অতিথি কলাম : দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তারে জাতিসংঘের উদ্বেগ

1.jpg

॥ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট ॥
প্রথমআলো পত্রিকায় গত ৫ এপ্রিল প্রথম পৃষ্টায় ’দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তারে উদ্বেগ’ এবং ’ব্যাংকের দুর্নীতিতে বছরে ক্ষতি ১০ হাজার কোটি টাকা’ শিরোনামে দুইটি জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ-প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে, যা পড়ে দেশের সাধারণ মানুষও গভীরভাবে চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েছে।
গত ১৪ ও ১৫ মার্চ জেনেভায় জাতিসংঘের সামাজিক,অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অধিকারবিষয়ক কমিটির দুদিনব্যাপী বৈঠকে বাংলাদেশ প্রতিবেদন পেশ করে। প্রতিবেদনটি পর্যালোচনার পর গত ২৯ মার্চ তাদের সুপারিশ চুড়ান্ত করে। আনুষ্ঠানিকভাবে ৩ এপ্রিল এটি প্রকাশ করা হয়। কমিটিতে বাংলাদেশের পক্ষে প্রতিবেদন পেশ এবং বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব দিয়েছিলেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শাহরিয়ার আলমের নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল। জাতিসংঘের উক্ত কমিটি পর্যবেক্ষণের শুরুতে দারিদ্র বিমোচন, মাথাপিছু আয় বৃদ্ধি, গড় আয়ু বেড়ে সাড়ে ৭১ বছর হওয়া এবং স্বল্পোন্নত দেশ থেকে উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশের যোগ্যতা অর্জনে সন্তোষ প্রকাশ করেছে। তা ছাড়া বিভিন্ন ক্ষেত্রে নারীদের অগ্রগতি, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহনে নারীদের অংশগ্রহন, স্থানীয় সরকারে এক-তৃতীয়াংশ আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত রাখার বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে। বাংলাদেশকে কমিটি প্রশংসা করছে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শতভাগ শিশুর অর্ন্তভুক্তি ও লিঙ্গসমতা নিশ্চিত করায়।
তবে রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের জন্য সরকারী তহবিল ব্যবহার ও দুর্নীতির ব্যাপক বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। জাতিসংঘের উক্ত কমিটি চায় বাংলাদেশ যেন দুর্নীতি দমন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করে এবং এ ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের ছাড় দেওয়া না হয়। সরকারী তহবিল ও সেবা রাজনৈতিক ফায়দা হাসিলের উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হওয়া,জমি বন্দোবস্ত ও মৌলিক সেবা পেতে ঘুষ দেওয়ার মত খবরে কমিটি বিশেষভাবে উদ্বিগ্ন বলে জানিয়েছে। তারা মনে করে দুর্নীতি সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক,সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অধিকার ভোগের ক্ষেত্রকে মারাত্মকভাবে বিপর্যস্ত করছে। এর শিকার হচ্ছে মূলত পশ্চাদপদ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠী। এ ব্যাপারে রাজধানী ঢাকায় বসবাসকারী দেশের খ্যাতনামা মানবাধিকারকর্মী,আইনজীবীসহ বিশেষজ্ঞদের মতামতও প্রতিবেদনে ছাপা হয়েছে। কিন্তু জেলা শহরসহ গ্রামগঞ্জে বসবাসকারী জনগণের এ সংক্রান্তে মতামত ছাপা হয় নাই।
দেশব্যাপী ব্যাপকভাবে বিস্তারিত দুর্নীতি সাম্প্রতিক বছরগুলোতে শত সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও দুদকের কঠোর পদক্ষেপের ফলে কিছুটা কমেছে যা ট্রান্সপেরেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রির্পোটে স্বীকৃত হয়েছে। জাতিসংঘের উক্ত কমিটির পর্যবেক্ষণে কেন দুর্নীতি ব্যাপক বিস্তার লাভ করেছে এবং কি উপায়ে তা দ্রুত দমন করা যাবে তার কোন সুনির্দিষ্ট পরামর্শ নাই,যদিও দুর্নীতি দমন আইন কঠোরভাবে প্রয়োগ করার ক্ষেত্রে উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ও রাজনীতিবিদদের ছাড় না দেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতার কারণে,নৈতিকতার কারণে,প্রচলিত আইনে বিচারের শাস্তির ভয়ের কারণে ও পরকালে সৃষ্টিকর্তার বিচারে শাস্তির ভীতির কারণে বেশীর ভাগ মানুষ সাধারণত দুর্নীতি করা থেকে বিরত থাকবে তা প্রত্যাশিত। বাকী সামান্য আইন অমান্যকারী দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগ করে বিচারের আওতায় এনে শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে। অনেক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, দেশব্যাপী