আন্তর্জাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবসের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতেও দুর্নীতি!

download-4-1-1-1.jpg

দুর্নীতি কি? দুুর্নীতি দমন কমিশন আইন,২০০৪ এর ২(ঙ) ধারায় প্রদত্ত সংজ্ঞা অনুযায়ী ’দুর্নীতি’ অর্থ দুদক আইনের তফসিলে উল্লেখিত অপরাধসমূহ। গত ২১ জুন, ২০১৬ তারিখের সংশোধনী অনুযায়ী সংশোধিত সর্বশেষ তফসিল অনুযায়ী প্যানেল কোডের ১৬১,১৬২,১৬৩, ১৬৪, ১৬৫, ১৬৫এ, ১৬৫বি, ১৬৬,১৬৭,১৬৮,১৬৯,২১৭,২১৮ ও ৪০৯ এর অধীন অপরাধসমূহ এবং প্যানেল কোডের ৪২০, ৪৬৭,৪৬৮,৪৭১ ও ৪৭৭এ ধারার অধীন কোন অপরাধ সরকারী সম্পদ সম্পর্কিত হলে অথবা সরকারী কর্মচারী বা ব্যাংকের কর্মকর্তা-কর্মচারী বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারী কর্তৃক দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনকালে সংঘটিত হলে কেবল সেক্ষেত্রে বর্ণিত অপরাধসমূহ। ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি দমন আইনের অপরাধসমূহ। মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন,২০১২ এর অধীন ঘুষ ও দুর্নীতি সংক্রান্ত অপরাধসমূহ। উল্লেখিত অপরাধের সাথে সংশ্লিষ্ট বা সম্পৃক্ত প্যানেল কোডের ১০৯,১২০বি এবং ৫১১ এর অধীন অপরাধসমূহ।
উল্লেখিত প্যানেল কোড বা দন্ডবিধির ধারাগুলোর অর্থ কি বা ধারাগুলোতে কি আছে? কোন অপরাধের প্ররোচনা দেয়া বা সহায়তা করার শাস্তি ১০৯ ধারায় আছে। মৃত্যুদন্ড,যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা দুই বছর বা ততোধিক মেয়াদের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডনীয় কোন অপরাধ করার জন্য অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র করার শাস্তির বিধান আছে ১২০বি ধারায়। সরকারী কর্মচারী হয়ে বা হবার আশা করে কোন সরকারী কার্য করার জন্য বা করা থেকে বিরত থাকার জন্য ঘুষ নেওয়ার শাস্তির বিধান ১৬১ ধারায়। অসাধু বা অবৈধ উপায়ে সরকারী কর্মচারীকে প্রভাবিত করার উদ্দেশ্যে ঘুষ নেওয়ার শাস্তির বিধান ১৬২ ধারায়। সরকারী কর্মচারীর ব্যক্তিগত প্রভাব প্রয়োগের জন্য ঘুষ নেওয়ার শাস্তির বিধান ১৬৩ ধারায়। সরকারী কর্মচারীকর্তৃক ১৬২ ও ১৬৩ ধারায় বর্ণিত অপরাধসমূহের সহায়তা করার শাস্তির বিধান ১৬৪ ধারায়। সরকারী কর্মচারী কর্তৃক তার কার্যের সাথে জড়িত কোন ব্যক্তির নিকট থেকে বিনামূল্যে কোন মূল্যবান বস্তুু গ্রহন করার শাস্তির বিধান ১৬৫ ধারায়। ১৬১ ও ১৬৫ ধারায় অপরাধে সহায়তা করার শাস্তির বিধান আছে ১৬৫এ ধারায়। ১৬১ বা ১৬৫ ধারার অপরাধে সহায়তা করতে বাধ্য,প্রলুব্ধ,জোর বা বশ করে করা হলে সহায়তাকারীর অব্যাহতির বিধান আছে ১৬৫বি ধারায়। কোন ব্যক্তির ক্ষতি সাধনকল্পে সরকারী কর্মচারীকর্তৃক আইন অমান্য করার শাস্তির বিধান আছে ১৬৬ ধারায়। ক্ষতি সাধানকল্পে সরকারী কর্মচারী কর্তৃক অসুদ্ধ বা ভুল দলিল প্রণয়ন করার শাস্তির বিধান আছে ১৬৭ ধারায়। সরকারী কর্মচারী বেআইনীভাবে ব্যবসায়ে নিয়োজিত হওয়ার শাস্তির বিধান আছে ১৬৮ ধারায়। সরকারী কর্মচারী কর্তৃক বেআইনীভাবে সম্পত্তি ক্রয় বা নিলাম ডাকার শাস্তির বিধান আছে ১৬৯ ধারায়। কোন ব্যক্তিকে শাস্তি থেকে বা কোন সম্পত্তিকে বাজেয়াপ্তকরণ থেকে বাঁচানোর উদ্দেশ্যে সরকারী কর্মচারী কর্তৃক আইনের নির্দেশ লংঘন করার শাস্তির বিধান আছে ২১৭ ধারায়। কোন ব্যক্তিকে শাস্তি থেকে বা কোন সম্পত্তিকে বাজেয়াপ্তিকরণ থেকে রক্ষার জন্য সরকারী কর্মচারীকর্তৃক ভুল দলিল বা লিপি প্রণয়নের শাস্তির বিধান আছে ২১৮ ধারায়। সরকারী কর্মচারী,ব্যাংকার,ব্যবসায়ী বা এজেন্ট কর্তৃক অপরাধজনক বিশ্বাসভঙ্গের শাস্তির বিধান আছে ৪০৯ ধারায়। প্রতারণা ও ঠকবাজীর দ্বারা সম্পত্তি অর্পণ বা মূল্যবান দলিল প্রণয়ন পরিবর্তন বা