রোহিঙ্গা পাচারকারী আসামীর পক্ষে জামিনের আবেদন

download-4-1-1-1.jpg

আমার স্নেহের জুনিয়ার এডভোকেট বন্ধু হরি সাধন পাল টেকনাফ এলাকার একজন হাজতী আসামীর পক্ষে একটি জামিনের দরখাস্ত অবকাশকালীন দায়রা জজ আদালতে শুনানী করার জন্য মক্কেলসহ আমার চেম্বারে আসেন। একজন মহিলা আসামী দুগ্ধপোষ্য শিশুসহ এই মামলায় হাজতে ছিলেন। মহিলা বিবেচনায় তাকে জামিন দিলেও মালয়েশিয়ায় রোহিঙ্গা পাচারের অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃত পুরুষ আসামীকে ম্যাজিষ্ট্রেট আদালত এবং দায়রা জজ আদালত বার বার জামিনের প্রার্থনা করার পরও জামিনের আবেদন নামজ্ঞুর করছেন। এই বার আপনাকে দিয়েই জজ কোর্টে শুনানী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি বলে মামলার কাগজপত্রগুলো আমাকে দেন। আমি সাধারণতঃ কাগজপত্রের বাইরের বা আইনবর্হিভুত অপ্রয়োজনীয়,অপ্রাসঙ্গিক কোন কথা মামলা শুনানীর সময় আদালতে বলে আদালতের মূল্যবান সময় নষ্ট করি না। যারা প্রাসঙ্গিক-অপ্রাসঙ্গিক না বুঝে আইনতঃ অপ্রয়োজনীয় লম্বা সাবমিশন দেন তাদের আমি পছন্দ করি না। লম্বা সাবমিশনে কোর্ট যেমন বিরক্ত হন, অন্যান্য আইনজীবীরাও আকারে ইঙ্গিতে বিরক্তিবোধ প্রকাশ করেন। কিন্ত এই মামলায় মানব পাচার আইনের ৭/৮ ধারায় অভিযুক্ত হাজতী আসামীর জামিনের জন্য আদালতের অনুমতি নিয়ে নথীবর্হিভুত কিছু কথা বলতে হবে।
মামলার সংক্ষিপ্ত বিবরণ হল, গোপন সুত্রে পুলিশ খবর পান যে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাকে ইঞ্জিন নৌকাতে করে মালয়েশিয়া পাচার করার উদ্দেশ্য টেকনাফের সমুদ্রচর এলাকার একটি বাড়ীতে জমায়েত করে রাখা হয়েছে। রাতের আধারে পাচার করা হবে। পুুলিশ গিয়ে কথিত পাচারের জন্য প্রস্তুত ১৯জন রোহিঙ্গাকে উক্ত বাড়ী থেকে উদ্ধার করেন এবং পাচারকারী দলের সক্রিয় সদস্য হিসাবে একজন পুরুষ ও একজন মহিলাকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করে থানায় মামলা দায়ের করেন।
অবকাশকালীন দায়রা জজ আদালতে আমি শুনানীর শুরুতে বলি, মানব পাচার সংক্রান্ত সংঘবদ্ধভাবে সংঘটিত আন্তঃদেশীয় অপরাধসমূহ প্রতিরোধ ও দমন এবং মানব পাচার অপরাধের শিকার ব্যক্তিবর্গের সুরক্ষা ও অধিকার বাস্তবায়ন ও নিরাপদ অভিবাসন নিশ্চিতকরণের উদ্দেশ্যে আমাদের দেশে মানব পাচার প্রতিরোধ ও দমন আইন,২০১২ প্রণীত হয়। উক্ত আইনের ৭ ধারায় সংঘবদ্ধ মানব পাচারের শাস্তি হল অপরাধ সংঘটনকারী ব্যক্তি মৃত্যুদন্ডে বা যাবজ্জীবন কারাদন্ডে বা অন্যুন সাত বছর সশ্রম কারাদন্ডে এবং পাঁচ লক্ষ টাকা অর্থদন্ডে দন্ডিত হবেন। ৮ ধারায় মানব পাচারের অপরাধ সংঘটনে প্ররোচনা,ষড়যন্ত্র বা প্রচেষ্টার দন্ড হল, অনধিক সাত বছর এবং অন্যুন তিন বছর সশ্রম কারাদন্ড এবং অন্যুন বিশ হাজার টাকা অর্থদন্ড। আমার মক্কেলকে এজাহারের দাবী মতে ঘটনাস্থল থেকে হাতে নাতে ধৃত করা হয়েছে। ১৯জন রোহিঙ্গাও আলামত হিসেবে উদ্ধার করা হয়েছে। আইনতঃ মহিলা বিবেচনায় যে আসামীকে জামিন মজ্ঞুর করা উচিত ছিল তাকেও জামিন মজ্ঞুর করা হয়েছে। এই আসামীর জামিনাবেদন ইতিপূর্বে একাধিক বার নামজ্ঞুর করা হয়েছে। কেন বা কোন নতুন কারণে আমি আবার জামিনের প্রার্থনা করছি? আদালতের সদয় অনুমতি নিয়ে আমি মাত্র দশ মিনিট আদালতের সামনে থাকা নথীবর্হিভুত