রোহিঙ্গা সংকটের ৭ মাস আজ

images-5.jpg

মাহাবুবুর রহমান :
বাংলাদেশে রোহিঙ্গা সংকটের ৭ মাস পূর্ণ হচ্ছে আজ। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে পার্শ্ববর্তি দেশ মিয়ানমারের সেনাবাহিনী কর্তৃক নির্মম নির্যাতনের শিকার হয়ে কক্সবাজারের টেকনাফের ১২ টি পয়েন্ট দিয়ে প্রাণ ভয়ে পালিয়ে আসে রোহিঙ্গারা। তারা আশ্রয় নেয় জেলার উখিয়া এবং টেকনাফ উপজেলার ১৬ টি আশ্রয় শিবিরে। সরকারি হিসাব মতে এ পর্যন্ত ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে বায়োমেট্্িরক নিবন্ধন করা হয়েছে। আরো কিছু সংখ্যক বাকি থাকতে পারে। সে হিসাবে পৃথিবীর ইতিহাসের সবচেয়ে বড় শরনার্থী শিবিরে পরিণত হয় কক্সবাজারের উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্প। আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গাদের তাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে মাঝে মধ্যে বেশ তোড় জোড় হলেও কাজের কাজ কিছুই হয় নি। শুধু চুক্তি আর চিঠি আদান প্রদানেই রয়ে গেছে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন। স্থানীয়দের দাবী বিপুল সংখ্যাক রোহিঙ্গার চাপ সামলাতে গিয়ে ইতিমধ্যে কক্সবাজারের সামজিক,পরিবেশ এবং অর্থনৈতিক ভাবে বিপর্যয় ঘটেছে যেহেতু খুব দ্রুত রোহিঙ্গাদের ফেরত যাওয়ার সম্ভবনা দেখা যাচ্ছে না তাই কক্সবাজারের জন্য আরো বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে বলে মনে করেন সচেতন মহল। তাদের দাবী দ্রুত রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো ছাড়া কোন বিকল্প নেই।
কক্সবাজার শরণার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কর্মকর্তা মোঃ আবুল কালাম বলেন, সর্ব শেষ ১১ লাখের মত রোগিঙ্গা নিবন্ধন হয়েছে বলে জানা গেছে। গত বছরের ২৫ আগষ্টের পর থেকে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আসতে শুরু করে, আমরা তাদের সর্বোচ্চ মানবিকতা দিয়ে সেবা নিয়ে যাচ্ছি। আমি নিজেও প্রত্যাবাসন কমিটির সদস্য হিসাবে মিয়ানমার গিয়েছিলাম সেখানে উনাদের কাছে আমাদের পক্ষ থেকে দাবী ছিল তারা যাতে রোহিঙ্গাদের নিজ দেশে ফিরিয়ে নেয়। তারা কিন্তু ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়েছে। আপনারা জানেন যে এক সময় মিয়ানমার নানান ভাবে রোহিঙ্গাদের তাদের নাগরিক নয় বল্লেও এখন কিন্তু সেটা আর বলছে না, এখন তারা ফিরিয়ে নিতে বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছে এতেও আমরা আশাবাদি রোহিঙ্গারা একদিন তাদের নিজ দেশে ফেরত যাবে।
উখিয়া হলদিয়া পালং ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ শাহআলম বলেন,১৯৮০ সালের দিকে যে রোহিঙ্গারা এসেছে তারাই এখনো ফেরত যায়নি। কাগজে কলমে কিছু ফেরত গেলেও বাস্তবে অন্তত ৫ লাখ রোহিঙ্গা স্থানীয়দের সাথে মিশে গেছে। এবার ও আমার মনে হয় সহজে প্রত্যাবাসন হবে না। হলেও খুব অল্প তা হবে লোক দেখানো। আর রোহিঙ্গাদের কারনে আমরা অর্থনৈতিকভাবে চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছি। নিত্যপন্য থেকে শুরু করে সব কিছু এখন দ্বিগুন দামে কিনতে হচ্ছে। এছাড়া শ্রম বাজার তাদের দখলে চলে গেছে। এরা যতদিন থাকবে সমস্যা তত বাড়বে, তাই দ্রুত প্রত্যাবাসন ছাড়া কোন বিকল্প নেই। না হলে আমাদের জন্য আরো বড় বিপর্যয় অপেক্ষা করছে।
টেকনাফ কৃষকলীগের সভাপতি আবুল হোসেন রাজু বলেন, আমার অনেক আত্বীয় স্বজনের জমিতে এখন রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প করা হয়েছে। সরকার তাদের যে নির্দিস্ট ক্যাম্প করে দিয়েছে তারা সেখানে সংকোলন না হওয়াতে রাতে শত শত রোহিঙ্গা মিলে স্থানীয়দের ফসলি জমি এবং পাহাড়ী বনে আক্রমন করে জোরপূর্বক ঘর র্নিমান করছে। কোন স্থানীয়রা প্রশাসনের কাছে বিচার দিলে বিচার পাচ্ছে না। কিছু দিন আগে একটি গ্রামের কিছু নিরিহ উপজাতীদের রোহিঙ্গারা আক্রমন করে মারধর করে তাদের জমি জমা দখল করে নিয়েছে। এছাড়া প্রশাসন চেস্টা করলেও তাদের নিয়ন্ত্রনে রাখা যাচ্ছে না। তারা জেলাব্যাপী ছড়িয়ে পড়ছে।