নষ্ট করা বা করতে অসৎভাবে প্ররোচনা দেওয়ার শাস্তির বিধান আছে ৪২০ ধারায়। মূল্যবান দলিল,উইল বা মূল্যবান দলিল প্রণয়ন বা হস্তান্তরের বা অর্থ গ্রহনের ক্ষমতা জাল করার শাস্তির বিধান ৪৬৭ ধারায়। প্রতারণার জন্য জালিয়াতী করার শাস্তির বিধান আছে ৪৬৮ ধারায়। জাল বলে জেনেও জাল দলিলকে প্রকৃত দলিল হিসাবে ব্যবহার করার শাস্তির বিধান ৪৭১ ধারায় এবং মিথ্যা হিসাবপত্র রাখার শাস্তির বিধান আছে ৪৭৭এ ধারায়। যাবজ্জীবন কারাদন্ড বা অন্য কোন মেয়াদের কারাদন্ডে দন্ডনীয় অপরাধ করার চেষ্টার শাস্তির বিধান আছে ৫১১ ধারায়।
কোন সরকারী কর্মচারী ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি দমন আইনের ৫(২) ধারায় বর্ণিত অপরাধমূলক অসদাচরণ সংঘটন করলে বা সংঘটনের উদ্যোগ গ্রহন করলে ৭বছর পর্যন্ত কারাদন্ড,অর্থদন্ড বা উভয় দন্ডে দন্ডিত হবেন এবং সংশ্লিষ্ট আর্থিক সম্পদ বা সম্পত্তিও রাষ্ট্রের অনুকুলে বাজেয়াপ্ত হবে।
দেশে দুর্নীতি এবং দুর্নীতিমূলক কার্য প্রতিরোধের লক্ষ্যে দুর্নীতি এবং অন্যান্য সুনির্দিষ্ট অপরাধের অনুসন্ধান এবং তদন্ত পরিচালনার জন্য একটি স্বাধীন দুর্নীতি দমন কমিশন প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে ’দুর্নীতি দমন কমিশন আইন,২০০৪’ প্রণীত হয়। দুদক আইনের তফসিলে উল্লেখিত অপরাধগুলোর অনুসন্ধান ও তদন্ত করে আসামীদের বিরুদ্ধে আদালতে বিচারের জন্য অভিযোগপত্র দাখিল করতে পারে। অপরাধের বিচারের ভার আদালতের ওপর। দুদকের আইন প্রণয়নের যেমন ক্ষমতা নাই,অপরাধীদের বিচার করে শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতাও নাই।
দুর্নীতি দমন কমিশন আইন,২০০৪ এর ১৭(ছ) ধারায় নির্ধারিত কার্যাবলী সম্পাদনের জন্য ১৭(ট) ধারার বিধান অনুযায়ী দুদক দেশের প্রতিটি এলাকায় দুর্নীতি প্রতিরোধের উদ্দেশ্যে গণসচেতনতা গড়ে তোলার লক্ষ্যে জেলা,উপজেলা,নগর ও মহানগর পর্যায়ে দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি গঠন কল্পে ২০১০ সালে একটি গঠনতন্ত্র ও কার্য-নির্দেশিকা প্রণয়ন করে। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির মূল কাজ হল অহিংস পদ্ধতিতে ও প্রচলিত আইন ও বিধি-বিধানের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থেকে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণ-সচেতনতা সৃষ্টির জন্য বিভিন্ন ধরনের প্রচারণামূলক কর্মসুচী গ্রহন করা। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে সততা ও নিষ্ঠাবোধ সৃষ্টি করে দুর্নীতির বিরুদ্ধে গণসচেতনতা গড়ে তোলা। দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি কার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে দুর্নীতি দমন কমিশনের দিক নির্দেশনা অনুসরণ করতে বাধ্য। প্রতিরোধ কমিটির সদস্যদের জন্য বর্জনীয় বিষয়সমূহ হল, কমিশনের অনুসন্ধান বা তদন্ত কার্যক্রমকে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত করা থেকে বিরত থাকা। সরকারী,আধা-সরকারী,স্বায়ত্বশাসিত বা বেসরকারী কোন দপ্তরের দাপ্তরিক কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ করা বা প্রভাব বিস্তার করা হতে বিরত থাকা। ব্যক্তিস্বার্থে কারো বিরুদ্ধে মিথ্যা,তুচ্ছ বা বিরক্তিকর তথ্য কমিশনে প্রেরণ করা হতে বিরত থাকা। আইনতঃ যে কাজ করা উচিত তা না করা বা আইনতঃ যে কাজ করা উচিত নয় তা করাই দুর্নীতি।
