অধিকাংশ নারীই নির্যাতনকে তাদের ভাগ্য মনে করে

Iren.jpg

আইরিন আকতার ॥
নারী নির্যাতন বন্ধের জন্য সরকার বিভিন্ন আইন ও ব্যবস্থা গ্রহন করলেও সমস্যা রয়ে যাচ্ছে অন্তরালেই। অধিকাংশ নারীই জানেনা যে তারা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কিংবা তাদের উপর অন্যায় হচ্ছে। তারা জানেনা তাদের উপর হওয়া অন্যায়ের জন্য আইন আছে এবং শাস্তির ব্যবস্থা রয়েছে। অধিকাংশ নারীই তাদের উপর হওয়া অন্যায় ও নির্যাতনকে তাদের কপালের লিখন বা ভাগ্য মনে করে। তারা মনে করে নারী হলেই কপালে জুটবে অপমান, বৈষম্য আর বঞ্চিত হতে হয় পদে পদে । এ যেন নারীদের নিয়তী।
আমি নিজে একজন নারী হওয়ায় খুব কাছ থেকে কথা বলেছি আমার কাছের – দূরের শিক্ষিত , স্বল্পশিক্ষিত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যাতীত কিছু নারীদের সাথে। অনেকেই জানিয়েছেন তাদের সাথে ঘটে যাওয়া বিভিন্ন অনাকঙ্খিত ঘটনা। তবে নির্যাতনের চূড়ান্ত পর্যায়ে না পৌছুলে একজন নারী কখনোই তা প্রকাশ করতে চায়না। যখন তাদের দেয়ালে পিঠ ঠেকে যায় তখনই প্রকাশ পায় তার উপর ঘটে যাওয়া বর্বরতার কথা। আমি অবাক হয়েছি যখন দেখেছি শিক্ষিত,স্বল্প শিক্ষিত ও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যতীত সকল নারীই এক সুতোই এসে মিশেছে। তারা কম বেশি সবাই তাদের উপর হওয়া অন্যায় ও নির্যাতনকে ভাগ্য বলে মেনে নেয়। আবার মানসিক নির্যাতনও যে একপ্রকার নির্যাতন তা অনেক শিক্ষিত নারীই জানেনা।
কথা বলেছিলাম মহেশখলী উপজেলার গৃহবধূ জাহেদা বেগম (২৮) (ছদ্ম নাম) এর সাথে। তার বিয়ের বয়স ৮ বছর । বিয়ের প্রথম দিন থেকেই খোঁচা দিয়ে কথা বলতে শুরু করে ননদ ও শাশুড়ী। বিয়ের পাঁচ দিনের মাথায় যৈাতুকের জন্য মারধর করে বাপের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়া হয়। অভাবি পিতা ধার করে টাকাসহ কন্যাকে শশুড় বাড়িতে পাঠালে। কিছুদিন পরপর একই কাজ করতে থাকে তার স্বামী। প্রতিদিনই তুচ্ছ কারনে মারধর করে তাকে। আর এ নির্যাতনকে ভাগ্য মনে করেই স্বামীগৃহে নিরবে নির্যাতন সয়ে আট বছর সংসার করছে এ নারী। তার ভাষ্য মতে “ মেয়ে হয়ে জন্মেছি এসব তো সহ্য করতেই হবে। ”একদিন হয়তো তার স্বামী ভালো হয়ে যাবে এই আশাতেই নিরবে মার খাচ্ছে জাহেদা।