কিছু অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক ও যুক্তিসঙ্গত কথা এবং যুক্তি উপস্থাপন করবো। আমরা পত্রিকায় প্রকাশিত ও ইলেক্ট্রোনিক মিডিয়ায় প্রচারিত প্রতিবেদন থেকে জানতে পারি যে বর্তমানে মালয়েশিয়ায় তিন লাখ,পাকিস্তানে আড়াই লাখ,সৌদি আরবে তিন লাখ,ইন্দোনেশিয়ায় বিশ হাজার,ভারতে চল্লিশ হাজার এবং প্রতিবেশী অন্যান্য দেশগুলোসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আরো লক্ষাধিক রোহিঙ্গা বসবাস করছে। উল্লেখিত দেশের প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে কেবলমাত্র যে চল্লিশ হাজার ভারতে বসবাস করছে তারা সরাসরি মিয়ানমার-ভারত সীমান্ত পেরিয়ে সে দেশে গিয়েছে। ইউএনএইচসিআর এর উদ্যোগে মাত্র ১০০০ রোহিঙ্গা সরকারীভাবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে বৈধভাবে বসবাস করছেন। বাকী প্রায় সাড়ে নয় লাখ রোহিঙ্গাকে মিয়ানমার সরকার সরকারীভাবে পাসপোর্ট দিয়ে বিদেশে পাঠায় নাই বা যে দেশে রোহিঙ্গারা বসবাস করছেন সেই দেশও তাদের সরকারীভাবে নেয় নাই। তারা কিভাবে সে দেশগুলোতে গিয়েছে? তারাও যদি এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে থাকতো তাহলে বাংলাদেশে এখন রোহিঙ্গার সংখ্যা ২২/২৩ লাখ হতো। প্রায় দশ লক্ষাধিক রোহিঙ্গারা চোরাকারবারী বা মানব পাচারকারীদের সহায়তায় সেই দেশসমূহে গিয়ে বসবাস করছে। ১৯৭৮ সালে বার্মিজ সেনাবাহিনীর নির্যাতনের কারণে যে লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল তারা আনুষ্ঠানিকভাবে বার্মায় ফিরে গিয়েছে। প্রকৃত সত্য হল প্রত্যাবাসিত রোহিঙ্গারা কিছু দিনের মধ্যে আবার নির্যাতিত হয়ে বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করেছে। ১৯৯২ সালের চুক্তি অনুযায়ীও বেশীর ভাগ রোহিঙ্গাকে দিনে আনুষ্ঠানিকভাবে ফিরিয়ে নিয়ে রাতের আধারে আবার বাংলাদেশে তাড়িয়ে দিয়েছে। প্রায় ৪০ হাজার রোহিঙ্গা এখনও পুরাতন শরণার্থী শিবিরে বসবাস করছে। ২০১২সালে একবার এবং ২০১৬ সালের অক্টোবরে আবার বড় সংখ্যক রোহিঙ্গাকে হত্যা,নির্যাতন,ধর্ষণের মূখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য করেছে মিয়ানমারের সেনাবাহিনী। যখন যে সরকার ক্ষমতায় ছিল বাংলাদেশের কোন সরকারই মিয়ানমারের বিরুদ্ধে রোহিঙ্গা বিতাড়নের আনুষ্ঠানিক কোন অভিযোগ করে নাই। বরং নিরবতার মাধ্যমে রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ মেনে নিয়েছে । কক্সবাজার জেলার অনেক এলাকায় বাংলাদেশী জনগণের চেয়ে রোহিঙ্গা আশ্রয় গ্রহনকারীদের সংখ্যা বেশী হয়ে গেছে। কক্সবাজারের পাহাড়,পর্বত,গাছ গাছালি,জীবজন্তু,পশুপাখী,পরিবেশ ও মানব জীবন রোহিঙ্গা আগ্রাসনে ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্থ। তা কক্সবাজারের ভুক্তভোগী জনগণই সরাসরি উপলব্ধি করতে পারছে। আদালত প্রশ্ন করতে পারেন,আইনতঃ অজামিনযোগ্য অপরাধে অভিযুক্ত আসামীকে জামিন কেন দেব? বাংলাদেশের কোন নাগরিক পাহাড়ের গাছ কাটলে বন আইনে মামলা হয়,পাহাড় কাটলে পরিবেশ আইনে মামলা হয়,পাসপোর্ট ছাড়া কেউ বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করলে বা কোন বাংলাদেশী নাগরিক প্রতিবেশী রাষ্ট্রে অনুপ্রবেশ করলে অবশ্য গ্রেপ্তার হবেন, বৈদেশিক