ দিতে চলে যান। ওই মাসে এক সন্ধ্যায় স্থানীয় রাজাকারদের সহযোগিতায় পাকিস্তানি সেনারা তাদের গ্রামকে ঘিরে ফেলে। হিন্দু প্রধান গ্রামটির শ’খানেক নারী-পুরুষ স্কুলের মাঠে জড়ো করে। স্থানীয় হিন্দুদের সাথে সাহানার বাবা ও এক ভাইকেও আর্মি ধরে নিয়ে যায়। অনেক নারী-পুরুষ ভৈরবে ঝাঁপ দেয়, অনেকেই নদী সাঁতরানোর সময়ই মেশিনগানের গুলি খেয়ে মরে। সাহানাকে তার মা বাড়ির পেছনের ডোবায় লুকিয়ে থাকতে বলে স্কুলের মাঠে সে তার স্বামীকে বাঁচানোর জন্য দৌড়ে যায়।

সাহানাদের উঠোনের চারদিকে চারটা টিনের চালার ঘর, তার একটির পেছনে ডোবা। সেই ঘরটির এক কোনায় রেবাকে লুকিয়ে রেখে, সন্ধ্যার অবরোহী অন্ধকারে, সাহানা দৌড়ে আকন্দ আর আঁশশেওড়ার মাঝে বৃষ্টির পানি জমা ছোট ছোট খানা পেরিয়ে বাঁশঝাড়ের পাশে কচুরিপানা ভরা ডোবায় পৌঁছায়। অন্ধকারে পথ চলতে তার কোনো অসুবিধা হয় না, অন্ধকারেও তার চোখে সবকিছু লাল আবছা আলোয় জ্বলে, তার চেয়েও বড় কথা যেকোনো শব্দ তার কাছে আলো হয়েও ধরা দেয়। ডোবায় নেমে কোমর জলে দাঁড়িয়ে সাহানা দেখে ডোবার পাড়ে কে যেন এসে টর্চ দিয়ে তার খোঁজ করছে। অন্ধকারেও রহম রাজাকারকে চিনতে পারে সাহানা, তাকে ধরতেই রহম পাকিস্তানি সেনাদের গ্রামে নিয়ে এসেছে। রহম জানত সে কাছেই কোথাও আছে, কিন্তু তার প্রতিটি পদ শব্দ সাহানা অনুসরণ করতে পারছিল। খানার পানিতে পা পড়ে যেখানে ছলাৎ করে উঠছিল, সেখানে সে দেখছিল গাঢ় সবুজ আলো, আগাছায় কাপড়ের স্পর্শ হয়ে উঠছিল একটা অবর্ণনীয় গোলাপে। রহমের টর্চের আলো এড়াতে ডোবার আরো গভীরে গিয়ে দম বন্ধ করে পানিতে ডুব দেয় সাহানা। শব্দে ভরা ছিল সেই ডোবা, মাছের শব্দ, হয়তো বা সাপ, কাদা থেকে উঠে আসা অজানা গ্যাসের বুদবুদের শব্দ। সেই সব শব্দ সাদা আর সবুজ রঙে উজ্জ্বল হয়ে তার মনে ভেসে ওঠে। পানির ওপরে টর্চের আলো ধরা থাকে আরো কিছুক্ষণ। শুধুমাত্র তখনই যখন বুকটা মনে হয় ফেটে যাবে টর্চের আলো নিভে যায়। পানির ওপরে মাথা তুলে নিঃশ্বাস নেয় সাহানা, রহম রাজাকার চলে গেছে।

কান্নার শব্দ ভেসে আসছে বাড়ি থেকে। ভেজা কাপড়ে বাড়ি ফিরে সাহানা খুঁজে পায় রেবাকে। কিন্তু তার মা, বাবা ও ভাই আর ঘরে ফিরে আসে না।

আমি স্তব্ধ হয়ে সাহানার কাহিনী শুনি, কিন্তু সাহানা আমাকে ’৭১-এর ইতিহাস শোনাতে আসিনি। শব্দ থেকে আলো সঞ্চারিত হয়- এ কি ধরনের মনোবৈকল্য? তার স্বামী- আবু মুর্তজা- এ নিয়ে তাকে মানুষের সঙ্গে কথা বলতে নিষেধ করেছেন, পাছে লোকে তাকে হয় মিথ্যুক, নয় ডাইনি ভাবে। কিন্তু যত দিন যায় তত সে শব্দে সংবেদী হয়ে উঠছে, রাতের পর রাত সে জেগে থাকে, রাস্তার সামান্য শব্দ ঘরকে আলো করে দেয়। আমি জানি না সেদিন সাহানার কথা বিশ্বাস করেছিলাম কি না, তাকে তার ঠিকানাটা রেখে যেতে বলি, যদি এ বিষয়ে কোনো গবেষণা আমার চোখে পড়ে, তাকে জানাব বলে আশ্বাস দিই। সাহানার আচরণে আমি কোনো অস্বাভাবিকতা পাই না, আমি তাকে মাসখানেক পরে আবার চেম্বারে ফিরে আসতে বলি। সাহানা যুগীনগর রোডের একটা ঠিকানা দিয়েছিল।

