সর্বত্র ইয়াবার আগ্রাসন

download-13.jpg

রফিকুল ইসলাম :
সীমান্ত এলাকা, থানা পুলিশ, প্রশাসন, চিকিৎসক, শিক্ষক, সাংবাদিক, ধর্মীয় আলেম, পুরোহিত, ভান্তে সর্বোপরি দেশের আগামী প্রজন্ম, কিশোর-যুব সমাজ কেউ বাদ পড়ছে না মরন নেশা ইয়াবার নীল গ্রাস থেকে। ২০১৭ সালে আগষ্টের পূর্বে আসতো অনেকটা গোপনে। কিন্তু ব্যাপক হারে রোহিঙ্গা আগমনের পর থেকে মিয়ানমার হতে আসা শুরু করেছে বস্তায় বস্তায় কোটি কোটি পিস ইয়াবা ট্যাবলেট। বর্তমানে দেশে মাদক সেবনকারী সংখ্যা প্রায় ৭০ লাখের মত। তৎমধ্যে অতি সহজ লভ্য ও সস্তায় হাতের নাগালের মধ্যে পাওয়ায় ইয়াবা সেবনকারী সংখ্যাই বেশী। প্রায় প্রতিটি ঘরে, সমাজে, অফিস, কারখানা, শ্রমালয়, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান কোন কিছু বাদ পড়ছে না ইয়াবার হানা থেকে। ইয়াবার পেছনে প্রতি বছর দেশ থেকে পাচার হচ্ছে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার বেশী। ইয়াবা সহ মাদক প্রতিরোধ ও নিয়ন্ত্রণের ব্যর্থতায় সাধারন মানুষের মাঝে গণ অসন্তোষও বাড়ছে। এরা চায় যে কোন উপায়ে ইয়াবা নির্মূল করে ভবিষ্যৎ আলোর দিশারী আগামী প্রজন্মকে রক্ষা করা। দাবি উঠছে সীমান্ত এলাকা সহ মাদক প্রবন এলাকায় প্রশাসনিক পরিবর্তন পূর্বক সাড়াশি অভিযানের।
ইয়াবা ট্যাবলেটের মূল উৎপাদন ও সরবরাহকারী দেশ কথিত প্রতিবেশী বন্ধু রাষ্ট্র মিয়ানমার। আর ইয়াবা প্রচারের প্রধান রুট টেকনাফ, উখিয়ার নাফ নদী সীমান্ত, পার্বত্য নাইক্ষ্যংছড়ি, আলি কদম ও বিশাল প্রায় অরক্ষিত বঙ্গোপসাগর। উখিয়া ও টেকনাফ সীমান্ত দিয়ে অন্যান্য সময়ের তুলনায় গত ৮ মাসে ইয়াবা প্রচার বেড়েছে কয়েকশত গুন। এ দু’উপজেলার সীমান্তের প্রতিকূলে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য। সেখানে গত বছরের আগষ্টের ঘটনার পর সেখানকার ৭ লাখের কাছাকাছি অধিবাসী রোহিঙ্গা সীমান্তবর্তী দুই উপজেলায় আশ্রয় নেয়। প্রশ্ন দেখা দিতে পারে রাখাইনের প্রায় রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তাহলে কিভাবে কারা ব্যাপক হারে ইয়াবা পাচারের সাথে জড়িত রয়েছে। সোজা উত্তর মিয়ানমার সেনাবাহিনী, আশ্রিত রোহিঙ্গারা যোগসাজশ করে অধিক হারে ইয়াবা পাচার করে আনছে। আশ্রিত রোহিঙ্গাদের সাথে পুরনো স্থানীয় ইয়াবা পাচার কারীরা তো বহাল তবিয়তে রয়ে গেছে। এছাড়া আশ্রয় শিবির গুলো থেকে প্রতিদিন রাতের অন্ধকারে চুরি করে শত শত রোহিঙ্গা মিয়ানমার গিয়ে ইয়াবা এনে তা নিরাপদ আশ্রয় শিবির গুলোতে মজুদ করে থাকে। গত সোমবার ১৭ লক্ষ ইয়াবা সহ রাখাইনের রাচিডং এলাকায় একজন সেনা সদস্য সহ তিনজন আটক হয়েছে সেখানকার মাদক প্রতিরোধ বাহিনীর হাতে।
