অতিথি কলাম : মন্ত্রীর রোহিঙ্গা ফেরতের আশ্বাস কি বর্মী সেনাদের ফাঁদ

1.jpg

॥ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট  ॥
কক্সবাজার জেলার পাহাড়পর্বত, গাছপালা, পশুপাখী, জীবজন্তু, সামাজিক ও ভৌগোলিক পরিবেশ এবং সাধারণ মানুষ অস্বাভাবিক রোহিঙ্গা আগ্রাসনে ক্ষতিগ্রস্থ, চিন্তিত ও উদ্বিগ্ন। বাংলাদেশে পুরোনো-নতুন নিবন্ধিত আশ্রয় গ্রহনকারী রোহিঙ্গার সংখ্যা ১১ লাখ ছাড়িয়েছে। আগে ১৯৭৮ ও ১৯৯২ সালেও লাখ লাখ রোহিঙ্গা মুসলমান বর্মী সেনাদের নির্যাতনের মুখে প্রাণ বাচাঁনোর জন্য বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল এবং কাগজেপত্রে নাগরিকত্ব না দিলেও রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক হিসেবে স্বীকার করেই সেনা শাসকরা বার্মা তথা মিয়ানমারে ফেরত নিয়েছিল। বিশ্ব সম্প্রদায় তার সাক্ষী, ইতিহাস তার সাক্ষী। অতীতে কোন বার নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে কোন বর্মী মন্ত্রী দেখতে আসেননি। অবশ্য
আগে কোন বার রোহিঙ্গাদের বাড়ীঘর,সহায়সম্পত্তি,গ্রামের পর গ্রাম এবারের মত জ্বালিয়ে পুড়িয়ে নির্বিচারে গণহত্যা চালিয়ে বিতাড়িত করা হয়নি। চীনের প্রত্যক্ষ সহায়তায় ও রাশিয়া-ভারতের সমর্থনের কারণে মিয়ানমার সেনাবাহিনী এবার বেশী বেপরোয়া হলেও নির্মমভাবে জাতিগত নিধন ও গণহত্যা চালানোর অভিযোগে খোদ জাতিসংঘসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশ নজিরবিহীনভাবে প্রতিবাদমূখর হয়েছে এই বার। অনেক দেশের সংসদে জাতিগত নিধনের জন্য মিয়ানমারের বিরুদ্ধে নিন্দা প্রস্তাব গ্রহন করা হয়েছে। অনেক দেশে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কতিপয় জেনারেলদের বিরুদ্ধে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে। সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে গণতন্ত্র ও মানবাধিকারের জন্য শাস্তিপূর্ণ সংগ্রাম করার জন্য প্রদত্ত পুরস্কার ও সম্মাননা মিয়ানমারের কথিত নির্বাচিত নেত্রী অং সান সুচির কাছ থেকে কেড়ে নেওয়া হয়েছে বিশ্বব্যাপী। মিয়ানমারের বিরুদ্ধে সর্বাত্মক অবরোধ আরোপের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিশ্বব্যাপী আলোচিত হচ্ছে। গণহত্যাকারী জেনারেলদের বিচার দাবী করে দেশে দেশে বিক্ষোভ,মানববন্ধন হচ্ছে। গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করার অভিযোগে মিয়ানমারের বিচার আর্ন্তজাতিক ক্রিমিনাল কোর্টে করা যায় কিনা সেই মর্মে রুলিং চেয়ে সেই আদালতের একজন প্রসিকিউটার দরখাস্ত দাখিল করেছেন।
অনেক বাধা বিপত্তির পরও জাতিসংঘের সহকারী মহাসচিব উরসুলা মুয়েলার সম্প্রতি মিয়ানমারে ছয় দিনের সফর শেষে বিশ্ববাসীকে জানিয়েছেন সম্প্রতি সময়ে বাংলাদেশে সাত লাখের অধিক রোহিঙ্গা আশ্রয় নেওয়ার পরও চার লাখের বেশী রোহিঙ্গা মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে কার্যত অবরুদ্ধ অবস্থায় রয়েছে। তাদের মধ্যে প্রায় এক লাখ ৩০ হাজার রোহিঙ্গা ছয় বছর ধরে শিবিরে বন্দী আছে। তিনি বলেন, মিয়ানমারে সবচেয়ে ঝুঁকিতে থাকা ব্যক্তিদের সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি অবশ্যই সরকার,দেশীয় ত্রাণ সংস্থা ও আর্ন্তজাতিক সম্প্রদায়ের মানবিক সহায়তা কার্যক্রমের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা উচিত। যখন তারা দেশে আছে তখন তাদের নৃতাত্ত্বিক,ধর্মীয় পরিচয় ও নাগরিকত্ব পরিচয় নির্বিশেষে আমাদের কাজ করতে হবে। সংঘাতপ্রবণ এলাকার কেউ যাতে টেকসই ও নিরাপদ মানবিক সুরক্ষা ও সহায়তা থেকে বঞ্চিত না হয় তা নিশ্চিত করতে হবে। উন্নততর ভবিষ্যতের পথে অগ্রযাত্রায় মিয়ানমারের একজনেরও বাদ পড়া উচিত নয়। কক্সবাজারে শরণার্থী শিবিরগুলোতে