অতিথি কলাম : মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধ, ঘরে ঘরে দুর্গ

1-5.jpg

॥ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট॥

ইয়াবা ব্যবসায়ীদের নির্মূল করতে তালিকা করে ’বন্ধুকযুদ্ধে’ হত্যা করার অভিযান চলছে আর নিহতের সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। পত্রিকায় প্রকাশিত সংবাদে জানা যায় গত ১১দিনে ৬৩জন নিহত হয়েছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর সমালোচনার মধ্যেও চলছে কথিত ’বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের ঘটনা। বিরোধী দলের নেতারাও মাদক বিরোধী অভিযানকে সমর্থন করলেও বিনা বিচারে দেশের মানুষ হত্যার প্রতিবাদ করেছেন। এমন কি প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দুত ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বলেছেন, মাদক নির্মূলের নামে যাদের হত্যা করা হচ্ছে,তারা কারা আমরা জানি না। আমি ইতোপূর্বে সংসদেই বলেছি,মাদকসম্রাট তো সংসদেই আছে। তাদের বিচারের মাধ্যমে ফাঁসিতে ঝোলান। মাদক নির্মূলের নামে এভাবে বিনা বিচারে মানুষ হত্যা করতে পারেন না। প্রত্যোক নাগরিকেরই সাংবিধানিকভাবে বিচার পাওয়ার অধিকার আছে। সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে বলেছেন, মাদক সংক্রান্ত অপরাধ অবশ্যই দমন করতে হবে। গণতান্ত্রিক দেশে এটা হতে হবে আইন অনুমোদিত প্রক্রিয়ায়। এ হত্যা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। এ হত্যা চলতে থাকলে আমরা সম্পূর্ণ আইনের শাসনবিহীন ও গণতন্ত্রহীন দেশে পরিণত হব। পত্রিকায় সম্পাদকীয় লিখা হচ্ছে, এ দেশের পক্ষে যেমন মাদকের প্রকোপে বিপর্যস্ত হওয়া বেমানান তেমনি আবার বিচারবর্হিভুত হত্যাকান্ডের মাধ্যমে তা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টাও স্বাভাবিক নয়। বাংলাদেশকে গণতন্ত্র,মানবাধিকার ও আইনের শাসনের পথে থেকেই এ সংকট থেকে মুক্ত হতে হবে। মাদকাসক্তি জাতির অন্যতম প্রধান সমস্যায় পরিণত হয়েছে। বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী মাদকে আসক্ত হয়ে পড়েছেন,প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়েছে মাদকাসক্তি। ঠিক কত সংখ্যক মানুষ মাদকাক্ত তার কোন পরিসংখ্যান নেই।তবে বছরে বছরে তা দ্রুতগতিতে বাড়ছে,তার স্পষ্ট ইঙ্গিত পাওয়া যায় মাদকদ্রব্য,বিশেষ করে ইয়াবা বড়ি আটকে হিসাবের দিকে তাকালে। মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০১৭ সালে বাংলাদেশে শুধু ইয়াবা বড়ি আটক হয়েছে ৪ কোটি পিস। এটা আগের বছরের তুলনায় ১ কোটি ১০ লাখ পিস বেশী এবং ২০১০ সালের তুলনায় ৫০ গুণ বেশী। অর্থাৎ গত ৭/৮ বছরে এ দেশে মাদকদ্রব্য কেনাবেচা ও সেবন বেড়েছে প্রায় ৫০ গুণ। সাধারণভাবে আটক মাদকদ্রব্যের পরিমাণকে প্রকৃত চোরাচালানের ২০ ভাগের এক ভাগ হিসাবে অনুমান করা হয়। সেই হিসাবে ২০১৭ সালে দেশে প্রায় ৮০ কোটি পিস ইয়াবা