জাতিসংঘের অভিযোগ ভন্ডুলে মিয়ানমার কৌশল

images-3.jpg

রফিকুল ইসলাম :
বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের রাখাইনের ফেরত যাওয়ার অনুকূল পরিবেশ তৈরী হয়নি বলার কয়েকদিনের মাথায় ৫ সদস্যের এক রোহিঙ্গা পরিবার নিজ দেশে ফিরে গেছে। এ ফেরা নিয়ে রোহিঙ্গাদের মাঝে পরস্পর বিরোধী বক্তব্য ভেসে উঠছে। ফিরে যেতে আগ্রহীদের মতে এখানে এ অবস্থায় থাকার চেয়ে নিজ দেশে গিয়ে মরলেও ভাল। বাংলাদেশ বলছে মিয়ানমারের সাথে রোহিঙ্গা প্রত্যর্পন চুক্তি অনুযায়ী এটা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ার অংশ নয়।
মিয়ানমারে ফেরা বা বাংলাদেশের আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নেয়ার দোলাচলের মাঝে পড়ে অবশেষে শনিবার ৫ সদস্য একটি রোহিঙ্গা পরিবার অন্য রোহিঙ্গাদের অগোচরে সীমান্ত পেরিয়ে স্বদেশ ফিরে গেল। রাখাইন রাজ্যের উত্তর মংডুর বাংলাদেশ সীমান্ত সংলগ্ন মিয়ানমারের তুমব্রু লেট ওয়ে এলাকার মৌলভী রশিদ আহাম্মদের ছেলে ইফতার আলম প্রকাশ আক্তার আলম (৪৫), স্ত্রী, দুই মেয়ে ও অপর নিকট আত্মীয় যুবতীকে নিয়ে শনিবার গোপনে স্বদেশ ফিরে যায়। সেখানে অভিবাসন ও স্বাস্থ্য বিভাগের লোকজন তাদের স্বাস্থ্য পরীক্ষা করেন। এরপর ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গারা যেহেতু রাখাইনের অধিবাসী সে অনুযায়ী তাদের বায়োমেট্রিক নিবন্ধন করে ন্যাশনাল ভেরিফেকেশন কার্ড বা এনভিসি কার্ড দেওয়া হয়। ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গাদের প্রয়োজনীয় ঔষধপত্র, খাবার সামগ্রী তৈজস পত্র, কাপড়চোপড় প্রদান করা হয়েছে বলে মিয়ানমারের তুমব্রু সীমান্ত থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে। ফিরে যাওয়া ইফতার আলম সীমান্তের বাংলাদেশ তুমব্রু কোনারপাড়ার ওপাড়ে মিয়ানমারের তুমব্রু লেট ওয়ে ইউনিয়নের চেয়ারম্যান। তাদেরকে ২/৩ দিন তুমব্রু লেট ওয়েতে নির্মিত রোহিঙ্গা অভ্যর্থনা কেন্দ্রে রাখার পর তাদের নিজ ঘরবাড়িতে ফিরে যাওয়ার আশ্বাস দিয়েছে মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু নো ম্যান্স ল্যান্ডে গত বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে অবস্থান নেয় প্রায় ছয় হাজার বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলিম। গত বছরের ২৫ আগষ্ট সংঘটিত সহিংস ঘটনায় মিয়ানমারের রাখাইনের উত্তরাংশ থেকে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ ও ইজ্জত রক্ষার্থে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সীমান্তের তুমব্রু নো ম্যান্স ল্যান্ডেও একই ঘটনার শিকার উল্লেখিত রোহিঙ্গারা অবস্থান নেয়। নো ম্যান্স ল্যান্ডের উক্ত অংশটি বস্তুত কোন দেশের না হলেও সেটি মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে সেখানে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুতদের জন্য নির্মিত আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নিতে অপারগতা জানিয়ে আসছে। গত মাসে এসব রোহিঙ্গাদের নো ম্যান্স ল্যান্ড থেকে তাড়াতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নানা ভাবে কঠোর চাপ প্রয়োগ করলেও সেখানকার রোহিঙ্গারা অবস্থান ত্যাগ করছে না।
গত নভেম্বরে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তিতে চুক্তি সম্পাদনের দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উল্লেখ রয়েছে। এরপর গত জানুয়ারীতে উভয় দেশের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম জোরালো করতে গঠিত হয় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ। চুক্তিতে সীমান্তের তুমব্রু কোনারপাড়া নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়ার কথাও উল্লেখ ছিল। কিন্তু মিয়ানমার সে কথা রাখেনি। গত বুধবার রাখাইন উন্নয়ন সংক্রান্ত প্রধান ও মিয়ানমারের ইউনিয়ন সমাজ কল্যাণ, ত্রাণ ও পুর্ণবাসন মন্ত্রীর নেতৃত্বে প্রথম কোন মিয়ানমার উচ্চ পর্যায়ের প্রতিনিধি দল কুতুপালং রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে রোহিঙ্গাদের সাথে সরাসরি আলোচনায় মিলিত হন। বস্তুত সে সফরের পর থেকে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মাঝে দ্বিধাবিভক্তি লক্ষ্য করা যাচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নেয়া সচেতন রোহিঙ্গারা গতকাল জানিয়েছেন এখানে আশ্রয় শিবিরে বিভিন্ন ধরনের হুমকি ও চাপ অব্যাহত রয়েছে। তা ছাড়া যে সব ঘরে রোহিঙ্গাদের বসবাস করতে হচ্ছে মরুভূমির মত প্রায় এসব এলাকার ঘরগুলোতে দিনরাত সমানে বসবাসের অনুকূল তেমন কোন পরিবেশ নেই।
কক্সবাজার-৩৪ বিজিবির উপ অধিনায়ক ও অতিরিক্ত পরিচালক মেজর মোঃ ইকবাল হাসান বলেন, শনিবার কোন এক সময় উক্ত রোহিঙ্গা পরিবারটি গোপনে মিয়ানমার ফিরে গেছে সেটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সাথে গোপনে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার, সরকারের অতিরিক্ত সচিব মোঃ আবুল কালাম বলেন তুমব্রু শুন্য রেখায় অবস্থান করা ৫ সদস্যের একটি পরিচার মিয়ানমারে ফেরত গেছে বলে প্রচার হয়েছে। সীমান্তের ঐ অংশটি মিয়ানমারের অংশ বিশেষ। তাই এটি কোন ভাবেই প্রত্যাবাসনের পর্যায়ে পড়ে না। ওখানকার রোহিঙ্গারা তাদের দেশে আসা যাওয়া করতেই পারে। সুতারাং এটি প্রত্যাবাসন নয়। তিনি বলেন, সীমান্তে শুন্য রেখায় থাকা প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গা যদি তাদের দেশে চলে যায় বা তাদের সরকার নিয়ে যায় তাহলে এটি খুবই ইতিবাচক। আর এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ হবে।

Top