আশ্রয় শিবিরে প্রতি মাসে যোগ হচ্ছে ১৮শ’ নবজাতক রোহিঙ্গা

download-2-7.jpg

রফিকুল ইসলাম :
বাংলাদেশে মিয়ানমারের রাখাইন থেকে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়া আশ্রয় শিবির গুলোতে প্রতিদিনি গড়ে ৬০টি রোহিঙ্গা নবজাতক শিশু জন্ম হচ্ছে। আর এতে প্রতি মাসে নতুন জন্ম নেয়া রোহিঙ্গা শিশুর সংখ্যা ১৮শ এর মত। জাতিসংঘের শিশু বিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ এর বুধবার প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ হয়েছে। গত বছর আগষ্টে মিয়ানমারে মুসলিম রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে সেনা ও জাতিগত সহিংসতা, নির্যাতনের মুখে পালিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গাদের মধ্যে কমপক্ষে গত ৯ মাসে ১৬ হাজার নবজাতক রোহিঙ্গা শিশু জন্ম নিয়েছে বলে জানা গেছে।
ইউনিসেফের বাংলাদেশে নিযুক্ত প্রতিনিধি অ্যাডুয়ার্ড বেইগবেদারে উদ্বৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নিজ, ঘরবাড়ি থাকা সত্বে অনেক দূরে পরদেশে ভয়াবহ ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থার মধ্যে প্রতিদিন জীবনের প্রথম নিঃশ্বাস নিতে হচ্ছে আশ্রয় শিবির গুলোতে ৬০টি শিশুকে। তারা জন্ম নিচ্ছে সে সব মায়ের গর্ভে যারা বলপূর্বক বাস্তুচ্যুত, সহিংসতায় আতংকগ্রস্থ ও ধর্ষনের মত কঠিন পরিস্থিতির শিকার, সুস্থ ও সুষ্টুভাবে জীবনের সূত্রপাত ঘটার যে পরিবেশ দরকার আশ্রয় শিবির গুলোতে সে পরিবেশ পরাহত। টাইম ম্যাগাজিনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে নিরাপত্তা রক্ষীদের উপর গত বছরের আগষ্টের শেষের দিকে মিয়ানমারে রাখাইনের রোহিঙ্গা উগ্রপন্থি আরসার হামলার প্রতি উত্তরে সে দেশের সেনাবাহিনী কঠোর প্রতিশোধ পরায়ন হয়ে নিরহ রোহিঙ্গাদের উপর হামলে পড়ে। তাদের সাথে যোগ হয় সাম্প্রদায়িক সংখ্যালঘু বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী কিছু উগ্র সন্ত্রাসী।
এ সময় ধর্ষন, অগ্নি সংযোগ, গুলি করে বা কুপিয়ে হত্যা সহ চরম নৃশংসতার ঘটনা ঘটিয়েছে তারা। এ সময় ঘটনার শিকার হয়ে অন্তত ৬লাখ ৯৩ হাজার রোহিঙ্গা বাধ্য হয়ে সীমান্ত পেরিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়। বাংলাদেশ সরকারের শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার কার্যালয় মতে এপ্রিল পর্যন্ত মোট বায়োমেট্রিক রোহিঙ্গা নিবন্ধিত সংখ্যা ১১লক্ষ ৮ হাজারের মত। এসব রোহিঙ্গারা ২০১৬ সাল সহ ইতিপূর্বে বিভিন্ন সময়ে রাখাইনের সেনা ও সাম্প্রদায়িক ধর্মীয় নির্যাতনের শিকার হয়ে বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়। জাতিসংঘের এ সংস্থার মতে পৃথিবীর সব চেয়ে বিপন্ন জনগোষ্টির মধ্যে রোহিঙ্গারা উল্লেখ যোগ্য। জন সহিংসতার শিকার যে সব নারী ও বালিকা প্রাণে বেঁচে আছেন তারা সব চেয়ে বেশী বিপন্ন ও ঝুঁকিতে রয়েছে। তারা বিভিন্ন সামাজিক ও পরিবেশ গত নানা প্রতিকুলতার মাঝে প্রায় এক ঘরে অবস্থায় রয়েছে বাংলাদেশের কক্সবাজারের আশ্রয় শিবির গুলোতে। তাদের মাঝে রয়েছে ব্যাপক মানষিক ক্ষত।
