নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে কক্সবাজারের বধ্যভূমি

COXS-BAZAR-MOHESH-KHALI-BODDOVOME-PIC-14082016.jpg

তুষার তুহিন :
স্বাধীনতার ৪৫ বছরে দেশে কয়েকদফা সরকারের পটপরিবর্তন হয়েছে। সরকারের সাথে সাথে পাল্টেছে কক্সবাজার জেলার চেহারা। তবে এত দীর্ঘ সময়েও সংরক্ষিত হয়নি কক্সবাজারের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, বধ্যভূমি, গণকবরসহ নানা স্থাপনা। এসব স্থাপনা সংরক্ষণ করা হবে বলে অনেকবার আশ্বাস দিয়েছিল জেলা প্রশাসন। সর্বশেষ ২০১৫ সালের ৯ ডিসেম্বর কক্সবাজার জেলা সম্মেলন কক্ষে জেলার ১২ টি বধ্যভূমি সংরক্ষনের উদ্দ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলা জানানো হয়েছিল। তারপর ক্যালেন্ডারের পাতা থেকে হারিয়ে গেছে দুটি বছর। সংরক্ষনের কোন উদ্যোগই নেয়নি প্রশাসন। উল্টো প্রশাসনের চরম উদাসীনতা, দায়িত্বহীনতা, অবজ্ঞা, অযতœ আর অবহেলায় কালের বিবর্তণে নিশ্চিহ্ন হওয়ার পথে কক্সবাজার জেলার ১২ টি বধ্যভুমি। তবে প্রশাসন বলছে, উদাসীনতা নয়, টাকার অভাবেই সংরক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না জেলার বধ্যভূমিগুলো।
মুক্তিযোদ্ধা সংসদ সূত্র জানায়, কক্সবাজার জেলার তিনটি উপজেলায় ১২টি স্থানকে বধ্যভূমি হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কক্সবাজার পৌরসভার কবিতা চত্বর সড়কের ১৬ ইসিবির দপ্তর সংলগ্ন ছয় একর জমি। মহেশখালীতে ১০টি ও টেকনাফে একটি বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে। তবে এসবের একটিকেও সংরক্ষণ করা হয়নি। উল্টো বেদখল হয়ে গেছে আটটি বধ্যভূমি, চারটি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এছাড়া ইতিহাসের পাতা থেকে এসব স্মৃতিচিহ্ন মুছে দিতে চলছে নানা ষড়যন্ত্র।
বীর মুক্তিযোদ্ধা গোলাম রব্বান জানান, ১৯৭১ সালের ১২ মে কক্সবাজার শহরে কবিতা চত্বর রোডে পুরোনো সিভিল রেস্ট হাউসে (১৬ ইসিবি দপ্তর) পাকিস্তানি বাহিনী ক্যাম্প স্থাপন করে। এরপর থেকেই সেখানে চলে ধর্ষণ, নির্যাতন, আর খুন। প্রতিদিন রাত পোহালেই দেখা যেতো শেয়াল-কুকুর অসংখ্য নারী পুরুষের মরদেহ নিয়ে টানাটানি করছে।
তিনি আরো জানান, স্বাধীনতার ৪৫ বছর পরও শহরের বধ্যভূমির ছয় একর জায়গা এখনো মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়নি।
এ ব্যাপারে বধ্যভূমি চিহ্নিত কমিটির অন্যতম সদস্য প্রবীণ আইনজীবী অ্যাডভোকেট হাবিবুর রহমান জানান, ১৯৯৭ সালে শহরের বধ্যভূমিটি চিহ্নিত করা হয়। ইসিবি ক্যাম্পের পশ্চিম ও উত্তর পাশের ছয় একর জমিকে। সে সময় বধ্যভূমিকে চিহ্নিত করে চারপাশে বাঁশের বেড়া দেওয়া হয়। কিন্তু ক্ষমতার পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে বেদখল হয়ে গেছে সেই বধ্যভূমি।
বীর মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার হোসেন জানান, একটি মহল মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্নকে ধ্বংস করার জন্য সেখানে গড়ে তুলেছে বাহারছড়া উচ্চ বিদ্যালয়, ইসলামিয়া মহিলা কামিল মাদ্রাসা, মসজিদ, এতিমখানা ও বসতবাড়িসহ নানা স্থাপনা।
