অতিথি কলাম : আইসিসিতে মিয়ানমার জেনারেলদের বিচার : নিরাপত্তা পরিষদের সিদ্ধান্ত

1-5.jpg

 ॥ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট ॥

সম্প্রতি নেদারল্যান্ডসের হেগে অবস্থিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) প্রাক্-বিচারিক শুনানীতে তিন সদস্যের আদালত বাংলাদেশের কাছে তথ্য সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আদালত আগামী ১১ জুনের মধ্যে প্রকাশ্যে বা গোপনে এ বিষয়ে পর্যবেক্ষণ দিতে বাংলাদেশকে অনুরোধ জানিয়েছেন। রোহিঙ্গাদের জোরপূর্বক তাদের আদি নিবাস রাখাইন থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে তদন্তের জন্য আইসিসির চীফ প্রসিকিউটার বা প্রধান কৌশলী ফাতাও বিনসুদা ৯ এপ্রিল আদালতে আবেদন জানান। তার এই আবেদনের এক মাসের মাথায় প্রাক্-বিচারিক শুনানীতে বাংলাদেশের কাছ থেকে মতামত নেওয়ার সিদ্ধান্ত হল। আইসিসির ওয়েবসাইট থেকে জানা গেছে, প্রাক্-বিচারিক শুনানীতে আদালত বলেছেন, মিয়ানমার থেকে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেওয়ার যে অভিযোগ রয়েছে তাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাংলাদেশ। তাই কৌশলীর অনুরোধের বিষয়ে বাংলাদেশের যথাযথ কর্তৃপক্ষের পর্যবেক্ষণ চাওয়াটা যথার্থ হবে। কৌশলীর অনুরোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে আদালতের জন্য ওই পর্যবেক্ষণ সহায়ক হবে। উল্লেখিত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কাছে তিনটি বিষয়ে প্রকাশ্যে বা গোপনে লিখিত পর্যবেক্ষণ চেয়েছেন আইসিসি। রোহিঙ্গাদের উপস্থিতির ফলে বাংলাদেশে কি অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে, রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দেওয়ার বিষয়ে আদালতের কাজ করার সুযোগ আছে কিনা এবং কৌশলীর অনুরোধের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নিতে বাংলাদেশ প্রাক্-বিচারিক শুনানীতে আদালতকে কোনভাবে সহায়তা করতে পারে কিনা,তা নিয়ে মতামত চাওয়া হয়েছে। ফাতাও রুয়ান্ডা গণহত্যা সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের আইনজীবী ছিলেন। পরে তিনি রোম ষ্ট্যাটিউটের মাধ্যমে গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত বা আইসিসির প্রসিকিউটার বা বাদী পক্ষের মামলা পরিচালনাকারী দলের সদস্য হন। ২০১২ সালে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের প্রধান প্রসিকিউটার পদে নিযুক্ত হন। আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ পদে তার মতো একজন কালো আফ্রিকান মুসলিম নারী নিয়োগ পাওয়া একটি বিরল ঘটনা। তিনি অল্প সময়ের মধ্যেই তার সাহসী ও নিরপেক্ষ কাজের জন্য বিশ্বব্যাপী ব্যাপক আলোচিত হয়ে ওঠেন। তিনি আইসিসির চীফ প্রসিকিউটার হিসেবে ইরাকে ব্রিটেনের এবং আফগানিস্তানে আমেরিকার সেনারা এবং সিআইএ যুদ্ধাপরাধ করেছে কিনা,তা তদন্তের প্রশ্ন তুলেন। আল হাসান আবদুল আজিজ নামে মালির একজন ইসলামী জঙ্গীর বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে শতাধিক নারীকে বাধ্যতামূলক যৌনকর্মে বাধ্য করার অপরাধে অভিযুক্ত করেন। ফিলিপাইনের একনায়ক দুতার্তের বিরুদ্ধে মাদক ব্যবসা দমনের নামে গণহত্যার অভিযোগ তদন্তের প্রার্থমিক পদক্ষেপ গ্রহন করলে তাকে ফিলিপাইনে প্রবেশ করামাত্র গ্রেপ্তার করার হবে বলে দুতার্তের ঘোষণা তাকে আরো বিশ্বব্যাপী আলোচিত করে। ইদানিং তিনি মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে সংঘটিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ তদন্তের লক্ষ্যে আইসিসিতে দরখাস্ত করায় বাংলাদেশেও তাকে নিয়ে আলোচনা হচ্ছে।
বাংলাদেশ রোম চুক্তিতে স্বাক্ষরকারী দেশ হলেও পঞ্চাশ বছরের অধিক কাল ধরে সামরিক বাহিনীর লাগাতার শাসনাধীনে থাকা মিয়ানমার এটিতে স্বাক্ষর করেনি। আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী আন্তর্জাতিক চুক্তির পক্ষ না হলে কোন দেশের জন্য চুক্তির বিধান কার্যকরী হবে না। মিয়ানমার রাষ্ট্রীয়ভাবে রোহিঙ্গা মুসলিম জনগোষ্ঠীকে রাখাইন রাজ্য থেকে বিতাড়িত করার লক্ষ্যে সুপরিকল্পিত গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ করলে ১১ লক্ষাধিক রোহিঙ্গা প্রাণ বাচাঁনোর জন্য বাংলাদেশে অনুপ্রবেশ করে আশ্রয় নিলে বাংলাদেশ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। বাংলাদেশের হাজার হাজার একর ভুমি এখন মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের দখলে চলে গেছে। মিয়ানমারের গণহত্যার প্রত্যক্ষ কুফল ভোগ করতে হচ্ছে বাংলাদেশের জনগণকে,বাংলাদেশকে। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের মারাত্মক ভুক্তভোগী রাষ্ট্র। বাংলাদেশ রোম চুক্তির পক্ষরাষ্ট্র বিধায় আইসিসি মিয়নমারের জঘন্য গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে ব্যাপারে তদন্ত ও বিচার করতে এখতিয়ার রাখেন। আইসিসির চাহিতমতে অবিলম্বে পর্যবেক্ষণ পাঠানো বাংলাদেশের নৈতিক ও আইনী দায়িত্ব এবং কর্তব্য।