বড়ি কেনাবেচা হয়েছে। এ থেকেই অনুমান করা যায়,এ দেশে মাদকসেবীর সংখ্যা কি বিশাল। উদ্বেগের বিষয়,মাদকসেবীরা মুলত তরুণ বয়সী,শারীরিক ও মানসিক দিক থেকে একটা জাতিকে পঙ্গু করে ফেলতে পারে মাদক। সীমান্ত পেরিয়ে বিপুল পরিমাণ মাদকদ্রব্য বাংলাদেশে প্রবেশ করলে অভিযান চালিয়েই দেশের ভিতরে কেনাবেচনা বন্ধ করা সম্ভব হবে না। সীমান্তরক্ষী বাহিনীগুলোকে প্রতিবেশী দেশগুলো থেকে বাংলাদেশে মাদক প্রবেশের পথগুলো শতভাগ বন্ধ করতে হবে। আগে মনে করা হত শুধু কক্সবাজার-টেকনাফেই ইয়াবা ব্যবসায়ী আছে। কিন্তু এই বার অভিযানে বাংলাদশের অনেকগুলো জেলাতেই বন্দুকযুদ্ধে ইয়াবা ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে। মাদকদ্রব্য চোরাই পথে দেশে আনতে এবং তা দেশের ভিতরে ছড়িয়ে দিতে শক্তিশালী চক্র জড়িত আছে। প্রভাবশালী রাজনৈতিক নেতা,মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তের কর্মকর্তা,আইনশৃংখলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যরা এক চক্রের অর্ন্তভুক্ত বলে জানা যায়। চিহিৃত মাদকসম্রাট বা গডফাদারদের স্পর্শ না করে শুধু খুচরা মাদক বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অভিযান চালিয়ে স্থায়ী সুফল আসা করা যাবে না বলে বিশেজ্ঞরা মনে করেন।
ইদানিং বিভিন্ন সভায় সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা আইনজীবীদের ইয়াবা মামলার আসামীদের জামিন না নেওয়ার প্রকাশ্যে অনুরোধ করছেন। আইনজীবীরা জামিন চাইলেই কোর্ট জামিন দিতে বাধ্য নন। গাড়ীতে ড্রাইভারের সীটের নিচে বা একজন যাত্রীর দখল হতে ইয়াবা পাওয়া গেলে সকল যাত্রী আসামী হবে কেন? সে ক্ষেত্রে নির্দোষ মানুষকে ঘৃণিত ইয়াবা মামলায় বেআইনীভাবে,অনৈতিকভাবে দাবী আদায়ে ব্যর্থ হয়ে যদি আসামী করা হয় জামিন চাওয়া বা জামিন দেওয়া অন্যায় হবে কেন? জামিন ম্যাজিষ্ট্রেট কোর্ট না দিলে দায়রা জজ আদালতে,দায়রা জজ আদালত না দিলে হাইকোর্টে,হাইকোর্ট না দিলে সুপ্রীমকোর্টে যে কোন হাজতী আসামীর পক্ষে যে কোন আইনজীবী আইনতঃ জামিনের প্রার্থনা করতে পারেন। এটা সাংবিধানিক অধিকার। একজন আইনজীবীর দায়িত্ব হল আইনসম্মতভাবে ন্যায় বিচার করতে আদালতকে সাহায্য করা। শিশু,মহিলা,অক্ষম,গুরুতর অসুস্থ ব্যক্তিদের জামিন দেওয়ার বিধান আইনে আছে। তদন্ত সমাপ্ত করার আইনদ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তদন্তকারী কর্মকর্তা মামলার তদন্ত সমাপ্ত করতে ব্যর্থ হলে হাজতী আসামীকে জামিন দেওয়ার বিধান আছে। অভিযোগপত্র দাখিল করলেও সরকারপক্ষ আইনদ্বারা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সাক্ষ্যপ্রমাণ দিয়ে বিচার শেষ করতে ব্যর্থ হলেও হাজতী আসামীকে জামিন দেওয়ার নির্দেশনা আইনে আছে। সাধারণত ইয়াবা মামলাগুলোর বাদী হন সরকারের আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্য বা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা, মামলার