একজন শিক্ষকের স্বগোতোক্তি

Raihan-Uddinr.jpg

॥ অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন॥
শিক্ষক তাকে বলতে হয় নিরস সব তত্ত্বের কথা। সামনে বসে থাকা প্রানাবেগ কম বয়েসি চঞ্চল ছাত্রেরা শোনবে কেন ওসব কথা? অবশ্য পরীক্ষা পাশের পাওয়াটাই যদি আসল তাগিদ, তার জন্য আজকাল নানান ধরনের ফন্দিফিকির বেরিয়ে গেছে। তবুও আমার মেলাই অভিজ্ঞতা অনেক শিক্ষক জানেন কেমন করে বলতে হয় জ্ঞানের কথা, তত্ত্বের কথা, এবং ওরা শোনে।
ছোট্ট একটা গল্প দিয়ে শুরু করি-প্রুশিয়ার রাজা ফ্রেডরিক দা গ্রেট ছিলেন একজন শিল্প সাহিত্য , সঙ্গিতের বড় সমজদার।তিনি এসব ক্ষেত্রে বড় পৃষ্ঠপোষক হিসাবে স্মরনীয়।তিনি সঙ্গীত সম্মন্ধে একটা মুল্যবান কথা বলেছিলেন। তিনি বলেছিলেন.“যদি সারা পৃথিবীকে ক্রিতদাশ বানাতে চাও তাহলে সঙ্গীত শেখ,গানের প্রভাব অসীম, ভাল মন্দ ছোট বড় গান সবাইকে মোহিত করে।” গান শুধু যে সবাইকে সম্মোহিত করে তা নয়, গানের মতো আরো একটি জিনিষ আছে। তা হচ্ছে কথা। সুন্দর , সুললিত, মনোমুদ্ধকর এবং দিপান্বিত কথা। কথার ভেতর দিয়েই মহাপুরুষেরা মানবজাতিকে কল্যাণের দিকে ডাক দেন।রাজনৈতিক নেতারা জনগনকে উদ্বুদ্ধ করেন। কবি সাহিত্যিক ও লেখকরা মানুষকে উচ্চতর জীবনের সন্ধান দেন। আর দার্শনিকরা এ্ই কথার ভেতর দিয়েই মানুষকে দিক নির্দেশনা করেন। যেখানেই অনেক মানুষকে উদ্ধুদ্ধ করার, উজ্জিবিত করার দরকার সেখানেই কথার দরকার।অসামান্য কথার চেয়ে অজেয় এই পৃথিবীতে আর কিছুই নেই।
এখন আসি শিক্ষকের বিষয়ে। তাঁর জীবনে কথার ভুমিকা কি সেই বিষয়ে। মহামানব থেকে শুরু করে রাস্ট্রনায়ক, গনমাধ্যমের তপস্বাধক লেখক এদের সবার মতো শিক্ষকও দাড়িয়ে আছেন একটি বিশাল জনগোষ্ঠির সামনে। এই গোষ্ঠির নাম ছাত্র। এই ছাত্ররা আগামী দিনের ভবিষ্যত। এদের বড় করে সম্পুর্ন মানুষ হিসাবে গড়ে তোলতে হবে। তাহলে আগামী দিন সম্পন্ন হবে।বড় হবে। শিক্ষকের উপর এই গুরু দায়িত্ব ন্যস্ত। তাঁর কাজ এদের বড় করে তোলা। সমৃদ্ধ মানুষ করে তোলা । এজন্যে সিলেবাস ধরে ছাত্রকে বেদল বিদ্যা শিক্ষা দিলে শিক্ষকদের চলেনা।ছাত্রকে তার স্বপ্ন দেখাতে হয়। বড় জীবনের দিকে তাকে জাগ্রত করে তোলতে হয়।উচ্চায়ত পৃথিবীর চিত্র তার সামনে তোলে ধরে তাকে সেদিকে আহবান করতে হয়। বলতে হয় এদিকে এস, এখানে তোমার সম্ভাবনা। এখানে তোমার বিকাশ। এখানে তোমার আলোকোজ্জল মুক্তি। এই পুরু কাজটাই শিক্ষককে করতে হয় কথার মাধ্যমে।তাই শিক্ষক জীবনে কথার গুরুত্ত্ব এতোই গুরুত্ত্ব পুর্ন। ছাত্রের জীবনের চারিদিক থেকেই তাঁকে জাগিয়ে তোলতে হবে।এই জন্য তাঁর কথার ভিতর কথা বলার উচু মাপের ক্ষমতা থাকতে হয়। তা না হলে এই অসাধ্য সাধন করা, উচু মাপের শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হয় না।
