অতিথি কলাম : প্রত্যাবাসনে পরিকল্পিত দীর্ঘসুত্রিতায় কক্সবাজারবাসী হতাশ ও অতংকিত

1.jpg

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট :
মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত হয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের ফেরত নেওয়ার বিষয়ে গঠন করা বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের আলোচনাতে কখন প্রত্যাবাসন শুরু হবে সে সম্পর্কে কোন সিদ্ধান্ত হয় নাই। প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া নিয়ে মিয়ানমারের পক্ষ থেকে তৈরী করা জটিলতাও কাটেনি এ বৈঠকে। প্রত্যাবাসন শুরুর আগে প্রক্রিয়া ঠিক করতে আরও আলোচনা করার কথা জানিয়েছেন মিয়ানমারের কর্মকর্তারা। যদিও বাংলাদেশের কর্মকর্তাদের সাথে আলোচনায় মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের দ্রুত প্রত্যাবাসনের প্রয়োজনীয়তার ব্যাপারে একমত পোষন করেছে। মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নেতা দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব মিন্ট থু বলেন, বৈঠক ফলপ্রসু হয়েছে। তিনি এক প্রশ্নের উত্তরে বলেন প্রত্যাবাসনের জন্য সংশ্লিষ্টদের (রোহিঙ্গাদের) মধ্যে আরও সচেতনতা বাড়াতে হবে। তবে কবে নাগাদ প্রত্যাবাসন শুরু হবে সে বিষয়ে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে তিনি কোন উত্তর দেননি। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব শহীদুল হক সাংবাদিকদের বলেন, ’আপনারা জানেন এ ধরনের প্রত্যাবাসন সব সময় অত্যন্ত জটিল ও কঠিন বিষয়। তবে আমরা মনে করছি এই প্রত্যাবাসন যত দ্রুত শুরু সম্ভক্ষ ্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র্র হবে। এ বিষয়ে আমাদের বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের কোন মতপার্থক্য নেই।’ তিনি আরো বলেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সম্পর্কিত সব বিষয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার প্রতিনিধি দল আলোচনা করেছে। আমাদের আলোচনায় অগ্রগতি আছে’। বাংলাদেশ মিয়ানমারের ওয়ার্কিং গ্রুপের বৈঠকের হতাশাব্যঞ্জক ফলাফল নিয়ে পত্রিকায় বিস্তারিত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে। একই দিনের পত্রিকায় আরো প্রকাশিত হয়েছে যে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে মিয়ানমার সেনাবাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে সীমান্ত পেরিয়ে কক্সবাজারের বিভিন্ন ক্যাম্পে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গারা প্রতিদিন প্রায় ৬০টি শিশুর জন্ম দিচ্ছে। রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে আশ্রয় নেওয়ার পর এ পর্যন্ত ১৬ হাজার শিশুর জন্ম দিয়েছে।
