কোটারই দরকার নেই : প্রধানমন্ত্রী

11.jpg

কক্সবাজার  ডেস্ক :
শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে ক্ষুব্ধ হয়ে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে কোটা পদ্ধতি একেবারেই তুলে দেওয়ার কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। কোটা সংস্কারের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে রাজধানীতে স্থবিরতা এবং সারাদেশে বিক্ষোভের মধ্যে বুধবার বিকালে সংসদে একথা বলেন সরকার প্রধান।
শেখ হাসিনা বলেন, “বারবার এই আন্দোলন ঝামেলা মিটাবার জন্য কোটা পদ্ধতি বাতিল; পরিষ্কার কথা; আমি এটাই মনে করি, সেটা হল বাতিল।” আন্দোলনকারীরা আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক ও মন্ত্রী ওবায়দুল কাদেরের সঙ্গে দুদিন আগে বৈঠক করলেও প্রধানমন্ত্রীর সুনিন্দিষ্ট ঘোষণা ছাড়া রাজপথ না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তার পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলনকারীদের ধৈর্য ধরার পরামর্শ দিয়ে বুধবার সকালে ওবায়দুল কাদের বলেছিলেন, বিকালে সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী এই বিষয়ে কথা বলবেন। বিকালে সংসদ অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রীর প্রশ্নোত্তর পর্বে আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর কবির নানক কোটা সংস্কার নিয়ে শিক্ষাঙ্গনে চলমান অস্থিরতার প্রসঙ্গটি তুলে সরকার প্রধানের জবাব জানতে চান। এরপর বক্তব্যের প্রায় প্রতিটি ছত্রে চলমান আন্দোলন নিয়ে বিরক্তি প্রকাশ করেন শেখ হাসিনা।
আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে শিক্ষার্থীদের এবার ঘরে ফিরে যেতে বলেন তিনি। আন্দোলনের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাড়িতে হামলাকার জন্য দায়ীদের শাস্তি দেওয়ার কথাও তিনি বলেন। ফেইসবুকে এক ছাত্রের নিহত হওয়ার গুজব ছড়িয়ে উসকানির কথাও বলেন তিনি। বর্তমানে সরকারি চাকরিতে নিয়োগে ৫৬ শতাংশ পদ বিভিন্ন কোটার জন্য সংরক্ষিত; এর মধ্যে মুক্তিযোদ্ধার সন্তানদের জন্য ৩০ শতাংশ, নারী ১০ শতাংশ, জেলা ১০ শতাংশ, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ৫ শতাংশ, প্রতিবন্ধী ১ শতাংশ। কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারী ‘ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’ কোটার পরিমাণ ১০ শতাংশে কমিয়ে আনার দাবি তুলেছে। তারা কোটায় প্রার্থী পাওয়া না গেলে মেধা তালিকা থেকে তা পূরণের দাবিও জানায়। সংসদে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের পর আন্দোলনকারীদের প্ল্যাটফর্ম ‘ছাত্র অধিকার সংরক্ষণ পরিষদ’র যুগ্ম আহ্বায়ক নুরুল হক নূর সাংবাদিকদের বলেন, তারা রাতে বসে এই বক্তব্য বিশ্লেষণ করে বৃহস্পতিবার সিদ্ধান্ত জানাবেন। তার আগ পর্যন্ত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলনরত শিক্ষার্থীরা রাজধানীর বিভিন্ন স্থানে সড়কে অবস্থান নিয়ে বিক্ষোভ দেখাচ্ছিলেন।
গত কয়েক মাস ধরে আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় রোববার আন্দোলনকারীরা শাহবাগে সড়ক অবরোধ করলে পুলিশ তাদের পিটিয়ে তুলে দেওয়ার পর আন্দোলন বেগবান হয়। তারপর থেকে প্রতিদিনই চলছে বিক্ষোভ। কোটা সংস্কারের দাবির আন্দোলনে নারী শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ এবং জেলায জেলায় শিক্ষার্থীদের নেমে আসার বিষয়টি তুলে ধরে শেখ হাসিনা বলেন, “এরাও চায না, ওরাও চায না। ঠিক আছে; কোটাই থাকবে না। কোটার দরকারই নাই। বিসিএসে যাবে, পরীক্ষা হলে মেধার ভিত্তিতে নিযােগ পাবে।” স্বাধীনতার পর কোটা পদ্ধতি চালুর পর বিভিন্ন সময় তা সংস্কারের বিষয়টি তুলে ধরে তিনি বিরক্তিভরে বলেন, “কোটা থাকলেই সংস্কার। না থাকলে সংস্কারের কোনো ঝামেলাই নেই। আন্দোলন হলে সময নষ্ট হবে। কাজেই কোটা পদ্ধতি থাকারই দরকার নাই।”
