রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারের তোড়জোড়

Ukhiya-Cox-Rafique-13-01-2018.doc.jpg

রফিকুল ইসলাম :
বাংলাদেশের অস্থায়ী আশ্রয় শিবির গুলোতে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার জোর তৎপরতা শুরু করেছে। সীমান্তের দুইটি স্থানে অভ্যর্থনা ক্যাম্প স্থাপন, ফেরত যাওয়াদের নিজ নিজ গ্রামের ফিরে না যাওয়া পর্যন্ত অবস্থানের জন্য ট্রানজিট ক্যাম্প নির্মান, নাগরিকত্ব যাচাই বাছাই করন, নাগরিকত্ব পরিচয় পত্র প্রদান, ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা সহ নানা উদ্যেগ গ্রহণ করেছে। আর এসব কর্মকান্ডের পেছনে অর্থ সহায়তা করছে বিশ্ব ব্যাংক, চীন, জাপান, ভারত, মিয়ানমার সরকার ও তাদের ব্যবসায়ীরা। এ লক্ষে আগামী ১৫ জানুয়ারী মিয়ানমারের ইয়াঙ্গুনে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গঠিত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপ এর বৈঠকে রোহিঙ্গা প্রর্ত্যাপন নিয়ে চুড়ান্ত কর্ম কৌশল নির্ধারন করা হবে বলে জানা গেছে।
মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যের ইমেগ্রেশন ও জনসংখ্যা বিভাগের প্রধান অং মিনের উদ্বৃতি দিয়ে জানানো হয়েছে সীমান্তের তুমব্রু লেট ও নাকফুরা পয়েন্ট দিয়ে বাংলাদেশ থেকে ফেরত যাওয়া মিয়ানমার অধিবাসীদের গ্রহণ করা হবে। শরনার্থীদের গ্রহণ করতে অভিবাসন, জনসংখ্যা, বেসামারিক প্রশাসন, পুলিশ ও স্বাস্থ্য বিভাগ যৌথ ভাবে কাজ করতে জনবল নিয়োগ করেছেন। ১৯৯৩ সালে শরনার্থী প্রর্ত্যাপন চুক্তির সাথে সঙ্গতি রেখে প্রতিদিন দুইটি পয়েন্ট দিয়ে দেড়শত করে তিন শ লোক গ্রহন করা হবে। মিয়ানমার কর্তৃক বাংলাদেশে নিকট প্রেরিত উদ্বাস্তুদের পারিবারিক তথ্য ফরম পররাষ্ট্র মন্ত্রনালয়ের মাধ্যমে গ্রহণ করে তা মাঠ পর্যায়ে যাচাই পূর্বক ছাড়পত্র দিয়ে পুনরায় বাংলাদেশে কাছে প্রেরন করা হবে। আগামী ২২-২৩ জানুয়ারীর মধ্যে শরনার্থী প্রর্ত্যাপন কাজ শুরু করার প্রস্তুতি নিয়ে এগিয়ে যাওয়া হচ্ছে। জাতিসংঘের সাবেক মহাসচিব কফি আনানের নেতৃত্বাধীন রাখাইন কমিশনের সুপারিশ মালা অনুযায়ী ১৯৮২ সালেরর নাগরিকত্ব আইন অনুযায়ী রাজ্যের বাসিন্দাদের অথবা বাংলাদেশ থেকে ফেরত আসা মুসলিম শরনার্থীদের নাগরিকত্ব যাচাই কার্ড বা এনভিসি দেওয়া হবে।
১৯৮২ ও ১৯৪৮ সালে নাগরিকত্ব আইন অনুসারে যোগ্য ব্যক্তিরা জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্যও আবেদন করতে পারবে। এতে জন্মসূত্র ও আইনি সূত্রে নাগরিকত্ব পাওয়ার সুযোগ রয়েছে। যেসব মুসলিম অধিবাসীদের গোলাপী কার্ড রয়েছে তারা বা তাদের উত্তরাধিকারদের এনভিসি কার্ড না নিলেও জাতীয় পরিচয়পত্রের জন্য আবেদন করতে হবে বলে জানা গেছে। রাজ্যের সাধারন লোকজন এনভিসি কার্ড নিতে আগ্রহী হলেও রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী অব্যাহত হুমকির কাছে নিরাপত্তাহীনতায় এনভিসি নিচ্ছে না অনেকে। এনভিসি না নিলে জাতীয়তার জন্য আবেদন করা যাবে না। আর যারা আরশার সাথে সম্পৃক্ত প্রমাণ হবে তাদের চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আবার শরনার্থী প্রর্ত্যাপন কেন্দ্রে অন্যান্য সরকারী সংস্থার সাথে সন্ত্রাসীদের চিহ্নিত করতে পুলিশ, সীমান্ত রক্ষী ও অভিবাসন বিভাগের লোকজন নিয়োজিত থাকবে।
