রক্তে লেখা আরেক নাম বিপ্লবী দৌলত খান আজ চকরিয়া গণতান্ত্রিক আন্দোলনের শহীদ দৌলত খানের ৩০তম শাহাদাৎ বার্ষিকী

Mijba-Chakaria-04-12-2017-2.docx-2.jpg

 

॥ এডভোকেট আমজাদ হোসেন ॥
আজ শহীদ দৌলত খানের ৩০ তম শাহাদাৎ বার্ষিকী। বিগত ১৯৮৭ সালের ৫ই ডিসেম্বর তৎ কালীন সামরিক শাসক এরশাদ এর শৃংখলাবদ্ধ গণতন্ত্রকে উদ্ধারের নিমিত্তে বাংলাদেশের সকল রাজনৈতিক দল যথাক্রমে জাতির জনকের তনয়া গণতন্ত্র মানসকন্যা বিশ্ব-নেত্রী দেশ-রতœ গড়ঃযবৎ ড়ভ ঐঁসধহরঃু জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন ১৫ দলীয় জোট ম্যাডাম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বাধীন ৭ দলীয় জোট ও রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বাধীন বা দলীয় জোট অর্থাৎ ত্রিদলীয় জোট মিলে জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ভোট ও ভাতের অধিকার পুনরুদ্ধারের আন্দোলন গড়ে তুলেন। আন্দোলন দিন দিন বেগবান হওয়ায় এক পর্যায়ে ৫ই ডিসেম্বর ১৯৮৭ সালে চকরিয়া উপজেলা ঘেরাও কর্মসূচী ঘোষণা করলে বৃহত্তর চকরিয়ার ত্রিদলীয় ঐক্য জোটের নেতা কর্মীরা কর্মসূচীমতে উপজেলা ঘেরাও এর সিদ্ধান্ত নেয়। ঐ সময় আমি বৃহত্তর চকরিয়া পেকুয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলাম।
তখন কক্সবাজার আওয়ামীলীগের তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক আমার পরম শ্রদ্ধাভাজন শিক্ষাগুরু জহিরুল ইসলাম এডভোকেটের সাথে যোগাযোগ করার বার বার চেষ্টা করেও ব্যর্থ হই।
৫ই ডিসেম্বর তৎকালীন স্বৈরাচার সরকার হঠাৎ স্কুল, কলেজ অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন। মিছিল, সমাবেশ, অবরোধ নিষিদ্ধ করে ফরমান জারী করে। এর পরেও আমরা বৃহত্তর চকরিয়ার ত্রিদলীয় ঐক্যজোটের নেতাকর্মীরা উপজেলা ঘেরাও কর্মসূচী বাস্তবায়নের সিদ্ধান্তে অটল থাকি।
শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বন্ধের ঘোষণা অনেক ছাত্রের অজানা ছিল। যে কারণে চকরিয়া বর্তমান বিশ্ববিদ্যালয় কলেজের অনেক ছাত্র কলেজে গিয়ে বন্ধের বিজ্ঞপ্তি শুনে ফেরৎ আসার কালে তৎকালীন কলেজ ছাত্রলীগের নেতা আমিনুর রশিদ দুলাল চকরিয়া কলেজের তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা খালেদুল ইসলাম, শাহ আলম, ইয়াহিয়া কুতুবী, তৎকালীন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের চকরিয়া উপজেলা সভাপতি জাকারিয়া, ছাত্রলীগ নেতা জিল্লুর রহমানদেরকে ম্যাজিষ্ট্রেট শফিকুর রহমান এর নেতৃত্বে চকরিয়া থানার একদল পুলিশ গ্রেফতার করে। তখন সকাল অনুমান ৮টা-৯টার দিকে। আমি তখন কর্মসূচীতে যাওয়ার জন্য প্রস্তুতি নিতেছিলাম। উদ্দেশ্য ছিল প্রথমে উপজেলা চেম্বারে যাব। পরে চিরিংগা স্টেশন হইতে সকলে একত্রিত হয়ে অবরোধ কর্মসূচী আরম্ভ করব। কিন্তু ছাত্রনেতাদের গ্রেফতারের আকস্মিকতায় আমি তাৎক্ষণিক রিকশাযোগে একা চিরিংগা স্টেশনে যাই। বর্তমান চিরিংগা স্টেশনস্থ রওশন মার্কেটের সামনে অবস্থান নিই। আমি যাওয়ার সাথে সাথে আমার সাথে যোগ দেন চকরিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগের সহ সভাপতি প্রয়াত মাষ্টার আবুল হাসেম বি.