উখিয়া ও টেকনাফের শীর্ষ গডফাদার ও পৃষ্টপোষকদের আস্কারায় টেকনাফের মোছনী, নয়াপাড়া, লেদা, উনচিপ্রাং ও চাকমার কূল এবং উখিয়ার জামতলী, হাকিম পাড়া, তাজনিমার খোলা, ময়নারঘোনা, বালুখালী ও কুতুপালংয়ে গড়ে তোলা রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির। গত বছরের আগষ্টের পর যখন রোহিঙ্গরা ব্যাপক হারে আগমন করে তখন দেখা গেছে ঐসব এলাকার চিহ্নিত ইয়াবা পাচারকারী গডফাদাররা নিজেদের অর্থায়নে সীমান্ত এলাকা থেকে যানবাহন দিয়ে, অন্যান্য সহায়তার মাধ্যমে রোহিঙ্গাদের এনে প্রথম প্রথম এসব স্থানে উদ্বাস্তু আশ্রয় শিবির স্থাপন করে। স্থানীয় ও রোহিঙ্গা ইয়াবা পাচারকারী গডফাদার ও তাদের লোকজন উদ্বাস্তু রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির গুলোতে ইয়াবা পাচার ও মজুদের নিরাপদ আস্তানা বানিয়ে অবাধে ইয়াবার বড় বড় চালান দেশের সর্বত্র পাচার করছে। টেকনাফ, উখিয়া সহ বাংলাদেশের সর্বত্র কোথাও না কোথাও থেকে প্রতিদিন ইয়াবা জব্ধ হচ্ছে। তবে বরাবরই গডফাদাররা ধরা ছোঁয়ার বাহিরে থাকলেও ধরা পড়ছে বহনকারী লোকজন। গত বৃহস্পতিবার থাইল্যান্ডের দক্ষিণাঞ্চলের পুলিশ তল্লাশী চালিয়ে চারটি প্রাইভেট কার থেকে এক কোটি পিস ইয়াবা ট্যাবলেট সহ ৬ পাচারকারীকে আটক করেছে বলে থাই পুলিশের উদ্বৃতি দিয়ে এএফপি জানিয়েছে।
এ ক্ষেত্রে রোহিঙ্গারাও জড়িয়ে পড়ছে। গত মার্চ পর্যন্ত সময়ের মধ্যে শতাধিক রোহিঙ্গা ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে আটক হয়েছে। তা ছাড়াও উক্ত আশ্রয় শিবির গুলোও ইয়াবা ক্রয় বিক্রয়, সেবনের নিরাপদ এলাকায় পরিনত হওয়া এবং ইয়াবার পাশাপাশি হাতের নাগালে রোহিঙ্গা মেয়েদের সান্নিধ্য এলাকার কিশোর, যুবক, বিবাহিত কেউ এ নীল ছোঁয়া থেকে বাধ পড়েছ না বলে অভিভাবকদের অভিযোগ। রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির ভিত্তিক নিয়ন্ত্রক স্থানীয় গডফাদারদের অধিকাংশ সরকার বিরোধী বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মী। আবার কেউ কেউ স্থানীয়ভাবে জন প্রতিনিধিও। তারা ইয়াবা পাচার করেছে যেমনি নিরাপদে, আবার ওদের মাধ্যমে বিভিন্ন উগ্রপন্থি গোষ্টির গোপন অর্থায়ন, যাতায়াত সম্পর্কিত ফায়দাও লুঠছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
সম্প্রতি সরকারের বিভিন্ন সংস্থার যৌথভাবে প্রনিত তালিকার মাধ্যমে দেখা গেছে ইয়াবার নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছে ১১শ ৫১জন। তৎমধ্যে টেকনাফে ৯১২জন, কক্সবাজার সদরের ৪৩ জন, রামুতে ৩৪ জন, কুতুবদিয়ায় ৪৮, মহেশখালী ৩৩ জন, পেকুয়ায় ২২ জন এবং উখিয়ায় ৭ জনের নাম রয়েছে। এসব তালিকায় থাকাদের মধ্য থেকে ৬০জনকে গডফাদার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ইতিমধ্যে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রন অধিদপ্তর সারাদেশের ১৪১ জন মাদক সাম্রাজ্যের গডফাদারদের নাম