কক্সবাজারে শুটকি উৎপাদনের ধুম

sotki.jpg

মাহাবুবুর রহমান :
পর্যটন নগরী কক্সবাজারে এখন শুটকি তৈরি এবং তা প্রকৃয়াজাত করনে ব্যস্ত সময় পার করছে অন্তত ৫০ হাজার শুটকি তৈরির সাথে জড়িত শ্রমিক। সংশ্লিষ্টদের আশা এবার ৩০০ কোটি টাকার শুটকি উৎপাদন হতে পারে। যা দেশে বিদেশে শুটকির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এদিকে শুটকি ব্যবসায়িদের দাবী তাদের কোন ধরনের সরকারি ভাবে সহযোগিতা করা হয় না। এছাড়া যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই নাজুক, আর বিদ্যুৎ নেই, মোট কথা খুবই মানবেতর জীবন যাপন করে এই বিশাল শিল্পের সাথে কাজ করছে। যদি সরকারি ভাবে তাদের কিছু ঋন দিয়ে সহযোগিতা করতো তাহলে এই ব্যবসায় তারা আরো লাভবান হতে পারতো। একই সাথে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি করার দাবি জানান তারা।
কক্সবাজার শুটকি ব্যবসায়ি সমিতির কোষাধ্যক্ষ কায়সার আলম জানান প্রায় ১ মাসের বেশি সময় ধরে শুটকি উৎপাদন শুরু হয়েছে, তবে গত কয়েক দিন ধরে কার্যক্রম বেশি চলছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শুটকি মোকাম কক্সবাজারের নাজিরার টেক। এখানে চলতি মৌসুমে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার শুটকি উৎপাদন হতে পারে। যা দেশ বিদেশের শুটকির চাহিদা মেটাতে সক্ষম। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন দেশের সবচেয়ে বড় এই শিল্পকে সরকার কোন সহযোগিতা করেনা। বরং মাঝে মধ্যে অনেক ঝামেলায় ফেলে। এর সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে নাজিরারটেকে আসতে যোগাযোগ ব্যবস্থা খুবই খারাপ, কোন বড় গাড়ীতো আসার প্রশ্নই আসে না, মটরসাইকেলও আসে না। এছাড়া এখানে বিদ্যুৎ ব্যবস্থাও খুব নাজুক, বেশির ভাগ সময় লোভোল্টেজ থাকে। তিনি আশা প্রকাশ করেন এই মৌসুমে কমপক্ষে ২৫০ লাখ টন শুটকি উৎপাদন হবে যার আনুমানিক মূল্য ৩০০ কোটি টাকা।
স্থানীয় মৎস্যজীবী সমিতির সভাপতি আমান উল্লাহ বলেন শুটকি উৎপাদন একটি অনেক বড় প্রকৃয়া এটার সাথে কয়েক হাজার মানুষ জড়িত, আমার মতে শুটকি একটি বড় শিল্ল, কিন্তু এই ব্যবসা এখানো শিল্পের মর্যাদা পায় নি। আমরা খুবই কষ্টের মধ্যে থেকে ব্যবসা করে আসছি।
সরজমিনে গিয়ে দেখা গেছে শহরতলীর নাজিরারটেক, ফদনারডেইল, নুনিয়াছরা, সমিতিপাড়াসহ উপকূলীয় কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, হাজার হাজার আবাল বৃদ্ধ বনিতা শুঁটকি উৎপাদনে মহা ব্যস্ত। গভীর সাগর থেকে অসংখ্য ট্রলার মাছ আহরণ করে নাজিরারটেক ও ফদনারডেইল ঘাটে ভিড়ছে। এসব ট্রলার আসা বিভিন্ন কাঁচা মাছ রোদে শুকিয়ে শুঁটকি করা হচ্ছে। বাঁকখালী নদীর তীরের বিভিন্ন গ্রামের কয়েক হাজার বসত ঘরের ছাদে ও উঠানে মাচা বানিয়ে তৈরি হচ্ছে শুঁটকি।
এখানে ছুরি, লইট্যা, পোয়া, ফাইস্যা, লাক্কা, মাইট্যা, রূপচান্দা মাছসহ বিভিন্ন ধরনের শুঁটকি উৎপাদিত হয়।
এছাড়া পর্যটকদের চাহিদা পূরণে নানান প্রতিকূলতা এবং সীমাবদ্ধতার মধ্যে কক্সবাজারের উপকূলিয় উপজেলার বিভিন্ন স্থানে পুরোদমে চলছে শুঁটকি উৎপাদন। মহেশখালী উপজেলার কুতুবজোম ইউনিয়নের অর্ন্তভুক্ত সোনাদিয়া, শহরের পার্শবর্তি খুরুশকুল, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, টেকনাফের বাহারছড়া ও প্রবালদ্বীপ সেন্টমার্টিনের শুঁটকিমহালে চলছে শুটকি উৎপাদন।