মূল সাক্ষীও হন সরকারী বাহিনীর সদস্যরা। কক্সবাজার জেলার দায়রা জজ আদালতগুলোতে অনুমান শতকরা নব্বই ভাগ ইয়াবা মামলায় আসামীদের শাস্তি হয়েছে। সরকারী চাকুরীরত সাক্ষীগুলো আদালতে আসলে,সরকারী আইন কর্মকর্তারা সাক্ষীর হাজিরা দিলে আদালতগুলো সাক্ষ্যপ্রমাণ নিয়ে দোষীদের শাস্তি দিতে প্রস্তুত। সরকারপক্ষের সাক্ষ্য গ্রহন করার ক্ষেত্রে আসামীপক্ষের আইনজীবীর আইনত কোন দায়িত্ব নেই,সাক্ষীকে আদালতে প্রদত্ত সাক্ষ্যের সত্যতা যাচাই করার জন্য জেরা করা ব্যতীত। অভিযোগ আছে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা গ্রেপ্তার বাণিজ্য ও জামিন বাণিজ্য নিয়ে খুব উৎসাহী হলেও আসামীর বিরুদ্ধে আদালতে সাক্ষ্য দিয়ে দোষী সাব্যস্থ করে দন্ডিত করাতে তেমন আগ্রহ দেখা যায় না। ইয়াবার মামলায় দায়রা জজ আদালত কোন আসামীকে বেআইনীভাবে জামিন মজ্ঞুর করলে বা খালাস প্রদান করলে তার বিরুদ্ধে সরকার পক্ষে হাইকোর্টে আপিল/রিভিশন করার বিধান আছে। আসামীকে হাইকোর্টে আপিল করতে হলে টাকা খরচ করে সার্টিফাইড কপি নিতে হয়। সরকার পক্ষে বিনাখরচে সার্টিফাইড কপি দেওয়া হয়। সরকার পক্ষে আসামীর বিরুদ্ধে বিনা খরচে আপিল করার বিধান আছে। শুধু দরকার দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের আগ্রহ। বিগত সাত/আট বছরে ইয়াবা মামলার জামিনের বিরুদ্ধে কয়জন আসামীর জামিনের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে জামিন বাতিলের জন্য আপিল করা হয়েছে? বেগম খালেদা জিয়াকে হাইকোর্ট কর্তৃক প্রদত্ত জামিন বাতিল চেয়ে/স্থগিত চেয়ে সরকারপক্ষে সুপ্রীমকোর্টে আপিল করা হলেও ইয়াবা মামলায় প্রদত্ত আসামীর জামিন বাতিল চেয়ে সরকারপক্ষে হাইকোর্টে/সুপ্রীমকোর্টে কয়টা আপিল হয়েছে? না হওয়ার কোন গোপন রহস্য আছে কি? সরকারী কৌশলীরা ব্যতীত আইনজীবীরা সরকারের কোন বেতন ভাতা পান না। জনগণের টেক্সের টাকা থেকে বেতনভাতা গ্রহনকারী সরকারী কর্মকর্তারা আইনে নির্ধারিত কর্তব্য সম্পাদন করতে আইনত বাধ্য। আইনজীবীদের নিয়ন্ত্রণকারী সংস্থা বাংলাদেশ বার কাউন্সিল। কয়েক দিন আগে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে সরকারপন্থীরাই ১৪টা আসনের মধ্যে ১২টিতে বিজয়ী হয়েছেন। বাংলাদেশ বার কাউন্সিল যদি নির্দেশ দেন কোন আইনজীবী মাদকের মামলা বা ইয়াবা মামলার আসামীর জামিন কোন আদালতে চাইতে পারবে না বা উকালতি করতে পারবে না তখন যদি কোন আইনজীবী আসামীর জামিন চান তবে তার শাস্তি হবে , সনদ বাতিল হবে। দেশের স্বার্থে প্রয়োজন হলে আইনজীবীরা সে সিদ্ধান্তও মানবে। কিন্ত সরকারী কর্মকর্তাদের নিজেদের আইনগত দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার ভার আইনজীবীদের ঘাড়ে দেওয়া সমীচীন হবে না।
