অতিথি কলাম : স্মরণীয় বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরীর কিছু কথা

1.jpg

॥ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর,এডভোকেট ॥

বাংলাদেশ সুপ্রীমকোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী ১মে ২০১৮ ঢাকার একটি বেসরকারী হাসপাতালে ইন্তেকাল করেছেন (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন)। তাঁর মৃত্যুর সাথে সাথে ফেসবুক,ইন্টারনেট ইত্যাদি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ও পরের দিন কক্সবাজারের স্থানীয়ভাবে প্রকাশিত দৈনিক পত্রিকাগুলোতে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী সম্পূর্ণ জীবনবৃত্তান্ত ছাপা হয়। ফেসবুকে বেশ কিছু পোস্টে আমি মন্তব্যও করেছি। আমিরুল কবির চৌধুরী মামাত ভাই এর ছেলে আমার স্নেহভাজন অধ্যাপক দিলোয়ার চৌধুরী তার মরহুম চাচা সম্পর্কে দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার অতিথি কলামে লেখার অনুরোধ করেন। ইতোমধ্যে অনেকগুলো পত্রিকায় জীবনী প্রকাশ হওয়ায় একই জীবনী আবার আমার কলামেও লিখলে পাঠকদের একই জিনিস বার বার পড়তে ভাল লাগবে না। তাই আমিরুল কবির চৌধুরী সম্পর্কে কিছু ব্যক্তিগত স্মৃতিচারণমুলক বিচ্ছিন্ন ঘটনার কথা সম্মানিত পাঠকদের জানাব।
আমি ১৯৬৯ সালে কক্সবাজার হাইস্কুল থেকে ( এখন কক্সবাজার সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়) এসএসসি পরীক্ষায় পাশ করে চট্টগ্রাম আগ্রাবাদ সরকারী কর্মাস কলেজে ভর্তি হই। তখন চট্টগ্রাম,ঢাকায় কলেজ/বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর আত্মীয়স্বজনের ছেলে মেয়েরা যারা লেখাপড়া করতেন তারা কক্সবাজার থেকে গিয়ে বাস থেকে নেমে আগে আমিরুল কবির চৌধুরীর দেওয়ানবাজারস্থ বাসায় যেতেন। তারপর খাওয়াদাওয়া করে রেস্ট নিয়ে যার গন্তব্যে যেতেন। আমিও ছাত্র জীবনে তার আত্মীয় ছাত্রীদের বাসায় পৌছে দিয়ে অনেকবার খেয়েছি। তারঁ স্ত্রীও (কারো জন্য খুকু ভাবী,কারো জন্য খুকু মামী,কারো জন্য খুকু চাচী) খুব অতিথিপরায়ন ও উদার। উনার সহায়তা সহযোগিতা নিয়ে কক্সবাজার অঞ্চলের অনেকে উচ্চ শিক্ষিত হয়েছেন। সরকারী-বেসরকারী উচ্চ পদে আসীন হয়েছেন। তিনি চট্টগ্রামস্থ কক্সবাজার সমিতির ১৯৬৪-৯০ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠাতা সাধারণ সম্পাদক ও ১৯৯১-৯৬ পর্যন্ত সভাপতির দায়িত্ব পালন কালে কক্সবাজারের অনেক লোককে বিভিন্নভাবে সাহায্য করেছেন।
১৯৭৮ সালে রোহিঙ্গারা হাজারে হাজারে বাংলাদেশের কক্সবাজার এলাকায় অনুপ্রবেশ করে আশ্রয় নিলেও সামরিক শাসকদের নিষেধাজ্ঞার কারণে সে সংক্রান্তে কোন খবর সংবাদপত্রে প্রকাশিত হচ্ছিল না। কক্সবাজার প্রেসক্লাবে গঠিত ’কমিটি ইন এইড অব রোহিঙ্গা মুসলিম রিফিউজী’ নামের সংগটনটি স্থানীয়ভাবে সংগৃহীত ত্রাণ সামগ্রী নিয়ে রোহিঙ্গাদের সহায়তা করছিলাম। উক্ত কমিটির সভাপতি এডভোকেট ছালামতউল্লাহ,সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক মফিদুল আলম ও আমি সঙ্গে আরো কয়েকজন রোহিঙ্গা নেতা নিয়ে ঢাকা প্রেসক্লাবে প্রেস কলফারেন্স করে দেশী বিদেশী সাংবাদিকদের