শিক্ষকের আরো একটি দায়িত্ব আছে।সেটি সাধারন দায়িত্ব। যত বড় জীবনের দিকেই শিক্ষক ছাত্রকে ডাক দেন না কেন, তাঁর প্রাথমিক দায়িত্ব একটি বিশেষ বিষয় পড়ানো।সিলেবাস অনুযায়ী একটি বিশেষ বিষয় পড়ানো। সিলেবাস অনুযায়ী তাঁকে একটি বিশেষ বিষয়কে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে শেষ করতে হয়। এই কাজটি যোগ্যতার সঙ্গে করার জন্য একজন শিক্ষককে সুন্দর করে কথা বলার অধিকারী হতে হয়। একটি নিরস বিষয়কেও কথার রমনীয় লালিত্যে তাঁকে প্রানবন্ত এবং আনন্দময় করে তুলতে হয় ছাত্রের সামনে। তাঁর নিজের দীপ্ত বুদ্ধি, সাবলিলতা, নাটকিয়তা, কৌতুহল, জীবনরস এসবকিছুর থির দিয়ে ছাত্রের মনের মধ্যে সুন্দর করে গেঁথে দিতে হয়।শিক্ষক যদি তাঁর কথা বলার রমনীয়সুন্দর্য্যে ছাত্রের মনকে আনন্দময়ভাবে মাতিয়ে তুলতে না পারেন, তাহলে কি করে তিনি ৪০/৫০ মিনিট ছাত্রকে ক্লাসে ধরে রাখবেন? কিন্তুু দুর্ভাগ্য আজ আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থা নানা দিক থেকে দু:খজনক অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে।শিক্ষাগৃহ আজ স্কুলগৃহ থেকে শিক্ষকের বাড়ীতে বাড়ীতে স্থানান্তরিত হয়ে গেছে।প্রায় প্রতিটি শিক্ষকের বাসাই যেন এক একটি দোকান। মুক্তবাজার অর্থনীতির আদর্শে সেখানে বিদ্যার অবাধ বেচাকেনা চলছে।কোন কোন শিক্ষকের বাড়ী যেন এক একটি সুপার মার্কেট।
অবশ্য সরকার চাচ্ছেন শিক্ষকদের স্কুল মুখী করতে। কারন যেনতেন প্রকারে স্কুলের ক্লাস সেরে বাড়ী কিংবা নিজের কোচিং সেন্টারে একদল ছাত্রকে নিয়ে পড়াতে পারলেই অনেক টাকা।স্কুল কলেজের ছাত্রছাত্রীদের প্রাইভেট পড়ানো যাবেনা তা স্কুল কলেজের ম্যানুয়েলে উল্লেখ আছে।তা সত্বেও তা মানা হচ্ছেনা।অনেক সময় দেখা যায় স্কুল কলেজের পাশে শিক্ষক মহাশয়ের বাড়ী, নিয়মিত ক্লাসের পাশাপাশি তাঁর বাড়ীতেও ক্লাস চলছে। কোন কোন শিক্ষকের বাড়ীতে গিয়ে দেখা গেছে সারি সারি বেঞ্চ, অদুরে মাইক লাগানো আছে শিক্ষকের কথা শোনা যায় মতো।এটি অবাক হবার মতো , যেখানে অনেক সরকারী বেসরকারী স্কুল কলেজে শব্দ যন্ত্র বসিয়ে ক্লাস করার বিষয় এখনো সম্ভব হয়নি, সেখানে পাইভেট টিউটরদের বাসায় তা হচ্ছে ।কোন কোন বাসায় ফটোস্টেট মেশিন পর্যন্ত রয়েছে। অতিরিক্ত টিউটর রয়েছে পড়াবার জন্যে। যেমন আমাদের ডাক্তারদের বেলায় হ্েচ্ছ। ডাক্তারদের চেম্বারে বেশকয়েকজন এসিস্টেন্ড থাকেন । তারা ডাক্তারের ইশারায় রোগীদের ব্যবস্থাপত্র লিখে দেন। আমাদের পার্শবর্তী দেশ পশ্চিমবঙ্গ সরকার প্রতিটি শিক্ষককে “ আমি কোন ছাত্র ছাত্রী পড়াইনা” এই ডিক্লারেশন দিতে অনুরোধ করেছিলেন। আমাদের দেশের শিক্ষকরা কতটুকু বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন তা অভিবাবকরা ভালোকরেই জানেন।