সরেজমিনে শহরের কবিতা চত্বর সড়কের বধ্যভূমি এলাকা পরিদর্শন করে দেখা যায়, বধ্যভূমির পশ্চিমপাশে উচ্চ বিদ্যালয়, এর পেছনে শ’দুয়েক রোহিঙ্গা পরিবারের বসতি, এর পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ছড়ার পাশে বাউন্ডারি দিয়ে ঘেরা ইসলামিয়া মহিলা কামিল মাদ্রাসা। এর ভেতরে রয়েছে তিন তলা তিনটি ভবন। যেসব নির্মাণ বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমল থেকে। এর পাশে রয়েছে একটি মসজিদ। এরপর দালাল এতিম কমপ্লেক্স নামে একটি তিন তলা ভবন। ওই ভবনের সামনে দিয়ে ১৬ ইসিবি দপ্তর ও বিমান বাহিনীর ঘাঁটি। বিমান বাহিনীর ঘাঁটির পেছনে রয়েছে ওই পাতকূয়া দু’টি। তবে ময়লা আবর্জনায় ভরাট হয়ে গেছে।
কক্সবাজার বধ্যভূমি নামক প্রবন্ধের লেখক সাংবাদিক ফজলুল কাদের চৌধুরী জানান, বধ্যভূমির জমিতে গড়ে উঠেছে ওই স্কুল মসজিদ মাদ্রাসা ভবনসহ এতিমখানা।
এছাড়া মহেশখালী উপজেলার ১০টি বধ্যভূমির মধ্যে ছয়টি বধ্যভূমি বেদখল হয়ে গেছে। বাকি চারটি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এর মধ্যে গোরকঘাটা বাজার ও দক্ষিণ হিন্দু পাড়া, ঠাকুরতলা আদিনাথ পাহাড়, হোয়ানক পুইছড়ি, মুন্সির ডেইল, কালারমারছড়া বাজার এলাকার বধ্যভূমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে দোকানপাট ও বসতঘর।একই উপজেলায় অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে বড় মহেশখালী দেবেঙ্গাপাড়া, দেবেঙ্গাপাড়া শ্মশান, পালপাড়া ও কায়স্থপাড়া এলাকার বধ্যভূমি।
তাছাড়া টেকনাফ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পেছনে নাইটং পাহাড়ের পাদদেশে একটি বধ্যভূমি অরক্ষিত অবস্থায় রয়েছে। এ বধ্যভূমির জমিতে বসতবাড়ি গড়ে উঠেছে।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সভাপতি এড. সিরাজুল মোস্তফা বলেন, জেলাবাসী চায় মুক্তিযুদ্ধে স্মৃতিস্থান সংরক্ষিত হোক। কিন্তু প্রশাসনের সেভাবে আগ্রহ নেই। এবার বিজয় মেলার মঞ্চ থেকে, বিজয় দিবস উপলক্ষে জেলা আওয়ামীলীগের আলোচনা সভা এবং জেলা প্রশাসন কর্তৃক মুক্তিযোদ্ধা সংবর্ধণা অনুষ্ঠান থেকে জেলার মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিচিহ্ন, বধ্যভূমি, গণকবরসহ নানা স্থাপনা সংরক্ষনের এজেন্ডাটি তুলে ধরা হবে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক মো. মাহিদুর রহমান জানান, ১৪ ডিসেম্বর জেলা প্রশাসনের সম্মেলন কক্ষে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা হয়েছে। তবে সত্যি বলতে কি এসব কাজ নানা ব্যস্ততার কারণে শুধু আলোচনাতেই থেকে যায়।
তিনি আরো বলেন, জেলা প্রশাসনের নিজস্ব অর্থায়নে বধ্যভুমি সংরক্ষনের মত বৃহৎ কাজ করা সম্ভব নয়। এর জন্য দরকার সরকারী ফান্ড। টাকার অভাবের কারণে মূলত আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ থাকছে স্বাধীনতার স্মৃতিচিহ্নের সংরক্ষণ।
মহেশখালী-কুতুবদিয়া আসনের সংসদ সদস্য ও জাতীয় সংসদের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক স্থায়ী কমিটির সদস্য আশেক উল্লাহ রফিক বলেন, সরকার সারাদেশে একই নকশা বধ্যভূমিতে স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করবে। সে লক্ষ্যে সারাদেশ থেকে বধ্যভূমি চিহ্নিত করা হয়েছে। প্রকল্পটি বর্তমানে জিডিপি’তে রয়েছে। সেখান থেকে বাস্তবায়ন হলেই প্রকল্পের কাজ শুরু হবে। আশা করছি খুব শীঘ্রই বাজেট পাশ হয়ে যাবে এবং প্রজন্মের জন্য মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষণ করা সম্ভব হবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top