মহেশখালীর শুটকি ব্যবসায়ি নাছির উদ্দিন বলেন মহেশখালীর শুটকি খুবই বিখ্যাত, আমাদের এখানে শতভাগ বিষমুক্ত এবং সুন্দর পরিবেশে শুটকি উৎপাদন হয়। তবে শুটকি উৎপাদন এবং বিপনন প্রক্রিয়ায় সরকার যদি আরো সহযোগিতা করতো তাহলে সবার জন্য ভাল হতো। তিনি বলেন, মহশখালীতে অন্তত ১৫/২০ হাজার মানুষ শুটকি ব্যবসার সাথে জড়িত। এখানে ছোট বড় মিলিয়ে প্রায় ৫০ টির বেশি শুটকি মহাল আছে।
সোনাদীয়ার স্থানীয় ব্যবসায়ী মনছুর আলম বলেন, দেশের ২০ শতাংশ শুঁটকি এখান থেকে উৎপাদিত হয়। এখানকার শুঁটকি তরতাজা মাছ কেটে করা হয় এবং এতে কোনো ধরনের ক্ষতিকর কীটনাশক মেশানো হয় না।
শহরতলীর নুনিয়াছরার শুঁটকি ব্যবসায়ী আবছার কামাল জানান, প্রতি সপ্তাহে তিনি নাজিরারটেক ও ফদনারডেইল গ্রাম থেকে গড়ে ১শ’ মন শুঁটকি চট্টগ্রামের খাতুনগঞ্জে সরবরাহ দিচ্ছেন। সেখান থেকে ওই শুঁটকি তিন পার্বত্য জেলা রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবানসহ সারা দেশে যাচ্ছে বলে তিনি জানান।
বর্তমানে প্রতিকেজি রূপচাঁদা ১২ শ’ থেকে আড়াই হাজার টাকা, মাইট্যা ৭শ’ থেকে ১ হাজার টাকা, কোরাল ৯শ’ থেকে দেড় হাজার টাকা, পোপা ৫শ’ থেকে ১ হাজার টাকা, চিংড়ি এক হাজার থেকে ২ হাজার টাকা, লইট্যা ৪শ’ থেকে ৮ শ’ টাকা, ছুরি ৬শ’ থেকে দেড় হাজার টাকা, অন্যান্য মাছ ২০০ থেকে ৫০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
শুঁটকি ব্যবসায়ীদের সঙ্গে আলাপকালে জানা যায়, শহরের নুনিয়াছরা এলাকার ১৬ টিসহ জেলার ৪১টি উৎপাদনকারী শুটাকি মহলে পোপা শুঁটকি রপ্তানি করে গত বছর প্রায় ১৮৬ কোটি টাকা আয় করে। পরিবেশ অনুকূলে থাকলে এ বছর শুঁটকি রপ্তানি থেকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আয়ের আশা করা হচ্ছে।
এসব মহালে উৎপাদিত বিপুল পরিমাণ পোপা শুঁটকি হংকং, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় রপ্তানি করা হচ্ছে। বেশির ভাগ পোপা শুঁটকি রপ্তানি হচ্ছে হংকং এবং হংকং-এ পোপা শুটকী তুমুল জনপ্রিয়। সেখানকার অধিবাসীরা পোপা শুঁটকি দিয়ে স্যুপ তৈরি করেন।
কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আব্দুল আলীম বলেন কক্সবাজারের শুটকির একটি বিশাল সুনাম আছে সেটা টিকিয়ে রাখতে হবে। মাঝে মধ্যে শুনা যায় শুটকিতে ক্ষতিকারক বিষ মিশিয়ে তারা কৃত্রিম ভাবে শুটকি উৎপাদন করছে এটা খুবই দুঃখ জনক। এ সময় তিনি শুটকি ব্যবসায়িদের সর্বাত্মকভাবে সহযোগিতা করা হয় বলে জানান।
বাংলাদেশ সল্টেড অ্যান্ড এক্সপোর্টাস অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি বলেন, সরকার ফ্রোজেন ফুডসহ রপ্তানিমুখী শিল্প প্রতিষ্ঠানে শতকরা ১০ ভাগ ইনসেনটিভ দিয়ে থাকে। কিন্তু পোপাসহ অন্যান্য শুঁটকি রপ্তানির ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা ওই সুবিধা পাচ্ছেন না। এই সুবিধা পেলে শুঁটকির বিপরীতে বার্ষিক বৈদেশিক উপার্জন ৪০০ কোটি টাকা ছাড়িয়ে যেত।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top