মিয়ানমারে রাখাইন রাজ্যে সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগী সশস্ত্র উগ্রবৌদ্ধ রাজাকারদের দ্বারা নিরস্ত্র অসহায় রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর সংঘটিত গণহত্যা,গণধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের সকল ভুক্তভোগী ভিকটিম, প্রতক্ষ্যদর্শী সাক্ষী,সাক্ষ্যপ্রমাণ ও আলামত বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহনকারী রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে বিদ্যমান আছে। রাখাইন রাজ্যে শুধু রোহিঙ্গাদের বসতবাড়ী ও গ্রামগুলোর ধ্বংসস্তুপের আলামতই দেখা যাবে। তাই প্রত্যক্ষভাবে সাক্ষ্যপ্রমাণ গ্রহন করার জন্য আইসিসির প্রধান প্রসিকিউটার ফাতাও বিনসুদাকে বাংলাদেশ সফরের অনুরোধ জানানো হবে, আমজনতা তা প্রত্যাশা করে।
উল্লেখ প্রয়োজন যে গত মাসের শেষে ও এ মাসের শুরুতে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদের একটি প্রতিনিধিদল বাংলাদেশে রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরগুলো নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে ও মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্য পরিদর্শন করে রোহিঙ্গা নিপীড়নের আন্তর্জাতিক তদন্তের বিষয়টি অতি গুরত্বের সাথে বলেছে।
গত ১০ মে রয়টার্স এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মিয়ানমারকে জবাবদিহিতার মধ্যে আনার ব্যাপারে শুরুতে চীন বিরোধিতা করেছে। শেষ পর্যন্ত মিয়ানমারকে জবাবদিহির আওতায় আনার বিষয়ে যুক্তরাজ্যের খসড়া বিবৃতির প্রশ্নে ১৫ সদস্যের নিরাপত্তা পরিষদ সর্বসম্মত হয়েছে। রোহিঙ্গাদের ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর অভিযানের পর নিরাপত্তা পরিষদের প্রতিনিধিরা গত সপ্তাহে প্রথমবারের মতো সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখতে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সফর করেন। ওই সফরের পর রোহিঙ্গা নারীদের ওপর যৌন নিপীড়ন,শিশুদের বিরুদ্ধে সহিংসতাসহ রোহিঙ্গা মুসলমানদের ওপর নৃশংসতার জন্য অভিযুক্তদের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে এবং অবিলম্বে রাখাইন রাজ্যে অবারিত চলাচল নিশ্চিত করতে মিয়ানমারের কাছে নিরাপত্তা পরিষদ এক বিবৃতিতে অনুরোধ জানিয়েছে।
আমরা কক্সবাজাবাসী তথা বাংলাদেশে মানুষ সরে জমিনে রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করে,নির্যাতিত রোহিঙ্গাদের সাথে কথা বলে,মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের গ্রাম ও বাড়ীঘরের ধ্বংসস্তুপ দেখে মিয়ানমারকে অনুরোধ করে প্রদত্ত সর্বসম্মত বিবৃতির জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সদস্যদের আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। আমরা আরো প্রত্যাশা করি চীন ও রাশিয়া জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে মিয়ানমারের বিরুদ্ধে কার্যকরী পদক্ষেপ গ্রহনের বিরুদ্ধে ’ভেটো’ ক্ষমতা অপপ্রয়োগ করা থেকে বিরত থাকবে। জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক শান্তিরক্ষী বাহিনীর তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গারা অতি দ্রুত তাদের জন্মভুমি রাখাইনে তথা আরাকানে নিজস্ব বাড়ীভিটিতে ফিরে যাওয়ার জন্য আনান কমিশনের সুপারিশগুলো অনতি বিলম্বে বাস্তবায়ন, কার্যকরী করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদের সর্বসম্মত সিদ্ধান্তক্রমে মিয়ানমারকে বাধ্য করা হবে। সাত জন সেনা সদস্যকে দশ বছর করে শাস্তি দিয়ে মিয়ানমার সেনাবাহিনী স্বীকার করেছে রাখাইনে রোহিঙ্গাদের দেশত্যাগে বাধ্য করার জন্য গণহত্যা চালানো হয়েছে। মিয়ানমারের সকল দায়ী জেনারেলদের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক ফৌজদারী আদালতে বিচারের ব্যবস্থা করার জন্য নিরাপত্তা পরিষদে সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত গ্রহন করে আইসিসিকে অনুরোধ করা হবে।

লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Top