কক্সবাজার চেম্বার অফ কমার্সের সভাপতি আবু মোর্শেদ চৌধুরী খোকা বলেন, আমরা প্রথম থেকে দেখছি বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বেশ কয়েক বার মিয়ানমার কে ফেরত নেওয়ার জন্য তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে। মিয়ানমার ও ১৫ জানুয়ারী সহ কয়েক দফা সময় দিয়েছিল কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয় নি। বরং এখন দেখছি প্রত্যাবাসন নিয়ে কোন আলোচনাই হচ্ছে না। সর্বশেষ ৪ দিন আগে চীন সরকারের পক্ষ থেকে যেভাবে পরিস্কার করে বলা হয় রোহিঙ্গারা ফিরতে দেরী হবে। কই বাংলাদেশের পক্ষ থেকেতো তার কোন প্রতিবাদ বা ব্যাখা চাওয়া হয়নি। আমার মতে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে আনা এবং প্রত্যাবাসনের নামে দীর্ঘসূত্রিতা সব কিছুর পেছনে একটি বড় আন্তর্জাতিক শক্তির হাতআছে। আমাদের সরকারের উচিত হবে সে গুলো খুজে বের করে সেখানেই কাজ করা। তাহলেই হয়তো কিছু হবে। যদি তারা দ্রুত ফেরত না যায় তাহলে আমাদের ইতিহাস ঐতিহ্য সংকটের মুখে পড়বে।
কক্সবাজার সরকারি কলেজের অর্থনীতি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক কামরুল আহসান বলেন,রোহিঙ্গা আসার ফলে অনেক স্থানীয় মানুষ বা ছেলে মেয়েরা চাকরী বা অন্যান্য কারনে কিছু আর্থিক সুবিধা পেলেও সেটা অস্থায়ী। বরং তারা যেভাবে আমাদের স্বাভাবিক জীবনের অর্থনৈতিক প্রবাহকে ঘুরিয়ে দিয়ে যাচ্ছে সেটার রেশ আমাদের দীর্ঘমেয়াদী টানতে হবে। রোহিঙ্গাদের কারনে কক্সবাজারের আঞ্চলিক অর্থনীতির ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। সেটা পোষাতে অনেক সময় লাগবে। তিনি বলেন মিয়ানমার সরকার তাদের স্বার্থগত কারনে রোহিঙ্গাদের ফেরত নিতে তাল বাহানা করবে কিন্তু আমাদের উচিত হবে আর্ন্তজাতিক শক্তিকে কাজে লাগিয়ে দ্রুত রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো।
কক্সবাজার দক্ষিন বন বিভাগের কর্মকর্তা আলী কবির জানান, ইতি মধ্যে ৬ হাজার একর বনভূমিতে রোহিঙ্গাদের ক্যাম্প বিস্তৃত হয়েছে। সামনের দিনে কি হয় জানি না। সকলেই জানে রোহিঙ্গারা আসার পর থেকে পাহাড়,জঙ্গল সংরক্ষিত বন ভুমি সব কিছুর বিশাল ক্ষতি হয়েছে। মানবিক দিক বিবেচনা করে রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দেওয়া হয়েছে সেটা ভাল তবে সেটা যদি দীর্ঘ মেয়াদী হয় তাহলে কক্সবাজারের পরিবেশ,জীব বৈচিত্র সহ আনুষাঙ্গিক অনেক কিছুর জন্য সমস্যা হবে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আরফাজুল হক টুটুল বলেন,কক্সবাজারে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের অপরাধমুলত কর্মকান্ডের জন্য এ পর্যন্ত ১৪৩ টি মামলা হয়েছে তার মধ্যে ২০৬ জন রোহিঙ্গা আসামীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে ১০ টি। তিনি বলেন রোহিঙ্গারা মাদক, চোরাচালান, ধর্ষন, পাচার, পতিতাবৃত্তি সহ নানান অপরাধে জড়িত আছে। তবে সবাই এক নয়। আর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ইতি মধ্যে ৫টি অস্থায়ী পুলিশ ক্যাম্প ১টি স্থায়ী এবং টেকনাফে একটি পুলিশ ক্যাম্প সহ মোট ৭ টি বিশেষ পুলিশ ক্যাম্পে বসানো হয়েছে সেখানে থেকে আইনশৃংখলা নিয়ন্ত্রন করা হচ্ছে।
এব্যাপারে কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন বলেন,রোহিঙ্গাদের মানবিক সহায়তা দেওয়ার কারনে পৃথীবির সবদেশের কাছে আমাদের সম্মান বেড়েছে। তবে এটা ঠিক যে বিপুল সংখ্যক রোহিঙ্গার কারনে আমাদের বিশেষ করে কক্সবাজারের জন্য বেশ কিছু সমস্যা হচ্ছে। তবে সরকার এবং এনজিও গুলোও ইতি মধ্যে স্থানীয়দের জন্য বিশেষ প্রকল্প নিয়ে কাজ করছে। এ সময় তিনি বলেন রোহিঙ্গারা যত দ্রুত তাদের নিজ দেশে ফেরত যায় ততই আমাদের জন্য মঙ্গল।

Top