নজরুল স্মরণে

picture-for-paper.jpg

॥ অধ্যাপক রায়হান উদ্দিন॥
“বল বীর বল উন্নত মম শীর ,শীর নেহারি আমারি নত শীর ঐ শিরখ হিমাদ্রির”।এই অগ্নিঝরা কবিতা বিদ্রোহের ১৯২১ খ্রী: রচনা করেন প্রবল আত্মবিশ্বাসী এক তরুন কবি মাত্র ২২ বছর বয়সে কাজী নজরূল ইসলাম। সেই সময়কার রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে তাকে বিদ্রোহী কবি আখ্যা দেওয়া হয়। ১৯২০ দশকে ভারতবর্ষ এক ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষনে দাড়িয়ে ১৯১৯ খ্রি: নির্লজ্জ জালিয়ানওয়ালাবাগ হত্যাকান্ড ভারতের ব্রিটিশ রাজ এর বিরোদ্ধে সংগ্রামকে এক চরম পর্যায়ে নিয়ে যায়। নজরুলও সেই আন্দোলনে ঝাপিয়ে পড়েন। এই বিশের দশকেই গান্ধীজি অসহযোগ আন্দোলনের পক্ষে প্রচার শুরু করেন। এতে নজরুলও সামিল হন। অসহযোগ আন্দোলন যখন চরম পর্যায়ে পৌছেছে সেই সময়ে গান্ধীজি যুব সমাজকে এই আন্দোলন থেকে নিরস্ত্র হতে বললেন। বহুদিন ধরে বাংলায় দারিদ্র,কৃষক শোষন, জাতি বৈষম্য, ধর্মান্ধতা চলে আসছিল। নজরুল এই সব সামাজিক , রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সম্মুখিন হয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছিলেন। তাই তিনি তার সমস্ত আবেগ দিয়ে রচনা করেন ‘বিদ্রোহী’ কবিতা। ১৮৯৯ খ্রি: ২৪ শে মে পশ্চিমবাংলার বর্ধমান জেলার চুরুলিয়া গ্রামে কাজী বা বিচারক পরিবারে নজরুলের জন্ম।এই পরিবার বিহার থেকে বাংলায় বসবাস করতে আসে।তার পিতা মসজিদের ইমাম ছিলেন। অনেক ভাই বোনের মধ্যে নজরুল অন্যতম। দারিদ্রের মধ্যে জন্ম ,তাই তার নাম রাখা হয় দুখুমিঞা। জন্মস্থান চুরুলিয়ার ধ্বংসাবসেশের মধ্যেই তিনি বড় হন। এক ইতিহাস প্রসিদ্ধ হিন্দু রাজার গড়ের বর্ণনা পাওয়া যায় তার কিশোর বয়সের লেখা কবিতা “ভগ্নস্থুপে”। নজরুল গ্রামের মকতবে পড়াশুনা শুরু করেন। কিন্তু আট বছর বয়সে পিতার আকস্মিক মৃত্যুতে তিনি সংসার প্রতিপালনের জন্য মাজারে খাদেমের কাজ এবং মসজিদে মোল্লাগিরি করতে বাধ্য হন। শিঘ্রই তিনি ঐ অঞ্চলের লোকসংস্কৃতি দল লেটুর দলে যোগ দান করেন। ঐ দলের হয়ে নাটক ও গান রচনা করতে গিয়ে নজরূল হিন্দু পৌরানিক কাহিনী এবং বাংলা লোক সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হন। নজরুলের ছাত্র জীবন দারিদ্রের কারনে বার বার ব্যাহত হয়। দারিদ্রের বিরোদ্ধে সংগ্রাম করতে গিয়ে তাকে কখনো ভৃত্যের কাজ করতে হয়, আবার কখনো রুটি তৈরির কারখানাতে কাজ নিতে হয়। বৃত্তি পাওয়া মেধাবী ছাত্র হওয়া সত্বেও তিনি স্কুলে পড়া ছেড়ে দেওয়ার সিদ্বান্ত নেন। দেওয়ালে আটকানো বর্নাঢ্য প্রাচীরপত্র নজরুলকে মুদ্ধ করতো। