সবুজ খামারে চির-সবুজদের স্মরণীয় মিলনমেলা

download-4-1-1-1.jpg

ইতিহাস পরিক্রমা থেকে জানা যায় ১৮৭৪ সালে কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠিত হয়। বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, প্রতিষ্ঠালগ্নে এটি মাদ্রাসা ছিল। ১৯০৮ সালে তৎকালীন বৃটিশ সরকার বিদ্যালয়ের দায়িত্বভার নিয়ে নাম ও কার্যক্রম পরিবর্তন করে এটাকে এম,ই স্কুলে (middle English school) রূপান্তর করে। ১৯২৩ সালের ৪ জানুয়ারী এম,ই স্কুলকে এইচ,ই স্কুলে (higher English school) পরিণত করা হয় এবং উচ্চ ইংরেজী বিদ্যালয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা হয়। এর মধ্যে দিয়ে বিদ্যালয়টি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃক (matriculation) মেট্রিকুলেশান পরীক্ষা দেওয়ার অনুমতি পায়। ১৯২৫ সালে সর্ব প্রথম এই বিদ্যালয় থেকে ৬ জন ছাত্র মেট্রিকুলেশান পরীক্ষার জন্য নির্বাচিত হন এবং তার মধ্যে ৪জন প্রথম বিভাগে ও ১ জন দ্বিতীয় বিভাগে পাশ করে তাক লাগিয়ে দেন। ১৯৫২ সালে এই স্কুলটি কক্সবাজার মডেল হাইস্কুল নামে রূপান্তরিত হয় এবং ১৯৭০ সালে সরকারী হয়ে কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় হিসেবে নামান্তরিত হয়।
আমরা যারা বর্তমান কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৯ সালে এসএসসি পাশ করেছি আমাদের সার্টিফিকেটে স্কুলের নাম উল্লেখ আছে ’কক্সবাজার মডেল হাইস্কুল’। ১৯৫২সালের আগে যারা পাশ করেছেন তাদের সার্টিফিকেটে স্কুলের নাম উল্লেখ আছে ’কক্সবাজার হাইস্কুল’। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর থেকে সবগুলো সার্টিফিকেটে ’কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়’ লেখা আছে। যে নাম লেখা হউক না কেন স্কুলের আসল নাম বুঝতে হবে কক্সবাজার হাইস্কুল।
২৫ ডিসেম্বর ২০১৬ তারিখ ব্যাপক উৎসাহ উদ্দিপনার মধ্য দিয়ে কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ের ১৪২ বছর পূর্তি ও কসউবি প্রাক্তন ছাত্রদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠান হয়েছে। আমাদের বন্ধুরা কক্সবাজার হাইস্কুলের এসএসসি ১৯৬৯ ব্যাচ হিসেবে পরিচিত এবং কক্সবাজার হাইস্কুল এসএসসি ৬৯ ব্যাচ বন্ধুসভা নামে আমাদের একটি সংগঠন আছে যার সভাপতি হিসেবে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওমর ফারুক ও সাধারণ সম্পাদক হিসেবে গোলাম কিবরিয়া দায়িত্ব পালন করছে। তারাই আমাদের ব্যাচের বন্ধুদের খোজখবর নিয়ে যোগাযোগ করে তালিকা প্রস্তুত করে এবং যারা মৃত্যুবরণ করে তাদের নাম মৃতের তালিকাভুক্ত করে। মৃতের ২৪ জনের তালিকায় আছেন ছৈয়দ কাসেম,আমির হোসেন,আবুল হোসাইন,আবদুর রহিম,মোহাম্মদ আলী,অমূল্য ধর, মংবাছিং,কামাল উদ্দিন,মাষ্টার মোহাম্মদ হোসাইন,আবুল খাইয়ের,আমীর সুলতান,মুক্তিযোদ্ধা আবু তালেব,মাসুদুল হক, দুলাল শর্মা,এডভোকেট নজরুল ইসলাম, মোস্তাক আহমদ, মাষ্টার শাহজাহান,ছলিম উদ্দিন,আবু বকর,নাছিম মেম্বার, ছৈয়দ আলম, আলী হোসেন, ইলিয়াছ বাঙ্গালী ও নুরুল ইসলাম(ঢাকা)। আল্লাহর রহমতে আমাদের ব্যাচের প্রায় ৫০ জন এখন বেচেঁ আছে বলে জানা গেলেও নিয়মিত যোগাযোগ আছে ৩৩ জনের সাথে।
গত ৩০/১২/১৭ আমরা খুরুস্কুল সবুজ খামারে অধ্যক্ষ মোহাম্মদ ওমর ফারুক,গোলাম কিবরিয়া,জহির আহমদ(নুর হোটেল),ড. নুরুল ইসলাম(চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়),এডভোকেট মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর,নুরুল আবচার(পৌর চেয়ারম্যান) এডভোকেট কামরুল হাসান,এডভোকেট আবুল কালাম সিদ্দিকী,এডভোকেট আবুল কালাম আজাদ,মোহাম্মদ মোসলিম,করিম ইউসুফ(ঢাকা),নুরুল হুদা,আক্তার নেওয়াজ খান, দুলাল ধর, নুরুল ইসলাম,অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন,সওকত আলম,মফিজুর রহমান (মফিজ কোম্পানী),ফয়জুর হক বাবুল,মোহাম্দ ইউনুচ,মাস্টার মোহাম্মদ হোসেন,ফরিদুল আলম,ফরিদ আহমদ, ওস্তাদ জাহাঙ্গীর খান, সতীন্দ্র নাথ দে(কবি অমিত চৌধুরী),দিল মোহাম্মদ (ঢাকা),বখতিয়ার উদ্দিন ও আমানুল কবির উপস্থিত হয়ে মৃত বন্ধুদের আত্মার মাগফেরাত ও শান্তির জন্য মোনাজাত করেছি,প্রার্থনা করেছি। স্মৃতিচারণ করেছি,অতীত,বর্তমান ও ভবিষ্যত নিয়ে কথা বলেছি। প্রাণ খুলে আড্ডা দিয়েছি। মহিলারাও তাদের মত করে মজলিস জমিয়েছে। ব্যতিক্রমও একটু ছিল। এসএসসি ৬৯ ব্যাচ বর্হিভুত কসউবি সাবেক ছাত্র ছোট ভাই হাজী গিয়াসউদ্দিন স্ত্রীসহ বড় ভাই ও ভাবীদের খেদমত করার ইচ্ছা প্রকাশ করে খুরুস্কুল রাস্তার পাড়ার বিখ্যাত ’বাকগুলা’ নিয়ে উপস্থিত হয়েছিল। কক্সবাজারের জনপ্রিয় মুখ ইঞ্জিনিয়ার বদিউল আলম চিরসবুজ বদ্দাদের আনন্দ দেখতে সময় মত হাজির হয়েছিল।
গত বছর অল্পদিনের মধ্যেই আমাদের প্রিয় বন্ধু মুক্তিযোদ্ধা আবু তালেব,মাসুদুল হক,মাস্টার মোহাম্মদ হোসাইন ও ছলিম উদ্দিন মৃত্যুবরণ করায় আমরা যারা এখনও আল্লাহর কৃপায় বেঁচে আছি তারা স্ত্রীসহ এক জায়গায় একসাথে দেখা করে একটা দিন মিলনমেলা করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। আমাদের বন্ধুরা অনেকে অসুস্থ শরীর নিয়ে স্ত্রী,কন্যা,নাতিসহ উপস্থিত হয়েছে। অনেকের স্ত্রী ইতিমধ্যেই বিরোগ হওয়ায় বা