স্বাগত ১৪২৫ বঙ্গাব্দ

download-9.jpg

মনতোষ বেদজ্ঞ :
‘এসো, এসো, এসো হে বৈশাখ/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক।। মুছে যাক গ্লানি ঘুচে যাক জরা/ অগ্নিস্নানে শুচি হোক ধরা।’ বাংলা নববর্ষের ঊষালগ্নে এই গানের সুরে সুরে বৈশাখকে স্বাগত জানিয়েছেন কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তাঁর এই গানের সুরে বিশ্বব্যাপি বাংলাভাষাভাষী মানুষ উদ্বেলিত হয় নববর্ষ উৎসবের আনন্দে। মানুষের মুখে মুখে এই গান ছড়িয়ে পড়ে আকাশে বাতাসে।
আজ পহেলা বৈশাখ। বাংলা ১৪২৫ সনের প্রথমদিন। দিনটি আমাদের বাংলা নববর্ষ। বাংলাদেশে প্রতিবছর ১৪ এপ্রিল এই উৎসব পালিত হয়। বাংলা একাডেমি কর্তৃক নির্ধারিত আধুনিক পঞ্জিকা অনুসারে এই দিন নির্দিষ্ট করা হয়েছে। এছাড়াও দিনটি বাংলাদেশ ও পশ্চিমবঙ্গে সরকারি ছুটির দিন হিসেবে গৃহীত। বাংলা বর্ষপঞ্জি অনুসারে দিন শুরু হয় বৈশাখের প্রথমদিন সূর্য ওঠার পর থেকে। ইংরেজি বছরে দিন শুরু হয় রাত বারোটার পর থেকে এবং আরবী বছরে দিন শুরু হয় আকাশে চাঁদ ওঠার পর। এতে করে ইংরেজি নববর্ষে যেমন রাত বারোটায় উৎসব পালন করা হয় ঠিক তেমনি সূর্য উদয়ের পরই বাংলা নববর্ষের শুভেচ্ছা জানানো হয়, উৎসব পালিত হয়।
১৫৮৪ খ্রিস্টাব্দে মোঘল সম্রাট আকবর বাংলা সনের প্রবর্তন করেন বলে বেশিরভাগ পন্ডিত মনে করেন। ওই সময় বঙ্গে শক বর্ষপঞ্জি ব্যবহৃত হতো, যার প্রথম মাস ছিল চৈত্র। বাংলা বর্ষপঞ্জি প্রথমে ‘তারিখ-ই-এলাহী’ বা ‘ফসলি সন’ নামে পরিচিত ছিল। ১৫৮৪ সালের ১০ বা ১১ মার্চ তারিখে এটি ‘বঙ্গাব্দ’ নামে প্রচলিত হয়। এ নতুন সালটি সম্রাট আকবরের রাজত্বের ২৯তম বর্ষে প্রবর্তিত হলেও তা গণনা করা হয় ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দের ৫ নভেম্বর থেকে। সপ্তম শতাব্দীর প্রারম্ভে শশাঙ্ক বঙ্গদেশের রাজচক্রবর্তী রাজা ছিলেন। আধুনিক ভারতের বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার অধিকাংশ এলাকা তার সামাজ্য ছিল। অনুমান করা হয়, জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের সোমবার ১২ এপ্রিল ৫৯৪ এবং গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডারের সোমবার ১৪ এপ্রিল ৫৯৪ বঙ্গাব্দের সূচনা হয়েছিল। দ্বিতীয় মত অনুসারে, মধ্যযুগে বাংলা সনের প্রচলনের আগে কৃষি ও ভূমি কর বা খাজনা আদায় করা হত ইসলামিক হিজরি বর্ষপঞ্জি অনুসারে। কিন্তু চাষাবাদ করা হত সৌর বছর অনুযায়ী। হিজরি বর্ষপঞ্জি চান্দ্রমাস নির্ভর বলে সবসময় কৃষি কর্মকান্ড অর্থবর্ষের সঙ্গে মিলত না। আমাদের ইতিহাস কৃষিজ ইতিহাস। তাই বাংলা বর্ষবরণের সঙ্গে কৃষিমাতৃক বাংলার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে।