দুদকের নির্দেশনা অনুযায়ী দেশের দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটিগুলো প্রতি বছর আর্ন্তজাতিক দুর্নীতি প্রতিরোধ দিবস,দুর্নীতি প্রতিরোধ সপ্তাহ ও অন্যান্য বিশেষ দিনগুলো পালন করে থাকে। এই বছর প্রথম বারের মত আর্ন্তজাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবস সরকারীভাবে পালন করার সিদ্ধান্ত হওয়ায় দুদক ও কক্সবাজার জেলা প্রতিরোধ কমিটি কক্সবাজার জেলা প্রশাসনকে দিবসটি পালনে যথাসাধ্য সহযোগিতা করে। দুদকের একজন ডেপুটি ডাইরেক্টর,একজন সহকারী ডাইরেক্টর ও জেলা প্রতিরোধ কমিটির পক্ষে সাধারণ সম্পাদক বেশ কয়েক দিন আগে থেকেই জেলা প্রশাসনের সাথে যোগাযোগ রেখে সহযোগিতা করে। দুর্নীতি বিরোধী পোস্টার সরবরাহ করা,পোস্টারগুলো কক্সবাজার শহরের গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দেওয়ালে লাগিয়ে দেওয়া,ব্যানার,ফেস্টুন ও ক্যাপ সরবরাহ করেছে। জেলা প্রশাসনের কর্মসুচীতে অংশ গ্রহন করে আলোচনা সভায় দুদকের সহকারী ডাইরেক্টর অজয় সাহা সুচনা বক্তব্য দিয়েছেন,জেলা প্রতিরোধ কমিটির সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক অজিত দাস ও সভাপতি এডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর দুর্নীতি বিরোধী বক্তব্য রেখেছেন। ব্যানার,ফেস্টুন ও ক্যাপে লিখা ছিল আয়োজনের কক্সবাজার জেলা প্রশাসন ও সহযোগিতায় দুদক ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি। কিন্তু মিডিয়ায় প্রচারের জন্য প্রেরিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে দুদক ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির কথা যেমন উল্লেখ নাই,আলোচনা সভায় বক্তৃতা দেওয়া বক্তাদের তালিকায়ও দুদকের সহকারী ডাইরেক্টর বা প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি,সাধারণ সম্পাদকের নাম নাই। কক্সবাজার জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সাবেক সভাপতি এডভোকেট সিরাজুল মোস্তফা সভায় উপস্থিত না থাকলেও তিনি বক্তৃতা দিয়েছেন বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। জেলা মহিলা আওয়ামী লীগের সভাপতি কানিজ ফাতেমা বক্তব্য রেখেছেন বলে উল্লেখ করা হলেও নজিরবিহীন দ্রুত গতিতে সভা শেষ করায় তাকে বক্তৃতা করার সুযোগই দেওয়া হয় নাই। আর একজন বড় কর্মকর্তা বক্তৃতা না দিলেও তার নামও বক্তব্য রেখেছেন মর্মে উল্লেখ করা হয়েছে। মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সম্মানিত ব্যক্তিদের বড় করা হয়েছে,না ছোট করা হয়েছে? বিতর্কিত প্রেস বিজ্ঞপ্তিটি কে বা কারা তৈরী করেছেন ? তাদের কাছে দুদক ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির নাম এত অপছন্দের ও বর্জনীয় কেন ?
কক্সবাজারের একজন মেধাবী ও নির্ভীক সাংবাদিক মোহাম্মদ আলী জিন্নাত বলেন, আর্ন্তজাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবসের সংবাদ তিনি প্রেস বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী তৈরী করেন নাই। প্রেস বিজ্ঞপ্তির সাথে প্রেরিত ছবি দেখেই তার পরিচিত ব্যক্তিদের নাম তিনি দিয়েছেন ’রূপসীগ্রাম’ পত্রিকায়। ছবিতে কক্সবাজারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের প্রধান এবং স্থানীয়ভাবে পরিচিত ও সম্মানিত ব্যক্তিদের দেখা যাচ্ছে, ব্যানার ফেস্টুন,ক্যাপ ইত্যাদিতে সহযোগিতায় দুদক ও কক্সবাজার জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি লেখা পরিস্কার পড়া যাচ্ছে।
দুদক ও দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির লাগাতার গণসচেতনতামূলক কর্মসূচীর কারণে কক্সবাজারে ইতোমধ্যেই অসততা,মিথ্যা ও দুর্নীতি বিরোধী গণসচেতনতা বেশ বৃদ্ধি পাওয়ায় সচেতন ব্যক্তিরা আমাদের প্রকাশ্যে প্রশ্ন করছেন,আর্ন্তজাতিক দুর্নীতি বিরোধী দিবস পালন সংক্রান্ত অনুষ্ঠানের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতেও কি দুর্নীতি ? মিথ্যা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ না করে ঘুমিয়ে থাকাও কি দুর্নীতি নয়?
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top