অর্ধশত হাসপাতাল রেডিওলজি ও টেকনোলজিস্টবিহীন

images-16.jpg

শিপন পাল :
জেলায় অভিজ্ঞ ল্যাব রেডিওলজি ও টেকনোলজিস্টবিহীনভাবে (এক্স-রে) চলছে অর্ধশতাধিক হাসপাতাল। নিয়ম না থাকলেও প্রশিক্ষণবিহীন টেকনিশিয়ান দ্বারা পরিচালিত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলো। নীতিমালায় টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্টবিহীন কোন ধরণের হাসপাতাল গড়ে তোলা যাবেনা বলে স্পষ্ট উল্লেখ থাকলেও তা মানছেন না সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। ঠেকানো যাচ্ছে না সনদবিহীন ভূয়া লোকবল নিয়োগ। যার কারণে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এদিকে জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য জেলায় বেশ কয়েকবার অভিজ্ঞ রেডিওলজি ও টেকনোলজিস্ট (এক্স-রে) দ্বারা হাসপাতাল পরিচালনা করার দাবি উঠলেও তা বরাবরই তা স্থবির। নির্দ্ধিধায় চালানো হচ্ছে ভুয়া লোকবল দিয়ে হাসপাতালের কার্যক্রম।
সূত্রে প্রকাশ, জেলার প্রায় হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট (এক্স-রে) এর পরিবর্তে বর্তমানে অনভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান দ্বারা কাজ চালানো হচ্ছে। মূলতঃ সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ অভিজ্ঞ টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্টদের পর্যাপ্ত বেতন দিয়ে নিয়োগ দিতে ইচ্ছুক নন। যার কারণে স্বল্পবেতনে অনভিজ্ঞ টেকনিশিয়ান দ্বারা হাসপাতালের গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো পরিচালনা করা হচ্ছে। ভুক্তভোগী হচ্ছে শুধুমাত্র জেলার জনগণ। যার কারণে জনস্বাস্থ্য পুরোপুরি নিশ্চিত করা যাচ্ছে না। এতে একদিকে যেমন নির্ভুল রিপোর্ট পাওয়া যাচ্ছে না অন্যদিকে অর্থও অপচয়ও বেড়ে চলছে। যার কারণে মৃত্যু সংখ্যাও বাড়ার সম্ভাবনা থেকে যায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলার বেশ কয়েকটি হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ব্যতিত প্রায় হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়াগনস্টিক সেন্টার অভিজ্ঞ ল্যাব টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্টবিহীন। কিছু কিছু হাসপাতালে অভিজ্ঞ টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট থাকলেও তা স্বল্পতার কারণে জনসেবা পুরোপুরি নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।
ভুক্তভোগী অনেকের অভিমত, কক্সবাজার জেলার সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল রেডিওলজি ও টেকনোলজিস্ট বিহীনভাবে পরিচালিত হওয়ায় ভাল মানসম্মত সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে সাধারণ মানুষ। অভিজ্ঞ রেডিওলজি ও টেকনোলজিস্টের কাজগুলো করানো হচ্ছে সাধারণ টেকনিয়ানদের দিয়ে। যার কারণে পশ্রাব পরীক্ষা করাতে গেলে অনেক সময় টেকনিশিয়ানদের রিপোর্ট আসে কিডনির সমস্যা নিয়ে। ফলে বিভ্রান্তকর অবস্থায় পড়তে হয় জেলার সাধারণ রোগীদের। কক্সবাজারের এক্স-রে রিপোর্ট এতো নিন্মমাণের যে অন্য কোথাও গেলে তা কোন ডাক্তার গ্রহণ করেননা। দেশের অন্যান্য জায়গার রিপোর্টগুলোর সাথে কক্সবাজার জেলার রিপোর্টগুলোর কোন মিল থাকে না। সমস্যা পশ্রাব পর্যন্ত থেকে যায়। কিডনি পর্যন্ত যায়ই না। অথচ কক্সবাজার জেলার রিপোর্টগুলো হয় উল্টো। এমন অনেক ঘটনা জেলার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে রয়েছে।
সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, শহরের ন্যাশনাল হাসপাতাল, সি-সাইড হাসপাতাল, কক্সবাজার সদরের ঈদগাঁহর পপুলার ল্যাব, ঈদগাঁও ন্যাশনাল হাসপাতাল, ডায়বেটিক কেয়ার সেন্টার, ঈদগাঁহ ডিজিটাল হাসপাতাল, ঈদগাঁহ ডায়গনস্টিক সেন্টার, ঈদগাঁহ সেন্ট্রাল হাসপাতাল, ঈদগাঁহ মেডিকেল সেন্টার, মা মনি হাসপাতাল, মর্ডাণ ডায়গনষ্টিক সেন্টার, রিখা মেডিকেল সেন্টার, সী-কক্স ডায়গনস্টিক সেন্টারে কোন ধরণের অভিজ্ঞ ল্যাব টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট (এক্স-রে) নেই।
একইভাবে উখিয়ার লাইফ কেয়ার হাসপাতাল, উখিয়া সেঞ্চুরী ল্যাবেও কোন ধরণের অভিজ্ঞ ল্যাব টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট নেই। এদিকে রামু ডায়গনস্টিক সেন্টারও চলছে অভিজ্ঞ টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট বিহীনভাবে।
অন্যদিকে চকরিয়ার সিটি হাসপাতাল, চক্ষু হাসপাতাল, এশিয়ান হাসপাতাল, মা ও শিশু হাসপাতাল, ল্যাব ইন, ল্যাব হাউস, পপুলার ডায়গনস্টিক সেন্টার, পপুলার ল্যাব, শেফা প্যাথলজি, হামজা প্যাথলজি, হিল সাইড, একুশে ডায়গনস্টিক সেন্টার, সান রাইজ প্যাথলজি সেন্টার, বদরখালী প্যাথলজি সেন্টার, বদরখালী ল্যাব হাউজ, ল্যাব কেয়ার চকরিয়া, মডেল ল্যাব হারবাং ডায়গনস্টিক সেন্টারও অবৈধভাবে চলছে অভিজ্ঞ ল্যাব টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট বিহীনভাবে। অনুরূপভাবে মহেশখালীর নিউরন ডায়গনস্টিক সেন্টারেও নেই অভিজ্ঞ কোন ল্যাব টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট।
এদিকে কক্সবাজার সদর উপজেলায় প্রায় ২ ডজন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টার, কেয়ার সেন্টারের মধ্যে শুধুমাত্র কক্সবাজার মেডিকেল হাসপাতালে ৬ জন টেকনোলজিস্ট ও ২ জন রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট, সুর্য্যরে হাসি ক্লিনিকে রেডিওলজি টেকনোলজিস্টবিহীন ১ জন টেকনোলজিস্ট, ঈদগাঁহর নাবিল ডায়গনস্টিকে রেডিওলজি টেকনোলজিস্টবিহীন ১ জন টেকনোলজিস্ট রয়েছে। একইভাবে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেডিওলজি টেকনোলজিস্টবিহীন ২ জন টেকনোলজিস্ট, উখিয়ার অরজিন হাসপাতালে ২ জন টেকনোলজিস্ট ও ১ জন রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট রয়েছে। অন্যদিকে রামু উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেডিওলজি টেকনোলজিস্টবিহীন ১ জন টেকনোলজিস্ট রয়েছে।