স্ত্রীরা অন্য কাজে ব্যস্ত থাকায় একাই মিলনমেলায় হাজির হয়েছে। আমাদের বন্ধুদের গড় বয়স ৬৫ বছর। নুরুল আবচার (পৌর চেয়ারম্যান) সব চেয়ে কম বয়স্ক এবং তার প্রথম পুত্র এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। আড্ডায় দুলাল ধর দাবী করে সব চেয়ে বেশী বয়স্ক সে,তার বর্তমান বয়স ৭১ বছর। আমাদের মধ্যে অনেকে ডায়াবেটিশ,উচ্চ রক্তচাপ,হৃদ রোগসহ অন্যান্য বৃদ্ধজনিত রোগে আক্রান্ত। বেশ কয়েক জন কোন রোগছাড়া সম্পূর্ণ সুস্থ আছে। তবে খাদ্যের ব্যাপারে প্রায় সকলের কিছু কিছু নিষেধাজ্ঞা বা নিয়ন্ত্রণ আছে। ডিমের লাল অংশ,নারিকেল,গরু-খাসীর মাংস,চিংড়ী,অত্যাধিক ঝাল ইত্যাদির ওপর অনেকের নিষেধাজ্ঞা আছে। একদিনের জন্য সবাই তরুণ। কেউ নিষেধাজ্ঞা মানে নাই,স্ত্রী-কন্যারাও নিষেধ করে নাই। সারা দিন আনন্দ উৎসব ইচ্ছামত খাওয়া দাওয়ার পরও আজ পর্যন্ত চিরসবুজদের কেউ অসুস্থ হওয়ার খবর পাওয়া যায় নাই,ইনসাল্লাহ।
খাওয়ার তালিকায় ছিল সকালে সবুজ খামারে পৌছে ডিম সিদ্ধ,লেক্সাস বিস্কিট,বাংলা কলা,তেলাপিয়া মাছ ফ্রাই,নারিকেল। দুপুরের খাবারের তালিকায় ছিল চিনাগুরা চাউলের সাদা ভাত, আলু দিয়ে ঝাল কচি খাসীর মাংস, নারিকেল তরকারি দিয়ে মুরগীর মাংস(দেশী রাতাকুরা),চিংড়ী ভোনা,তেলাপিয়া ফ্রাই, কাতাল মাছের ঝোল,সুটকি দিয়ে কাচা মরিচ ভর্তা। আড্ডার মাঝে মাঝে রং চা। ফেরার সময় কক্সবাজারের বিলুপ্তপ্রায় জনপ্রিয় ’বাকগুলা’ নাস্তা দিয়ে চা। নানা-নানী,দাদা-দাদী,মেয়ে,নাতি সবাই বাকগুলা খুব পছন্দ করেছে। সারা দিন সাদা কাচা সুপারী দিয়ে মিষ্টি পান ছিল। আবুল কালাম সিদ্দিকীর মত অনেকে জর্দাও খেয়েছে প্রচুর। প্রথম সাক্ষাতে যেমন বিদায় বেলায়ও অনেকে আবেগপ্রবন হয়ে যায়। প্রশ্ন ছিল আল্লাহ আমাদের সকলকে কি আবার এইভাবে মিলিত হওয়ার সুযোগ দেবেন?
কক্সবাজার হাইস্কুল এসএসসি ৬৯ ব্যাচের বন্ধুসভার ৪৮ বছর, মিলনমেলার ছবিসহ বেশ কয়েকটা পোষ্ট জনপ্রিয় ফেসবুকে দেওয়া হলে অনেকে ’লাইক’ দিয়ে আমাদের বন্ধুদের দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন। যারা লাইক দিয়েছেন,মন্তব্য করেছেন,আমাদের চিরসবুজ আখ্যায়িত করেছেন, আমাদের দীর্ঘায়ু কামনা করেছেন সবাইকে আন্তরিক ধন্যবাদ। আমাদের জন্য দোয়া করবেন যেন আবার আগামী বছর আমরা সকলে সুস্থ শরীরে বন্ধুসভার মিলনমেলায় শরিক হতে পারি। সমাজের সকল অন্যায়,অবিচার,অসংগতির মধ্যেও নিজেদের ভাল থাকার উপায় বের করতে হবে।
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।॥

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top