জাহেদার মতই কক্সবাজারের খুরুশকুলের আরেক নারী সুফিয়া বেগম (৩২)। বিয়ের ৬ বছরে পর পর তিনটি কন্যা সন্তান জন্ম দেয় এ নারী। এর অপরাধে প্রতিদিনই শুশুড় বাড়ির লোকজনের কাছ থেকে শুনতে হয় গালমন্দ। আর কপালে জোটে স্বামীর প্রহার। সে জানায় শেষ কন্যা হওয়ার পর গলাটিপে ধরে মেরে ফেলতে চেয়েছিল তার স্বামী। পরপর তিনটি কন্যা হয়াটা যেন তারই অপরাধ। বর্তমানে কন্যা সন্তান হওয়ার অপরাধে তার স্বামী দ্বিতীয় বিয়ে করে। এখনো এ নারী তিনবার কন্যা সন্তান জন্ম দেয়াটা নিজের অপরাধ বলে মনে করে। আর তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েটাকে ভাগ্য বলেই মেনে নিয়েছে।
কক্সবাজার শহরের মেয়ে ২৫ বছরের নারী সাবিনা ইয়াসমিন (ছদ্মনাম) কক্সবাজার সরকারি কলেজ থেকেই পাশ করেছেন ডিগ্রী। বিয়ে হয়েছে সবে দুই বছর। বিয়ের কিছুদিন যেতে না যেতেই শুশুড় বাড়ির লোকজনের নানা আবদার। রোজার সময় কাঁচা , রান্না করা হরেক রকম ইফতারি, ঈদে গুষ্টি সমেত লোকজনের জন্য কাপড় চোপড়, কোরবানে আস্ত গরু, আম- কাঁঠাল, শীতের সময় পিঠা। বাপের বাড়ি থেকে না আসলে খোঁচা দিয়ে কথা বলে শুশুড় বাড়ির লোকজন। অনিচ্ছা সত্তে¦ও এসব আবদার পূরন করতে জানাতে হয় তার হার্টের রোগী মাকে। যদি খাবার কম পড়ে শুরু হয় বাপের বাড়ির গুষ্ঠি উদ্ধার। নিরবে সয়ে যায় আর চোখের জল ফেলে সাবিনা। বিয়েতে শুশুড় বাড়ির লোক কিছু না চাইলেও তার বাবার কাছ থেকে বুঝে নিয়েছে মোটর সাইকেলর চাবি আর ঘরও সাজাতে হয়েছে তার বাপের বাড়ির আসবাবে। সাবিনা বলেন “ এ সব খুব কষ্ট লাগে। বাবা- মার কাছ থেকে চাইতে লজ্জা লাগে। কিন্তু কি করব , না পাঠালে যে বাব-মা তুলে বকা দেয়। আর এসব তো এখন নিয়ম। আমরা মেয়ে এসব তো আমাদের সহ্য করতেই হবে।”
কক্সবাজার শহরে বিয়ে হয়ে আসে চকরিয়ার মেয়ে জেনিফার ইসলাম (২৮)। চট্টগ্রাম কলেজ থেকে করেছে অর্নাস-মার্ষ্টাস। ইচ্ছে ছিল চাকরি করার। কিন্তু প্রতিনিয়ত স্বামী ও শুশুড় বাড়ির লোকজনের বাঁধা। চাকরি করা চলবেনা, একা বাইরে যাওয়া চলবেনা, ঘনঘন বাপের বাড়ি যাওয়া চলবেনা, জোরে কথা বলা যাবেনা। এতশত “না” এর মুখে জেনিফার এখন ভারসাম্যহীন। ছিটকে পড়েছে যেন এক অন্য জগতে। অধিকাংশ সময় কাটে তার সংসারের কাজ করে। আর সময় পেলেই নিরবে কাঁদে। তার কান্না এখন তার প্রেমকরে বিয়ে করা স্বামীর চোখেও পড়েনা। জেনিফার বলেন “ মেয়ে হয়ে জন্ম নেয়া অপরাধ। কিভাবে এর থেকে বের হব? আমি তো নারী,আমার নিজের কোন ইচ্ছে থাকতে পারেনা, কোন স্বাধীনতা থাকতে পারেনা।”
কথা হয় আমার এক শিক্ষিত দূর সর্ম্পকের বোনের সাথে। রামুর মেয়ে সে , বিয়ে হয়েছে একই এলাকায়। তার এক পুত্র সন্তান রয়েছে যার বয়স ৮ বছর। আমি অবাক হয়েছি যখন শুনেছি সে এখন থেকেই তার ছেলের বিয়েতে যৌতুক নেবার স্বপ্ন দেখে। তার ভাষ্যমতে “আমি যৌতুক চাইবোনা। তবে আজকালতো না চাইলেও বাবা মা দিয়ে দেয়। মেয়ের সুখের জন্য সব কিছু দিবেনা? সেটা যৌতুক হবে কেন?”