কোনো কারণে সাহানাকে আমি চেম্বারের বাইরে বারান্দা পর্যন্ত এগিয়ে দিই। সরু সিঁড়িটা দিয়ে নামার সময় খেয়াল করি সাহানার শরীরে হঠাৎ কেমন যেন একটা স্থবিরতা এসেছে, যেন হঠাৎ করে তার বয়স বেড়ে গেছে, সিঁড়িটা দিয়ে নামতে তার অসুবিধা হচ্ছিল। এরপর সাহানা আর ফিরে আসেনি। আমিও এর মধ্যে আবার যুক্তরাজ্য যাই একটা ডিগ্রির জন্য। সেখানে গিয়ে সিনেস্থেশিয়া নামে একটি বৈশিষ্ট্যের কথা শুনি। অনেক মানুষ নাকি লিখিত সংখ্যা দেখলে তাতে রঙ দেখে, যেমন ১ হলো লাল, ২ সবুজ ইত্যাদি। রংটা যে খুব স্পষ্ট তা নয়, বরং সংখ্যাটা ঘিরে আবছা আলোয় জ্বলে। অনেক দিন পরে আমার সাহানার কথা মনে পড়ে, সাহানা শব্দ থেকে রং দেখে, সংখ্যা দেখে রং দেখা কি তার থেকে খুব দূর হতে পারে? সিনেস্থেশিয়া মানেই হলো একটি বোধ দিয়ে আর একটি বোধের জাগরণ। দেখলাম শব্দ থেকে আলো সঞ্চারণ সিনেস্থেশিয়ারই একটা অংশ, সেটাকে ক্রোমেস্থেশিয়া বলে। তখনই ভাবি, দেশে গিয়ে সাহানাকে খুঁজে বের করতে হবে।

দুই বছর পরে দেশে ফিরে যুগীনগরের রাস্তায় বাসাটা খুঁজে বের করলাম। এভাবে হুট করে সাহানার খোঁজে চলে আসা ঠিক হবে কি না, বুঝতে পারছিলাম না, কিন্তু আমার আর কোনো উপায় ছিল না। বাইরে নামফলকে লেখা ছিল- আবদুর মুর্তজা। বাইরের দরজায় কড়া নাড়লে এক মধ্যবয়সী ভদ্রলোক দরজা খুললেন। আমি আমার পরিচয় দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম উনি মুক্তিযোদ্ধা মুর্তজা কি না। বললাম ওনার সঙ্গে কিছু কথা আছে, একটু সময় নিতে চাই ওনার। ভেতরে এসে বসতে বললেন। আমি কোনো ভূমিকা না করে বললাম, ‘আপনার স্ত্রী সাহানা কয়েক বছর আগে আমার চেম্বারে এসেছিলেন, তার একটা বৈশিষ্ট্য আলোচনা করতে।’

কিন্তু সাহানার নামটা উচ্চারণ করা মাত্র ভদ্রলোকের মুখ বদলে গিয়ে একটা কদাকার চেহারা ধারণ করল। চিৎকার করে বললেন, ‘কী বললেন? আমার স্ত্রী সাহানা। এখনই এই ঘর থেকে বের হন। ব্যাটা জোচ্চর, কি ঠগবাজি করতে এসেছ এখানে। মিথ্যাবাদী।’

আপনি থেকে তুমি, তারপর তুই, তারপর আরো অনেক ধরনের গালি- যা এখানে লেখা যাচ্ছে না- ব্যবহার করলেন। বুঝলাম আসাটা ঠিক হয়নি। আমি বেশ দ্রুতই প্রস্থান করলাম।

