উদ্বাস্তু মানুষের ভাগ্য বিড়ম্বনা

Nihad-News-Pic-1.jpg

আজিম নিহাদ :
আশির দশকে উত্তাল সাগরে ভিটেবাড়ি হারিয়ে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার কিছু মানুষ জীবিকার খোঁজে ভীড় করে কক্সবাজার শহরে। শহরের পশ্চিম-উত্তর পাশে সাগরের পাড় ঘেঁেষ ধীরে ধীরে আশ্রয় গাড়ে তারা। কুতুবদিয়ার সাথে মিল রেখে উদ্বাস্তু মানুষেরা এলাকাটির নাম দেয় কুতুবদিয়াপাড়া।
জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সাগর ভিটেবাড়ি কেড়ে নিয়ে সর্বশান্ত করলেও উদ্বাস্তু মানুষ গুলোর ভাগ্য কখনোই পরিবর্তন হয়না। জেলে বা শ্রমিকের কাজ করে কোনরকম জীবন চলে তাদের। এই এলাকাটি পৌরসভারই অংশ। কিন্তু গত চার দশকেও এখানে উন্নয়নের কোন ছোঁয়া লাগেনি।
জানা যায়, পানির উচ্চতা বেড়ে দ্বীপ উপজেলা কুতুবদিয়ার খুদিয়ারটেক, কৈয়ারবিল, আলী আকবর ডেইল, উত্তর ধুরুং, দক্ষিণ ধুরুং ও বড়ঘোপ ইউনিয়নের কিছু কিছু এলাকা সাগরে বিলীন হয়ে যাওয়ায় ভিটেবাড়ি হারিয়ে উদ্বাস্তু হয়ে পড়ে ওইসব এলাকার মানুষ। পরে এসব উদ্বাস্তুরা জীবিকার সন্ধানে ১৯৮০ সালের দিকে কক্সবাজার শহরে ভীড় করে। ধীরে ধীরে শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় বসবাস শুরু করে।
পরবর্তীতে মহেশখালী উপজেলার মাতারবাড়ি ও ধলঘাটা ইউনিয়নেরও কিছু কিছু এলাকার মানুষও একই অবস্থার শিকার হয়ে তারাও শহরের কুতুবদিয়াপাড়ায় আশ্রয় গড়ে তুলে।
কুতুবদিয়াপাড়ার আশপাশে সমিতিপাড়া, ফদেনার ডেইল, নাজিরারটেক এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছে কক্সবাজার পৌরসভার ১নং ওয়ার্ড। এর আগে এই এলাকাটি ছিল ঝিলংজা ইউনিয়নের আওতাভুক্ত। ২০০৮ সালে বর্ধিত পৌরসভায় এটিকে ১নং ওয়ার্ড হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ওয়ার্ডের পশ্চিমে বঙ্গোপসাগর, পূর্বে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সীমানা প্রাচীর, দক্ষিণে সমুদ্র সৈকতের ডায়বেটিক পয়েন্ট ও উত্তরের বাঁকখালীর মোহনা। এরই মাঝখানে প্রায় ৮ বর্গকিলোমিটার জায়গা নিয়ে এলাকাটি গড়ে উঠেছে। ঘনবসতি পূর্ণ এই এলাকায় সাড়ে ৬ হাজার বসতবাড়ির মধ্যে জনসংখ্যা রয়েছে প্রায় অর্ধলক্ষ। এরা সকলেই উদ্বাস্তু। যদিও ভোটার সংখ্যা রয়েছে মাত্র আট হাজার। তাও এই সংখ্যা শহরের অন্যান্য ওয়ার্ড থেকেও অনেক বেশি।
ওই ওয়ার্ডে বিপুল সংখ্যক মানুষ বসবাস করলেও সবক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছে এলাকাটি। ইটের তৈরী নাজুক যোগাযোগ ব্যবস্থা, নেই সরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অপ্রতুল বিদ্যুৎ সুবিধা এবং স্বাস্থ্যসেবা উন্নয়নের ছোঁয়া লাগেনি এলাকাটিতে। এ যেন আধুনিক পর্যটন শহরের ভেতর যাযাবর রাজ্য।
সরেজমিনে দেখা গেছে, ১নং ওয়ার্ডের ৯৫ শতাংশ মানুষেরই দরিদ্রতা নিত্যসঙ্গী। সাগরে মাছ ধরে, শুটকি আড়তে শ্রমিকের কাজ করে, সৈকতে পোনা আহরণ করে জীবন চলে তাদের। এই এলাকার ৪৫ ভাগ নারীও শুটকি মহালে শ্রমিকের কাজ করে পরিবারে যোগান দেয়। তারাও চরম অবহেলিত। দরিদ্র প্রবণ এই এলাকায় এক সঙ্গে ঘেঁষাঘেঁষি করে বিপুল সংখ্যক মানুষ বসবাস করায় মানবজট সৃষ্টি হয়েছে। যেসব শিশুদের বিদ্যালয়ে যাওয়ার কথা, তারা ছুটে শ্রমের পেছনে। এখানকার বেশির ভাগ মানুষই খোলা টয়লেটে মলমূত্র ত্যাগ করে। এর ফলে মারাত্মক পরিবেশ বিপর্যয়ের মধ্যে নিত্যবাস তাদের।