এসব তো বিবাহিত নারীদের প্রত্যাহিক ধারাবাহিকতার কথা। অবিবাহিত নারীরা কি খুব ভালো আছে? শুধু কি নারী, কন্যা শিশুও কি ভালো থাকতে পারে? বাবা- মায়ের সবসময় দুঃশ্চিন্তা, আদর করার ছলে কে কখন শরীরে হাত দিবে, চকলেট দেয়ার বাহানায় নির্জন স্থানে নিয়ে যাবে। আর বড় হলে পথ চলতে প্রতিনিয়ত শিকার হতে হয় যৌন হয়রানির মত হাজারো ঘটনার। ভীড়ের মধ্যে ,লোকাল বাসে চলতে ধাক্কা খেতে হয় পুরুষদের (ইচ্ছে করে)। পথে টিটকারি ,শিষ আর বাজে কথা শোনা তো নারীদের নিত্য দিনের রুটিন হয়ে দাড়িয়েছে। এখানেও আমরা নারীরা মেনেনি, নারী হয়েছি বলে এ হয়রানি আমাকেই ভোগ করতে হবে। নারীদের হয়রানি করা পুরুষদের জন্মগত অধিকার। ( সব পুরুষের কথা বলছিনা) আবার সেই পুরুষরা নিজের বোনকে যখন হয়রানির শিকার হতে দেখে লঙ্কা কান্ড বাধিয়ে দেয়। যে তার বোনকে বাজে কথা বলল ছেড়ে দেয়না তাকে।
কবে এর থেকে বের হতে পারবো আমরা? কখন নারীরা মনে করবে নারী হওয়াটা অপরাধের নয়। নারী হওয়াটা ভাগ্যের। এর জন্য আমি একা পুরুষকে দায়ী করবোনা। এর জন্য দায়ী করবো নারী -পুরুষ সকলের দৃস্টিভঙ্গি। সকলের আগে নারীর নিজের অধিকারটা বুঝে নেয়া সক্ষমতা অর্জন করতে হবে। নারী হওয়াটা র্দূভাগ্যের নয়, সৌভাগ্যের মনে করতে হবে। নিজেকে নারী নয় আগে মানুষ মনে করতে হবে। নিজের অধিকারটুকু যদি আদায় করতে না শিখি কারো পক্ষেই নারী নির্যাতন বন্ধ করা সম্ভব হবেনা। তবে হ্যা একা একটি নারী কখনো সমাজ বদলাতে পারবেনা। সচেতনতা সৃস্টি করতে হবে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে একটি ঘর থেকে। বাবা-মা যদি তার কন্যাকে, স্বামী তার স্ত্রীকে, শুশুড় – শাশুড়ী তা পুত্রবধুকে, ভাই তার বোনকে যোগ্য সম্মান , মর্যাদা ও অধিকার দেয় তবে একদিন নারী নির্যাতন বন্ধের স্বপ্ন আমরা দেখতে পারি। আর সেই দিন হয়তো বাসে নারীদের জন্য আলাদা আসনের ব্যবস্থা থাকবেনা। সংসদে সংরক্ষিত আসন থাকবেনা। আলাদা করে নারী কোটা থাকবেনা। নারীদের জন্য আলাদা অধিদফতর থাকবেনা। নারী-পুরুষ সমতা চেয়ে চিৎকার করতে হবেনা। সেদিনই বুঝবো নারীরা সঠিক মর্যাদা পেয়েছে।

Top