এ রকম অপমানিত জীবনে হইনি। মাথা নিচু করে হেঁটে যাচ্ছি, আর একটা রিকশার খোঁজ করছি, যাতে এই পাড়া থেকে পালাতে পারি। এই ছোট রাস্তায় রিকশা দাঁড়ানোর কোনো জায়গা নেই, কাজেই রিকশার পেতে হলে বড় রাস্তায় যেতে হবে। এর মধ্যে পেছন থেকে আমার জামাটা কে যেন টেনে ধরল। ভাবলাম আবু মুর্তজা আমাকে ধরেছে, এবার প্রাণ নিয়ে এখান থেকে যেতে পারলে হয়। ঘুরে তাকিয়ে দেখি একটি ১৭-১৮ বছরের মেয়ে। হাঁপাচ্ছে, তাকে আমাকে ধরতে তার অনেকটা দৌড়াতেই হয়েছে। একটু লজ্জিত হয়ে মুখ নিচু করে সে বলল, ‘আমার নাম রেবা, সাহানা আমার মায়ের নাম।’

আমি স্তম্ভিত হলাম। সে বলল, ‘আপনাকে এগিয়ে দিই।’

এই মেয়েটি আমাকে এগিয়ে দেবে মানে আমাকে এই পাড়া থেকে নিরাপদে বের করে দেবে! রেবা বলল, ‘আপনি মিথ্যেবাদী নন। আপনার মুখ দেখেই আমি সেটা বুঝতে পেরেছি। মানুষ সত্য বলে না মিথ্যা বলে, সেটা আমি সাথে সাথেই বুঝে যাই। মিথ্যা বলার সময় তাদের ত্বকের তাপমাত্রার সামান্য পরিবর্তন হয়, আমি সেটা ধরতে পারি।’

অল্পবয়সি কেউ এমন গুছিয়ে কথা কি বলতে পারে? আমি আশ্চর্য হই।

‘তুমি ধরতে পার? কীভাবে?’- আমি প্রশ্ন করি।

‘ত্বকের তাপমাত্রাভেদে বিভিন্ন আলো বের হয়, আমি সেটা দেখতে পাই। আপনি আমার মাকে খুঁজতে এসেছিলেন, কিন্তু আমার মা বেঁচে নেই। আপনার কাছে যিনি গিয়েছিলেন তিনি আমার মা নন, আমার সৎ-মা।’

রেবার কথাগুলো ধরতে আমার অসুবিধা হলো। রেবা আমার প্রশ্নের জন্য অপেক্ষা করে না, বলে, ‘আমার মায়ের মৃত্যুর পরে বাবা তার থেকে বয়সে প্রায় কুড়ি বছরের ছোট একজনকে বিয়ে করে। আমি তাকে সালেহা-মা বলে ডাকি। সালেহা-মা বাবার কাছ থেকে আমার মা সম্বন্ধে শোনে, বাবা তাকে মায়ের শব্দতে আলো দেখা, লেখায় রং দেখা সব বলে। প্রতিদিনই বলে। এই শুনতে শুনতে সালেহা-মা বোধহয় একধরনের বিভ্রান্তির মধ্যে পড়ে যায়। নিজেকে আমার মা-সাহানা- বলে ভাবতে শুরু করে। আপনার চেম্বারে যখন তিনি যান নিজেকে সাহানা ভেবেই যান।’

‘সব সময়ই যে তিনি সাহানা থাকেন তা নয়’, রেবা কিছুক্ষণ চুপ থেকে আবার বলে, ‘কিন্তু গত কয়েক বছরে এই আচরণটা বেড়েছে।’

‘আর তোমার মা? উনি কবে মারা গেলেন?’

‘১৯৭১ সালে, জুলাই মাসে। সন্ধ্যাবেলা পাকিস্তানি আর্মি গ্রামে ঢোকে। রহম রাজাকার নামে গ্রামেরই একজন তাদের পথ দেখিয়ে নিয়ে আসে। বাড়ির পেছনের ডোবায় মা লুকাতে গিয়েছিলেন। সেখানে তলিয়ে যান। সারা গ্রাম আর্মিরা জ্বালিয়ে দেয়, শ’খানেক লোককে হত্যা করে, অনেক মেয়েকে ধরে নিয়ে যায়। আমার নানা-নানি-মামাও মারা যান। পরে ডোবায় মায়ের দেহ ভেসে ওঠে, কিন্তু সেটা তুলে কবর দেবার লোক ছিল না।’

সাহানা-না সাহানা নয়, তরুণী সালেহা আমার চেম্বারে এসবই বলেছিল, শুধু সাহানার মৃত্যুর সংবাদটা দেয়নি।