বর্মি সেনাকর্তৃক রোহিঙ্গা নির্যাতন ও বাংলাদেশের কক্সবাজারে অনুপ্রবেশ করে আশ্রয় নেওয়ার বিষয়টি জানানোর উদ্দেশ্যে ঢাকা যাওয়ার সময় চট্টগ্রামস্থ কক্সবাজার সমিতির সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আমিরুল কবির চৌধুরী ও সভাপতি এডভোকেট শফিক সাহেবের সাথে দেখা করেছিলাম। আমরা বর্মি সেনাদের দ্বারা ধর্ষিতা হয়ে নিহত এক মেয়ের ছবিসহ এক পৃষ্টায় বাংলা ও অপর পৃষ্টায় ইংরেজীতে একটি লিফলেট তৈরী করেছিলাম যা আমিরুল কবির চৌধুরী ও শফিক সাহেব দেখে প্রয়োজনীয় সংশোধন করে দিয়েছিলেন।
১৯৯৬ সালে আমিরুল কবির চৌধুরী সততা,মেধা ও যোগ্যতা বিবেচনায় (দলীয়করণ ও রাজনৈতিক বিবেচনায় নয়) হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি নিযুক্ত হন। তিনি পারিবারিক সফরে কক্সবাজার আসার খবর পেলে আমি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি হিসেবে কক্সবাজার আইনজীবী সমিতির আইনজীবীরা তার সাথে দেখা করার ইচ্ছা প্রকাশ করেছেন বলে আমি তাকে জানালে তিনি নিজেই বারে চলে আসেন। সে দিন প্রস্তুতিবিহীন, অঘোষিত, স্বতস্ফুত সংবর্ধনা সভা হয়েছিল তার সম্মানে। কক্সবাজারের ইতিহাসে প্রথম নিজেদের একজনকে বিচারপতি হিসেবে পেয়ে জেলার আইনজীবীরা তথা সাধারণ মানুষ খুশীতে আত্মহারা হয়েছিল সেদিন। টিনের চালার সেই পুরাতন আইনজীবী সমিতি ভবনে অনুষ্ঠিত সে স্মরণীয় সভার সভাপতিত্ব করার সৌভাগ্য হয়েছিল আমার।
আমি ১৯৮০-৮৩ পর্যন্ত সিআরপিসি,প্যানেল কোড,এভিডেন্স এক্ট বই এর লেখক বিখ্যাত আইনজীবী আলহাজ্ব জহিরুল হক সাহেবের জুনিয়ার হিসেবে চট্টগ্রাম দেওয়ান বাজার দেওয়ানজী পুকুরপাড়স্থ চেম্বারে ছিলাম। তখন এডভোকেট রানা দাশ গুপ্তও একই চেম্বারে বসতেন। আমিরুল কবির চৌধুরীর চেম্বার এবং বাসাও বেশ নিকটে। আমিরুল কবির চৌধুরীর চেম্বারে এডভোকেট শাহজাহান বসতেন। আর পাশের এডভোকেট মাহামুদুর রহমানের চেম্বারে এডভোকেট লুৎফুর কবির বসতেন।
আমিরুল কবির চৌধুরী জহিরুল হক সাহেবের প্রথম জুনিয়ার। তিনি বিচারপতি হওয়ার পর যতবার চট্টগ্রাম এসেছেন প্রতিবার জহিরুল হক সাহেবের সাথে দেখা করেছেন। তিনি ১৯৭৯ সালে মাত্র ৩৯ বছর বয়সে বাংলাদেশের সর্বকনিষ্ঠ পাবলিক প্রসিকিউটার নিযুক্ত হন চট্টগ্রাম জেলার। তখন কক্সবাজার চট্টগ্রাম জেলার অধিন মহকুমা ছিল। তিনি ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত অতি সততার সাথে,সুনামের সাথে বৃহত্তর চট্টগ্রাম জেলার পাবলিক প্রসিকিউটারের দায়িত্ব পালন করেন। আমি জহিরুল হক সাহেবের জুনিয়ার হলেও প্রতিদিন আমিরুল কবির সাহেবের পিপির অফিসে যেতাম। অফিসে যাওয়ার সময় টিফিন ক্যারিয়ার ভর্তি খাবার নেওয়া হত বাসা থেকে। প্রায় সপ্তাহে বৃহস্পতিবারে বা সোমবারে টিফিন ক্যারিয়ার না দেখলে আমি তাঁর সহকারী ফয়েজকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলতেন আজকে স্যার রোজা। দেখেছি রমজান মাস ছাড়াও তিনি রোজা রাখতেন। আসামীর কাছ থেকে টাকা না নিয়ে,ঘুষ না নিয়ে কিভাবে পাবলিক প্রসিকিউটারের দায়িত্ব পালন করতে হয় তা তিনি দেখিয়েছেন। ১৯৮৮ সালের মার্চ মাসে আমি ৩৫ বছর বয়সে কক্সবাজার