আশ্রয় নেওয়াদের কাছ থেকে ক্রমেই প্রকাশিত হওয়া মর্মান্তিক ঘটনাগুলোর বিষয়ে যথার্থভাবেই বিশ্বের দৃষ্টি পড়েছে। রাখাইন রাজ্যে এখনো চলাফেরার নিষেধাজ্ঞার কারণে প্রান্তিকীকরণের শিকার ও কঠোর জীবনযাপনে বাধ্য হওয়া চার লাখেরও বেশী মুসলিম রোহিঙ্গার দুঃখের কথা আমরা ভুলতে পারি না। কোনোভাবেই আমাদের ভুলে যাওয়া উচিত নয়। নিষেধাজ্ঞা ও বিধিনিষেধ রোহিঙ্গাদের অধিকার এবং স্বাস্থ্য,জীবিকা,সুরক্ষা শিক্ষা ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সেবা পাওয়ার ক্ষেত্রে বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। উরসুলা মুয়েলার পরিশেষে বলেন, মিয়ানমারের বর্তমান পরিস্থিতি বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফিরে যাওয়ার জন্য অনুকুল নয়।
ইতোমধ্যে কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের নিজের দেশে আশ্রয় দেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেছে কানাডা সরকার। ফিলিপাইনের রাষ্ট্রপতির পক্ষেও মিয়ানমারে গণহত্যা থেকে বাঁচার জন্য কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়া বিশ্বের সবচেয়ে নির্যাতিত দুর্গত রাষ্ট্রহীন মানবসন্তান রোহিঙ্গাদের তাদের দেশে আশ্রয় দেওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করা হয়েছে। ৭০০০ হাজার দ্বীপ নিয়ে ফিলিপাইন রাষ্ট্র গঠিত। মাত্র ১১টি দ্বীপেই মানুষ বসবাস করে। বাংলাদেশের দ্বিগুণ সমান আয়তনের ফিলিপাইনের জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি ৫ লাখের মত। তাদের মধ্যে অনেকে আবার বিদেশে থাকে। জাতিসংঘ ও অন্যান্য উন্নয়ন সংস্থার সহায়তা নিয়ে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে নিয়ে ফিলিপাইন পতিত অনাবাদী জমিকে কাজে লাগাতে খুবই আগ্রহী বলে জানা গেছে। মাতৃভুমি আরাকানে ফিরে যাওয়াই রোহিঙ্গাদের প্রবল ইচ্ছা হলেও বিকল্প হিসেবে আপাতত জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে ফিলিপাইনে পুনবাসিত হতেও তাদের আগ্রহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। এ আগ্রহ দেখে মিয়ানমারের পক্ষে ফিলিপাইনের বক্তব্যের প্রতিবাদ করা হয়েছে।
১৯৬২ সালে নির্বাচিত সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করে জেনারেল নে উইন সামরিক শাসন জারী করে ক্ষমতা দখল করে এবং ১৯৮৮ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকে। ১৯৮৮ সালে ক্ষমতা নিয়ে জেনারেল শ মং ১৯৯২ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকে। ১৯৮৮ সালে জেনারেল শ মংয়ের ক্যাবিনেটে ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে মুল সিদ্ধান্ত গ্রহনে থাকা জেনারেল থান শয়ে ১৯৯২ সালে সশস্ত্র বাহিনীর কমান্ডার ইন চিফ হয়ে সর্বময় ক্ষমতা দখল করেন। এখনও মূল ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করেন সাবেক জেনারেল থান শয়ে। বার্মার সেনাবাহিনীতে তার প্রভাব এত বেশী যে ১৯১১ সালে কয়েক ডজন যোগ্য অফিসারকে ডিঙিয়ে জেনারেল মিন অং লাইকে সেনা প্রধানের ও রাষ্ট্রের ক্ষমতায় বসান। সাবেক জেনারেল থান শয়ের সাথে দেখা করে বুঝাপড়া করেই অং সান সুচি ক্ষমতার শেয়ার পেয়েছেন। এখনও চীনের প্রভাবশালী নেতারা মিয়ানমার সফরে আসলে তার সাথেই আগে দেখা করেন বলে জানা যায়। এখনও মিয়ানমারের প্রকৃত ক্ষমতা সেনাবাহিনীর জেনারেলদের হাতে। গণহত্যার মূখে জোরপূর্বক বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের সসম্মানে পূর্ণ নাগরিকত্ব দিয়ে স্বদেশ মিয়ানমারে ফিরিয়ে নেওয়ার বৈশ্বিক চাপকে উপেক্ষা করার লক্ষ্যেই বাংলাদেশের সাথে চুক্তি সম্পাদন করা হয়েছে এবং এ বার একজন মন্ত্রীর নেতৃত্বে বেসামরিক প্রতিনিধি দল বাংলাদেশে প্রেরণ করা হয়েছে উল্লেখিত জেনারেলদের পরিকল্পনা অনুযায়ী। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির প্রথমবারের মতো পরিদর্শনে আসা মিয়ানমারের সমাজকল্যান,ত্রাণ ও পুনর্বাসন মন্ত্রী উইন মিরাট জানতে চান তারা ফেরত যাবে কিনা। রোহিঙ্গাদের সমস্বরে উত্তর, হ্যা আমরা আমাদের বাড়ী-ভিটায় ফিরে যেতে চাই। এ সাক্ষাতে রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়াসহ ১৩ দফা দাবী তুলেছে মন্ত্রীর সামনে। বর্মী মন্ত্রীর সাথে রোহিঙ্গাদের সব কথাবার্তা হয়েছে বার্মিজ ভাষায়। রোহিঙ্গারা প্রায় সকলেই রোহিঙ্গা ভাষায় এবং ভালমত বার্মিজ ভাষায়ও কথা বলতে পারে। অনেক রোহিঙ্গা বার্মিজ ভাষায় শুধু কথা নয় লিখতেও পারে। কিন্তু একজন রোহিঙ্গাও বাংলা ভাষায় কথা যেমন বলতে পারে না, বাংলায় লিখতেও পারে না। রোহিঙ্গা ভাষার সাথে স্থানীয় চাটগাইয়া-কক্সবাজারের আঞ্চলিক ভাষার কিছু মিল আছে। তবে সে আঞ্চলিক ভাষায় বাংলাদেশের অন্য জেলার লোকেরা কথা বলতে পারে না বা বুঝেও না। তাই মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর গণহত্যা,গণধর্ষণ,বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দিয়ে প্রবল নির্যাতন-নিপীড়নের মূখে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া ও যথাযথভাবে সময়মত বাংলাদেশে নিবন্ধন করা রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্য যাচাই বাচাই করার নামে শুধু সময়ক্ষেপন,কুটকৌশল ও প্রতারণা নয় কি? ফিরে যাওয়ার ব্যাপারে রোহিঙ্গাদের প্রবল আগ্রহ দেখে মন্ত্রী এবার তার আসল কথা বলেন, রোহিঙ্গাদের প্রথমে অবশ্যই এনভিসি কার্ড(ন্যাশনাল ভেরিফিকেশন কার্ড) নিতে হবে। এনভিসি কার্ড নিলেই পরে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যাবে। এনভিসি কার্ডের প্রথম কথা হল,আমরা বাঙ্গালী মিয়ানমারে এসে অবৈধভাবে বসবাস করছি মর্মে স্বীকারোক্তি। রোহিঙ্গারা এ ধরনের স্বীকারোক্তিতে ঠিপ/দস্তখত করতে কোনভাবেই রাজী নয়। রোহিঙ্গাদের দাবী, আমরা কোন দিন বাঙ্গালী ছিলাম না,বাংলাদেশে বসবাস করি নাই। আমরা হাজার বছর ধরে পুরুষানুক্রমে আরাকান রাজ্যে বসবাস করে আসছি। আমরা তখনও রোহিঙ্গা মুসলমান,এখনও রোহিঙ্গা মুসলমানই আছি। আমরা বাঙ্গালী সেই স্বীকারোক্তিতে দস্তখত দিতে প্রলুব্ধ করার জন্য মিয়ানমারের ক্ষমতাসীন জেনারেলরা মন্ত্রীকে পাঠিয়েছে। আমরা নিজেরাই বাঙ্গালী হিসাবে স্বীকার করলে গণহত্যা ও জাতিগত নিধনের জন্য দায়ী জেনারেলরা বিশ্বসম্প্রদায়ের চাপ থেকে কিছুটা মুক্তি পাবে। সেই দেশে রোহিঙ্গা মুসলমান নামের কোন জাতি কোন দিন ছিল না,বাঙ্গালীরাই অবৈধভাবে সেই দেশে গিয়ে বসবাস করছে বর্মী জেনারেলদের সেই দাবী প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হবে।
মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায়,নিরাপদ ও সম্মানজনকভাবে ফেরার পরিবেশ আছে কিনা তা যাচাই করার দায়িত্ব পেয়েছে জাতিসংঘের শরণার্থী বিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআর। বাংলাদেশের সাথে ইউএনএইচসিআর একটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষর করেছে। এতে করে রোহিঙ্গাদের স্বেচ্ছায় নিরাপদে মিয়ানমার ফিরে যাওয়ার ব্যাপারটা দীর্ঘায়িত হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশংকা প্রকাশ করছেন। কারণ মিয়ানমারের জেনারেলরা রোহিঙ্গাদের সেই দেশে ফিরিয়ে নিতে মোটেও আন্তরিক নয় বলে তারা সব সময় বিভিন্ন অজুহাতে সময়ক্ষেপন করতে থাকবে। এ ক্ষেত্রে ফিলিপাইনের দ্বীপে সাময়িকভাবে রোহিঙ্গাদের পুনবাসিত করলে রোহিঙ্গাদের জন্য যেমন ভাল হবে, কক্সবাজারের মাটি,মানুষ ও পরিবেশের ওপর থেকে কিছুটা ভার কমবে।
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Top