দুর্নীতি দ্রুত বিস্তার লাভ করেছে রাজনীতির মাধ্যমে। ১৯৯১ সালে নির্বাচিত সরকার প্রতিষ্ঠা হওয়ার পর থেকে ক্ষমতাসীনদের উদ্দ্যোগে সব কিছুতে দলীয়করণ ও রাজনীতিকরণ প্রবণতা শুরু হয়, যা প্রতিযোগিতামূলকভাবে এখনও অব্যাহত আছে। দুধের সাথে পানি মেশানোর মত রাজনীতির সাথে দুনীর্তিকে এমনভাবে মিশিয়ে ফেলা হয়েছে যে কোনটা রাজনীতি আর কোন দর্নীতি তা খোদ রাজনৈতিক দলের নেতা/কর্মীরাও নিশ্চিত নন,অনেক সময় বিভ্রান্ত হয়ে যান। শুধু দুদককে দিয়ে দেশব্যাপী দুর্নীতি দমন করা সম্ভব নয় । দুদকের জনবল আছেন মাত্র ১০৭৩ জন। দুদকের চেয়ারম্যান দুর্নীতি না করতে ও দুর্নীতিবাজদের ধরতে নির্দেশ দিলে চাকুরী যাওয়ার ভয়ে তাঁর অধীনস্থ মাত্র ১০৭৩ জনই তার নির্দেশ মান্য করবেন। দুর্নীতির বিরুদ্ধে দেশব্যাপী জনসচেতনতা সৃষ্টিতে দুদকের কর্মসূচী বাস্তবায়নকারী দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির কয়েক হাজার সদস্যরাও দায়িত্বশীলতার কারণে তার নির্দেশ মানতে পারেন। কিন্তু একজন রাজনৈতিক দলের নেতার লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি অনুসারী আছেন। একজন নেতা যদি আমার দলের কেউ দুর্নীতি করলে বা কারও বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তাকে দল থেকে,দলীয় বিবেচনায় প্রাপ্ত সরকারী পদ থেকে সাময়িক বহিস্কার,বহিস্কার করা হবে বলে ঘোষণা দিলেই অনেক দুর্নীতি বন্ধ হয়ে যাবে। তদন্তে প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত দুর্নীতিবাজদের দলের পক্ষ থেকে স্থানীয় পরিষদের নির্বাচন থেকে জাতীয় নির্বাচনের কোথায়ও দলীয় মনোনয়ন দেওয়া হবে না। দুর্নীতিবাজরা দলের নেতা/কর্মী বা সদস্য হতে পারবে না মর্মে প্রত্যেক রাজনৈতিক দলের গঠনতন্ত্রে সুস্পষ্ট বিধান থাকা উচিত। একমাত্র বিএনপিতে সে ধরনের দুর্নীতিবিরোধী বিধান থাকলেও তা সম্প্রতি বাতিল করে দেশবাসীকে হতাশ করেছে। অন্য কোন দলে সে ধরনের দুর্নীতিবিরোধী বিধান না থাকলেও গঠনতন্ত্র সংশোধন করে তা করা উচিৎ। অন্য দলকে দুর্নীতিবাজ বলার আগে নিজের দলকে দুর্নীতিমুক্ত করা উচিৎ। অন্যকে দুর্নীতিবাজ বলার আগে নিজেকে দুর্নীতিমুক্ত করা উচিৎ। অন্য দলের লোকে যে কাজ করলে দুর্নীতি হয় নিজের দলের লোকেরা সেই কাজ করলে কি এবাদত হবে? রাজনৈতিক সদিচ্ছা ছাড়া মহাশক্তিশালী রাজনৈতিক দলের সাথে যুদ্ধ করে দুর্নীতি দমন করা দুদকের পক্ষে সম্ভব নয়। কোন রাজনৈতিক দলের নেতার বিরুদ্ধে দুদক আইনের তপশীলভুক্ত কোন অপরাধ করেছেন মর্মে অভিযোগ পাওয়া গেলে তা অনুসন্ধান করে দেখার এখতিয়ার ও ক্ষমতা আইন অনুযায়ী দুদকের আছে। কিন্তু সেই রাজনৈতিক দলের পক্ষে প্রত্যেক দিন মিটিং,মিছিল,প্রেস কনফারেন্স করে জনমনে দুদক সম্পর্কে বিভ্রান্তি ছড়ালেও দুদকের পক্ষেও পাল্টা মিছিল মিটিং করে জবাব দেওয়া বিধিসম্মত নয়। রাজনৈতিক দলের সম্মানিত নেতারা শুধু রাজনীতিই করবেন, রাজনীতির মোড়কে দুর্নীতি নয়। তাই দেশের বৃহত্তর স্বার্থে,জনস্বার্থে রাজনীতিকে দুর্নীতিমুক্ত করা অত্যন্ত জরুরী ও সময়ের দাবী।
ব্যাংক খাতের অদক্ষতায় বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১ শতাংশের সমপরিমাণ ক্ষতি হয়। ২০১৬-১৭ অর্থবছরের জিডিপি বিবেচনায় এ ক্ষতির পরিমাণ ১০ হাজার কোটি টাকার সমান বলে মনে করে বেসরকারী গবেষণা সংস্থা সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিং(সানেম)। রাজনৈতিক বিবেচনায় অযোগ্য.অনভিজ্ঞ,অদক্ষ,অপেশাদার লোকদের নতুন ব্যাংক প্রতিষ্ঠার লাইসেন্স দেওয়া, ব্যাংকের চেয়ারম্যান,পরিচালকসহ গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়ায় দুর্নীতির কারণেই ব্যাংক খাতের এ ক্ষতি হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যার যে দায়িত্ব সে তার দায়িত্ব সময়মত যথাযথভাবে পালন করলে দুর্নীতি হবে না,দুর্নীতি অবশ্যই কমে যাবে। দেশের প্রকৃত আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হলে দুর্নীতি কমে যাবে। আইন প্রথমে সরকারকে মানতে হবে, প্রশাসনকে মানতে হবে। সরকার আইন অনুযায়ী কোন দলীয় লোককে গুরুত্বপূর্ণ পদে তিন বছরের জন্য নিয়োগ দেন যদি আট বছর পরও দুর্নীতির অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তার বদলি না হয়, জবাবদিহিতা না থাকে সে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ব্যক্তি বেপরোয়ায়া,স্বৈরাচার ও দুর্নীতিবাজ হবে না কেন?
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Top