জেলার পাবলিক প্রসিকিউটার নিযুক্ত হলে তিনি আমাকে এক চিঠিতে অভিনন্দন জানিয়ে শুভ কামনা করেছিলেন। আমি পিপির দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে অসুবিধা হলে বা আইনগত সমস্যায় পড়লে তাঁকে টেলিফোন করে পরামর্শ নিতাম। পিপি হিসেবে দায়িত্ব পালন করার সময় আমি আমিরুল কবির চৌধুরীকেই আদর্শ হিসেবে নিয়েছিলাম। তাঁর সততা ও আদর্শ আমাকে প্রভাবিত করেছিল,অনুপ্রাণিত করেছিল। তিনি আমাকে সব সময় সাহায্য করেছেন তা কৃতজ্ঞচিত্তে আজও স্বীকার করছি।
কক্সবাজার জেলা জজ কোর্টে কর্মরত আমার মত একজন সাধারণ আইনজীবীর লেখা আইনবই ’ ল অন এক্সপ্লোসিভ সাবস্ট্যান্স এক্ট এন্ড আমর্স এক্ট’ নামের বই এর জন্য তিনি ২০০০ সালে বিচারপতি হিসেবে ’প্রিফেস’ লিখে দিয়ে আমাকে উৎসাহিত করেছিলেন।
আমি দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকার একজন নিয়মিত কলাম লেখক। পত্রিকায় প্রকাশিত নির্বাচিত কিছু কলাম নিয়ে ঢাকা বাংলাবাজারের ’লেখাপ্রকাশ’ নামের প্রকাশনী সংস্থার মালিক কবি বিপ্লব ফারুক ২০০৯ সালে অমর একুশে বইমেলা উপলক্ষে ’খোন্দকার মোস্তাকদের তালিকা চাই’ শিরোনামে একটি বই প্রকাশ করার প্রস্তুতি সমাপ্ত করে আমাকে বইটি একজন প্রিয় ব্যক্তিকে উৎসর্গ করার জন্য বলেন। সাথে সাথে কোন চিন্তা না করেই আমি লিখে দিলাম, ”উৎসর্গ- স্বাধীন বাংলাদেশে চট্টগ্রাম জেলার তৎকালীন কক্সবাজার মহকুমার অধিবাসীদের মধ্যে প্রথম পাবলিক প্রসিকিউটার,কক্সবাজার জেলার অধিবাসীদের মধ্যে হাইকোর্টের প্রথম ডেপুটি অ্যাটর্ণি জেনারেল,কক্সবাজার জেলার অধিবাসীদের মধ্যে সুপ্রীমকোর্টের প্রথম বিচারপতি,জাতীয় মানবাধিকার কমিশন বাংলাদেশ এর প্রথম চেয়ারম্যান,সৎ,ধার্মিক,নির্লোভ সমাজসেবক ও একজন আদর্শ মানুষ বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ।”
বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরী হাইকোর্ট বিভাগের বিচারপতি থাকা কালে আমি একবার রমজান মাসে ঢাকা গেলে তিনি আমাকে ও এডভোকেট আবু বকুর সিদ্দিকীকে তার বাসায় ইফতারের দাওয়াত দিয়েছিলেন। ইফতার ও নামাজ শেষে তিনি জানালেন তিনি একটা বই লিখেছেন। তবে তিনি চান তার মৃত্যুর পরেই বইটি প্রকাশিত হউক। তার একমাত্র পুত্র ইঞ্জিনিয়ার,দুই মেয়ে আইনের লাইনে থাকলেও প্রকাশনা সম্পর্কে তাদের কোন অভিজ্ঞতা নেই। তাঁর স্ত্রীকে ডেকে বললেন বইটি তাঁর মৃত্যুর পরে প্রকাশের জন্য বই এর পান্ডুলিপি যেন আমাকে হস্তান্তর করেন। বইটি ইতোমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে কিনা আমি জানি না। যদি প্রকাশিত না হয়ে থাকে আমি উনার প্রিয় ভাতিজা অধ্যাপক দিলওয়ার চৌধুরীকে ( কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর সক্রিয় সদস্য হিসেবে যার প্রকাশনা সম্পর্কে বেশ অভিজ্ঞতা হয়েছে) বইটি প্রকাশের উদ্যাগ নিয়ে নিজেরা পারিবারিকভাবে অথবা কক্সবাজার সাহিত্য একাডেমীর মাধ্যমে প্রকাশ করার জন্য অনুরোধ করছি। বইতে কি আছে তা জানার আমি খুব আগ্রহী।
আল্লাহ মরহুম বিচারপতি আমিরুল কবির চৌধুরীকে বেহেস্ত দান করুন। আ মি ন।

লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Top