বাংলাদেশে সীমান্ত পেরিয়ে ইয়াবা আসে মিয়ানমার থেকে । মিয়ানমারে প্রায় ৪০টি ইয়াবা প্রস্তুতকারী কারখানা আছে যার মালিক মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর জেনারেলরা। জোরপূর্বক প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে গণহত্যা,গণধর্ষণ,বাড়ীঘর জ্বালিয়ে দিয়ে বাংলাদেশে তাড়িয়ে দিয়ে সীমান্ত খোলা রাখার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে মিয়ানমারের জেনারেলদের এটাও একটা উদ্দেশ্য। ইয়াবা সমস্যা নির্মূল করতে গেলে মিয়ানমারের ইয়াবা প্রস্তুতকারী কারখানাগুলোই ধ্বংস করে দিতে হবে যা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। সীমান্ত রোহিঙ্গাদের কারণে সম্পূর্ণ বন্ধ করাও সম্ভব হচ্ছে না। অর্থনীতির নিয়ম অনুযায়ী চাহিদা থাকলে সরবরাহ আসবে। চাহিদা না থাকলে সরবরাহ আসবে না , চাহিদা না থাকলে উৎপাদনই বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশে ইয়াবা সেবন বন্ধ করলে, ইয়াবা ব্যবসাও বন্ধ হবে। ইয়াবা আমদানীও বন্ধ হবে। ইয়াবা সেবনকারীদের মা-বাবা পরিবার আছে। সমাজের দায়িত্ব,জাতির দায়িত্ব না নিয়ে নিজের পরিবারের দায়িত্ব নিয়ে ইয়াবা সেবন বন্ধ করা খুব কঠিন কাজ নয়। অতি রাজনীতিকরণ,দলীয়করণের কারণে আমাদের দেশের সামাজিক বন্ধন একটু নরম হলেও এখনও পারিবারিক বন্ধন অটুট আছে। প্রত্যেকে তার পরিবারের ছেলে-মেয়েদের প্রতি কড়া দৃষ্টি রাখবে। কেউ ইয়াবা অসক্ত হলে পারিবারিকভাবে বন্ধ করা না গেলে সংশোধন কেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে। দেশের প্রতিটি জেলায় দুর্নীতিমুক্ত সংশোধন কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধে শরিক হওয়ার জন্য জনগণকে সুনির্দিষ্টভাবে ক্ষেত্র তৈরী করে দিতে হবে। দায়িত্ব দিতে হবে,দায়িত্ব নিতে হবে। শুধু শ্লোগন যথেষ্ট নয়। তবে মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে মাদকসেবী ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রেখে শাস্তি দিয়ে যেতে হবে। বন্দুকযুদ্ধের নামে জাতিতে জঘন্য মিথ্যাচার উপহার আর নয়। ’অপারেশন ক্লিন হার্টের’ সময় ’হার্টএটাকে’ তালিকাভুক্তদের হত্যা করার মিথ্যাচার জাতি যেমন বিশ্বাস করেনি,এখনও করছে না প্রতীয়মান হয়।
মানবতার মা, জাতির জনকের যোগ্য কন্যা, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে ঘোষণা দিতে হবে কোন মাদকাসক্তের স্থান আওয়ামী লীগে হবে না। মাদকাসক্তরা আওয়ামী লীগে বা অংগ সংগঠনে সদস্যপদ পাবে না, কোন নির্বাচনে মনোনয়ন পাবে না। মাদকাসক্তরা সরকারী চাকুরীতে অযোগ্য বিবেচিত হবে। রক্ত পরীক্ষার মেডিকেল সার্টিফিকেট লাগবে মাদকাসক্ত নয় মর্মে। প্রত্যেক ঘরে ঘরে মাদকাসক্তের বিরুদ্ধে দুর্গ গড়ে তুলতে হবে। পরিবার থেকেই মাদকসেবীদের ভাল করতে হবে,স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে হবে। প্রত্যেক উপজেলায় মাদকাসক্ত নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তুলা হবে। দেশে মাদকসেবী না থাকলে মাদক ব্যবসায়ীও সৃষ্টি হবে না।

লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Top