কুতুবদিয়ার খুইজ্যার টেক এলাকা থেকে এসে ত্রিশ বছর আগে কুতুবদিয়াপাড়ায় বসতি গড়ে তুলেন জালাল আহমেদ (৬৫)। সেসময় তাঁর সঙ্গে তাঁর আরও চার ভাই চলে আসেন। তাদের প্রত্যেকের পরিবারের ৫ থেকে ৭ জন সন্তান রয়েছে।
জালাল আহমেদ ও তাঁর চার ভাই পেশা হিসেবে জেলে। সাগরে মাছ আহরণ করে কোন রকম জীবিকা নির্বাহ করেন তারা। সাগরে মাছ ধরা বন্ধ থাকলে চরম অভাব নেমে আসে সংসারে। আবার মাছ ধরা মৌসুমেও সাগরে বিপদ সংকেত দেখা দিলে টানা অনেক দিন ঘরে বসে দিনকাটে তাদের। এভাবেই জীবন চলছে তাদের। সরকারি কোন বিদ্যালয় না থাকায় তাদের কারও সন্তানই পড়াশোনা করতে পারেনি।
জালাল আহমেদ বলেন, ছোটবেলা থেকেই সাগরের সাথে যুদ্ধ করে জীবন চলছে কোন রকম। যখন মাছ ধরতে পারে না, তখন ধার দেনা করে চলতে হয়। তাদের জীবনের কোন উন্নতি নেই। স্থায়ী উন্নতির জন্য কোন সময় কোন সরকারই এগিয়ে আসেনি। অনিশ্চিয়তায় দিনকাটে তাদের।
তিনি আরও বলেন, কেউ সাগরে মাছ ধরতে গিয়ে ঘুর্ণিঝড়ের শিকার হয়ে মারা গেলে তাঁর পরিবারকে পথে বসতে হয়। প্রতি বছর কেউ না কেউ সাগরে মারা যায়। তাদের পরিবারের জন্য সরকারীভাবে কোন সহযোগিতার উদ্যোগ নেওয়া হয় না।
জানা গেছে, সরকারিভাবে কোনখাতে পৃষ্ঠপোষকতা না থাকলেও ১নং ওয়ার্ডের মানুষ সরকারকে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব দেয়। শুটকি আড়তের নিলাম, গৃহকর, ব্যক্তিগত ও প্রাতিষ্ঠানিক আয়করসহ বছরে সরকার কোটি টাকার রাজস্ব পায় এই এলাকা থেকে। কিন্তু সরকারের উন্নয়নের চোখ যেন এলাকাটিতে পড়েই না। সরকারি সুযোগ-সুবিধাবিহীন এই এলাকার মানুষের দিনকাটে দুর্ভোগ আর শঙ্কায়।
জানা গেছে, প্রায় সাড়ে ছয় হাজার বসতবাড়ির মধ্যে তিন হাজার বসতবাড়ি পৌরসভারকে নিয়মিত গৃহকর দেয়। বাকিগুলো গৃহকরের আওতায় আনার প্রক্রিয়াধীন। প্রতি বছর দক্ষিণ চট্টগ্রামের সবচেয়ে বড় নাজিরারটেক শুটকি মহালের নিলাম উঠে ২০ থেকে ২৫ লাখ টাকা। শুটকি মহাল ও অন্যান্য ব্যবসায়ীক প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্স থেকেও ভ্যাট, ট্যাক্স বাবদ আসে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব। এছাড়াও ব্যক্তিগত আয়ের কর প্রদানকারি রয়েছে প্রায় ১৫০ জনের মত।
সরকারকে নিয়মিত আয়কর প্রদান করেন সমিতিপাড়ার মো. আব্দুল্লাহ। তিনি একজন ঠিকাদার। তিনি আক্ষেপ করে বলেন, ‘সরকারকে নিয়মিত কর প্রদান করি। কিন্তু সরকারি কোন সুযোগ-সুবিধা আসে না। সরকার যখন নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, সরকারের উচিত নাগরিকের পর্যান্ত সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা। কিন্তু অজানা কারণে যুগ যুগ ধরে সরকারের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
পৌরসভার ১নং ওয়ার্ডের কমিশনার আক্তার কামাল বলেন, এই এলাকায় বিপুল সংখ্যক মানুষ বসবাস করে। কিন্তু এখানে নাগরিক সুবিধা নেই বললেই চলে। সড়কের উন্নয়ন আসে ডায়বেটিক পয়েন্ট সংলগ্ন এডিবি হ্যাচারী পর্যন্ত। জেলে ও শ্রমজীবী মানুষের উন্নয়নে সরকারের কোন উদ্যোগ নেই। পৌরসভা থেকে যে পরিমাণ বরাদ্ধ আসে সেটিও পর্যাপ্ত নয়।

Top