সপ্তাহের মধ্যে আরো ৬ পরিবার মিয়ানমারে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত আলীকদম থেকে মিয়ানমারে চলে গেছে ৩৪ উপজাতি পরিবার

1-1.jpg

এস.কে খগেশপ্রতি চন্দ্র খোকন :
বাংলাদেশের আদিবাসীরা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে গেলেই তাদের দেওয়া হচ্ছে চাষের জমি, গরু, প্রতিমাসে রেশন ও চাষাবাদের উপকরণ, থাকার জায়গা এবং নগদ অর্থ সহায়তা দিচ্ছে এমন উড়ো মিথ্যা খবর বিশ্বাস করে বাংলাদেশ ছেড়ে গেছে পার্বত্য অঞ্চলে বসবাসকারী কিছু উপজাতি পরিবার।
এ কথা বিশ্বাস করে নিরাপদে থাকা ও খাওয়ার আশায় বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার সীমান্তবর্তী এক ইউনিয়ন থেকে ২৬ ম্রো পরিবার দেশ ত্যাগ করে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলে গেছে। তবে যারা গেছে তারা এখন কি অবস্থায় আছে – দেশে থাকা তাদের আত্মীয় স্বজনরা এখন পর্যন্ত কেউ সংবাদ পায়নি বলে জানান কয়েকজন নিকট আত্মীয়রা।
এ বিশ্বাসের উপর গত ৬ মাসের মধ্যে বান্দরবানের আলীকদম ইউনিয়নের সীমান্ত সংলগ্ন ৪নং কুরুকপাতা ইউনিয়নের ৫ ওয়ার্ডের ৯টি পাড়া থেকে ২৬ পরিবারের ১৩৯ জন বাংলাদেশী নাগরিক জন্ম ভূমি ছেড়ে চলে গেছে। এ ছাড়া উপজেলার ৩ নং নয়াপাড়া ইউনিয়নের বাসুদেব কারবারী চাকমা পাড়া থেকে গত এক মাসে ৪টি চাকমা পরিবার ও ৪টি তঞ্চঙ্গা পরিবার মিয়ানমারে চলে গেছে এবং আগামী সপ্তা খানেকের মধ্যে আরো কিছু পরিবার চলে যাবে বলে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যান ও এলাকাবাসী নিশ্চত করেছেন।
এ ছাড়া আগামী কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চাকমা ও তঞ্চঙ্গা সম্প্রদায়ের দুই পাড়া থেকে আরো ৫ থেকে ৬ পরিবার দেশ ত্যাগ করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছেন আলীকদম উপজেলার নয়াপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যন বাবু ফোগ্য মারমা।
এদিকে গত ১৪ মার্চ বুধবার দুপুর ১২টার সময় সীমান্ত সংলগ্ন উপজলার কুরুকপাতা ইউনিয়নের ৫নং ওয়ার্ডের রালাই ম্রো পাড়ার বাসিন্দা প্রো ওয়াই ম্রো(৪০)পিতা- মৃত-ইয়ং ম্রো তার চার সন্তান ও স্ত্রীকে নিয়ে উড়ে কথায় বিশ্বাস করে বাড়ী থেকে প্রায় ছয় কিলোমিটারের মতো পাহাড়ী পথ বেয়ে দেশ ছেড়ে মিয়ানমার সীমানায় ঢুকে পড়লে তাদের(মিয়ানমার) সীমানায় পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে ঘটনাস্থলেই প্রো ওয়াই মারা যায়। এ সময় প্রো ওয়াই এর স্ত্রী ও দু সন্তান স্থল মাইন বিস্ফোরণে গুরুতর আহত হয়। আহতরা বর্তমানে চট্রগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে।
স্ব-পরিবারে বাংলাদেশী এক পরিবার দেশ ত্যাগ করতে গিয়ে মিয়ানমার অংশে পুঁতে রাখা স্থলমাইন বিস্ফোরণে নিহত ও আহত হওয়ার ঘটনার পর বিষয়টি প্রশাসনসহ সকলের নজরে আসে।
