ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গা ইফতার আলম বেইমান!

1-1.jpg

রফিকুল ইসলাম :
শনিবার মিয়ানমার ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গা নেতা ইফতার আলম চেয়ারম্যান রোহিঙ্গাদের চোখে একজন বেইমান হিসেবে চিহ্নিত হয়ে পড়েছে। রোহিঙ্গাদের উগ্র পন্থী একটি অংশ ইফতার আলম চেয়ারম্যান ফিরে যাওয়াকে কোন ভাবে মেনে নিতে পারছে না। তারা মিয়ানমার ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গা নেতা ইফতার আলমকে বাংলাদেশে অবস্থান কালে মিয়ানমার সরকারের গুপ্তচর হিসেবে কাজ করেছিল বলে জানিয়েছে। তবে ঘটনা প্রকাশ পাওয়ার আগেই সুচতুর রোহিঙ্গা নেতা ইফতার আলম স্ব পরিবারে মিয়ানমার ফিরে যায় বলে তাদের দাবী। আবার অন্য একটি অংশ মিয়ানমার সরকারের সাথে তলে তলে যোগাযোগ করে সম্পর্ক গড়ে তুলে বর্ষার আগেই ফিরে যেতে চাচ্ছেন।
শনিবার মিয়ানমার ফিরে যাওয়া ইফতার আলম ও তার আত্মীয় রোহিঙ্গাদের সাথে অনেক আগে থেকেই মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও বর্ডার গার্ড পুলিশ- বিজিপি সহ সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ের সাথে সুসম্পর্ক ছিল। বাংলাদেশে গত আগষ্টের পর থেকে সে স্বপরিবারে অন্য রোহিঙ্গাদের সাথে পালিয়ে এসে তুমব্রু কোনার পাড়া নো ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রয় নেয়। নো ম্যান্স ল্যান্ডে থেকে তিনি বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে বিচরন করে বাংলাদেশের রোহিঙ্গা সংকটের নানা গুরুত্বপূর্ণ খবর মিয়ানমার সেনাবাহিনীর কাছে পাচার করতো বলে রোহিঙ্গাদের একটি অংশ দাবী করছে। তবে তার গতি বিধি সন্দেহজনক হলেও তিনি দীর্ঘদিন নিজ দেশে লোকজনের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করায় আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা ও প্রশাসনের লোকজন তাকে তেমন সন্দেহ করতো না। রোহিঙ্গা নেতা অজুহাত দেখিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও জিবিপির সাথে প্রায় সময় ইফতার আলম ফোনে যোগাযোগ রাখতেন বলে রোহিঙ্গারা জানিয়েছে।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু কোনার পাড়া নো ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রয় নিলেও ফিরে যাওয়া রোহিঙ্গা নেতা ইফতার আলম তুমব্রুতে স্থানীয় নারী ইউপি সদস্য ফাতেমা বেগমের বাড়িতে ভাড়ায় থাকতেন। তুমব্রু সীমান্তে নো ম্যান্স ল্যান্ডে থাকা রোহিঙ্গা নেতা দিল মোহাম্মদ, সুবাইয়ের বলেন রাতের অন্ধকারে তার সাথে থাকা অসহায় রোহিঙ্গাদের ফেলে ইফতার আলম গোপনে সীমান্ত ফাড়ি দিয়ে দেশে ফিরে যায়। রাখাইনে সেনাবাহিনী ও রাখাইনদের সাথে ইউপি চেয়ারম্যান হিসেবে তার সম্পর্ক ছিল দহরম মহরম। এ কারনে তিনি বার বার সরকার মনোনীত চেয়ারম্যান হতেন। এরপরও আমাদের সঙ্গে তেমন জানি তিনি পালিয়ে এসে নো ম্যান্স ল্যান্ডে আশ্রয় নেয়। তবে নো ম্যান্স ল্যান্ডে বেশী দিন থাকেনি তিনি। নো ম্যান্স ল্যান্ডে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের পাশে স্থানীয় ঘুমধুম ইউনিয়নের মহিলা মেম্বারের বাড়ি ভাড়া নিয়ে থাকতেন। সেখানে তার স্ত্রী সাজেদা বেগম (৪০), মেয়ে শাহেনা বেগম (১২) ছেলে তারেক আজিজ (৭), মেয়ে তাহেরা বেগম (৮), ও গৃহকর্মী সওকত আরা বেগম (২০) থাকতেন।
উক্ত রোহিঙ্গা নেতারা ছাড়াও বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরের রোহিঙ্গারা জানান, ইফতার আলম বাড়ি ভাড়া নিলেও নো ম্যান্স ল্যান্ডে প্রায় সারাদিন অন্য রোহিঙ্গাদের সাথে কাটাতেন। এসব রোহিঙ্গাদের সাথে সুখ দু:খের কথা বলতেন। মাঝে মধ্যে আড়ালে গিয়ে মিয়ানমারের কারও সঙ্গে কথা বলতেন। তিনি চলে যাওয়ার পর রোহিঙ্গারা সভাবতই অভিযোগ করছেন এতদিন উক্ত চেয়ারম্যান রোহিঙ্গাদের সাথে থেকে মিয়ানমারের পক্ষ হয়ে গুপ্ত চরের কাজ করেছিল। ঘুমধুম ইউনিয়নের ১,২ ও ৩নং ওয়ার্ডের নারী ইউপি সদস্য ফাতেমা বেগম বলেন, প্রথমে মানবিক কারনে আমার বাড়িতে উক্ত চেয়ারম্যানকে আশ্রয় দিয়েছিলাম। তার গতিবিধি সন্দেহ জনক হওয়ায় সাড়ে তিন মাসের মাথায় তাকে বাড়ি ছেড়ে চলে যেতে বলি। এরপর থেকে তুমব্রু নো ম্যান্স ল্যান্ডে অন্য রোহিঙ্গাদের সাথে ঝুপড়ি ঘরে থাকত।