কিন্তু অসহায় এই অভিবাবকরা একপ্রকার জিম্মি এই শিক্ষকদের হাতে। প্রাইভেট পড়াতে হবে , নাহলে নির্ঘাত ফেল। স্কুলে কতটুকু পাঠদান হয় তাও অভিবাবকরা বুঝতে পেরেছেন। এমনকি কোন কোন সময় দেখা গেছে শিক্ষকদের ক্লাস রুটিনে নিজের নাম দুপুর একটার আগে না দেওয়াতে রীতিমতো কথা কাটাকাটি হয়। এনিয়ে সরকার শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সময়সীমা বেঁধে দিয়েছেন। এটাকে অনেক শিক্ষক তুঘলকি কান্ড বলে উল্লেখ করেছেন। এভাবে গোটা শিক্ষক জাতির নৈতিক এমন অধঃপতন হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখেনা। স্কুলের কলেজের প্রশ্নপত্র ফাঁস থেকে, ছাত্রীদের ধর্ষন ইত্যাদী কিছু কিছু স্কুল কলেজের, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্টুপিড শিক্ষক করে যাচ্ছেন। এসব পরিমলদের সরকার শাস্তি দিলেও টনক নড়েনি একটুও। ঐ সমস্থ শাস্ত্র শকুনদের ঠিক করতে সরকার হিমশিম খেয়ে যাচ্ছেন।
আজকে অভিভাবকরা কি চাচ্ছেন? তাঁরা চাচ্ছেন শিক্ষকেরা তাঁদের সন্তানদের পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়ার ব্যবস্থা করে দিবেন।।ঐ চেস্টাতেই তাঁদের যেন সব রকম সাফল্য, তাঁদের যেন সার্থকতা। ছাত্রদের আজ আর কেউ শিক্ষার্থী হিসেবে দেখতে চাচ্ছেন না। প্রায় সবাই ছাত্রদের দেখতে চাচ্ছেন পরীক্ষার্থী হিসেবে। আমি মনে করিনা যে একজন শিক্ষকের কাজ শিক্ষার্থীকে ভালো নম্বার পাইয়ে দেওয়া নয়। এটা যিনি করেন তাকে শিক্ষক বলা যাবেনা । ইংরেজীতে তার একটা নাম রয়েছে। তার নাম ‘টিউটর” ।তিনি টিউটর এবং কোচিং সেন্টারের ইনষ্ট্রাক্টর। তিনি শিক্ষক নন। শিক্ষক টিউটরের চাইতে অনেক বড় মাপের।শিক্ষক ছাত্রের কাছে পড়ানোর বিষয়টি তোলে ধরার পাশাপাশি ছাত্রের হৃদয়ে ঐ বিষয়ের প্রতি ভালোবাসা জাগিয়ে তোলতে চেস্টা করেন। ঐ বিষয়ে স্বপ্নে এবং প্রেমে ছাত্রের হৃদয়কে উদ্বুদ্ধ করে তুলতে চেস্টা করেন। যে বিষয়ে শিক্ষক পড়ান সে বিষয়টি ঘিরে শিক্ষকের মধ্যে যে আনন্দ আর ভালোবাসার উতাল পাতাল হয়েছে, সেটা তাকে উচ্ছল শব্দে প্রতিভাবান ভাষায় ছাত্রের হৃদয়ে সঞ্চার করতে হবে। এটা যদি তিনি না পারেন তবে তিনি কখনও সফল হবেন না।বড় মাপের শিক্ষকই হোক আর ছোট মাপের শিক্ষকই হোক তাঁকে সুন্দর অনবদ্যভাবে কথা বলার ক্ষমতা থাকতে হবে। তা না হলে তিনি শিক্ষক হিসেবে ব্যর্থ হয়ে যাবেন।যদি শিক্ষকের কথার মধ্যে লালিত্য ও প্রসাদগুন না থাকে তাহলে সে কি হতে পারে শিক্ষক?

Top