কম.। তাকে আমার সম্মুখে বেপরোয়াভাবে আহত করে পুলিশ গ্রেফতার করে। তৎকালীন ছাত্রনেতা সরওয়ার আলম, দৌলত খান, লুৎফুর কবির, আমিরুল কবির, আমিরু, জামাল উদ্দিন জয়নাল, এম.আর. চৌধুরী, ডুলাহাজারা আওয়ামীলীগ নেতা মোক্তার আহমদ, মীর আহমদ, আমার ছোট ভাই ছাত্রলীগ নেতা মরহুম শহিদ হোসেন ও কাইছার সহ শতাধিক নেতাকর্মী একত্রিত হলে আমি কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সাধারণ সম্পাদক শ্রদ্ধাভাজন এডভোকেট জহিরুল ইসলাম সাহেবের পুনরায় টেলিফোনে যোগাযোগে ব্যর্থ হইয়া আমরা উপজেলা অবরোধের নিমিত্তে চিরিংগা স্টেশন হইতে উপজেলা মুখী মিছিল আরম্ভ করি। “স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক” এই সমস্ত স্লোগনে স্লোগানে মিছিল চলতে থাকে। বর্তমান থানা রাস্তার মাথায় পুলিশ বাধা দিলে পুলিশের ব্যারিকেট ভঙ্গ করে আমরা উপজেলা অভিমুখী যাত্রা অব্যাহত রাখি। অনুমান ১২:০০ ঘটিকার দিকে আমরা উপজেলা ফটকে উপস্থিত হয়ে স্লোগান দিই এবং গ্রেফতারকৃত নেতা কর্মীদের মুক্তি দাবী করতে করতে তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী অফিসারের অফিস কক্ষের সামনে উপস্থিত হই। শত শত জনতা উপজেলা চত্ত্বর ঘেরাও করে এবং স্বৈরাচারের পতনের দাবীতে এবং সেই দিন গ্রেফতারকৃত ছাত্রনেতা ও তৎকালীন সহ-সভাপতি সদ্য প্রয়াত মাস্টার আবুল হাসেম বি.কম. সাহেবের মুক্তি দাবী করিয়া দীর্ঘক্ষণ বক্তৃতা দেওয়ার এক পর্যায়ে তৎকালীন উপজেলা ম্যাজিষ্ট্রেট জনাব শহিদুল্লাহ সাহেব এসে আমাকে লোকজন নিয়া চলে যাওয়ার জন্য নির্দেশ দেওয়ার সাথে সাথেই উপস্থিত রিজার্ভ পুলিশের সদস্যগণ একযোগে বক্তৃতারত অবস্থায় আমাকে বেদড়ক মারধর করে। ইতিমধ্যেই উপস্থিত পুলিশের তরফ থেকে আমাদের লক্ষ্য করে পঁচিশ রাউন্ড গুলি ছুঁড়ে। আবার অপর দিকে রমনাথ পোদ্দার নামক জনৈক পুলিশ কর্মকর্তা এস.আই. পিস্তল দিয়া গুলি করতে থাকে। এই সময় আমাদের লক্ষ্য করে রাইফেল ও পিস্তল থেকে যে গুলি ছুঁড়া হয়েছে তাতে দৌলত ঘটনাস্থলে আহত হয়। তার সাথে সাথে পুলিশ আমাকে গ্রেফতার করে টি.এন.ও. সাহেবের কক্ষে নিয়ে যায়। অপরদিকে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ও উপস্থিত জনতা দৌলতের গুলিবিদ্ধ দেহ নিয়ে হাসপাতালে গেলে তাকে ডাক্তারেরা মৃত ঘোষণা করেন।
আমার গ্রেফতারের খবরটি আমার স্ত্রী ফিরোজাকে টেলিফোনে দিতে চাইলে পুলিশ আমার হাত থেকে টেলিফোনের রিসিভারটি কেড়ে নেয়। দৌলতের মৃত্যুর সংবাদে সারা চকরিয়ার মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। বিকাল অনুমান ৫:০০ ঘটিকার দিকে আমাকে অনুমান শ-খানেক পুলিশ বেষ্টনীর মাধ্যমে আমাকে থানায় নিয়ে আসে এবং সমগ্র চকরিয়ায় কারফিউ জারী করা হয়।
থানায় ঢুকার সাথে সাথে এক দুর্ধর্ষ পুলিশ আমাকে লক্ষ্য করে রাইফেল নিয়ে আমার মাথায় স্বজোরে আঘাত করতে চাইলে আমি সরে গিয়ে আমার মাথা রক্ষা করি। অন্যথায় সেদিন আমারও মৃত্যু হতে পারত। তার কিছুক্ষণ পর আমাকে কক্সবাজার কারাগারে নিয়ে যাওয়া হয় এবং দৌলতকে কক্সবাজার নিয়া আসা হয়।
দৌলতের ময়না তদন্ত করা হয় নাই। কক্সবাজারের বিশিষ্ট আইনজীবী দৌলতের নিকট আত্মীয় জনাব ছৈয়দ আহমদ দৌলতের লাশ কক্সবাজার থানায় সনাক্ত করেন।
