চৈত্রসংক্রান্তি : আমাদের কিছু বিভ্রান্তি এবং করণীয়

Progyananda-Bhikkhu-Copy.jpg
॥  প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু ॥
বছর ঘুরে আবারো ফিরে এল চৈত্রসংক্রান্তি। এবছর ১৩ এপ্রিল চৈত্রসংক্রান্তি পালিত হচ্ছে। পরের দিন ১৪ এপ্রিল পয়লা বৈশাখ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিন। চৈত্রসংক্রান্তি, বাঙ্গালি ঐতিহ্য এবং সংস্কৃতির একেবারে কিছুই নয় তাও কিন্তু নয়। ইতিহাস একথা বলেনা। বিশেষ করে হিন্দু এবং বৌদ্ধরা চৈত্রসংক্রান্তি উদযাপন করে থাকেন। স্থানীয় ভাষায় এটাকে তারা পরব বলে থাকেন। এ উপলক্ষে তারা খই, নাড়ু, জিরা থেকে শুরু করে বিভিন্ন রকমের ঐতিহ্যবাহী খাবার তৈরি করে থাকেন।এই খাবারগুলো দিয়ে অতিথিদেরকেও আপ্যায়ন করা হয়।এদিন কম বেশি সবাই নতুন নতুন পোষাকও পরিধান করেন। কালে চৈত্রসংক্রান্তি আরো বেশি গ্রহণযোগ্যতা লাভ করেছে। এটা এক ধরণের উৎসবে পরিণত হয়েছে। জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে সকলে উপভোগ করেন। ফলে সম্প্রীতির জায়গাটাও প্রশস্ত হবার সুযোগ তৈরি হয়। এটা ভাল দিক বলে মনে করি।
কিন্তু চৈত্রসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে আমাদের কিছু ভুল এবং বিভ্রান্তি আছে। যা আমাদের বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন আছে বলে মনে করি।
বুদ্ধস্নানঃ
বাংলাদেশে চৈত্রসংক্রান্তিকে কেন্দ্র করে কোন একসময় থেকে অনেক এলাকায় বুদ্ধস্নান প্রথা চালু হয়ে যায়। অর্থাৎ এদিন নারী-পুরুষ অনেকে বুদ্ধস্নান করান। বিহার প্রাঙ্গনে আসন করে বুদ্ধ প্রতিবিম্ব বসিয়ে বুদ্ধস্নান করানো হয়। নতুন বছর উপলক্ষে বৌদ্ধরা প্রায় সকলে চৈত্রসংক্রান্তিকে সামনে রেখে ঘরবাড়ি এবং আসবাবপত্র ধোয়া-মূছা করে থাকেন। হয়তো সেই চিন্তাধারা থেকে বুদ্ধকেও স্নান করানো প্রথা চালু হয়ে গেছে। যদি তাই হয়, তাহলে বুদ্ধ কি অপবিত্র থাকেন? বুদ্ধ কি ময়লাযুক্ত থাকেন? বুদ্ধকে পবিত্র করানোর প্রয়োজনীয়তা এবং যোগ্যতা আমাদের আছে কি? এরকম অনেক প্রশ্ন থেকে যায়।
বুদ্ধস্নানের নামে যা হয়ঃ
মধ্যরাত থেকে অনেক নারী-পুরুষ রাস্তায় নেমে আসেন। তাদের হাতে পানির একটি বালতি বা জগ জাতীয় কিছু থাকে। এক পর্যায়ে একজন আরেকজনকে পানি দিয়ে ভিজিয়ে দেওয়ার প্রতিযোগিতায় অর্থ্যাৎ পানি খেলায় মেতে ওঠেন। এক বিহার থেকে আরেক বিহার এবং এক পাড়া থেকে আরেক পাড়ায় গিয়ে মূলত পানি খেলায় মেতে ওঠেন। কোন এক সময় বালতি বা জগে কিছু পানি থেকে গেলে তা অথবা পুণরায় পানি ভর্তি করে বুদ্ধস্নান করান। এভাবে চলে সকাল পর্যন্ত। এখানে কি কোন পুণ্যচেতনা আছে? বৌদ্ধ প্রধান কিছু দেশেও বুদ্ধস্নান প্রথা আছে। কিন্তু তারা কি এভাবে বুদ্ধস্নান করান? আমাদের  প্রজন্ম কি শিখছে আমাদের থেকে?