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় প্রাচীর পত্রে বাঙালী সৈন্য দলে যোগ দেবার আহবান জানানো হয়েছে দেখে নজরুল ব্রিটিশ সৈন্য দলের উনপঞ্চাশ নম্বর বাঙালী পল্টনে নাম লেখালেন। নজরূল যুদ্ধে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহন না করলেও নওশেরা এবং প্রাচীতে থাকার সময় তিনি তার ফার্সী ভাষার চর্চা ছাড়েন নি। সংবাদপত্রের মাধ্যমে নজরুল বিশ্বের সমসাময়িক পরিস্থিতি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হতে লাগলেন। অন্যতম হলো বলশেভিক আন্দোলন। নজরুল আরো গভীরভাবে লেখা শুরু করলেন।১৯১৯খ্রি: একটা উদারনীতি মুসলমান পত্রিকায় তার প্রথম লেখা “বাউন্ডেলের আত্মকাহিনী” প্রকাশিত হয়।এর পর বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকায় নজরুলের বেশকিছু লেখা ছাপা হয়, যার মধ্যে প্রথম প্রকাশিত কবিতার নাম “মুক্তি”। এই পাক্ষিক পত্রিকার কর্ণধার ছিলেন মুজাফ্ফর আহমেদ। সৈনিক জীবন থেকে প্রত্যাবর্তনের পর কমিউনিস্ট আদর্শে বিশ্বাসী এই ব্যক্তিত্বের সঙ্গে নজরূল ঘনিষ্ট ভাবে জড়িয়ে পড়েন। তার লেখক জীবনের শুরু সাংবাদিকতার মাধ্যমে। মুজাফফর আহমেদের সান্নিধ্যে আসার পর মুসলমান রাজনিতিবীদ ফজলুল হকের সহায়তায় নজরুল প্রাত্যহিক “নবযুগ’ পত্রিকা বের করেন। তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধে তিনি আমাদের দেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের সংগে রুশ বিপ্লব, আইরিশ বিদ্রোহ এবং কামাল আতাতুর্কের নতুন তুর্কির তুলনা করেছেন। এই পত্রিকায় কৃষিজিবী এবং শ্রমজিবী মানুষের কথা তিনি বারে বারে তুলে ধরেন। সরকারের নিষেধজ্ঞা না মেনে সরকার বিরোধী লেখাপ্রকাশ করার জন্য সরকার নবযুগ পত্রিকা বন্ধ করে দেয় ১৯২১ খ্রি: জানুয়ারীতে। এর পরেই সঙ্গীত নজরুলের প্রধান অবলম্বন হয়ে দাড়ায়। উচ্চ বিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিনি উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের তালিম নেন এবং নওশেরাতে থাকার সময় গজলের সঙ্গে পরিচিত হন। রবীন্দ্র সঙ্গীত গেয়ে নজরুল গায়ক হিসেবে প্রথম পরিচিতি লাভ করেন। নজরুল তার সৃস্ট গানে আরবী ও ফার্সী ভাষা নিয়ে নতুন মাত্রা নিয়ে এসেছিলেন। তিনিই প্রথম বাংলা গজল গানের প্রবর্তক। ১৯২২খ্রি: নজরুল নিজে প্রকাশ করলেন দিপাক্ষিক পত্রিকা “ধুমকেতু”। প্রখ্যাত সাহিত্যিক শরৎচন্দ্র নজরুলকে উৎসাহিত করে বলেন, তিনি যেন শত্রু মিত্র নির্বিশেষে নির্ভয়ে সত্যি কথা বলতে পারেন। রবীন্দ্রনাথ ধুমকেতুকে স্বাগত জানিয়ে বললেন,‘এখনো যারা অচেতন হয়ে আছে , ধুমকেতু যেন তাদের জাগিয়ে তোলে”। পত্রিকার প্রথম সংখ্যাতে নজরুলের লেখা প্রথম কবিতা “ধুমকেতু”প্রকাশিত হয়। সেখানেও তিনি লেখেন,“তাই বিপ্লব আনি,বিদ্রোহ করি। মানুষের প্রতি নানা ধরনের অন্যায়,অবিচার যেন,মানুষকে দাসত্বের শৃঙখলে আবদ্ধ করেছিল,তারই প্রতিবাদপত্র ধুমকেতু। হিন্দু মুসলমান ধর্মের উদ্ধৃতি দিয়ে নজরুল তাঁর প্রতিবাদের ভাষা তৈরি করেছিলেন। দুর্গার অসুর নিধন শক্তির আধারে লেখা আনন্দময়ীল