নাগরিক আইন ও পাসপোর্ট আইনে মামলা হবে। কিন্তু ২০১৭ সালের আগস্ট থেকেই বাংলাদেশে প্রায় ৮ লাখ রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ করে পাহাড় পর্বত গাছ গাছালি কেটে থাকার বাসস্থান তৈরী করছে। তাদের বিরুদ্ধে কোন মামলা হয় নাই,বরং তাদের সরকারীভাবে,বেসরকারীভাবে,আর্ন্তজাতিকভাবে ত্রাণ/সাহায্য দেওয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের সরকার যেমন রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারে নাই, জাতিসংঘসহ আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ও আজ পর্যন্ত রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে মর্মান্তিকভাবে ব্যর্থ হয়েছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্র,বন্ধুরাষ্ট্র,মুরব্বী রাষ্ট্র সবাই এসে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়ার জন্য বাংলাদেশের প্রশংসা করছে,বাংলাদেশের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে। কিন্তু কেউ রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে নিয়ে আশ্রয় দিয়ে ভাল কাজটি করবে বলে বলছে না। বার্মিজ তথা মিয়ানমার সেনাবাহিনীর বিগত ৫০ বছর ধরে একই নীতি ছলে বলে কৌশলে গণধর্ষণ,গণহত্যা চালিয়ে,বাড়ীঘর জ্বালিয়ে নিচিহৃ আশ্রয়হীন করে হলেও রোহিঙ্গাদের তাদের জন্মভুমি আরাকান থেকে বিতাড়িত করবে। কক্সবাজারের মানুষ মনে করে জাতিসংঘ যেমন রোহিঙ্গাদের স্থায়ীভাবে রাখাইনে ফেরৎ পাঠাতে ব্যর্থ হয়েছে, অন্য কেউ কক্সবাজার থেকে রোহিঙ্গা অন্যত্র সারিয়ে নেওয়ার কাজ করে কক্সবাজারবাসীকে একটুও ভারমুক্ত করে নাই। দেশ সমাজের ঘৃণিত,নিন্দিত চোরাচালানী বা অবৈধ মানব পাচারকারীরাই লাখ লাখ রোহিঙ্গাকে গোপনে অবৈধভাবে পাচার করে কক্সবাজারবাসীকে ভারমুক্ত করেছে। ১৯৭১ সালে এই দেশে অস্ত্র আইন চালু ছিল। অবৈধ অস্ত্র হাতে নেওয়া অপরাধ তা ভেবে যদি বাংলাদেশে আপামর জনগণ পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধে ঝাপিয়ে না পড়তো তবে কি বাংলাদেশ স্বাধীন হত? শুধু মানব পাচারকারী নয় বিশ্বের যে কেউ বৈধভাবে হউক বা অবৈধ পথে হউক রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে,অন্য দেশে বা অন্যত্র সরিয়ে নিয়ে কক্সবাজারের পবিত্র মাটি রোহিঙ্গামুক্ত করলে তাকে/তাদেরকে কক্সবাজারবাসী স্যালূট করবে,তাদের প্রতি চিরকৃতজ্ঞ থাকবে। কারণ রোহিঙ্গারা মারাত্মক এইডসের জীবানু বহনকারী, রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের জন্য ক্যানসার। এখন জাতিসংঘ,যুক্তরাষ্ট্র,ইউরোপীয় ইউনিয়ন,প্রতিবেশী দেশ বা মুসলিম দেশগুলোর চেয়ে মানব পাচারকারীই ভুক্তভোগী কক্সবাজার জেলাবাসীর কাছে বেশী আদরণীয়।
”প্রয়োজন নেই কবিতার স্নিগ্ধতা
কবিতা তোমায় দিলেম আজকে ছুটি,
ক্ষুধার রাজ্য পৃথিবী গদ্যময়
পুর্ণিমা চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি।”
সুতরাং ন্যায় বিচারের স্বার্থে,কক্সবাজারবাসীর স্বার্থে,বাংলাদেশের বৃহত্তর স্বার্থে,কক্সবাজার জেলাকে রোহিঙ্গাদের দখলমুক্ত করার কাজে লিপ্ত প্রকৃত দেশপ্রেমিক বিনা বিচারে দীর্ঘদিন হাজতবাসকারী আসামীকে জামিনে মুক্তি দেওয়া একান্ত আবশ্যক।
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top