‘ক্লাসে ফিরে যাক’ : জনদুর্ভোগ অবসানে কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলনকারীদের এখন ঘরে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “আন্দোলনটা কী, সমস্ত লেখাপড়া বন্ধ করে রাস্তায় বসে যাওয়া। হাসপাতালে মানুষ যেতে পারে না। ঢাকার বাইরে সবাই রাস্তায় নেমে গেছে। আন্দোলন যথেষ্ট করেছে, এবার তারা ক্লাসে ফিরে যাক। “কয়েকদিন ধরে সমস্ত ইউনিভার্সিটিগুলোতে ক্লাস বন্ধ। পড়াশোনা বন্ধ। তারপর আবার ভিসির বাড়ি আক্রমণ। রাস্তাঘাটে যানজট। সাধারণ মানুষের কষ্ট। সাধারণ মানুষ বারবার কষ্ট পাবে কেন?” রোববার শাহবাগ থেকে তুলে দেওয়ার পর রাতভর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পুলিশের সঙ্গে আন্দোলনকারীদের সংঘাত চলে। রাতে ছাত্রী হল থেকে নারী শিক্ষার্থীরাও বেরিয়ে এসে বিক্ষোভে যোগ দেয়। তার পরদিন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিক্ষোভের পাশাপাশি রাজধানীর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরাও নামে রাজপথে, ঢাকার বাইরেও শুরু হয় বিক্ষোভ। শিক্ষার্থীদের ঘরে ফিরে যাওযার তাগিদ দিযে শেখ হাসিনা বলেন, “চৈত্রের রোদে সারাক্ষণ রাস্তায বসে আছে, অসুস্থ হযে পডবে।” নারী শিক্ষার্থীদের নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করে তিনি বলেন, “মেয়েরা কীভাবে এত রাতে বেরিয়ে এল? আমি চিন্তায় সারারাত ঘুমাতে পারিনি। নানককে (জাহাঙ্গীর কবির নানক) পাঠিয়েছি।”
ফেইসবুক গুজব : আন্দোলনের মধ্যে এক ছাত্রের মৃত্যুর গুজব ছড়িয়ে উসকানি দেওয়ার কথাও বলেন শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, “একটা ছেলের মাথায় আঘাত লেগেছে। হঠাৎ একজন স্টাটাস দিয়ে দিল, সে মারা গেছে। সঙ্গে সঙ্গে ছেলে-মেয়ে সব বেরিয়ে গেল। “ডিজিটাল বাংলাদেশ আমরাই গড়ে তুলেছি। সেই কাজ গঠনমূলক কাজে ব্যবহার না করে গুজব ছড়ানোর কাজ এমনকি মেয়েরা, রাত ১টার সময় হলের গেইট ভেঙে মেয়েরা বেরিয়ে পড়ল।” গত রোববার রাতে গণজাগরণ মঞ্চের মুখপাত্র ইমরান এইচ সরকারের ফেইসবুকে এই স্ট্যাটাসটি এসেছিল, যে কারণে তাকে গ্রেপ্তারের দাবি সংসদে একদিন আগে তুলেছিলেন আওয়ামী লীগের এক সংসদ সদস্য।
ভিসির বাড়ির লুটের ‘মাল কোথায়’? : আন্দোলনের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাড়িতে হামলার ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ জানিয়ে এতে জড়িতদের শাস্তি নিশ্চিতের কথা বলেছেন প্রধানমন্ত্রী। গত রোববার রাতে সংঘাতের মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের বাড়িতে হামলা হয়। শেখ হাসিনা বলেন, “সবচেয়ে বড় হল ভিসির বাড়ি আক্রমণ। ওই ছবি দেখে আমার মনে হচ্ছিল, একাত্তরের আমাদের ৩২ নম্বরের বাড়িতে যেভাবে হামলা হয়েছিল, সেই রকম। একতলা, দোতলা সব তছনছ। সিসি ক্যামেরা পর্যন্ত ভেঙেছে। অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে এই ঘটনা ঘটানো হয়েছে।” উপাচার্যের বাড়িতে হামলার ঘটনাকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ নেতারা আন্দোলনকারীদের অন্য মতলব রয়েছে বলে সন্দেহ প্রকাশ করে আসছেন। শেখ হাসিনা বলেন, “এত বড অন্যায মেনে নিতে পারি না। গুরুজনকে অপমান করে প্রকৃত শিক্ষা লাভ করা যায না। সবচেয়ে জঘন্য ঘটনা ঘটিয়েছে। ছাত্ররা এরকম ধ্বংসাত্মক কাজ করে কী ভাবে? “যারা ভাংচুর লুটপাটে জড়িত, তাদের বিচার হতে হবে। ইতোমধ্যে গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। লুটের মাল কোথায় আছে, তা ছাত্রদেরই বের করে দিতে হবে।”