ঠিকানা উল্লেখ করা আছে। ইয়াবা পাচারের অন্যতম মোকাম মিয়ানমার সীমান্ত সংলগ্ন উখিয়া, টেকনাফ ও নাইক্ষ্যংছড়ির শত শত আলোচিত শীর্ষ ইয়াবা পাচারকারী গডফাদারদের নাম প্রকাশিত তালিকায় নেই। প্রনীত তালিকা অনুযায়ী ঢাকা বিভাগের ২৯জন, রাজশাহী বিভাগের ২১ জন, চট্টগ্রাম বিভাগের ৯১ জনের নাম গডফাদারদের নাম রয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। চট্টগ্রাম বিভাগের মধ্যে চট্টগ্রাম শহরের ৫জন, লোহাগাড়ায় ১জন, আনোয়ারায় ৫জন, পটিয়ায় ২জন, সাতকানিয়া ১জন, চন্দনাইশ ৩জন, রাঙ্গুনিয়ায় ৫জন, মিরসরাইর ১জন, রাউজানের ৩জন, ভুজপুর ১জন, ফেনী জেলায় ৫ জনের নাম রয়েছে।
এসব তালিকা দেখে স্থানীয় সচেতন ও সুশিল মহল হতাশা ব্যক্ত করে জানান, তালিকায় স্থান পাওয়া মাদক পাচারকারীদের চেয়ে আরো কয়েকগুন বেশী ইয়াবা পাচারকারী গডফাদারের বহাল তবিয়তে প্রচুর অবৈধ সম্পদের মালিক হয়ে গেছে। তবে টেকনাফের বেশ কিছু গডফাদের নাম আসলেও অনেকে রয়ে যাচ্ছে ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। তেমনটি উখিয়ার অবস্থা আরো বেহাল। মাদক বা ইয়াবা সাম্রাজ্যে যারা ইতিমধ্যে খ্যাতি অর্জন করে রাতারাতি অগাধ কালো টাকা, একাধিক গাড়ি বাড়ী ও অন্যান্য স্থাপনা সম্পদের মালিক হয়েছে সে ধরনের শত শত গডফাদারের নাম বাদ পড়ায় সর্ব মহলে হতাশা দেখা দিয়েছে। যাদের অনেকের কয়েক বছর আগেও সংসারে কঠিন টানাটানি অবস্থা ছিল, নুন আনতে পান্তা ফুরোত, অথচ বর্তমানে তাদের অনেকে কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পদের মালিক। তাদের দাবি আরো অধিকতর কঠোর নিরপেক্ষ গোয়েন্দা নজরদারীর মাধ্যমে শত শত ইয়াবা পাচারকারী, গডফাদারদের অবৈধ ভাবে অর্জিত সম্পদ বাজেয়াপ্ত পূর্বক সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন বলে সর্বমহলের দাবি।
প্রশাসন ও আইন শৃংখলা রক্ষাকারী সংস্থা সহ উর্ধতন সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট প্রতিদিন বিভিন্ন স্থান থেকে অসহায় লোকজনের পক্ষ থেকে অহরহ অভিযোগ যাচ্ছে ইয়াবা আগ্রাসন থেকে বাঁচার আকুতি নিয়ে। অভিযোগকারীদের মধ্যে অসহায় মা বাবা, ভাই বা বোন, স্ত্রী, পাড়া প্রতিবেশী, শিক্ষক, আলেম, মুক্তিযোদ্ধা সহ বিভিন্ন শ্রেণী পেশার লোকজন। অনুসন্ধানে দেখা গেছে উখিয়া ও টেকনাফে অতীতের যে সৌহার্দপূর্ণ সামাজিকতা বা রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ছিল বর্তমানে তা চরম অবক্ষয়ের পর্যায়ে। কারন ইয়াবার কালো টাকায় কয়েক বছর পূর্বেও যে লোকজন সমাজ বা রাজনৈতিক নেতাদের সামনে কথা বলার সাহজ পেতনা, থানা বা প্রশাসনের আঙ্গিনায় যাওয়ারও সক্ষমতাও ছিল না, তারাই বর্তমানে প্রায় সর্বত্র চষে বেড়াচ্ছে। এরা সামাজিক রাজনৈতিক বিভিন্ন প্রয়োজনে দুই হাতে টাকা ঢালছে। তাই তাদের