‘আর তোমাকে নানাবাড়ির একটা ঘরে পাওয়া গিয়েছিল, কাঁদছিলে?’ আমি জিজ্ঞেস করি।

‘হ্যাঁ, আমি নাকি কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গ্রামের বাদবাকি লোকেরা ফিরে এলে তারা আমাকে উদ্ধার করে। বাবা আগস্ট মাসে ফিরে এসে আমাকে পায়। যুদ্ধের শেষদিকে ঢাকার কাছে একটা পাকিস্তানি ক্যাম্প থেকে উনি একটি মৃতপ্রায় মেয়েকে উদ্ধার করেন। সে মেয়েই সালেহা-মা।’

হাঁটতে হাঁটতে অনেক দূর নবাবপুর রোডে চলে এসেছিলাম। রেবাকে বললাম, ‘তুমি এখান থেকে বাড়ি ফিরে যেতে পারবে?’ রেবা বলল, ‘এখান থেকে একটা রিকশা নিয়ে নেব। আমার জন্য চিন্তা করবেন না। মানুষ সত্য না মিথ্যা বলছে তা যেমন বুঝি, লোকে কী করতে পারে তাও আগে থাকতে বুঝি। এটা আমার মায়ের থেকে পাওয়া শক্তি।’

রেবাকে রিকশায় তুলে দিয়ে সেই রিকশার দিকে বহুক্ষণ তাকিয়ে থাকি। ভাবি সাহানার ক্ষমতা সঞ্চারিত হয়েছে তার মেয়ের মাঝে, এমনকি অদ্ভুতভাবে সালেহার মাঝেও।

এর বহু বছর পরে একবার মার্কিন দেশে বেড়াতে এসে আমার দেখা হয় পুরোনো দিনের বন্ধু অমলের সাথে। এক শীতের তুষার পড়া অপরাহ্নে অমলকে এই কাহিনী বললে সে বলে, সংখ্যা থেকে রং দেখা যাবার ঘটনা সে জানে, আর শব্দ থেকে রঙের কথা- যাকে ক্রোমেস্থেশিয়া বলে- সে পড়েছে। অনেক বড় বড় ক্লাসিক্যাল সুরকারদেরও নাকি সে রকম ছিল। অমল বলল, মস্তিষ্কের বিভিন্ন অংশের মধ্যে অবাঞ্ছিত যোগাযোগ সিনেস্থেশিয়ার কারণ বলে অনেকে ব্যাখ্যা করলেও কিছু বিজ্ঞানীর মতে, এর কারণ আরো গভীর- মস্তিষ্ক ইন্দ্রিয়বোধকে কীভাবে ব্যাখা করছে বা কী অর্থ দিচ্ছে, তার ওপর নির্ভর করে। অমলের কাছে সাহানার চেয়ে সালেহার ঘটনাটা আরো চমকপ্রদ লাগল। ও বলল, আমাদের মাথায় মিরর বা আয়না নিউরন আছে, যেগুলো কিনা অন্য মানুষের কার্যকলাপকে প্রতিবিম্বিত করে। সাহানাকে না বাঁচাতে পারায় মুর্তজার মনে একধরনের দোষবোধ কাজ করে, যা সালেহাকে আর্মি ক্যাম্প থেকে উদ্ধার করেও দূর হয় না। তাই সে সালেহাকে প্রতিনিয়তই সাহানার গল্প করে। মুর্তাজার কাছে সাহানার কথা শুনতে শুনতে সালেহার আয়না নিউরনগুলো ধীরে ধীরে সালেহাকে সাহানা করে তোলে, এইভাবে সালেহার ওপর সাহানার অস্তিত্ব আরোপিত হয়।

‘আর রেবা?’ আমি প্রশ্ন করি। ‘রেবা সাহানার সন্তান, তার ক্ষেত্রেও সিনেস্থেশিয়া ঘটে’, বলে অমল, ‘তবে আমার কেন জানি মনে হয় ঐ পরিবারের সবাই- এমন কি আবু মুর্তজাও- এই বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। মুর্তজার সিনেস্থেসিয়া না থাকলে সালেহার নিউরনকে সে হয়তো বা প্রভাবিতই করতে পারত না।’

অমলের কথা শুনে আমি নীরব হয়ে বসে থাকি। কাঁচের জানালার বাইরে নিস্তব্ধে তুষার পড়ে। সেই নিস্তব্ধতা কোনো আলো সৃষ্টি করে না, কিন্তু সেই নিস্তব্ধতা আমার মনকে বিষণ্নতায় ভরিয়ে দেয়।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top