কক্সবাজার কলেজে ছাত্রলীগের তান্ডব অধ্যক্ষ অবরুদ্ধ, শিক্ষক লাঞ্ছিত

cox-colag.doc.jpg

তুষার তুহিন :
বিবাদপূর্ণ জমিতে ‘শেখ রাসেল’ এর নামে রাস্তা নির্মান বন্ধ করে দেওয়ার প্রতিবাদে কক্সবাজার সরকারী কলেজে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা তান্ডব চালিয়েছে। গতকাল সোমবার দুপুর ১২ টায় রাস্তা নির্মাণ সহ ১২ দফা দাবীতে প্রশাসনিক ভবনে বিক্ষোভ মিছিল করে ছাত্রলীগ। সেই মিছিল থেকেই কলেজের চেয়ার টেবিল সহ আসবাবপত্র ভাংচুর, সাত শিক্ষককে লাঞ্চিত করা হয়। একই সাথে অধ্যক্ষের কক্ষে তালা দিয়ে অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। পরে পুলিশ গিয়ে অধ্যক্ষকে উদ্ধার করে ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
এ বিষয়ে কক্সবাজার সরকারি কলেজের ছাত্রী দিপান্নিতা বলেন, গতকাল কলেজ ছাত্রলীগের অন্তত ৪০/৫০ জনের একটি দল মিছিল সহকারে অধ্যক্ষ স্যারের রুমের দিকে আসে তারা হঠাৎ করে কোন কথাবার্তা ছাড়াই কলেজের গ্রীল দরজা জানালাতে লাথি মারতে থাকে এবং ভাংচুর করে পরে অধ্যক্ষর রুমে তালা মেরে দেয়। এবং শিক্ষকদের আসা যাওয়ার রাস্তার দরজা বন্ধ করে দেয় । পাশাপাশি সাতজন শিক্ষককে লাঞ্চিত করেছে তারা। ঘটনার সময় অদূরেই দাড়িয়ে ছিল কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি জাকের হোসেন এবং সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেন । এ নিয়ে এসময় সাধারণ ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক আতংক ছড়িয়ে সবাই কলেজ ক্যাম্পাস ত্যাগ করে।
তবে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি জাকির হোসেন বলেন, ওই আন্দোলনের সাথে ছাত্রলীগের কোন সম্পর্ক নেই। আন্দ্লোনটি করছে সাধারন শিক্ষার্থীরা। তারাই অধ্যক্ষের কক্ষে তালা দিয়েছে।
তিনি আরো দাবী করেন, ছাত্রলীগ উল্টো পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাজ করেছে। অধ্যক্ষকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করেছে।
তবে ইয়াসমিন নামের আরেক ছাত্রী বলেন কলেজ ছাত্রলীগ নেতা জসিম উদ্দিন, উৎপল বড়ুয়া, শরীফ হোসাইন সিকদার, সাব্বিরুল হক জুলাইব, নুরুল আবরার শাকিব, সালাহ উদ্দিন জাশেদ, মো: আনাস ও মো: রায়হানের নেতৃত্বে বিক্ষোভ মিছিল, ভাংচুর, অধ্যক্ষের কক্ষে তালা ও সাত শিক্ষককে লাঞ্চিত করে ছাত্রলীগ। সে সময় অদূরে কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি জাকির হোসেন ও সাধারণ সম্পাদক সাখাওয়াত হোসেনও ছিল।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন শিক্ষক অভিযোগ করেছেন, মিছিলে অংশ গ্রহনকারীরা অন্তত সাতজন শিক্ষককে পাকড়াও ও শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করেছেন।
এদিকে সরজমিনে কক্সবাজার সরকারি কলেজে গিয়ে দেখা গেছে সেখানে পুলিশের উপস্থিতি আছে,এবং কলেজ অধ্যক্ষের রুম খোলা আছে। ভেতরে জেলা আওয়ামীলীগ নেতাদের সাথে বৈঠক করছে কলেজ প্রশাসন ও ছাত্রলীগ। তখন শিক্ষকরা বলেন মূলত কলেজের পশ্চিম পাশের একটি জমি বেশ কিছু দিন ধরে দখল করে রেখেছিল এফাজ উল্লাহ নামের এক সন্ত্রাসী। গত সপ্তাহে সেখানে একটি রাস্তা নির্মান করতে দেখে কলেজ অধ্যক্ষ সেটা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে অভিযোগ আকারে দিয়েছে। পরে আমরা জানতে পারছি সেই রাস্তা র্নিমানের জন্য কলেজ ছাত্রলীগ নেতারা ১০ লাখ টাকা নিয়েছে। সর্বশেষ রবিবার সদর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সেই কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয় এতে ছাত্রলীগ নেতারা ক্ষিপ্ত হয়ে অধ্যক্ষর রুমে তালা দিয়েছে এবং কলেজে ভাংচুর করছে।
কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সাধারন সম্পাদক মোর্শেদ হোসাইন তানিম বলেন, কলেজ ছাত্রলীগ দীর্ঘদিন যাবৎ সুনামের সাথে কলেজে রাজনীতি করছে। বিষয়টি এক শ্রেণীর মানুষের সহ্য হচ্ছে না। তাই ছাত্রলীগকে বির্তকিত করতেই এখানে নাম ব্যবহার করা হচ্ছে। ছাত্রলীগ কলেজের স্বার্থে অতীতেও কাজ করেছে। ভবিষ্যতেও করবে।
তিনি আরো বলেন, যে রাস্তাটি নিয়ে এত সমস্যা সেটি সাধারন শিক্ষার্থীদের দাবীর প্রেক্ষিতে স্থানীয় সাংসদ সাইমুম সরওয়ার কমল টিআর প্রকল্প থেকে বরাদ্দ দিয়েছে। আর সাধারন শিক্ষার্থীদের জন্যই ছাত্রলীগ কাজ করে। যে ভুল বুঝাবুঝির সুৃষ্টি হয়েছে আশা করি অচিরেই এর সুষ্ঠু সমাধান হবে।
কক্সবাজার জেলা ছাত্রলীগের সভাপতি ইশতিয়াক আহমেদ জয় বলেন, সরকারী কলেজ নিয়ে কোন ধরনের ষড়যন্ত্র সহ্য করা হবে না। কলেজের স্বার্থে আমার অবস্থান কলেজ প্রশাসনের পক্ষে। তাই কলেজ ছাত্রলীগের কলেজ প্রশাসনের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই।
কক্সব্জাার সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ একেএম ফজলুল করিম চৌধুরী বলেন, ওই জমি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ আদালতে মামলা চলছে। তাই সেখানে রাস্তা নির্মান বন্ধ করতে কলেজের পক্ষ থেকে ইউএনও ও কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে আবেদন করা হয়।
তিনি আরো বলেন, ছাত্রলীগকে ভুল তথ্য দিয়ে এফাজ উল্লাহ নামে এক ব্যক্তি প্লটে যাওয়ার সুবিধার্থে ওই স্থানে রাস্তাটি নির্মাণ করছে। যা কলেজের কোনো কাজে আসবে না।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি ফরিদ উদ্দিন খন্দকার বলেন, কলেজ প্রশাসন, ছাত্রলীগ, আওয়ামীলীগ ও পুলিশ প্রশাসন সহ একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। কিন্তু এতে কোন সুরাহা হয়নি। তবে কলেজের পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সেখানে আগামী কয়েকদিন পুলিশ থাকবে।
কক্সবাজার সদর উপজেলা নির্বাহি কর্মকর্তা নোমান হোসেন প্রিন্স বলেন, এটি একটি বিরোধ পূর্ণ জমি । ওই জমিতে স্থাপনা নির্মানে আদালতের নিষেধজ্ঞা রয়েছে। বিষয়টি গোপন করে প্রকল্পটির অনুমোদন নেয় আওয়ামীলীগ নেতা ইয়াকুব আলী ইমন, আব্দুল মান্নান ও কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি জাকির হোসেন। অনুমোদনে শর্ত ছিল আমার সাথে পরামর্শ করেই রাস্তাটি নির্মাণ করা হবে। কিন্তু তারা আমাকে না জানিয়েই গোপনে রাতের আধারে রাস্তা নির্মাণ করছিল। এই কারণে আমি ১৭ মার্চ প্রকল্পটি বাতিল করে দেই। রাস্তা নির্মাণ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেই। তারপরও রাতের আধারে কাজ করার অপরাধে ৪ জনকে আটক করি। ভ্রাম্যমান আদালতের মাধ্যমে একজনকে ২ বছরের কারাদন্ড দিয়েছে।
কক্সব্জাার সরকারী কলেজের অধ্যক্ষ একেএম ফজলুল করিম চৌধুরী বলেন, ওই জমি নিয়ে দীর্ঘদিন যাবৎ আদালতে মামলা চলছে। তাই সেখানে রাস্তা নির্মান বন্ধ করতে কলেজের পক্ষ থেকে ইউএনও ও কক্সবাজার সদর থানা পুলিশকে আবেদন করা হয়।
কক্সবাজার জেলা আওয়ামীলীগের সাধারন সম্পাদক মুজিবুর রহমান বলেন, রাস্তা নির্মাণ করছে ভুমিদূস্য এফাজ উল্লাহ। সেখানে ছাত্রলীগকে ব্যবহার করা হচ্ছে। বিষয়টি অত্যন্ত লজ্জাজনক। এর সুরাহার জন্য আজ জেলা প্রশাসনের হলরুমে একটি বৈঠক রয়েছে।
কক্সবাজার জেলা প্রশাসক মো. কামাল হোসেন, আজ জেলা প্রশাসনের কার্যালয়ে বিষয়টির শান্তিপূর্ণ সমাধানের জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষ, উপজেলা প্রশাসন ও ছাত্রলীগের সাথে একটি বৈঠক করা হবে। আশা করি সেখান থেকেই এর একটি আইনগত সমাধান হবে। ওই বৈঠকে জেলা আওয়ামীলীগের নেতৃবৃন্দ উপস্থিত থাকবেন।

Top