আলীকদমের কুরুপপাতা ইউনিয়ন থেকে যারা মিয়ানমারে চলে গেছে তারা হলেন, ৫নং ওয়ার্ডের রালাই পাড়া থেকে- লিংক্লাং মোঃ পিতা- রাতুই সহ চার জন সদস্য, সাকনাউ ম্রো পিতা- নিয়াসউ সহ ছয়জন, মেনডং ম্রো পিতা-মেনলকসহ ছয়জন সদস্য, মেন ইয়া ম্রো পিতা- পালেসহ ছয় জন, আরোই ম্রো পিতা- লংনাথসহ চারজন, মাংরুম পাড়া থেকে- রেংথই ম্রো পিতা- রিংকুইসহ পাঁচজন, থংওয়াই ম্রো পিতা- রেংনংসহ চার জন, মুকাং ম্রো পিতা-মেনরাউসহচারজন সদস্য, রিসা ম্রো পিতা-দুই ওয়াইসহ চারজন সদস্য, তেইচ্চা পাড়া থেকে – চংমং কারবারী পিতা- তেকচাসহ পাঁচজন সদস্য, দুইডক ম্রো পিতা- তেইচ্চাসহ ৭জন সদস্য, ওয়াইলক ম্রো পিতা-চিংতাইসহ আটজন, দির ওয়াই ম্রো পিতা- মপংসহ এগারজন, কাইপ্রিয়া ম্রো পিতা- মেনক্রাতসহ বারজন, মেন চুং পিতা-কাইপ্রিয়াসহ সাতজন, বুত্তোপাড় থেকে- লংলং ম্রো পিতা-কা পেয়সহ পাঁচজন, ছেতং ম্রো পিতা- মেববতসহ পাঁচ জন, সাকলান ম্রো পিতা- বালিকংসহ তিনজন, মেননি পাড়া থেকে- মেনচং ম্রো পিতা- ইউলুইসহ চারজন, মেনইয়ম পাড়া থেকে – রুতুই ম্রো পিতা- মেনইয়মসহ পাঁচজন, পারাউ পাড়া থেকে- রেংছং ম্রো পিতা- অজ্ঞাতসহ চারজন, কাইম্পা ম্রো পিতা- কমলাইসহ পাচজন, কাম ইয়েন ম্রো পিতা- রেংহিনসহ ৩জন, মেনডন পাড়া থেকে- পাংলুই ম্রো পিতা-অজ্ঞাতসহ পাঁচজন।
এ ঘটনায় আলীকদম উপজেলা প্রশাসন জরুরী ভিত্তিতে গত গত ১৫ মার্চ উপজেলা পরিষদ হলরুমে উপজেলার চারটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান, সাধারণ পুরুষ সদস্য ও সংরক্ষিত মহিলা সদস্যদের নিয়ে সামাজিক নিরাপত্তা বিষয়ে বৈঠক করেন।
এ বিষয়ে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আমিরুল কায়ছার বলেন, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চলে গেলে নাকি তাদের চাষের জমি, গরু ও চাষাবাদের উপকরণ, থাকার জায়গা ও নগদ অর্থ সহায়তা দিবে এ রকম উড়ো কথা আলীকদম উপজেলায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ গোষ্ঠী জসাধারণের মাঝে বয়ে বেড়াচ্ছে। আর সেই উড়ো কথায় বিশ্বাস করে উপজেলা থেকে কিছু উপজাতি পরিবার চলে গেছে এমন কথা শুনছি। এমন সংবাদ আমাদের কাছে আসার পর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জনপ্রতিনিধিদের মাধ্যমে উপজেলায় বসবাসরত জনসাধারণকে এ রকম মিথ্যা ও উড়ো কথা বিশ্বাস না করার জন্য অনুরোধ জানান। এ সংবাদটি দ্রুত পৌঁছে দেওয়ার জন্য সকল জনপ্রতিনিধিদের এলাকায় পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে।
সীমান্ত সংলগ্ন উপজেলার ৪নং কুরুকপাতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ক্রাত পুং ম্রো এ প্রতিবেদককে বলেন, আমার ইউনিয়নটি মিয়ানমারের সাথে লাগোয়া। মাতামূহুরী নদীর উৎপত্তিস্থল ও দেশের সংরক্ষিত মাতামূহুরী রিজার্ভ এলাকা ঘিরে। ৯৫ শতাংশ ম্রো জনগোষ্ঠির বসবাস এখানে। মাতামূহূরী নদীর শাখা-প্রশাখা দিয়ে এবং উচু-নিচু পাহাড়ী পথ বেয়ে এখানকার মানুষের বসবাস। খুব কষ্টের জীবন যাপনের মাঝে সেই উড়ো কথা বিশ্বাস করে আমার ইউনিয়ন থেকে গত ৬ মাসে ৫ ওয়ার্ডের ৯টি পাড়া থেকে ২৬ পরিবারের ১৩৯ জন লোকজন জন্ম ভূমি ছেড়ে মিয়ানমারে চলে গেছে।
