বিলুপ্ত ডিপথেরিয়ার হানায় রোহিঙ্গারা

DP.gif

বিশেষ প্রতিবেদক :
প্রায় ত্রিশ বছর আগে বাংলাদেশ থেকে বিলুপ্ত ছোঁয়াচে রোগ ডিপথেরিয়ায় আক্রান্ত ১১০ জন রোহিঙ্গাকে সনাক্ত করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। ‘করনিব্যাক্টেরিয়াম ডিপথেরি’ নামক ব্যাকটেরিয়ায় ঘটিত সংক্রামক এই রোগে এ পর্যন্ত ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে জেলা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। আর এই সংক্রামক ব্যাধির হাত থেকে রোহিঙ্গা সহ স্থানীয়দের রক্ষা করতে গতকাল থেকে টিকা দেওয়া শুরু করেছে সরকার। অন্যদিকে বিলুপ্ত এই রোগটির সাখে অপরিচিত দেশের নতুন চিকিৎসকরা। তাই এই সংক্রামক ব্যাধি থেকে রোহিঙ্গা সহ স্থানীয়দের রক্ষা করা একটি বিশাল চ্যালেঞ্জ বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনীর দমন-পীড়নের মুখে গত ২৫ অগাস্ট থেকে প্রায় ছয় লক্ষ ৪৬ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছে। রাখাইনে দমন নিপীড়নের শিকার রোহিঙ্গারা দশকের পর দশক মৌলিক স্বাস্থ্য সেবা থেকেও বঞ্চিত রয়েছে।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. আব্দুস সালাম বলেন, ৯ ডিসেম্বর রাত পর্যন্ত ১১০ জন ডিপথেরিয়া রোগী সনাক্ত করা হয়েছে। তাদেরকে এমএসএফ হাসপাতাল, মালেশিয়ান হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। এ পর্যন্ত এই রোগে ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে।
উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য অফিসার ডা. মেজবাহ উদ্দিন বলেন, ডিপথেরিয়ার লক্ষণগুলো দেখা যায় ইনফেকশন হওয়ার দুই থেকে সাত দিন পরে। ৩৮ ডিগ্রী সেলসিয়াস বা ১০০.৪ ডিগ্রী ফারেনহাইট তাপমাত্রার জ্বর থাকে। ক্লান্তি ও শরীর ঠান্ডা হয়ে যায়। গলা ব্যথা হয়। গলার গ্রন্থি ফুলে যায়।ঢোক গিলতে সমস্যা ও ব্যথা হয়।অনেক বেশি কাশি হয়।
তিনি আরো বলেন, দুই থেকে তিন দিনের মধ্যে ব্যাকটেরিয়া যখন ভালো টিস্যুকে নষ্ট করে দেয় তখন মৃত টিস্যুগুলো পুরো ধূসর আবরণ তৈরি করে রোগীর গলা ও নাকে, একে সিউডোমেমব্রেন বলে। বিষাক্ত পদার্থ রক্ত¯্রােতে মিশে যেতে পারে যার ফলে হার্ট, কিডনি ও নার্ভ ড্যামেজ হয়ে যায়। গলার ভেতরে ধূসর আবরণ বা ফুলে যাওয়া টনসিল দেখে প্রাথমিকভাবে এ রোগ সনাক্ত করা হয়। এরপর আক্রান্ত স্থান থেকে টিস্যু নিয়ে কালচার করতে ল্যাবরেটরিতে পাঠিয়ে নিশ্চিত হতে হয়। কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার শাহীন মো. আব্দুর রহমান চৌধুরী বলেন, ডিপথেরিয়া একটি মারাত্মক সংক্রামক রোগ। প্রচন্ড জ্বর, গলা ব্যথা ও শ্বাসকষ্ট হচ্ছে ডিপথেরিয়ার প্রাথমিক লক্ষণ। তাই এই রোগের চিকিৎসার ক্ষেত্রে প্রথমে অ্যান্টিটক্সিন ইনজেকশন দিয়ে ব্যাকটেরিয়াকে ধ্বংস করতে হয়। এছাড়াও ইরাথ্রোমাইসিন ও পেনিসিলিনের মত এন্টিবায়োটিক দেওয়া হয় ইনফেকশন দূর করার জন্য। যেহেতু এটি একটি ছোঁয়াচে রোগ তাই ডিপথেরিয়ার রোগীদের অন্যদের থেকে আলাদা রাখা হয়।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. আবদুস সালাম বলেন, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহযোগীতায় বাংলাদেশ সরকার গতকাল থেকে উখিয়ার ৪৮ টি ও টেকনাফের ১২ টি ভ্রাম্যমান ক্যাম্প থেকে রোহিঙ্গাদের মাঝে ডিপথেরিয়ো রোগের প্রতিষেধক টিকা প্রদান করছে। পর্যায়ক্রমে ৫ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়া হবে। এতে ১২০ জন স্বাস্থ্যকর্মী কাজ করছে। তিনি আরো বলেন, এছাড়া রোহিঙ্গা ক্যাম্প অধুষ্যিত এলাকার স্থানীয় শিশুদের মাঝেও এই টিকা দেওয়া হবে।
সিভিল সার্জন আরো বলেন, রোগটি এদেশ থেকে বিলুপ্ত হয়েছে অনেক যুগ আগে। এই রোগের সাথে তাই আমাদের নতুন ডাক্তাররা অপরিচিত। একারণে এই রোগের মোকাবেলা আমাদের জন্যও একটি চ্যালেঞ্জ।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top