সুপ্রীম কোর্ট দিবস পালন ও প্রাসঙ্গিক কথা

download-4-1-1-1.jpg

স্বাধীন বাংলাদেশে ১৯৭২ সালের ১৮ ডিসেম্বর বঙ্গবন্ধু শেখ মুুজিবুর রহমান সুপ্রীম কোর্ট উদ্বোধন করেন। এই বছর ২ জানুয়ারী ২০১৮ প্রথম বারের মত সুপ্রীম কোর্ট দিবস পালন করা হয়েছে। এখন থেকে প্রতি বছর ১৮ ডিসেম্বর সুপ্রীম কোর্ট দিবস পালন করা হবে। এবার অবকাশ থাকার কারণে ২ জানুয়ারী তা পালিত হয়েছে। এ উপলক্ষে মাননীয় পাঁচজন বিচারপতির তত্ত্বাবধানে ”বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট” শিরোনামে একটি অতি মূল্যবান বই প্রকাশ করা হয়েছে। বই এ প্রায় আড়াই শ বছরের ইতিহাসসমৃদ্ধ সচিত্র তথ্য,দলিল ইত্যাদি ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয়েছে। যেমন, ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী আমল- মেয়র কোর্ট ১৭২৬-১৭৭৪ এবং কলকাতা সুপ্রীম কোর্ট ১৭৭৪-১৮৮১। ব্রিটিশ আমল কলকাতা হাইকোর্ট ১৮৬২-১৯৪৭। পাকিস্তান আমল ঢাকা হাইকোর্ট ১৯৪৭-১৯৭১। বাংলাদেশ হাইকোর্ট ১৯৭২ ও বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট ১৯৭২। প্রধান বিচাপতি ও বিচারপতিদের ছবিসহ নামের তালিকা,হাইকোর্টের এডভোকেট জেনারেলদের তালিকা,হাইকোর্ট বারের সভাপতি,সাধারণ সম্পাদকদের তালিকা,মহান মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী শহীদ আইনজীবীদের তালিকা, বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্টের বিচারপতিদের তালিকা,বাংলাদেশের এ্যার্টনি জেনারেলদের তালিকা, বাংলাদেশ সুপ্রীমকোট বারের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকের তালিকা যেমন দেওয়া হয়েছে বাংলাদেশে আইন পেশায় প্রথম নারী ও প্রথম নারী বিচারপতির ছবিসহ নাম দেওয়া হয়েছে। আমার মতে বইটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য ও দলিলসমৃদ্ধ। বইটির বিতরণ শুধু সুপ্রীম কোর্টের তালিকাভুক্ত আইনজীবীদের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা সমীচীন হবে না। প্রত্যেক আইনজীবী সমিতির লাইব্রেরীতে,প্রত্যেক কলেজ বিশ্ববিদ্যালয় যেখানে আইন বিষয় পড়ানো হয় সেখানে সঠিক ইতিহাস জানার জন্য লাইব্রেরীতে বইটি রাখা আবশ্যক।
ত্রিশ লাখ শহীদের রক্তের কালিতে লিখিত মুক্তিযুদ্ধের সুমহান দলিল ’গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধান’ এর চামড়ায় বাঁধানো শিরোনাম পৃষ্টার ও শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের তত্ত্বাবধানে অংকিত বাহাত্তরের হাতে লেখা সংবিধানের শুরুতে ব্যবহৃত জাতীয় ফুল শাপলার মোটিফ এর ছবি আছে। বাংলাদেশ সংবিধানের প্রস্তাবনা মাত্র পাঁচ প্যারায় লিখিত এই প্রস্তাবনায় বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অস্তিত্বের উদ্দেশ্য অসাধারণভাবে ফুটে উঠেছে। এমন সুলিখিত ও সুললিত কাব্যিক ব্যঞ্জনাময় রাজনৈতিক দলিল পৃথিবীর ইতিহাসে কমই লেখা হয়েছে। প্রস্তাবনায় অঙ্গীকার করা হয়েছে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠার মধ্য দিয়ে একটি সাম্য,ন্যায়ভিত্তিক ও ধর্মনিরপেক্ষ সমাজ প্রতিষ্ঠাই হবে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উল্লেখ্য রাজনৈতিক দর্শন। বাহাত্তরের হাতে লেখা সংবিধানের শেষে প্রদত্ত গণপরিষদের স্বাক্ষরপত্রের প্রথম পৃষ্টা। এই পৃষ্ঠায় জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরসহ অন্যান্য জাতীয় নেতৃবৃন্দের স্বাক্ষরও রয়েছে। এই জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ দলিলের ছবিও রয়েছে এই বই এ।
এই বইটি পড়ার আগে আমি জানতাম না যে শেরে বাংলা এ,কে,ফজলুল হক ঢাকা হাইকোর্ট বারের ১৯৪৮ থেকে ১৯৫৬ পর্যন্ত আট বার সভাপতি ছিলেন। আমি ব্যক্তিগতভাবে এডভোকেট আহমদ সোবহানের সহকারী হিসেবে ১৯৭৯ সালে এক বছর কাজ করেছি। তখন তিনি জাতীয় আইনজীবী সমিতির সভাপতি ছিলেন। কিন্তু এই বই পড়ে জানতে পারলাম তিনি ১৯৭২-৭৩,১৯৭৬-৭৭ দুইবার বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বারের সভাপতি নির্বাচিত হয়েছিলেন। জানতে পেরেছি এডভোকেট শামসুল হক চৌধুরী ১৯৮৩ থেকে ১৯৮৯ পর্যন্ত লাগাতার ছয় বার বাংলাদেশ সুপ্রীম কোর্ট বারের সভাপতি ছিলেন।
১৯৬৮ সালের ২৪ সেপ্টেম্বর বর্তমান সুপ্রীম কোর্ট ভবনটি উদ্বোধন করেছিলেন জেনারেল আইয়ুব খান। সামরিক শাসক ও স্বৈরাচার হিসেবে আমাদের দেশে আইয়ুব খান নিন্দিত হলেও তিনি তার স্মৃতিকথা ’ফ্রেন্ডস নট মাস্টার্স’ গ্রন্থে লিখেছেন, ’নির্বাহী বিভাগ ও আইনসভা সংবিধানের বিধানাবলির আওতায় কাজ করছে,এটা নিশ্চিত করতে একটি স্বাধীন বিচার বিভাগের প্রয়োজন’। সাবেক প্রধান বিচারপতি আমিন আহমদের লেখা থেকে দেখা যায় নিম্ন আদালত চালানোর দায়িত্ব পাকিস্তান আমলেও হাইকোর্টের ছিল। স্বাধীন বাংলাদেশের সংবিধান প্রণেতাদের মধ্যে অনেক প্রখ্যাত আইনজীবীরা এখনও তা দাবী করেন।
১৮ ডিসেম্বর ১৯৭২ বাংলাদশের স্বাধীন সুপ্রীম কোর্ট উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে জাতির জনক ও প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান,রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী,প্রধান বিচারপতি এ,এম,সায়েম ও আইনমন্ত্রী ড. কামাল হোসেন কে কি বলেছেন তা পরের দিন ১৯ ডিসেম্বর জাতীয় পত্রিকায় গুরুত্বসহকারে প্রকাশিত হয়েছিল। আজাদে প্রকাশিত হেডলাইন ছিল, স্বাধীন বাংলাদেশের স্বাধীন সুপ্রীম কোর্ট উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু, বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপ করা হবে না। রাষ্ট্রপতি বলেছেন, মৌলিক অধিকার রক্ষাকল্পে কঠোরতা অবলম্বন করুন। প্রধান বিচারপতি বলেছেন,পক্ষপাতের উর্ধ্বে থেকে বিচার কার্য সমাধা হবে। দৈনিক ইত্তেফাক পত্রিকায় হেডলাইন ছিল, সুপ্রীম কোর্টের অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধু, সরকার আইনের শাসনে বিশ্বাসী। পূর্বদেশ পত্রিকায় হেডলাইন ছিল, সুপ্রীম কোর্টের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বঙ্গবন্ধুর সুস্পষ্ট ঘোষণাঃ আদালতের অধিকারে হস্তক্ষেপ করা হবে না। দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবেই।