আগমনে এবং শীবের প্রলয় নাচনের তাৎপর্য্য বর্ননা করে তিনি “প্রলয়োল্লাষ” লিখেছিলেন। একি সঙ্গে ‘মহররম’ এবং ‘কারবালা, মক্কা, মদিনার জম জম ইদারার উপর প্রবন্ধ লিখে মুসলিম ঐতিহ্যের কাহিনীকে ধুমকেতুতে তুলে ধরে সবার দৃস্টি আকর্ষন করেন। ধুমকেতুর প্রথম সংখ্যায় নজরুল লিখলেন সবচেয়ে বড় ধর্ম হলো মানবিকতা। তার প্রধান লক্ষ্য ছিল হিন্দু মুসলমান সম্প্রীতি এবং ঐক্য। “মোরা এক বৃন্তে দুটো কুসুম হিন্দু মুসলমান, মুসলিম তার নয়ন মনি হিন্দু তাহার প্রাণ। এক সে আকাশ মায়ের কোলে যেন রবিশষী দোলে, এক রক্ত বুকের তলে এক সে নাড়ীর টান।” এই কারনে রক্ষনশীল মুসলিম পত্রিকা তাঁকে কাফের বলে ভর্ৎসনা করে এবং গোড়া হিন্দু সমাজ তাঁকে বর্জন করে। ১৯২২ খ্রি: নভেম্বর মাসে ব্রিটিশরাজ ধুমকেতু বন্ধ করে দেয় এবং নজরুলকে এক বছরের সশ্রম কারাদন্ডে দন্ডিত করে। আত্মপক্ষ সমর্থন করে তেজোদ্বীপ্ত কন্ঠে বলেন, আমার বাশীকে বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে বাশীর সুর থেমে থাকবেনা কারন সুর আমার বাশীতে নেই আছে হৃদয়ে। কারারুদ্ধ নজরুলের কলম থেমে থাকেনি, তিনি লিখলেন শিকলপরার গান্ এবং সৃস্টিসুখের উল্লাসের মতো প্রান মাতানো কবিতা। জেলে দুর্ববহারের প্রতিবাদে নজরুল অনশন শুরু করেন ১৯২৩ সালের মে মাসে। ৪০ দিনের অনশনে তার স্বাস্থ্য ভেঙ্গে পড়েছিলো। রবীন্দ্রন্থা ঠাকুর বাংলা সাহিত্যের স্বার্থে তাকে অনশন ভঙ্গ করার জন্য টেলিগ্রাম করেন। শ্রান্ত ,ক্লান্ত জাতির জীবনে বসন্তের হাওয়া বইয়ে দেবে এই আশায় কবি তাঁর গীতিনাট্য “বসন্ত” নজরুলকে উৎসর্গ করলেন। অবশেষে কুমিল্লার মাতৃস্থানিয়া বিরজা সুন্দরী দেবীর কথায় নজরুল তাঁর অনশন ভঙ্গ করেন। কুমিল্লা সেন গুপ্ত পরিবারের ¯েœহ ভালোবাসায় নজরুল মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলেন। এ্ই সময় তিনি বিরজা সুন্দরীর ভাশুরের মেয়ে প্রমিলার প্রতি গভীরভাবে আকৃষ্ট হন। ১৯২৩ খ্রি: ডিসেম্বর মাসে জেল থেকে ছাড়া পাওয়ার পর তিনি কুমিল্লায় গিয়ে প্রমিলার পানি প্রার্থি হন। প্রমিলাকে তিনি বিজয়িনী আখ্যা দেন। নজরুল প্রেমের বন্যায় ভেসে গেলেন এবং এই গানে তিনি তাঁর প্রিয়া এবং বাসর ঘরকে সাজিয়ে ছিলেন কল্পনায় এবং প্রকৃতির শ্রেষ্ঠ সম্পদ দিয়ে। নারী পুরুষের সমঅধিকারের দাবী তুলে তিনি তাঁর নারী কবিতায় লিখলেন,“মাথার ঘোমটা ছিড়ে ফেল নারী ভেঙ্গে ফেল শিকল”। ১৯২৬ খ্রী: কলকাতায় সাম্প্রদায়ীক দাঙ্গা শুরু হয়। ব্যথিত নজরুল বললেন এই হৃদয় মন্দির, মসজীদ, গীর্জা, হৃদয় থেকে বড় কোন মন্দীর, মসজিদ, কাবা হয়না। হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা দুর করতে নজরুল ১৯২৬ খ্রী: লিখলেন, তাঁর বিখ্যাত গান ‘কান্ডারী হুশিয়ার’।