‘আবারও সেই অদ্ভুত মায়াবী হাসি!’

rimme.jpg

লাইফস্টাইল ডেস্ক॥
নিউইয়র্কে আমার বাসার নীচতলায় তিন সদস্যের এক চায়নিজ পরিবারের বসবাস। বাবা-মা আর তাদের একমাত্র পুত্র। তারা সকলেই কর্মজীবী। এক বসন্তের ছুটিতে পরিবারটি তাদের দেশ চীনে গিয়ে টুকটুকে এক বধূ নিয়ে আসে। মেয়েটি অন্য সকল চায়নিজ রমণীর মতোই হালকা পাতলা গড়ন। তবে উচ্চতায় ঠিক যেন ঐশ্বরিয়া। এদেশে শুরুর দিকে পড়াশোনা করতো। এখন চাকুরি করছে। বিমানবালা। প্রায়ই দিনের কোন এক সময়ে মিনি স্কার্ট, কোট-টাই পরে, কোমল সুগন্ধি ছড়িয়ে, হাতে হ্যান্ড ক্যারিয়ার টেনে নিয়ে যেতে দেখি। বেলকণিতে দাঁড়ালে অনেকদূর পর্যন্ত তার হাইহিলের ঠক্‌ঠক্‌ শব্দ ভেসে আসে। চমৎকার স্মার্ট রূপবতী এক নারী।

আমি তাকে পাগলী ডাকি। প্রায়ই সে মূল দরজার চাবি নিতে ভুলে যায়। বাইরে থেকে ফিরে আমার দোতলার কলিংবেল চাপে। তার বেল বাজানোর মাঝেও কোন সৌন্দর্য নেই। এমনভাবে বেল দেয়, যেন তার নিজের বাসায় বেল দিচ্ছে। আর আমার কাজই যেন বাধ্যতামূলক তাকে দরজা খুলে দেয়া! প্রতিবার রাজ্যের বিরক্তি নিয়ে এগিয়ে যাই কিছু কথা শুনিয়ে দিবো ভেবে। কিন্তু দরজা খোলা মাত্রই হাসিমুখে কাঁচুমাচু করে বলবে, আমি খুব দুঃখিত তোমায় বিরক্ত করবার জন্যে। অতঃপর চায়নিজ স্টাইলে দু’হাত মাফ চাওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে থাকবে। আমার কোনদিনই বিরক্তি নিয়ে তাকে কিছু বলা হয়ে উঠেনি।

বড় ভুলো মন! কখনোবা দরজায় বিশাল একছড়া চাবি ঝুলিয়ে রেখে ভেতরে চলে যায়। আসা-যাওয়ার পথে তার একতলার দরজায় কিংবা মূল গেটে চাবিছড়া ঝুলতে দেখে দরজায় নক করে তাকে বুঝিয়ে দেই যখন, সে বিশাল এক হাঁ করে মুখে হাত দিয়ে বলবে, ওহ্‌ মাই গড, ওহ্‌ মাই গড!

অতঃপর আবারো সেই করজোড়ে ক্ষমা চাওয়ার ভঙ্গিতে মাথা নুইয়ে বলবে, থ্যাংক ইউ, থ্যাংক ইউ। গতকালও একগুচ্ছ চাবি দরজায় ঝুলছিলো। কলিংবেল দিতেই বেরিয়ে এলো মুখভর্তি ফেসিয়াল প্যাকসহ। এক চোখের শসা সরিয়ে তাকালো। চাবিছড়া হাতে দিয়ে বলি, ‘ময়না, তুমি আবারো একই ভুল করেছ’।

ময়না কিংবা পাগলী যে নামেই ডাকি না কেন, সেই ভুবন ভোলানো হাসি তার! যে হাসিতে ছোট্ট চোখজোড়া প্রায় বুঁজে আসে। কর জোড়ে মাথা নোয়ালো দু’বার। মুখে কিছু বলল না। ফেসপ্যাক দেয়া অবস্থায় কথা বলতে বারণ বলেই হয়তো।

আজ আমি চাবি নেইনি। বাইরে থেকে ফিরে কলিংবেল দিতেই একতলা থেকে দরজা খুলে দিলো সেই রূপবতী। অবাক হয়ে বলি, আমি কি ভুল করে তোমার ফ্লোরে বেল দিয়েছি ? সে খুব বিনীত ভঙ্গিতে বলল, ‘ না, তুমি তোমার ফ্লোরেই দিয়েছো, কিন্তু কতদিন তুমি আমায় গেট খুলে দিয়েছো, আজ একটু শোধ দিতে এলাম ‘। আবারও সেই অদ্ভুত মায়াবী হাসি!

পাগলিটা আসলেই একটা মায়াবতী! আমাদের দেশ, ভাষা এবং সংস্কৃতি ভিন্ন। তবুও একের জন্যে অন্যের কী অদ্ভুত মায়া!

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top