মিয়ানমার মন্ত্রীর আশ্বাসে আস্থা নেই রোহিঙ্গাদের

IMG_7695.jpg

রফিকুল ইসলাম ॥
রোহিঙ্গাদের প্রকাশ্যে ক্ষোভের মুখে মিয়ানমার সরকারের কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী মন্ত্রী উইন মিয়ে আয়ে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির পরিদর্শন করেছেন। গতকাল বুধবার সকাল সাড়ে ১১টার দিকে কুতুপালং রোহিঙ্গা অনিবন্ধিত শিবিরের ডি-৫ ব্লকে যাওয়ার পথে পথে বিচ্ছিন্ন ভাবে রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষরা দাবি দাওয়া সম্বলিত ব্যানার হাতে বিক্ষোভ প্রদর্শন করার চেষ্টা করে। এসময় পুলিশের হস্তক্ষেপে বিক্ষোভকারীরা তাদের বিক্ষোভ প্রদর্শন কর্মসূচি ব্যর্থ হয়। এ সময় বিক্ষোভকারী রোহিঙ্গাদের কর্তব্যরত পুলিশের মধ্যে ইটপাটকেল ছুটাছুড়ি, ধাওয়া ও পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে। পরে দুপুর ১২টার দিকে ডি-৫ ব্লকের একটি কমিউনিটি সেন্টারে রোহিঙ্গাদের সাথে মত বিনিময় কালেও উপস্থিত রোহিঙ্গারা মন্ত্রীর বক্তব্যে ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন।

মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সমাজ কল্যাণ, ত্রাণ ও পূর্ণবাসন মন্ত্রী এবং সরকারের রাখাইন প্রদেশের জন্য কফি আনান কমিশনের প্রনীত সুপারিশ মালা বাস্তবায়ন কমিটির প্রধান ও রাখাইন সহ মিয়ানমার ইউনিয়ন এন্টারপ্রাইজ হিউম্যানেটিরিয়ান এসিসটেন্ট রিসেটেলমেন্ট এন্ড ডেভলাপম্যান্ট কমিটির উপ প্রধান উইন মিয়ে আয়ে এর নেতৃত্বে ৮ সদস্যের মিয়ানমার প্রতিনিধি দল গতকাল বুধবার সকাল ১১টার দিকে মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় কোন মন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দলের এ প্রথম বাংলাদেশে অবস্থান রত তাদের রাখাইন প্রদেশের নাগরিক রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির পরিদর্শনে আসলেন।

বেলা সাড়ে ১১টার দিকে কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের ডি-৫ ব্লকে একটি কমিউনিটি সেন্টারে দুপুর পৌন একটা পর্যন্ত দীর্ঘ সময় ধরে রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষদের সাথে মত বিনিময় করেন। মত বিনিময় কালে তিনি রোহিঙ্গাদের বাঙ্গালী হিসেবে চিহ্নিত করে মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার কথা বলেন। এসময় বাঙ্গালী বলায় উপস্থিত রোহিঙ্গারা ক্ষুব্ধ হয়ে উঠেন। এসময় পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ হয়ে উঠে। উপস্থিত রোহিঙ্গারা এসময় মন্ত্রী সহ সফর সঙ্গীদের বিভিন্ন কাগজপত্র প্রদর্শন করে জানান তারা কখনো বাঙ্গালী ছিল না তারা জাতিগত ভাবে রোহিঙ্গা মুসলিম। রোহিঙ্গা এথনিক পরিচয়ে তারা মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার দাবি জানান।

