দুই মাসের মধ্যে ১ লাখ রোহিঙ্গার ঠাঁই হবে ভাসানচরে

W-01-1-e1526766595574.jpg

মনতোষ বেদজ্ঞ :
শনিবার সকাল সাড়ে ১০ টা। পাহাড় কেটে গড়ে তোলা উখিয়ায় বালুখালী-১১ রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে হঠাৎ দমকা হাওয়ার সাথে শুরু হয় অতিবৃষ্টি। বৃষ্টির তোড়ে নরম হয়ে আসে পাহাড়ের মাটি। শুরু হয় ভূমিধস। ঘরগুলো ভেঙে পাহাড়ের চূড়া ও ঢাল থেকে নিচের দিকে গড়িয়ে পড়ে। চালা উড়ে যায়। মাটির নিচে চাপা পড়ে ঘরের ভেতরে থাকা লোকজন। খবর পেয়ে মুহুর্তের মধ্যে ঘটনাস্থলে ছুটে যায় সেনাবাহিনীর সদস্যরা। তারা দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা শুরু করে। অল্প সময়ের ব্যবধানে উদ্ধার তৎপরতায় যোগ দেয় দমকল বাহিনী, বিজিবি’র ডগ স্কোয়াড, পুলিশ, র‌্যাব, আনসার, ফায়ার সার্ভিস, বিএনসিসিসহ স্থানীয় প্রশাসন, বেরসকারি সংস্থা, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা এবং শিবিরে বসবাসরত মিয়ানমারের নাগরিক (স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে)। তারা দ্রুত লোকজনকে উদ্ধার করে নিকবর্তী স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রগুলোতে নিয়ে যায়। চোখের নিমিষে ঘটে যাওয়া এ দৃশ্য সত্যিকার কোন প্রাকৃতিক দুর্যোগের নয়। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে রোহিঙ্গা শিবির এলাকায় দুর্যোগ বিষয়ক মহড়ার অংশ ছিল এটি। সম্ভাব্য প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলার পাহাড়ি এলাকায় অবস্থানরত জোরপূর্বক বাস্তচ্যুত মায়ানমার নাগরিকদের সুরক্ষায় দ্রুততার সাথে উদ্ধার অভিযান পরিচালনা, ক্ষয়ক্ষতির পরিমান কমানো এবং উদ্ধার কার্যক্রমের দেশী, বিদেশী সকল সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিতকরণের লক্ষ্যে এ মহড়া অনুষ্ঠিত হয় ।
বিগত ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট হতে এ পর্যন্ত জেলার উখিয়া ও টেকনাফ উপজেলায় এগার লক্ষাধিক বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মায়ানমার নাগরিক পাহাড়ের উপরে/ঢালে ও সমতলে অস্থায়ীভাবে তৈরি ক্যাম্পসমূহে বসবাস করছে। এসব এলাকায় আসন্ন বর্ষা মৌসুমে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, ভূমিধস অথবা পাহাড় ধসের মত প্রাকৃতিক দুর্যোগ হওয়ার আশংকা রয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবক হিসেবে দুর্যোগ মোকাবেলার প্রশিক্ষন পেয়ে মহড়ায় অংশ নেওয়া ‘বলপ্রয়োগে বাস্তুচ্যুত মিয়ানমারের নাগরিক’ নুর হোসেন জানান, দুর্যোগময় পরিস্থিতিতে লোকজনকে কিভাবে উদ্ধার করতে হয়, কিভাবে ক্ষয়ক্ষতি কমানো যায়Ñওইসব বিষয়ে তারা প্রশিক্ষন পেয়েছেন। ভবিষ্যতে এ প্রশিক্ষণ থেকে পাওয়া জ্ঞান তারা কাজে লাগাতে পারবেন। হঠাৎ দুর্যোগ হলে তারা মাঠে নামতে প্রস্তুত রয়েছেন।
মহাড়া অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সচিব শাহ কামাল। এসময় তিনি বলেছেন, ‘যেকোন ধরনের প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোবাবেলায় আমরা প্রস্তুত রয়েছি। কক্সবাজার অতি দুর্যোগপূর্ণ এলাকা। এ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাটাতে অবস্থানকারী রোহিঙ্গারা যাতে তাদের মনোবল ফিরে পায় তার জন্যই এ মহড়ার আয়োজন। তারা যেন বুঝতে পারে সরকার তাদের পাশে আছে। সরকার তাদের করার জন্য একটি মহড়া দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘আমরা একটি সার্ভে করেছি। সার্ভেটি করেছে এডিপিসি এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। তারা আমাদের রিপোর্ট দিয়েছে, এক লাখ ৩৩ হাজার রোহিঙ্গা ভূমি ধসের ঝুঁকিতে আছে। এর মধ্যে ৩৫ হাজার পরিবার আছে অতিবৃষ্টির কারণে বন্যার ঝুঁকিতে। ৩২ হাজার পরিবার আছে ভূমি ধসের ঝুঁকিতে। কিছু পরিবার উভয় ঝুঁকির মধেই রয়েছে। এ পরিবারগুলোকে আমরা স্থানান্তর করছি। ইতোমধ্যে আমরা ৫ হাজার পরিবারকে নতুন ১৪৩ একর জায়গায় স্থানান্তর করেছি। সর্বশেষ শুক্রবারও আমরা বিষয়টি নিয়ে এখানে সভা করেছি। ৩১ মে এর মধ্যে ঝুঁকিতে থাকা সকল রোহিঙ্গাকে স্থানান্তরের কাজটি আমরা সম্পন্ন করতে চেষ্টা করবো। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, জুনের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে এ পরিবারগুলোকে স্থানান্তর করা সম্ভব হবে। তবে আমাদের অনুরোধ রয়েছে, ৩১ মে এর মধ্যে স্থানান্তর সম্পন্ন করার। এবং এটা করতে পারলেই আমরা বেশি খুশি হবো।’
শাহ কামাল বলেন, ‘ভাসানচরে নৌ-বাহিনী কাজ করছে। খুব তাড়াতাড়ি আমরা এক লাখ রোহিঙ্গাকে নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তর করতে পারবো। আমরা আশা করছি, আগামী দুই মাসের মধ্যেই এটা করা সম্ভব হবে। সেখানে তাদের অনেক আয়বর্ধক কাজের সাথে সম্পৃক্ত করা হবে। ইউএন এজেন্সিগুলোর সাথে সমন্বয় করে আমরা এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেবো।’
মহড়ায় শরনার্থী, ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার মো: আবুল কালাম, সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) লেফটেন্যান্ট জেনারেল মোঃ মাহফুজুর রহমান, এরিয়া কমান্ডার কক্সবাজার এরিয়া ও জিওসি ১০ পদাতিক ডিভিশন মেজর জেনারেল মোহাম্মদ মাকসুদুর রহমান, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কাজী আব্দুর রহমান প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

Top