উক্ত চেয়ারম্যানের সাথে এ প্রতিনিধির সর্বশেষ কথা হয় গত ১১ এপ্রিল দুপুরে। যেদিন মিয়ানমারের সমাজ কল্যাণ মন্ত্রী কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির পরিদর্শনে এসেছিলেন। সেদিন তিনি বলেছিলেন, ভাই এখানে যে অবস্থা, কোন নিয়ন্ত্রণ নেই। সন্ত্রাসীরা বার বার তাকে সহ মিয়ানমার থেকে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়া সচেতন লোকজনদের নানা ভাবে হুমকি দিয়ে আসছে। অনেককে এরা খুনও গুম করেছে। তাই এখানে হয়ত বেশীদিন থাকা যাবে না। গতকাল উখিয়ার বিভিন্ন রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে অবস্থানরত অনেক শিক্ষিত ও সচেতন এবং অনেকটা স্বচ্ছল রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে জানা গেছে একই কথা। তারা আরো জানান, প্রচন্ড গরম, প্লাষ্টিকের ঘর কোথাও গাছপালা নেই, পানি সংকট ধু ধু মরুভুমির মত অবস্থা। এখানে কারও ইজ্জত সম্মান নেই। বিশেষ করে মহিলাদের নিয়ে খুবই উদ্বেগের সাথে দিন কাটাতে হচ্ছে। তা ছাড়া সামনে বর্ষা ও দুর্যোগের সমূহ আশংকা। তাই তারা বর্ষার আগে অন্তত মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায়। সেখানে গিয়ে যা আছে তাই নিয়ে অন্তত ভালমতে চলা যাবে বলে তারা জানান।
বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু নো ম্যান্স ল্যান্ডে গত বছরের সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে অবস্থান নেয়া প্রায় ছয় হাজার বাস্তুচ্যুত মিয়ানমার রোহিঙ্গা মুসলিম। গত বছরের ২৫ আগষ্ট সংঘটিত সহিংস ঘটনায় মিয়ানমারের রাখাইনের উত্তরাংশ থেকে প্রায় সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ ও ইজ্জত রক্ষার্থে পালিয়ে এসে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। সীমান্তের তুমব্রু নো ম্যান্স ল্যান্ডেও একই ঘটনার শিকার উল্লেখিত রোহিঙ্গারা অবস্থান নেয়। নো ম্যান্স ল্যান্ডের উক্ত অংশটি বস্তুত কোন দেশের না হলেও সেটি মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বলে জানা গেছে। ফলে সেখানে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে বাস্তুচ্যুতদের জন্য নির্মিত আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নিতে অপারগতা জানিয়ে আসছে। গত মাসে এসব রোহিঙ্গাদের নো ম্যান্স ল্যান্ড থেকে তাড়াতে মিয়ানমার সেনাবাহিনী নানা ভাবে কঠোর চাপ প্রয়োগ করলেও সেখানকার রোহিঙ্গারা অবস্থান ত্যাগ করেনি।
গত নভেম্বরে বাংলাদেশে পালিয়ে আসা বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এ চুক্তিতে চুক্তি সম্পাদনের দুই মাসের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু এবং আগামী দুই বছরের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করার উল্লেখ রয়েছে। এরপর গত জানুয়ারীতে উভয় দেশের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কার্যক্রম জোড়ালো করতে গঠিত হয় জয়েন্ট ওয়ার্কিং গ্রুপ। চুক্তিতে সীমান্তের তুমব্রু কোনারপাড়া নো ম্যান্স ল্যান্ডে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গাদের নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়ার কথাও উল্লেখ ছিল। কিন্তু মিয়ানমার সে কথা রাখেনি। বিভিন্ন আশ্রয় শিবিরে কর্মরত দায়িত্বশীল বিভিন্ন সংস্থার লোকজন অবশ্য মিয়ানমার ফেরা যাওয়া রোহিঙ্গা নেতার গুপ্তচরের অভিযোগ প্রত্যাখান করেছে।
কক্সবাজার-৩৪ বিজিবির উপ অধিনায়ক ও অতিরিক্ত পরিচালক মেজর মোঃ ইকবাল হাসান বলেন, শনিবার কোন এক সময় উক্ত রোহিঙ্গা পরিবারটি গোপনে মিয়ানমার ফিরে গেছে সেটা নিশ্চিত হওয়া গেছে। এ ছাড়া বাংলাদেশে অবস্থান নেয়া রোহিঙ্গাদের একটি অংশ মিয়ানমার কর্তৃপক্ষের সাথে গোপনে সার্বক্ষনিক যোগাযোগ রক্ষা করে চলছে। শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার, সরকারের অতিরিক্ত সচিব মোঃ আবুল কালাম বলেন তুমব্রু শুন্য রেখায় অবস্থান করা ৫ সদস্যের একটি পরিবার মিয়ানমারে ফেরত গেছে বলে প্রচার হয়েছে। সীমান্তের ঐ অংশটি মিয়ানমারের অংশ বিশেষ। তাই এটি কোন ভাবেই প্রত্যাবাসনের পর্যায়ে পড়ে না। ওখানকার রোহিঙ্গারা তাদের দেশে আসা যাওয়া করতেই পারে। সুতরাং এটি প্রত্যাবাসন নয়। তিনি বলেন, সীমান্তে শুন্য রেখায় থাকা প্রায় ৬ হাজার রোহিঙ্গা যদি তাদের দেশে চলে যায় বা তাদের সরকার নিয়ে যায় তাহলে এটি খুবই ইতিবাচক। আর এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুরো প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া সহজ হবে।

Top