বাঙালির চিরন্তন ঐতিহ্যের ধারাবাহিকতায় বর্ষবরণের আনন্দে, হালখাতার নবায়নে জীবনে নতুন স্বপ্ন সাজানোর দিন এটি। গ্রীষ্মের তীব্র খরতাপ উপেক্ষা করে দেশের প্রতিটি জনপদে এ দিনে থাকে মেলা, অনুষ্ঠান। এতে থাকে লাখো মানুষের প্রাণচাঞ্চল্য, উৎসব মুখরতার বিহ্বলতা। নতুন বছর মানেই এক নতুন সম্ভাবনা, নতুন আশায় পথচলা। নতুন বছরে নবচেতনায় উদ্বুদ্ধ জাতি। সব অপ্রাপ্তি ভুলে গিয়ে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচনের লগ্নে একটি আত্মমর্যাদাসম্পন্ন গণতান্ত্রিক, অসাম্প্রদায়িক ও সুখী–সমৃদ্ধ দেশ গড়ার প্রত্যয় নিয়েই বাঙালি পালন করে বৈশাখী উৎসব।
কক্সবাজার শহর ও জেলার প্রত্যেক উপজেলায় বৈশাখকে বরণ করে নিতে যথারীতি বসে বৈশাখী মেলা, চলে লোকগানের আসর। এসব আয়োজনে গ্রামের সহজ–সরল মানুষ রাতভর মেতে থাকে নির্মল আনন্দে। বৈশাখের ঐতিহ্যবাহী খাবার ইলিশ–পান্তা ছাড়াও ঘরে ঘরে তৈরি হয় মুখরোচক পিঠা, পায়েস, ভিন্ন ও দেশীয় নানা ধরনের পিঠা। কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরীর শহীদ দৌলত ময়দান, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, জেলা শহরের অভিজাত হোটেল-রেস্টুরেন্টগুলোতেও থাকে উৎসবের মহাআয়োজন।
জেলা প্রশাসনের আয়োজনে কক্সবাজার পাবলিক লাইব্রেরীর শহীদ দৌলত ময়দানে আজ সকাল ৭ টায় ‘বাংলা নববর্ষ ১৪২৫ বরণ’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। সকাল ৮ টায় জেলা প্রশাসক কার্যালয় প্রাঙ্গন থেকে মঙ্গল শোভাযাত্রা বের করা হবে। র‌্যালীটি শহরের হলিড়ের মোড় ঘুরে পিটিআই পরীক্ষন বিদ্যালয় দিয়ে শহীদ দৌলত ময়দানে এসে শেষ হবে। সকাল ৯ টায় সেখানে স্থাপিত মঞ্চে চলবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। এছাড়াও জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন দিনটিকে ঘিরে প্রভাত সঙ্গীত, মঙ্গল শোভাযাত্রা, পান্তা ভাতের আয়োজন, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা কর্মসূচি গ্রহন করেছে।
বাঙালির জাতীয় জীবনে দারুণ মাত্রা সৃষ্টি করেছে বাংলা নববর্ষ উৎসব। এ উৎসবে চারদিকে যেন মহামিলনের সুর বেজে উঠে। নববর্ষের সূর্য উদয়ের সাথে সাথে শুরু হয় বাংলাব্যাপী বর্ষবরণের মহাআয়োজন। এ উৎসবে বাঙালির জাতি সত্তার পরিচয় ফুটে উটে দারুণভাবে। এটি কেবল বাংলাদেশে সীমাবদ্ধ নয়, বিশ্বের যেখানে বাঙালির অবস্থান সেখানেই পালিত হয় বাংলা নববর্ষ উৎসব। অসাম্প্রদায়িক চেতনার এই উৎসব হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রীষ্টান সব জাতির মধ্যে সৃষ্টি করে অপূর্ব এক সম্প্রীতির মেলবন্ধন।

Top