স্থানীয় ও রোহিঙ্গাদের সহায়তায় আইওএম

Ukhiya-Cox-Rafique-19-12-2017.docc_-e1513750327547.jpg

রফিকুল ইসলাম :
সেপ্টেম্বরের ১৩ তারিখ, প্রচুর বৃষ্টি, সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছে। এসময় কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের পাশে উখিয়ার কুতুপালং আমতলায় বৃষ্টিতে ভিজে তখন বেহাল অবস্থা দুই দিন পূর্বে সেনা নির্যাতনের মুখে প্রান বাঁচাতে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গা আফলাতুন্নেছা। সাথে পিতৃহারা তিন জন ছোট এতিম শিশু। পেটের ক্ষুধা শরীরে যন্ত্রনা, কাদা, খাল, বিল, পাহাড়, জঙ্গল পেরিয়ে ১০দিন পায়ে হেঁটে আসতে আসতে সবাই অসহ্য যন্ত্রনায় কাতর। যখন কেউ তাদের খোঁজ নিচ্ছিলনা তখনই পর দিন সকালে আইওএম এর জনৈক কর্মী আফলাতুন্নেছাকে কুতুপালং নতুন শরণার্থী শিবিরে আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাতে নির্মম মানবতাবিরোধী অপরাধের শিকার হওয়া হাজার হাজার রোহিঙ্গা পরিবারকে আশ্রয় ও অন্যান্য মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে জাতিসংঘের আর্ন্তজাতিক অভিবাসন সংস্থা বা আইওএম।
জাতিসংঘের উক্ত সংস্থা গত ২৫ আগষ্টের পর থেকে মিয়ানমারের উত্তর রাখাইনে ভয়াবহ মানবিক বিপর্যয়ে কবলে পড়া লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গাদের পাশে মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সাথে স্থানীয় দরিদ্র লোকজনদেরও। গতকাল মঙ্গলবার উখিয়ার কুতুপালং নতুন উদ্বাস্তু শিবিরের ২/৫নং ব্লকের আইওএম পরিচালিত স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে কথা হয় অনেক রোহিঙ্গা, নারী, শিশু ও পুরুষের সাথে। তাদের মতে দেশে থাকতে বিনামূল্যে সহজলভ্য সরকারি হাসপাতালে স্বাস্থ্য সেবা পায়নি কোনদিন। অসুখ বিসুখ হলে গ্রাম্য কোয়াক ডাক্তার, ওঝা-বৈদ্য বা হুজুরের শরনাপন্ন হওয়া ছাড়া আর কোন কিছু ভাবাই কষ্ট কর ছিল। ৮মাসের সন্তান সম্ভাবা দিল জান খাতুন জানান, দেশে শত শত রোহিঙ্গা গর্ভবর্তী মা কোন টিকা বা সরকারি স্বাস্থ্যসেবা পায়নি। এখানে প্রতিদিন দুই একবার স্বাস্থ্য কর্মীরা ঘরে ঘরে গিয়ে খোঁজ নিচ্ছে। একটু সমস্য হলেই নিয়ে আসছে ডাক্তারের কাছে এ হাসপাতালে। অবস্থা সম্পন্ন হাতেগোনা কিছু পারিবার ছাড়া অধিকাংশ রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে বিশুদ্ধ নল কূপের পানি পান করা সহজ ছিল না। হাজার হাজার লোক বাঁশ ঝাঁড়, খাল পাড়ে, ঝোপ জঙ্গলে, খোলা বিলে মলমূত্র ত্যাগ করতো। আর এখানে সব কিছু বলতে গেলে অনেকটা পুরোপুরি স্বাস্থ্যসম্মত। ফলে যেভাবে এক স্থানে এগুলো মানুষের বসবাস, সেখানে নিজ দেশের পরিবেশ থাকলে নির্ঘাত প্রতিদিন অসংখ্য লোক মারা যেতো বলে দাবি করেন, রোহিঙ্গা মাস্টার জাফর আলম।