সুভাষ চন্দ্র বসু বললেন ,ভারতে জাতীয় সঙ্গীতের মধ্যে শ্রেষ্ঠ উদ্দিপন সঙ্গীত‘কান্ডারী হুশিয়ার’। ১৯২৬ খ্রী: অক্টোবর মাসে গভীর মানসিক যন্ত্রনায় তিনি লিখলেন,‘দারিদ’্র কবিতা। এই বছরেই নজরুল আর্থিক সঙ্কটের সম্মুখিন হন। এর মধ্যেই তাঁর ২য় পুত্রের জন্ম হয়। ব্যথাহত নজরুল সঙ্গীতের মধ্যে খুজে পেলেন আবার নতুন প্রেরনা। যে প্রেরনার উৎস ছিল তাঁর প্রিয় পুত্র অরিন্দম খালেদ। যাকে তিনি আদর করে ডাকতেন বুলবুল বলে। তারি নামে নজরুল তার প্রথম গান রচনা করেন। দুবছরের মধ্যে নজরুল প্রচুর গজল রচনা করেন এবং গানগুলি স্বরলিপি সহকারে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায় ছাপা হয়। নজরুলের গানকে বিপুলভাবে জনপ্রিয় করতে সাহায্য করেছিলেন শ্রী দীলিপ কুমার রায়। ১৯২৮ খ্রি: ব্রিটিশ সরকার অধিগ্রিহিত গ্রামোফোন কোম্পানী নজরুলের সাঙ্গিতিক প্রতিভায় আকৃষ্ট হয়ে তাঁকে বিশেষ পারিশ্রমিকের বিনিময়ে গ্রামোফোন কোম্পানীর গীত রচয়িতা সুরকার এবং প্রশিক্ষকের কাজে নিয়োগ করে। এর ফলে নজরুলের সাঙ্গিতিক জীবনের অগ্রগতি আরো প্রবল হয়। ১৯২৯ খ্রি: ১৫ ই ডিসেম্বর কলকাতার এলবার্ট হলে নজরুলকে জাতির পক্ষ থেকে সম্বর্ধনা জ্ঞাপন করা হয়। আচার্য্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায় তাঁর ভাষনে বলেছিলেন, নজরূল ইসলাম শুধু মুসসলমানের কবি নন,তিনি বাংলার কবি, বাঙ্গালীর কবি। সুভাষ চন্দ্র বলেন আমরা যখন যু্েদ্ধ যাবো তখন নজরুলের গান গাইবো,যখন জেলে যাবো তখনও নজরুলের গান গাইবো। কয়েক বছর পরে ব্রিটিশদের বিতাড়িত করতে সুভাষবসুর আজাদ হীন্দ ফৌজ জাপানীদের সাথে হাত মিলিয়ে যখন ভারতের পুর্ব সীমান্ত পার হয়েছিল, তখন নজরুলের ‘চল চল চল’ গানটি সেনাদের উদ্বুদ্ধ করেছিল।
নজরুলের সুখ কিন্তু দীর্ঘস্থায়ী হয়নি । ১৯৩০ খ্রি: মে মাসে প্রানাধিক প্রিয় বুল বুল দুরারোগ্য বসন্ত রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যায়। যদিও নজরুলের আরো দুটি সন্তান হয় তবুও তিনি বুল বুলের বিয়োগ ব্যথা কিছুতেই ভুলতে পারেননি। পরের বারো বছর তিনি সঙ্গীত সৃস্টিতে ডুবে রইলেন। প্রায় তিন হাজারের বেশী গান রচনা করে তাতে সুর সংযোজনা করেন। যা রবীন্দ্র নাথ ঠাকুরের গানের চেয়েও বেশী। মার্গ সঙ্গীতে আধারিত নজরুলের অনেক প্রেমের গান জাগতিক কামনা বাসনাকে বিষয়বস্তু করে লেখা। রাবিন্দ্রিক ভাব ভাবনা এবং নীতিবাগিশ ব্রাম্ম সমাজের কাছে তা বিস্ময়ের কারন হয়েছিল। বুলবুলের মৃত্যুর পর নজরূল আধ্যাত্ববাদের দিকে ঝুকে পড়েন এবং তন্ত্র মতে যোগ সাধনায় মন দেন। এ্ই সময় তিনি শ্যামা সঙ্গীত কির্তন সহ বেশ কিছু ভক্তি গীতি রচনা করেন। একি সময় তিনি পবিত্র কোরানে আটত্রিশটি পরিচ্ছদ এবং হাফিজ ও ওমর খৈয়ামের কিছু অনুবাদ করেন। নজরুলের ইসলামী গানকে জনপ্রিয় করেন শিল্পী আব্বাসউদ্দিন। এর ফলে মুসলিম ধর্মীয় নেতাদের মনে সঙ্গীত সম্মন্ধে যে বিরুপ ধারনা ছিল তা দুর হয় এবং মুসলিম সমাজের রক্ষনশীলতাকে অনেকটাই শিথীল করে।