নির্যাতিত এসব নারী ও বালিকার অনেকেই প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সহায়তাও পাচ্ছে না। গত বছরের সেপ্টেম্বর থেকে আশ্রয় শিবির গুলোতে জন্ম নেয়া প্রতি ৫জন শিশুর মধ্যে মাত্র একজন শিশু জন্ম হয়েছে স্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্রে। গত ৯ মাসে জন্ম নেয়া ১৬ হাজার শিশুর মধ্যে মাত্র ৩ হাজার শিশুর জন্ম হয়েছে এধরনের স্থানে। যেসব নারীর চিকিৎসা সেবা প্রয়োজন তাদের চিকিৎসা নিশ্চিত করতে প্রায় ২৫০ জন স্বেচ্ছাসেবী নিয়োগ করেছে ইউনিসেফ। অ্যাডুয়ার্ড বেইগবেদার বলেন, নতুন জন্ম নেয়া রোহিঙ্গা শিশু যারা ধর্ষনের কারনে জন্ম নিচ্ছে তাদের প্রকৃত সংখ্যা জানা অসম্ভব। তবে এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, যেসব মা সন্তান জন্ম দিতে যাচ্ছেন এবং প্রতিটি শিশু জন্ম নেওয়ার পর যেন সহায়তা ও সেবা পায় সে দিকে নজর রাখা প্রয়োজন। মিয়ানমারে রাখাইনে সেনা ও উগ্রপন্থি বৌদ্ধের দ্বারা ধর্ষন ও যৌন সহিংসতার শিকার হওয়া হাজারও রোহিঙ্গা নারী ও বালিকা জন্ম দিতে শুরু করেছে অপ্রত্যাশিত শিশু। এধরনের সন্তান সম্ভাবা ও প্রসব করা রোহিঙ্গাদের অধিকাংশের বয়স ১৮ বছরের নিচে।
আশ্রয় শিবির গুলোর নেতা ও স্বাস্থ্য কর্মীদের মতে চলতি মাস থেকে আগামী কয়েক মাসে এ ধরনের ধর্ষনের শিকার নারীদের বিশেষ করে স্বামী পরিত্যাক্ত, অল্প বয়সে বিধবা বা স্বামী প্রবাসী ও বিবাহীত শিশু, বালিকা ও তরুণী রাখাইনে ধর্ষনের শিকার হয়ে গর্ভধারন ও সন্তান প্রসবের ফলে সামাজিক ও পরিপাশ্বিক ব্যাপক মানসিক পীড়ন অবর্ণনীয়ভাবে বাড়িয়ে তুলছে। স্বাস্থ্য কর্মী ও সচেতন লোকজনের আশংকা ধর্ষনের ফলাফল হিসেবে জন্ম নেয়া এসব শিশুর ভবিষ্যৎ নিয়ে যথেষ্ট ঝুঁকি রয়েছে। এসব শিশুরা রোহিঙ্গা নারীদের লোমহর্ষক নির্যাতনের দিন গুলো মনে করিয়ে দিবে। পাশাপাশি এসব শিশুরা পরিচয় সংকটের কারনে বেড়ে উঠার ঝুঁকিতে পড়বে।
এরই মধ্যে অনেক ধর্ষনের শিকার রোহিঙ্গা নারী ও বালিকা অনিচ্ছাকৃত ভাবে গর্ভপাত ঘটিয়ে সন্তান নষ্ট করেছে। এ ধরনের একটি সাক্ষাৎকার ভিত্তিক প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে বৃটিশ গণমাধ্যম দ্যা গার্ডিয়ান। উক্ত প্রতিবেদনে একজন বিধবা মহিলা তার বর্ণনায় বলেছে সমাজের কাছে গর্ভপাতের জন্য কারো সাহায্য চাওয়া অনেক কঠিন। এক পর্যায়ে এ যন্ত্রণা থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য উপায় খোঁজাও বন্ধ করে দিই। এখন আমি সব কিছু আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছি। উক্ত মহিলার মত এমন আরো অনেক কত নারী ও বালিকা কক্সবাজারের আশ্রয় শিবির গুলোতে রয়েছে তার সঠিক পরিসংখ্যান কারও জানা নেই। দাতব্য প্রতিষ্ঠান এমএসএফের মতে ২৫ ফেব্রুয়ারী পর্যন্ত ২২৪জন রোহিঙ্গা নারীকে তারা চিকিৎসা দিয়েছে। যারা রাখাইনে যৌন সহিংসতার শিকার হয়েছে। তবে এমন হাজারও নারী হয়েছে যারা যৌন সহিংসতার শিকার হয়েও সামাজিক কলংকের ভয়ে সাহায্য নিতে আসছে না।

Top