জাতিসংঘের অন্যান্য সংস্থা, বিভিন্ন আইএনজিও, এনজিও, ব্যক্তির পাশাপাশি রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু শিবিরগুলোতে জরুরি এসব মানবিক সহায়তা প্রদান করে যাচ্ছে আইওএম। সংস্থাটির মতে গত ১৩ ডিসেম্বর পর্যন্ত নতুন ভাবে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আশ্রয় নিয়েছে ৬লাখ ৫৫ হাজার রোহিঙ্গা। সংস্থাটির কমিইউনিকেশন অফিসার শিরিন আক্তার এর দেয়া তথ্য মতে এ পর্যন্ত আইওএম ৫লাখ ৮১ হাজার উদ্বাস্তুদের আবাসন সহ অন্যান্য মানবিক সহায়তার ব্যবস্থা করেছে। আবাসন নির্মানের অন্যান্য উপকরনের পাশাপাশি ১লাখ ২৩ হাজারটি তেরপালিন বিতরন করা হয়েছে। ৩২ হাজার রোহিঙ্গাকে নন ফুড আইটেম বিতরন করা হয়েছে। ১লাখ ১৮ হাজার অসুস্থ রোহিঙ্গাকে স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হয়েছে। ২৮টি গভীর নলকূপের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানীয় জল, ১৪৫০টি স্বাস্থ্য সম্মত ল্যাট্রিনের মাধ্যমে ৭০ হাজার রোহিঙ্গা সুবিধা ভোগ করছে। ৫৯ হাজার রোহিঙ্গার মাঝে হাইজিন কিট বিতরণ করা হয়েছে। ৯১ হাজার ৫শ মানসিক দু:স্থ রোহিঙ্গা শনাক্ত করে তন্মধ্যে ৩হাজার ৫শ গুরুতর আন্ত মানসিক রোগি, ১৪ হাজার ২শ বহিঃ রোগীকে চিকিৎসার আওতায় আনা হয়েছে। ৩হাজার ৬শ জন চরম দু:স্থদের সম্ভ্রম বা মর্যাদাপূর্ণ ব্যবস্থার আওতায় আনা হয়েছে। ১১ হাজার দু:স্থ রোহিঙ্গাদের মাঝে সোলার ল্যাম্প বিতরন করা হয়েছে।
আইওএম এর তথ্য মতে আন্তর্জাতিক বিভিন্ন দাতা দেশ, ও সংস্থার সহযোগিতায় বাংলাদেশ সরকারের সাথে ঘনিষ্ট সম্পর্ক বজায় রেখে মিয়ানমারে কঠিন নির্যাতনের শিকার হয়ে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রিত রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটির কক্সবাজারস্থ সাব-অফিস প্রধান মিস সংযুক্তা সাহানি জানান রোহিঙ্গাদের পাশাপাশি আইওএম ক্ষতিগ্রস্ত উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন সামাজিক, পরিবেশ গত অবকাটামো বির্নিমানে সহায়তার উদ্যোগ নিয়েছে। উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আধুনিক প্রায় সব ধরনের চিকিৎসা সুবিধা ও সেবা প্রদানের সহযোগিতা করছে আইওএম। এতে স্থানীয় দরিদ্র লোকজনদের বিনামূল্যে স্বাস্থ্য সেবা ও ওষুধ প্রদান, প্রয়োজনে উন্নততর চিকিৎসার ব্যবস্থা করা হচ্ছে। তিনি জানান, রোহিঙ্গাদের মাঝে ডিপথেরিয়া সহ নানা সংক্রামক ব্যধির কারনে যাতে এলাকার লোকজনদের স্বাস্থ্য ঝুঁকিতে পড়তে না হয় সে দিকে আইওএম সতর্কভাবে দৃষ্টি দিচ্ছে বলে জানিয়ে তিনি জানান বিভিন্ন দিকের পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার লোকজনদের কর্মসংস্থান সহ নানা আয়বর্ধকমূলক কাজে নিয়োজিত করে স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থ সামাজিক অবস্থার উন্নয়নের কাজ করছে আইওএম।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top