রালাই ম্রো পাড়ার বাসিন্দা চেউ বেং ম্রো’র সাথে আলাপ কালে তিনি বলেন, মাতামূহুরী রিজার্ভ থেকে বাঁশ, গাছ উজাড় করে ফেলায় পাহাড়ে বসবাসরত মানুষ গুলো বসবাসে সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং পাহাড় গুললো ন্যাড়া হয়ে যাওয়ায় অতিরিক্ত গরমে ভিষণ কষ্ট হচ্ছে মানুষের। এ কারণে গত ৪ থেকে ৫ বছর ধরে আমাদের এলাকায় অভাব চলছে। সারা দিন পরিশ্রম করেও পরিবার চালানো কষ্ট হয়ে পড়ে। প্রতিনিয়ত অভাব লেগে থাকায় মানুষ কি করবে দিশা পাচ্ছিলোনা। তাই নিরাপদে থাকা ও খাওয়ার আশায় মাইন বিস্ফোরনে নিহত প্রো ওয়াই ম্রো গত দু’মাস আগে থেকে মিয়ানমারে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। এ রকম অনেক লোকজন দেশ ত্যাগ করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে।
এদিকে আলীকদম উপজেলার ৪নং কুরুকপাতা ইউনিয়নের চেয়ারম্যান বাবু ফোগ্য মার্মা এ প্রতিবেদককে বলেন, আগামী সপ্তা খানেকের মধ্যে আমার ইউনিয়নের বাসু দেব চাকমা পাড়া ও যোগেন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা পাড়া থেকে ৫ থেকে ৬ পরিবার মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আলীকদম সীমান্ত দিয়ে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
আলীকদমের নয়াপাড়া ইউনিয়ন থেকে যারা দেশ ছেড়ে চলে গেছে তারা হলেন, বাসু দেব চাকমা পাড়ার বাসিন্দা- যুদ্ধ মনি ত্রিপুরা পিতা- আনন্দ লাল চাকমা, দোরাইল্লা চাকমা পিতা- কান্ত মনি চাকমা, অনিল বরল চাকমা পিতা- অঞ্চল চাকমা, উথোয়াই চিং তঞ্চঙ্গ্যা পিতা- অজ্ঞাত। এছাড়া একই ইউনিনের যোগেন্দ্র তঞ্চঙ্গ্যা পাড়ার বাসিন্দা – জগদিশ তঞ্চঙ্গ্যা পিতা- চন্দ্রমান তঞ্চঙ্গ্যা, মংক্য তঞ্চঙ্গ্যা পিতা- ভাগ্য মনি তঞ্চঙ্গ্যা, চই পুঁচা তঞ্চঙ্গ্যা পিতা- অজ্ঞাত, উসাঅং তঞ্চঙ্গ্যা পিতা- চিং পু অং তঞ্চঙ্গ্যা।
এদিকে এ রকম উড়ো কথা বিশ্বাস করে এলাকার উপজাতি বাসিন্দারা দেশ ত্যাগ করে চলে যাওয়ার সিদ্ধান্তের পরিস্থিতিতে এলাকার মানুষের সিদ্ধান্ত পরিবর্তন আনতে উপজেলা প্রশাসন জরুরী ভিত্তিতে সরকারের চলমান- অতিদরিদ্র কর্মসৃজন কর্মসূচী, টিআর, কাজের বিনিময়ে টাকা, ভিজিএফ ও জিআর কর্মসূচীর কার্যক্রমের অর্থ ও টাকা শতভাগ কুরুকপাতা ইউনিয়নের সকল দূর্গম এলাকায় পৌঁছে দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আমিরুল কায়ছার।
এ ব্যাপারে আলীকদম উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মোঃ আবুল কালাম বলেন, উপজেলা থেকে কিছু উপজাতি পরিবার গত এক বছরের মধ্যে আলীকদম উপজেলা থেকে মিয়ানমারে চলে গেছে। আরো কিছু উপজাতি পরিবার গোপনে চলে যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। প্রশাসনের পক্ষ থেকে সহসা এ বিষয় নিয়ে কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়া দরকার বলে তিনি মনে করেন।

Top