মরহুম আবুল হাসেম বি.এস.সি. দৌলতের লাশ নিজ গ্রামে নিয়ে আসে এবং তার দাফন সম্পন্ন করে। আমরা জেলে যাওয়ার পর তৎকালীন ছাত্রলীগের সভাপতি, বর্তমান শ্রমিক লীগের নেতা গিয়াস উদ্দিন এবং আজকের কক্সবাজারের বিশিষ্ট আইনজীবী অপুর বড়–য়া তপুকে জেলের অভ্যন্তরে পাই।
দৌলতের এই হত্যাকান্ডে সীমাহীন বর্বরতা যারা প্রদর্শন করেছিল তার মধ্যে এস.আই. রমা নাথ পোদ্দার, বর্তমানে মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে চাকরী ইস্তেফা দিয়েছে। সেদিনের ওসি জনাব আবদু রউফ আজ অবসর জীবন যাপন করছেন। সেদিন দৌলতের মৃত্যুতেও আমাদের গ্রেফতারে যারা গভীর শোক প্রকাশ করেছিল তাদের মধ্যে তৎকালীন পুলিশ সুপার জনাব শামীম রেজা আজ পৃথিবী ছেড়ে পরকালে চলে গেছেন। সেই দিনের জেলা প্রশাসক জনাব এম.এ. কামাল আজ আর চাকরীতে নেই। জেলা প্রশাসক এম.এ. কামাল ও পুলিশ সুপার শামীম রেজা প্রায় সময় জেলখানায় আমাদেরকে দেখেতে যেত সাথে তৎকালীন উপজেলা ম্যাজিষ্ট্রেট জনাব মইনুল হক। আমি শ্রদ্ধাভরে ওনাদের স্মরণ করি।
আজ ৩০ বৎসর পর হিসাব করার পালা। গণতান্ত্রিক আন্দোলনের এই শহীদের জন্য আমার ত্রিদলীয় ঐক্য জোটের নেতারা কি বা করলাম? দৌলতের মৃত্যুর পর পর আমাদের প্রাণ প্রিয় নেতা মরহুম আবদু রাজ্জাক সাহেব দৌলতের কবর জেয়ারতে গিয়াছিল, শোকসভা করেছিল। দৌলত অকালে মারা গেছেন। তার কিছুদিন পর তার পিতা করিম দাদ পরপারে চলে যান। পুত্রহারা, স্বামীহারা ফিরোজা বেগমের ব্যাপারে আমি ১৯৯৬ সালে নবগঠিত পৌরসভার প্রশাসক হওয়ার পর জননেত্রী শেখ হাসিনা গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের প্রধান মন্ত্রীর পদে আসীন হওয়ার পর দৌলতের পরিবারের কথা জানাইলে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা দৌলতের পরিবারকে ১ লক্ষ টাকা অনুদান প্রদান করেন। দৌলতের মাতা ফিরোজা বেগম উক্ত টাকা তৎকালীন জেলা প্রশাসক জনাব আলী ইমাম মজুমদার এর মাধ্যমে প্রাপ্ত হন। জননেত্রী শেখ হাসিনার উক্ত অনুদানের ভিত্তিতে দৌলতের অবিবাহিত বোনদের বিবাহ দেয়। দৌলতের মা ফিরোজা বেগম এখন আর বেঁচে নেই। দৌলতের স্মৃতি ধরে রাখার জন্য চকরিয়া উপজেলার জনাব জাহাঙ্গীর বুলবুল ও মখসুদুল হক ছট্টুর নেতৃত্বে দৌলত স্মৃতি সংসদ হয়েছিল। প্রতি বছর কোরআন খানী, মিলাদ মাহফিল ও শোকসভার আয়োজন করে। দৌলতের স্মৃতিকে অম্লান করে রাখার জন্য কক্সবাজার জেলা শহরে পাবলিক লাইব্রেরীর ময়দানকে শহীদ দৌলত ময়দান নামে নামকরণ করা হয়েছে।
৫ডিসেম্বর মিছিল আর আজকের মিছিল এক নয়। সেই দিনের মিছিল ছিল সংসার ত্যাগীদের মিছিল, আজকের মিছিল সাংসারিক মিছিল।
আমি দৌলত সহ সেই দিন মিছিলে যারা ছিল তাদের সংসার গড়ার বা বড় লোক হওয়ার কোন উদ্দেশ্য ছিল না। ছিল গণতন্ত্র উদ্ধারের, ভোট ও ভাতের অধিকার আদায়ের। দৌলতের অমর আত্মার মাগফেরাত কামনা করি। আল্লাহ তাকে বেহেশত নসিব করুক।
খোদা হাফেজ।
লেখকঃ কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সহ সভাপতিও কমিউনিটি পুলিশ কক্সবাজার এর সভাপতি, সাবেক সভাপতি, কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক প্রশাসক, চকরিয়া পৌরসভা।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top