কদরও অনেক বেড়ে যাচ্ছে। তাই সমাজ ও রাজনৈতিকরা এখানে ইয়াবা পাচারকারীদের টাকার কাছে এক প্রকার জিম্মি হয়ে পড়ছে। উখিয়া সদর রাজাপালং ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর কবির চৌধুরী ও হলদিয়াপালং ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ শাহ আলম বলেন, ইয়াবা সেবনকারী ও পাচারকারী কারা সমাজে তাদের কি অবস্থান বর্তমানে হয়েছে তা সকলের জানা। এসব কুৎসিত মানুষগুলো সামাজিক ও রাজনৈতিক অবক্ষয়ের ভূমিকা রাখছে। প্রতিদিন ইয়াবা সংক্রান্ত নানা ধরনের সামাজিক, পারিবারিক কঠিন গুরুতর শালিশ বিচারের মুখমোখি হতে হচ্ছে তাদের। এগুলো থেকে সকল স্থরের মানুষ অতি জরুরী ভাবে পরিত্রাণ চায় বলে তাদের দাবি।
উখিয়া ডিগ্রী কলেজের ইতিহাস বিভাগে অধ্যাপক তৌহিদুল আলম তহিদ বলেন, সর্বস্থরের মানুষ ও সরকারের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে দেশ আজ অনেকদূর এগিয়েছে। এ অগ্রযাত্রা আরো গতিময় করার যারা সাহসি ভূমিকা রাখবে সেই যুবক ও কিশোর শ্রেনী আজ গোলাপি ইয়াবার গ্রাসে নীলচে হয়ে যাচ্ছে। একানকার সব ধরনের সরকারী প্রশাসন, আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনী, রাজনৈতিক নেতা, সামাজিক নেতৃবৃন্দের প্রায় সকলের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ মদদে ইয়াবা পাচার হয়ে আসছে। সীমান্ত এলাকায় নিয়োজিত বিজিবি, পুলিশ সহ অন্যান্য সরকারী সংস্থার লোকজন দীর্ঘদিন ধরে ঘুরেফিরে এতদাঞ্চলে চাকুরী করার সুবাধে ইয়াবা পাচারকারী গডফাদারদের সাথে তাদের সখ্যতা থেকে যাচ্ছে।
তাই জরুরী ভিত্তিতে সব কিছুর আমুল পরিবর্তন করে মাঠ পর্যায়ে নতুন ভাবে ঢেলে সাজিয়ে চোখ বন্ধ করে সাড়াশি অভিযান চালিয়ে কঠোর ভাবে দমন করা না হলে আগামী প্রজন্ম একটি অসুস্থ ও পঙ্গুত্ব নিয়ে দেশের জন্য বোঝা হবে জানিয়ে তিনি বলেন, আগামী নির্বাচনের পূর্বে মাদক ইয়াবা নির্মূলে কঠোরতা গ্রহণ না করলে প্রয়োজনে ফিলিফিনের মত অভিযান না চালালে গণ অসন্তোষ ক্রমে বৃদ্ধি পাবেই। মুক্তিযোদ্ধা দুদু মিয়া বলেন, যে জাতি ৯মাস রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম করে স্বাধীনতা অর্জন করেছে এবং স্বাধীনতার সুফল যখন মানুষের ঘরে ঘরে পৌছে পাওয়ার সময় হয়েছে সে সময় এসে পরাজিত শক্তিগুলো ষড়যন্ত্র মূলক ভাবে বাংলাদেশের অর্জন নসাৎ করার জন্য সস্তায় ইয়াবার বিস্তার ঘটাচ্ছে। সুতারাং জাতি গুটি কয়েক মাদক বা ইয়াবা পাচারকারী গডফাদারদের হাতে জিম্মি হয়ে থাকতে পারে না। তাই সরকারকে যে কোন মূল্যে রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও আগামী প্রজন্মের স্বার্থে ইয়াবা সহ সব ধরনের মাদক পাচার, বিস্তার কঠোর ভাবে দমন করতে হবে। নচেৎ সরকারের প্রতি মানুষের অসন্তোষ বাড়বে বৈ কমবে না বলে তিনি জানান।

Top