চকরিয়ার গড়ে উঠা প্রায় ৩০টি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টার, কেয়ার সেন্টারের মধ্যে কোন ধরণের রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট নেই বললেই চলে। পুরো চকরিয়ায় শুধুমাত্র ৮টি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টার, কেয়ার সেন্টারে রয়েছে অভিজ্ঞ ল্যাব টেকনোলজিস্ট বিশেষজ্ঞ। এরমধ্যে চকরিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১জন টেকনোলজিস্ট, ডিজিটাল হাসপাতালে ১ জন টেকনোলজিস্ট, শেফা প্যাথলজি সেন্টারে ১ জন টেকনোলজিস্ট, বৈশাখী ল্যাবে ১ জন টেকনোলজিস্ট, জমজম হাসপাতালে ১ জন টেকনোলজিস্ট, চকরিয়া মেডিকেল সেন্টারে ২ জন টেকনোলজিস্ট, সিটি ল্যাবে ১ জন টেকনোলজিস্ট, শেভরণ ডায়গনস্টিক সেন্টারে ১ জন টেকনোলজিস্ট ও ১ জন রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট রয়েছে।
একইভাবে মহেশখালী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে রেডিওলজি টেকনোলজিস্টবিহীন ২ জন টেকনোলজিস্ট ও নিউরন ডায়গনস্টিক সেন্টার চলছে রেডিওলজি ও টেকনোলজিস্ট বিহীনভাবে।
বঙ্গবন্ধু টেকনোলজিস্ট (চিকিৎসা প্রযুক্তিবিদ) পরিষদ কক্সবাজার জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক দিল মোঃ শাহ আলম জানান, জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার জন্য অভিজ্ঞ ল্যাব রেডিওলজি ও টেকনোলজিস্টদের (এক্স-রে) কোন বিকল্প নেই। কারণ এনাদের দ্বারা তৈরিকৃত রিপোর্ট দিয়ে ডাক্তাররা ঔষধপথ্য দিয়ে থাকেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলেও সত্য যে, আমাদের পুরো কক্সবাজার জেলা জুড়ে নামেমাত্র কয়েকটি হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টারে অভিজ্ঞ রেডিওলজিস্ট ও টেকনোলজিস্ট রয়েছে। বাকী হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টারগুলো চালানো হচ্ছে অনভিজ্ঞ লোকবল নিয়োগ করে। শুধুমাত্র সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কিছু অর্থ সাশ্রয় করার আশায় এমনটি হচ্ছে। এর ফলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্থ হচ্ছে জেলার সাধারণ মানুষ। এরা প্রকৃতঅর্থে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। অভিজ্ঞ ল্যাব টেকনোলজিস্ট ও রেডিওলজি টেকনোলজিস্ট (এক্স-রে) দ্বারা জেলার সংশ্লিষ্ট হাসপাতাল, ক্লিনিক, ডায়গনস্টিক সেন্টার, কেয়ার সেন্টারগুলো পরিচালনা করার জন্য আমরা বার বার আন্দোলন করেছি। হাসপাতাল পরিচালনার নীতিমালা অনুসরণ করার জন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দাবি করেছি। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নীতিমালা পরিপন্থি কাজ করার বিষয়টিও আমরা সরকারের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের বরাবরে দাবি করেছি। আমরা চাই জেলার সাধারণ মানুষ স্বাস্থ্যসেবা থেকে যেন বঞ্চিত না হয়।
কক্সবাজার জেলা সিভিল সার্জন আবদুস সালাম জানান, অভিজ্ঞ ল্যাব রেডিওলজি ও টেকনোলজিস্ট (এক্স-রে) যেকোন হাসপাতালের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ যেকোন হাসপাতাল করার আগে ল্যাব রেডিওলজি ও টেকনোলজিস্ট বাধ্যতামূলকভাবে রাখার নিয়ম রয়েছে। কক্সবাজার জেলায় অভিজ্ঞ ল্যাব রেডিওলজি ও টেকনোলজিস্ট (এক্স-রে) বিহীনভাবে চালানো সংশ্লিষ্ট হাসপাতালগুলোর ব্যাপারে আমাদের দৃষ্টি রয়েছে। অভিজ্ঞ ল্যাব রেডিওলজি ও টেকনোলজিস্ট বিহীনভাবে চালানো অবৈধ হাসপাতালগুলোর জন্য জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। এব্যাপারে আমাদের কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top