আজকের বাস্তবতায় উগ্র দলীয়করণ ও রাজনীতিকরণ প্রবণতার মুখে বিচার বিভাগের স্বাধীনতা নির্বাহী বিভাগের হস্তক্ষেপমুক্ত খুব ভাল আছে,ভাল নেই। সরকারী দল বলে খুব ভাল আছে, বিরোধী দল বলে ভাল নেই। সংবিধানের দ্বিতীয় ভাগে রাষ্ট্র পরিচালনার মূলনীতি অংশের ২২ অনুচ্ছেদে নির্বাহী বিভাগ থেকে বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ কথাটি উল্লেখ থাকলেও সংবিধান কার্যকরী হওয়ার এত বছর পরও কি তা হয়েছে? বিচার বিভাগের পৃথকীকরণের কাজে ওয়ান/ইলেভেনের অনির্বাচিত সরকার বেশী অগ্রনী ভুমিকা রেখেছে এবং নির্বাচিত সরকারের বিজ্ঞ আইনজীবী-মন্ত্রীরাই বিচার বিভাগের পৃথকীকরণ, স্বাধীনতা ও নিজস্ব সচিবালয় প্রতিষ্ঠার বিপক্ষে নানা যুক্তি-কুযুক্তি দিয়ে বেশী কাজ করেছে, এ অভিযোগ শুনতে হবে কেন?
বিচার বিভাগের স্বাধীনতার জন্য আইনজীবীরা এক সময় খুব সোচ্চার থাকলেও এখন বিভক্ত। শামসুল হক চৌধুরী সুপ্রীম কোর্ট বারের সভাপতি থাকা কালে তার নেতৃত্বে বাংলাদেশের প্রায় সকল আইনজীবীরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর থেকে আইনজীবীদের দলীয় রাজনীতির ভিত্তিতে বিভক্ত করার প্রক্রিয়া প্রকাশ্যে শুরু হয় যা আজ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ পন্থী ও বিএনপি-জামাত পন্থী হিসেবে সুস্পষ্ট দুভাগে ভাগ হয়ে আছে। যদিও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক আইনজীবী এখনও এ দু’ধারার বাইরে নিরপেক্ষ অবস্থানে আইনজীবী হিসেবে নিজস্ব স্বকিয়তা নিয়ে আছেন। তাই এখন সুপ্রীমকোর্ট আইনজীবী সমিতির নির্বাচিত সভাপতি/সাধারণ সম্পাদকের বক্তব্য শুধু তাদের দলীয় নেতাকর্মীদের কাছেই গ্রহনযোগ্য হয়,বাকীদের কাছে গুরুত্বহীন। বিচারপতি নিয়োগের লিখিত কোন নীতিমালা যেমন নেই, আদালতের অবিচ্ছেদ্য অংশ আইনকর্মকর্তা নিয়োগের নীতিমালা এল,আর,ম্যানুয়েলে থাকলেও তা ১৯৯১ থেকে মানা হচ্ছে না। নিরপেক্ষ আইনজীবী ও সাধারণ মানুষ এখনও বিচার বিভাগের স্বাধীনতা চান। মানুষ প্রত্যাশা করে সুশিক্ষিত,সৎ,যোগ্য ও নিরপেক্ষরাই বিচারপতি ও আইনকর্মকর্তা হিসেবে নিয়োগ পাবেন,দলীয় ক্যাডার হিসেবে পরিচিতরা নন। স্বাধীন বিচার বিভাগ ও আইনের শাসন ছাড়া নির্বাচিত সরকার নির্বাচিত স্বৈরাচারে রূপান্তরিত হওয়ার ও গণতন্ত্র গণবিরোধী হাতিয়ারে রূপ লাভ করার সম্ভাবনা থেকে যায়। স্বাধীন বিচার বিভাগই গণতন্ত্রের গৌরব। দেশের বিচারপতিরা ও আইনকর্মকর্তারা যদি দলীয় সংশ্লিষ্টতা দেখে নিযুক্ত হন তখন সে দলীয়করণকৃত বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কি বিরোধীরা বা নিরপেক্ষ ও ন্যায় বিচার প্রত্যাশীরা চাইবেন?

লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

আপনার মন্তব্য লিখুন...

Top