বিগত ২৩ নভেম্বর বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে স্বাক্ষরিত চুক্তিতে উল্লেখ ছিল চুক্তি স্বাক্ষরের দুই মাসের মধ্যে প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু করা হবে। প্রায় ছয় মাস পার হয়ে গেলেও এখনও যৌথ ওয়ার্কিং গ্রুপের কোন পক্ষই বলতে পারছে না কখন থেকে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন শুরু হবে। পঞ্চাশ বছর ধরে পরিকল্পনা করে আগে দুইবার ১৯৭৮ সালে ও ১৯৯২ সালে তাড়িয়ে দেওয়া ও ফেরত নেওয়ার অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে এই বার যাদের গণহত্যা,গণধর্ষণ,বাড়ীঘর,গ্রাম জ্বালিয়ে দিয়ে তাড়িয়ে দিয়েছে তারা যাতে বাড়ীঘরে ফিরে যেতে না পারে সেনাবাহিনী সে ব্যবস্থাই করেছে। রোহিঙ্গারা ফিরে গিয়ে কোথায় থাকবে এ অনিশ্চয়তার কারণে রোহিঙ্গারা যাতে ফিরতে আগ্রহী না হয় সে জন্য বাড়ীঘর,গ্রাম পর্যন্ত জ্বালিয়ে দেওয়া হয়েছে। চীনের সহায়তায় আধুনিক বোলড্রোজার দিয়ে বাড়ীঘর গ্রাম নিচিহৃ করে উন্নয়নমূলক কাজ চালানোর জন্য রোহিঙ্গাদের ফেলে আসা বাড়ীঘর, জমি চীনকে দেওয়া হয়েছে। আরও কিছু দিন দেরী হলে রোহিঙ্গারা ফিরে গিয়ে যাতে নিজের বাড়ীঘরের স্থান সনাক্ত করতে না পারে। জাতিসংঘের প্রতিনিধি দলকে ঘটনাস্থল রাখাইনে নিয়ে গেলে তারাও যাতে রোহিঙ্গাদের বাড়ীঘরের,গ্রামের কোন চিহৃ খোঁজে না পান। চীন রাশিরা বাদ দিয়ে বিশ্ববাসী তথা বিশ্ববিবেকের সাথে প্রতারণা করার উদ্দেশ্যে দ্বিপাক্ষিক প্রত্যাবাসন চুক্তি করা হয়েছে এবং রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে না নেওয়ার দীর্ঘদিনের সেনাশাসকদের পরিকল্পনা অনুযায়ীই প্রত্যাবাসন বিলম্বিত করা হচ্ছে।
বাংলাদেশের দেওয়া প্রত্যাবাসনে ইচ্ছুক রোহিঙ্গাদের ৮০৩২ জনের তালিকা থেকে দীর্ঘ দিন সময় নিয়ে বাচাই করে মাত্র ১১০১ জনকে প্রত্যাবাসনের জন্য মিয়ানমার ছাড়পত্র দিয়েছে। তালিকায় থাকা বাকী ৬৯৩১ জন রোহিঙ্গা কোথায় যাবে? তাদের কি স্থায়ীভাবে বাংলাদেশে রাখতে হবে? চীনের ইন্ধনে মিয়ানমারের পাতা ফাঁদে পা দিয়ে যাচাই বাচাই করার ক্ষমতা মিয়ানমারের হাতে দিয়ে এখন দেখা যাচ্ছে মিয়ানমার এ আনুপাতিক হারে ফেরত নিলে ৯ লাখের অধিক রোহিঙ্গাকে ফেরত যাওয়ার ছাড়পত্র দেবে না। তাদের কি হবে, তাদের কি বাংলাদেশে রাখতে হবে? মিয়ানমারের নির্যাতনের মুখে তাড়িয়ে দেওয়া ১১ লাখের অধিক রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে যথাযথভাবে আধুনিক পদ্ধতি অনুসরণ করে তালিকাভুক্ত করে বাংলাদেশী জনগণের থেকে আলাদা করে অস্থায়ী শিবির নির্মাণ করে রাখা হয়েছে। জাতিসংঘ,আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো,দেশীবিদেশী এনজিও এবং বিশ্ববাসী তার সাক্ষী। মিয়ানমারের হাজার বছরের বসবাসকারী নাগরিক যাদের মধ্যে অনেকে একাধিকবার সংসদ সদস্য ও স্থানীয় পরিষদেও নির্বাচিত হয়েছেন সেই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমার ফিরিয়ে নেবে। এতে যাচাই বাচাই এর নামে বিলম্ব কেন? বাংলাদেশের একজন সর্বহারা ভিখারীও মগের মুল্লুক মিয়ানমারে গিয়ে বসবাস করতে আগ্রহী হবে না। বাংলাদেশের পার্বত্য অঞ্চলের গভীর জংগলে বসবাসকারী অনগ্রসর বৌদ্ধধর্মাবলম্বী অতিদরিদ্র উপজাতীয় সরল মানুষগুলোকে তৈরী বাড়ী,চাষের জমি,খাদ্য,নগদ টাকা দেওয়ার প্রলোভন দিয়েও গোপনে রাখাইন রাজ্যে নিয়ে যেতে সফল হয়নি মিয়ানমার।