রোহিঙ্গাদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, মিয়ানমারে বর্তমানে শান্তিপূর্ণ পরিস্থিতি বিরাজ করছে। আপনাদের দেশে ফিরে যেতে কোন সমস্যা হবে না। দেশে এখন নতুন প্রেসিডেন্টের নেতৃত্বে শাসন ব্যবস্থার বেশ পরিবর্তন হয়েছে। আপনারা এখন নিশ্চিন্ত ভাবে ফিরে গিয়ে নিজ দেশে অন্যান্য নাগরিকদের ন্যায় বসবাস করতে পারবেন। মিয়ানমার সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী ড. উইন মিয়ে আয়ে আরো বলেন, মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার ৬ মাসের মধ্যে নাগরিকত্ব প্রদানের কার্যকরি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে বাংলাদেশ থেকে স্বেচ্ছায় ফিরে গিয়ে তাদের ন্যাশনাল ভেরিফেকেশন কার্ড বা এনভিসি কার্ড নিতে হবে। এনভিসি কার্ড নেওয়ার ৫/৬ মাসের মধ্যে নাগরিকত্ব প্রদানের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। রোহিঙ্গাদের প্রশ্নের জবাবে মন্ত্রী বলেন, নাগরিকত্ব ফিরে পেলে আপনার সহায় সম্পদ, জমি জমা ফেরত পাওয়া যাবে।
রোহিঙ্গারা বলেন, যে এনভিসি কার্ডের জন্য রোহিঙ্গারা দীর্ঘ সময় থেকে নাগরিক বিহীন অবস্থায় অবস্থান করছে সেখানে নাগরিকত্বের নিশ্চিয়তা ছাড়া ফিরে যাওয়ার কোন উদ্দেশ্য তাদের নেই। মন্ত্রীর সাথে বৈঠকের শেষ পর্যায়ে রোহিঙ্গারা ১৩ দফা দাবি সম্বলিত একটি লিখিত পত্র মন্ত্রীর নিকট হস্তান্তর করেন। ১৩ দফা দাবি দাওয়ার মধ্যে সিট্যুয়ে সহ রাখাইন প্রদেশের সর্বত্র রোহিঙ্গাদের অবাধ চলাচলের সুযোগ সৃষ্টি করে বর্তমানে সেখানে বিদ্যমান অভ্যন্তরিন উদ্বাস্তু শিবির বা আইডিপি ক্যাম্প গুলো বন্ধ করে সেখানকার রোহিঙ্গাদের নিজ নিজ ঘরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। উত্তর রাখাইনে কোন ধরনের নতুন ভাবে আইডিপি ক্যাম্প করা যাবে না। রাখাইনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা রক্ষির উপস্থিতি নিশ্চিত করতে হবে। রোহিঙ্গা এথিনিসিটি স্বীকৃতি পূর্বক নাগরিকত্বের বাধা তুলে নিতে হবে। এনভিসি কার্ড সিস্টেম বাতিল করতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে জাতিসংঘ শরনার্থী বিষয়ক হাই কমিশনকে সম্পৃক্ত করতে হবে।

ফেরত যাওয়া রোহিঙ্গাদের প্রকৃত ভূমিতে নিজ গ্রাম এবং বসতি বসবাসের সুযোগ দিতে হবে। সরকার কর্তৃক জব্ধকৃত সহায় সম্পদ ও ভূমি ফেরত প্রদান করতে হবে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম, মানবাধিকার সংস্থা সহ সাহায্য কর্মীদের অবাধ কর্মকান্ড পরিচালনার সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। মিথ্যা অভিযোগ সহ নানা হয়রানি মূলক মামলায় আটক সকল রোহিঙ্গাকে মুক্তি দিতে হবে। সরকারী সকল পদে রোহিঙ্গাদের যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরি প্রদান করতে হবে। ধর্মীয় আচার অনুষ্ঠান, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সর্বত্র অবাধ যাতায়াত, ব্যবসা বানিজ্য সহ অন্যান্য নাগরিকদের ন্যায় সকল প্রকারের নায্য অধিকার ফিরিয়ে দিতে হবে। রোহিঙ্গাদের উপর সকল ধরনের সেনা সহ অন্যান্য সামরিক নির্যাতন বন্ধের নিশ্চিয়তা প্রদান করতে হবে।

এর পূর্বে মিয়ানমার মন্ত্রী কুতুপালং শরনার্থী শিবির ইনচার্জ ও সহকারী কমিশনার রেজাউল করিমের কার্যালয়ে এক মতবিনিময় সভায় মিলিত হন। উক্ত সভায় সরকারের অতিরিক্ত সচিব, শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মোঃ আবুল কালাম সহ জাতিসংঘ, আইএনজিও, এনজিও প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। উল্লেখ্য মিয়ানমারের কেন্দ্রীয় সরকারের সফর সঙ্গী হিসেবে বাংলাদেশের কোন মন্ত্রী বা এমপিদের মধ্যে কাউকে দেখা যায়নি। মিয়ানমার মন্ত্রী সফর সঙ্গী হিসেবে মিয়ানমার ইউনিয়ন এন্টারপ্রাইজ হিউম্যানেটিরিয়ান এসিসটেন্ট রিসেটেলমেন্ট এন্ড ডেভলাপম্যান্ট কমিটির প্রধান সমম্বয়ক প্রফেসর ড. অং তুন থেত, মিয়ানমার মহিলা এফেয়ার্সের চেয়ারপার্সন ড. থেত থেত ঝিন, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা বিভাগের মহা পরিচালক ড. কু কু নাইং, আন্তর্জাতিক অর্থ নৈতিক সম্পর্ক সংস্থার মহা পরিচালক কিউ মুয়ে থুন, ইন্টারফেইথ ডায়ালগ গ্রুপের ড. হ্লা থুন, থেন লুইং, থিন মিয়ান্ট সহ বাংলাদেশে মিয়ানমারে নিযুক্ত রাষ্ট্রদুত সহ কর্মকর্তারা এসময় উপস্থিত ছিলেন।

Top