১৯৩১ খ্রি: নজরুল মঞ্চ এবং চলচ্চিত্র জগতে প্রবেশ করেন। নজরুল কলকাতা বেতার কেন্দ্রে সঙ্গীত পরিচালক হিসেবেও যোগ দেন।১৯৩৯ খ্রি; নজরুলের স্ত্রী প্রমিলাদেবী পক্ষাঘাতে সয্যাশায়ী হয়ে পড়লেন। স্ত্রীকে সুস্থ করতে নজরুলকে নানান সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। স্ত্রীর অসুস্থতা এবং যুদ্ধ বিধ্বস্ত পরিমন্ডল তাকে বিচলিত করেছিল। দিনে দিনে তাঁর অস্থিরতা বৃদ্ধি পেতে থাকে। ১৯৪৮ খ্রি: কোন এক অজানা আশংকা অনুভব করে কবি লিখেছিলেন,“ যদি আর বাশী না বাজে , যদি তার সৃজনশীল ক্ষমতা হঠাৎ একদিন হারিয়ে যায়, তা হবে মৃত্যু নয় , মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর”। আগস্ট মাসে রবিন্দ্রনাথের তিরোধান দিবসে নজরুল তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে লিখলেন “রবিহারা” কবিতা। ১৯৪২ খ্রি: বেতারের এক অনুষ্টানের মাঝখানে কবি বাকরুদ্ধ হয়ে যান। ধীরে ধীরে তার চেতনাও লুপ্ত হয়। আগুনের বাশী নিজে থেকেই পুড়ে ছাই হয়ে যায়। তাই বোধ হয় তিনি তাঁর শেষ গানে লিখেছিলেন,“খেলা শেষ হলো শেষ হয় নাই বেলা”। সত্যি সত্যি কবির বেলা শেষ হয়নি। জীবমৃত অবস্থায় কবি নজরুল আরো ৩৪ বছর বেঁচেছিলেন। যে অবস্থার কথা তিনি বলেছিলেন, যা কিনা মৃত্যুর চেয়েও ভয়ঙ্কর। ভারতে এবং বিদেশে তাঁর চিকিৎসা হলেও কোন সুফল পাওয়া যায়নি। কবির মানসিক ভারসাম্য সম্পুর্নরুপে হারিয়েছিল। ১৯৪৫ খ্রি: কলিকাতা বিশ্ববিদ্যালয় “জগত তারিনি” স্বর্নপদক প্রদান করেন। ১৯৬০ খ্রি:ভারত সরকার তাঁকে “পদ্মভুষন” খেতাব দিয়ে সম্মানিত করে। ১৯৭১ খ্রি: বাংলাদেশ স্বাধীন হয়। এই স্বাধীনতা সংগ্রামে নজরুলের উদ্দীপন সঙ্গীত স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উদ্বুদ্ধ করেছিল। তাই স্বাধীন বাংলাদেশে কবিকে ১৯৭২ খ্রি: নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে তাঁকে জাতীয় কবির মার্যাদার সাথে সাথে ন্গারিকত্ব প্রদান করা হয় ‘একুুশে’ পদক দিয়ে সম্মানীত করা হয়। ঢাক বিশ্ববিদ্যালয় তাঁকে ২য়বার “ডিলিট ” প্রদান করে। এ্ই সম্মান যখন তিনি পেলেন তখন তাঁর মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে গেছে। এমনিই ভাগ্যের পরিহাস।“ তোমাদের পানে চাহিয়া বন্ধু আর আমি জাগিবনা, কোলাহল করি সারাদিনমান কারো ধ্যান ভাঙ্গিবনা। নিশ্চল,নিশ্চুপ আপনার মনে পুড়িব একাকী গন্ধ বিধুর ধুপ”।
১৯৭৬ খ্রি: ২৯ শে অগাস্ট তিনি ঢাকায় শেষ নি:শ্বাষ ত্যাগ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যলয় প্রাঙ্গনে রাস্ট্রিয় মার্যাদায় তাঁকে সমাহিত করা হয়। নজরুলের কন্ঠষ¦র বহু আগেই স্তব্দ হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তাঁর জনমন মথিত বানী তাঁর গানে কবিতায় তিনি রেখে গেছেন, যা সারা বিশ্বের বাঙ্গালীর কাছে আজো অ¤লান হয়ে আছে।

Top