২০১৬ সালের অক্টোবর থেকে গত ডিসেম্বর পর্যন্ত এনভিসি কার্ড ধারী ২০ জন গ্রাম প্রশাসককে আরসা গোপনে হত্যা করেছে। তাদের সকলে মুসলিম গ্রাম প্রশাসক ছিল বলে ইরাবর্তী অনলাইন জানিয়েছে। মিঝিমা অনলাইন রাখাইন রাজ্যে মুখমন্ত্রী নিই পো’র উদ্বৃতি করে বলেছে রাজ্যের নিরাপত্তা ও শৃংখলার জন্য আরাকান রোহিঙ্গা সালভেশন আর্মি বা আরসা ক্রমাগত হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। রাখাইনের তিনটি এলাকায় ৩০ জনের মত অবৈধ অনুপ্রবেশকারী সাধারন মুসলিমদের নানা ভাবে ভয়ভীতি দেখিয়ে যাচ্ছে। আরসার ক্রমাগত হুমকির কারনে শরনার্থী প্রর্ত্যাপন ব্যহত হওয়ার আসংখ্যা রয়েছে। ইয়াঙ্গুন ভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক মং মং সুই’র উদ্বৃতি দিয়ে জানিয়েছেন মংডুতে অন্তত ১৫টি গ্রামের লোকজনের সাথে আরসার যোগাযোগ থাকতে পারে। রোহিঙ্গা প্রর্ত্যাপনের সুযোগে সন্ত্রাসীদের প্রবেশ ঘটতে পারে। তাই সরকারকে নির্বাহী ব্যবস্থা নিতে সুপারিশ করেছেন।
মিয়ানমার টাইমর্স কেন্দ্রীয় সমাজ কল্যান, শ্রম ও জন সংখ্যা মন্ত্রী ও ইউনিয়ন এন্টারপ্রাইজ হিউম্যান এসিসট্রেন্ড ও উন্নয়ন কমিটির প্রধান সমম্বয়ক ড. মিয়াত সুয়ের উদ্বৃতি দিয়ে জানিয়েছে সীমান্তে দুইটি অভ্যর্থনা কেন্দ্রে ২/৩ দিন যাচাই শেষে শরনার্থীদের লাফোকং গ্রামে পূনঃ নির্মিত অস্থায়ী আশ্রয় শিবিরে স্থানান্তর করা হবে। সেখানে অন্তত ৩০ হাজার লোকের আশ্রয়ের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। সেখান থেকে জাতিসংঘ সহ অন্যান্য সাহায্য সংস্থার সহযোগীতায় এসব শরনার্থীদের নিজ নিজ ঘরবাড়ি বা গ্রাম ও আশপাশে পাঠিয়ে দেওয়া হবে। যাদের ঘর বাড়ি পুড়িয়ে গেছে তাদের জন্য নতুন গ্রাম গড়ে তোলা হচ্ছে। ফেরত আসা শরনার্থীদের দেশের আইন অনুযায়ী প্রয়োজনীয় নিরাপত্তা, মর্যাদা দেওয়ার প্রদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। তারা যাতে স্বাচ্ছন্দ্যে নানা পেশায় নিয়োজিত থেকে আয় রোজগার করে জীবিকা নির্বাহ করতে পারে।
এদিকে আগামী ১৫ জানুয়ারী বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা শরনার্থীদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে গঠিত যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠক অনুষ্ঠিত হবে। উক্ত বৈঠকে শরনার্থীদের প্রর্ত্যাপনের ব্যাপারে চুড়ান্ত কৌশল নির্ধারন করা হবে বলে জানা গেছে। বাংলাদেশে ও মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব দ্বয়ের নেতৃত্বে উক্ত কমিটির প্রথম বৈঠকে দ্রুত রোহিঙ্গা শরনার্থীদের মর্যাদা ও নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে ফেরত পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। কমিটির সদস্য ও কক্সবাজার শরনার্থী ত্রান ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোঃ আবুল কালাম জানিয়েছেন মিয়ানমার থেকে প্রেরিত শরনার্থীদের তথ্য ফরমে তাদের নাগরিকত্ব নিয়ে জটিলতা দেখা দিয়েছে। প্রকৃত পক্ষে নাগরিকত্বে কলামে রোহিঙ্গা না অন্য কিছু উল্লেখ করা হবে তা বৈঠকে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরপরও বাংলাদেশ বৈঠকে অন্ততঃ এক লক্ষ রোহিঙ্গার তালিকা হস্তান্তরের প্রস্তুতি নিয়ে এগুচ্ছে বলে জানা গেছে।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top