রোহিঙ্গা কাম্পে ছোঁয়াচে রোগের ছড়াছড়ি

Rohingya_Myanmar-4.jpg

বিশেষ প্রতিবেদক :
কলেরা, হাম, কালাজ্বর, গুটি বসন্ত, চর্মরোগ, বিলুপ্ত ডিপথেরিয়া সহ মারাত্বক সব ছোয়াচে রোগে আক্রান্ত উখিয়া ও টেকনাফে আশ্রিত রোহিঙ্গরা। গত সাড়ে ৩ মাসে নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৭ লক্ষ ৮০ হাজার ৩৪১ জনকে চিকিৎসা দিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ। এরমধ্যে ডিপথেরিয়ায় ৬ এবং এইডসে ২ জন সহ নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ৪৭ জন রোহিঙ্গা মারা গেছে।
কক্সবাজার সদর হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (এরএমও) মো. শাহীন আবদুর রহমান বলেন, রোহিঙ্গা গোষ্ঠীটি মিয়ানমারে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত ছিল। আমাদের দেশে আমরা যেমন বিভিন্ন রেভগের প্রতিষেধক হিসেবে নানা ধরনের টিকা গ্রহন করে থাকি কিন্তু তারা এদেশে আসার আগে কখনো কোন ধরনের টিকা গ্রহন করেনি। এজন্য রোহিঙ্গারা নানা ছোয়াচে রোগে আক্রান্ত। পাশাপাশি তাদের মধ্যে রয়েছে নানা ধরণের পানিবাহিত রোগ।
তিনি আরো বলেন, গত সাড়ে তিনমাস যাবৎ সদর হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে ২৫০ রোহিঙ্গা রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
কক্সবাজার সিভিল সার্জন ডা. আবদুস সালাম বলেন, ২৫ আগষ্টের পর থেকে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত জেলা স্বাস্থ্য বিভাগ ৭ লক্ষ ৮০ হাজার ৩৪১ জন রোহিঙ্গাকে চিকিৎসা দিয়েছে। এদের মধ্যে ডায়রিয়া রোগী ১ লক্ষ ৪৫ হাজার ৫১৯ জন, সর্দি, জ্বর, কাশি ও নিউমোনিয়ায় আক্রান্ত ২ লক্ষ ৪ হাজার ৮৪০ জন, হামের রোগী ৬৮ জন, জন্ডিসে আক্রান্ত ১ হাজার ৩৬৫ জন, চর্মরোগী ৬৫ হাজার ২৩১ জন, অপুষ্টির শিকার ২০ হাজার ৯৩৬ জন, মানসিক সমস্যায় ভুগছে ৩ হাজার ২৪২ , টিভি’তে আক্রান্ত ৭৪ জন। এছাড়া অন্যান্য নানা রোগে আক্রান্ত ১ লক্ষ ৩২ হাজার ৫৭৭ জন রোহিঙ্গাকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।
তাছাড়া ১০৭ জন এইডস রোগী এবং ১১০ জন ডিপথেরিয়া আক্রান্তকে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।একই সময়ে ৩ হাজার নারী এদেশে এসে সন্তান প্রসব করেছে। এছাড়া এই মুহুর্তে গর্ভবতী নারী রয়েছে আরো ২২ হাজার। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে ১০ অক্টোবর পর্যন্ত ৪৭ জন রোহিঙ্গা মারা গেছে।
সিভিল সার্জন আরো বলেন, একজন রোহিঙ্গার শরীরে একাধিক রোগ রয়েছে। এমন রোগীও আমরা পেয়েছি যিনি একদিকে সর্দি, জ্বরে আক্রান্ত অন্যদিকে সারা শরীরে চর্মরোগ রয়েছে। এছাড়া পাশপাশি সেই রোগী অপুষ্টিরও শিকার ছিল।
সরেজমিনে গতকাল কুতুপালং, বালুখালি, মধুরছড়া, গুলশান পাহাড়, আমতলী ও জামতলী রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শণ করে দেখা যায়, মেডিকেল ক্যাম্পগুলোর সামনে লম¦া ভীড়। চিকিৎসকরা জন্য আগতদের অধিকাংশ চর্মরোগ, ডায়রিয়া, আমাশয় ও সর্দি জ্বরে আক্রান্ত। আগতদের বেশীরভাগ, শিশু, নারী ও বৃদ্ধ।
ওই সময় আমতলী রেডক্রিসেন্ট মেডিকেল ক্যাম্পে চিকিৎসা নিতে আসা রোহিঙ্গা নারী সুফিয়া বলেন, মিয়ানমারের থাকা অবস্থা থেকেই তার মাঝে মাঝে কাপুনি দিয়ে জ্বর আসত। আবার ঘাম দিয়ে ছেড়ে যেত। তার হাটুতে, বাহুতে ব্যথা করে। এজন্যই মেডিকেল ক্যাম্পে এসেছেন। এখানে আসার পর তাকে রক্ত পরীক্ষা করা হয়। পরে তার শরীরের ম্যালেরিয়া ধরা পড়ে। এখন তিনি এসেছেন ম্যালেরিয়ার ওষুধ নিতে।
এ বিষয়ে রেডক্রিসেন্ট মেডিকেল টিমের এক স্বেচ্ছাসেবী বলেন, রোহিঙ্গারা অসচেতন। তাদেরকে সচেতন করতে গত তিন মাস আমরা এখানে কাজ করছি। যাদের সাথে আমরা এ পর্যন্ত কাজ করেছি তাদের শতকরা ৫ ভাগকে সচেতন করতে পেরেছি।
উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা মেজবাহ উদ্দিন বলেনÑ কলেরা, টাইফয়েড়, ডিপথেরিয়া, পোলিও ও হামের মত ছোঁয়াচে রোগে আক্রান্ত রোহিঙ্গারা। এদেরকে সেবা দিতে উখিয়ায় ৪৮ টি ও টেকনাফে ১২ টি মেডিকেল টিম কাজ করছে।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. আবদুস সালাম বলেন, নতুন আসা রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৩ লক্ষ ৯১ হাজার ৩৯৭ জনকে কলেরার টিকা, ১ লক্ষ ২৭ হাজার জনকে ভিটামিন এ ক্যাপসুল, ১ লক্ষ ২৯ হাজার ৭৫০ জনকে রুবেলার টিকা, ও ৬৯ হাজার ৫৩৯ জন রোহিঙ্গাকে পোলিওর টিকা খাওয়ানো হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, শনিবার থেকে রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ডিপথেরিয়োর প্রতিষেধক টিকা দেওয়া হচ্ছে। আমরা ৫ লক্ষ রোহিঙ্গাকে এই টিকা প্রদান করব। এছাড়া রোহিঙ্গাদের চিকিৎসায়,১০০ জন এমবিবিএস, বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, ইন্টার্নি চিকিৎসক, মেডিকেল স্টুডেন্টসহ ২ হাজার জনবল কাজ করছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top