‘আন্দোলন অযৌক্তিক’ : আন্দোলনকারীদের দাবি শুনে কোটা সংস্কারের বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষার আশ্বাস দেওয়ার পরও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “আলোচনা হল, একটা সুনিন্দিষ্ট তারিখ দিল, কেবিনেট সেক্রেটারিকে আমি দায়িত্ব দিলাম। তারা সে সময়টা দিল না। মানি না, মানব না বলে তারা যখন বসে গেল, আস্তে আস্তে সব তাদের সঙ্গে যুক্ত হল। “আলোচনা হচ্ছে, আন্দোলন চালানোর কী যৌক্তিকতা থাকতে পারে?” কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন নিয়ে সোমবার মন্ত্রিসভার বৈঠকে আলোচনার পর মন্ত্রিপরিষদ সচিব জানিয়েছিলেন, বিষয়টি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হবে। কোটায় যোগ্য প্রার্থী না পাওয়া গেলে মেধা তালিকা থেকে নিয়োগের যে প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হচ্ছে, তা নিয়ে আন্দোলনকারী এবং তাদের সমর্থক অধ্যাপকদের অজ্ঞতার বিষয়টি বলেন সরকার প্রধান। “একটা দাবিতে বলা আছে, যেখানে কোটায় পাওয়া যাবে না মেধা থেকে দিতে হবে। তাদের যে দাবিনামা, সেটাও স্পষ্ট না। তারা কি এটাও জানে না, কোটায় না পাওয়া গেলে মেধা তালিকা থেকে নেওয়া হয়। এটা তো নেওয়া হচ্ছে।” “আমার দুঃখ লাগে, আমাদের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনো কোনো প্রফেসর বা শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর, তারা আবার একই সুরে কথা বলছেন। তারা দেখেনই নাই, আমরা মেধা তালিকা থেকে নিয়োগ দিচ্ছি।”
আন্দোলনকারীদের নাতির বয়সী উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, “আমরা একটি নীতি নিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনা করি। অনেকে আমার নাতির বয়সী, তাদের কিসে মঙ্গল হবে না হবে, আমরা কি বুঝি না?”
‘মেধাবীরা বাদ যায়নি’ : শেখ হাসিনা বলেন, কোটা থাকলেও মেধাবীরা কখনও বঞ্চিত হয়নি। গত কয়েকটি বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণদের নিয়োগের তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, “মেধাবীরা বাদ যায়নি।” ৩৩তম বিসিএসে ৭৭ দশমিক ৪০ শতাংশ, ৩৫তম বিসিএসে ৬৭ দশমিক ৪৯ শতাংশ এবং ৩৬ তম বিসিএেস ৭০ দশমিক ৩৮ শতাংশ মেধার ভিত্তিতে নিয়োগ পায় বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, “কোটা যাই থাক, আমরা সবসময় যে কোটা পূরণ না হয় যে তালিকা থাকে সেখান থেকে তাদের চাকরি দিয়ে দিই।”
কোটা তুলে দেওয়ার কথা বলার পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রী সংস্কারের সুযোগ থাকার কথাও বলেন। “যদি দরকার হয় আমাদের কেবিনেট সেক্রেটারি তো আছেন। আমি তো তাকে বলেই দিয়েছি, সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বসে তারা কাজ করবেন। সেটা তারা দেখবেন।” এই আন্দোলন শুরুর পর সম্প্রতি চট্টগ্রামে এক জনসভায় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, মুক্তিযোদ্ধা কোটা বহাল থাকবে। “মুক্তিযোদ্ধাদের কারণেই বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে বিধায় তাদের অধিকার সবার আগে। মুক্তিযোদ্ধাদের ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনি সবাই সর্বাগ্রে অধিকার ভোগ করবে। সে কারণে চাকরিতে আমরা কোটার ব্যবস্থা করেছি।”
বুধবার সংসদে বক্তব্যেও কোটা কেন রাখা হয়, সেই বিষয়টি ব্যাখ্যা করেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি বলেন, অনগ্রসর জনগোষ্ঠী, পিছিয়ে থাকা জনপদের মানুষদের তুলে আনতে এই কোটা ব্যবস্থা। সংবিধানের ২৮(৪) অনুচ্ছেদে অনগ্রসরদের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার যে কথা বলা হয়েছে; তা মনে করিয়ে দেন প্রধানমন্ত্রী। কোটা না থাকলে বিকল্প ব্যবস্থায় ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী ও প্রতিবন্ধীদের নিয়োগের কথাও বলেন শেখ হাসিনা, তবে সেটা কীভাবে তা ব্যাখ্যা করেননি। তিনি শুধু বলেন, “যারা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী, প্রতিবন্ধী তাদের অন্যভাবে চাকরির ব্যবস্থা করে দিতে পারব।”

Top