প্রকৃত সত্য হল, মিয়ানমারের প্রতিনিধি দলের নিজস্ব কোন কথা নেই। বার্মার প্রকৃত শাসক সেনাবাহিনীর কথা অনুযায়ীই তারা কথা বলছে। কিন্ত আমাদের প্রতিনিধি দলের কার্যকলাপ,কথা শুনলে,পত্রিকায় পড়লে মনে হয় তারাও মিয়ানমার সেনাবাহিনীর দীর্ঘ দিনের পরিকল্পনা ছলে বলে কৌশলে রোহিঙ্গাদের তাড়িয়ে দিয়ে ’বাংগালী’ আখ্যা দিয়ে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়ে এ দেশে রেখে দেওয়াকে সহযোগিতা করা হচ্ছে বলে স্থানীয় কক্সবাজারবাসী মনে করছে। চুক্তি স্বাক্ষরের ৬মাসে একজন রোহিঙ্গাও ফেরত গেল না, আমাদের প্রতিনিধি দলের নেতারা কিসের অগ্রগতি দেখছেন? আমরা কক্সবাজারবাসী খুবই উদ্বিগ্ন ও হতাশ।
ইতিমধ্যেই আশ্রিত রোহিঙ্গারা স্থানীয় অধিবাসীর চেয়ে সংখ্যায় অধিক হয়ে যাওয়ায় স্থানীয় বাংলাদেশীরাই নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। কার্যক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে রোহিঙ্গারা এ দেশে অনেকগুলো প্রচলিত আইনের উর্ধ্বে। বাংলাদেশের কোন নাগরিক বনবিভাগের গাছ কাটলে বন আইনে মামলা হয়, পাহাড় কেটে বাড়ী করলে বন আইনে,পরিবেশ আইনে মামলা হয়। কিন্ত রোহিঙ্গাদের বিরুদ্ধে বনের গাছ কাটলে,পাহাড় কাটলে মামলা হয় না। তবে ইয়াবা পাচারের অভিযোগে,অবৈধভাবে অস্ত্র রাখার অভিযোগে হাতেনাতে ধৃত অনেক রোহিঙ্গার বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে,তারা হাজতে আছে।
কয়েক দিন আগে উখিয়ার থাইংখালী তাজমিয়ার খোলা রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরের কতিপয় মাদকাসক্ত ও ইয়াবা ব্যবসায়ী যুবক পাশের গ্রামের ধান ক্ষেতে ইয়াবা সেবন করলে গ্রামবাসী প্রতিবাদ করে। এতে গ্রামবাসী,রোহিঙ্গা ও পুলিশের ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। মামলা হয়েছে। ঐ মামলায় স্থানীয় পালংখালী ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রিয় চেয়ারম্যান ও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংগ্রাম কমিটির সাধারণ সম্পাদক এম গফুর উদ্দিন চৌধুরীই বেশ কিছু দিন কারাভোগ করে দায়রা জজ আদালত থেকে জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এ ঘটনার পর রোহিঙ্গারা গ্রামবাসীদের আক্রমণ করতে বেপরোয়া হয়ে যাবেন বলে স্থানীয়রা আশংকা প্রকাশ করছেন। ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরীর জামিনের দরখাস্ত শুনানীর সময় কক্সবাজার দায়রা জজ আদালত প্রাঙ্গনে উপস্থিত হওয়া উখিয়ার স্থানীয় লোকদের প্রশ্ন ছিল মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নির্মম নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য রোহিঙ্গারা বাংলাদেশের কক্সবাজার জেলায় আশ্রয় নিয়েছে। তারা দেশীবিদেশী এনজিওদের সহায়তার ’জামাইআদরে’ আছে যা মিয়ানমারে তারা কোন দিন পায়নি। বেশীর ভাগ রোহিঙ্গা নিজেদের মাতৃভুমি আরাকান তথা রাখাইনের বসতভিটিতে ফেরত যেতে ইচ্ছুক। কিন্তু দেশীবিদেশী এনজিও কর্মকর্তাদের কুপরামর্শে এখানে বাংলাদেশে থেকে যেতে উৎসাহী বেপরোয়া রোহিঙ্গাদের উপদ্রব,নির্যাতন থেকে ইজ্জত নিয়ে বাঁচার জন্য আমরা উখিয়াবাসী কোথায় আশ্রয় নেব? আমাদের দেশের প্রশাসনের কর্মকর্তারা আমাদের অবহেলা করার, আমাদের সাথে বিমাতাসূলভ আচরণ করার রহস্য কি?
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Top