আমার যুব সমাজের একাংশের ভ্রান্তিঃ
বুদ্ধস্নানের সাথে এখন নতুন সংযোজন হল, সারারাত ধরে পাড়ায় পাড়ায় সাউন্ড সিস্টেম বাজিয়ে হৈচৈ করা এবং নাচানাচি করা। বলতে খারাপ লাগছে যে, অনেকে মাতাল হয়ে এসব করছেন। বুদ্ধস্নান এবং সারারাত ধরে নাচানাচিকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন জায়গায় অপ্রীতিকর অনেক ঘটনাও ঘটছে। এমনকি ঘটনা হানাহানি এবং রক্তারক্তিতে পরিণত হয়। যে যুব সমাজকে দিয়ে আমরা সমাজ পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখি, যাদের অফুরান প্রাণশক্তিকে আমরা সমাজের চালিকা শক্তি বলে মনে করি তাদের কেউ ভুল পথে পা বাড়ালে আমরা খুববেশি হতাশ হই। এসবের কি আসলে অবশ্যই দরকার আছে? আনন্দ লাভের কি আর কোন ভাল মাধ্যম নেই! বৌদ্ধধর্মে কি এসব কোথাও বলা আছে?
পরামর্শ এবং অনুরোধঃ
এসব বিষয় নিয়ে আমরা যে সভা-সমিতিতে আলোচনা করিনা তাও নয়। কিন্তু বিষয়টি সবাইকে অনুধাবন করতে হবে। সবাইকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে। প্রিয় যুব সমাজ আনন্দ করবেন এতে দোষের কিছু নেই কিন্তু সেটা হতে হবে বিবেচনাপ্রসূত, সুন্দর, সুশৃংখল, মার্জিত এবং অনুকরণীয়।
* মধ্যরাত থেকে বিহারে বিহারে বুদ্ধপ্রতিবিম্ব বের করে না দিয়ে ভোর সকাল থেকে ব্যবস্থা করে দিলে ভাল হয়।
* নিজে স্নান করে খালি পায়ে কিংবা দলবেধে ধর্মীয় কীর্তন সহকারে নতুন গট বা কলসি নিয়ে সুশৃংখলভাবে বুদ্ধস্নান করা যেতে পারে।
* সকল প্রকার আনন্দ উৎসবে মদ বা মাদক বর্জন করুন।
* মদ পান করে কিংবা মাতাল হয়ে আনন্দ করতে করতে অনেক অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। প্রশাসন অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা নিলে যুক্তি দেখানো হয় এটা ধর্মের অংশ হিসেবে পালন করা হচ্ছে। ফলে ধর্মকেও খাটো করা হচ্ছে। তাদের এই অনৈতিক যুক্তিকে কেউ বা প্রশাসন যেন গুরুত্ব না দেন।
* সারারাত ধরে সাউন্ড সিস্টেম বাজিয়ে পাড়াবাসী বা এলাকাবাসীকে অতিষ্ট করে তোলার প্রয়োজন আছে কিনা বিবেচনা করে দেখুন।
* একই এলাকার পাড়ায় পাড়ায় সারারাত ধরে সাউন্ড সিস্টেম বাজিয়ে নাচানাচি না করে নির্দিষ্ট কোন এক জায়গায় উপভোগ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা যেতে পারে। সেখানে প্রশাসনিক নিরাপত্তাও থাকবে।
* নিজেদের আবেগ এবং ইচ্ছাগুলোকে ধর্মের নামে চালিয়ে দেওয়া থেকে আমরা যেন বিরত থাকি।
* সমাজে কেউ কাউকে কিছু বলেননা বলে আমরা বিবেকবান নাগরিক হিসেবে যা ইচ্ছে তা করতে পারি কিনা বিবেচনা করে দেখুন।
লেখক: সভাপতি, বৌদ্ধ সুরক্ষা পরিষদ, কক্সবাজার জেলা।
সহকারী পরিচালক, রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার।
Top