মাদক বিরোধী যুদ্ধ বানচালের ষড়যন্ত্র

download-6.jpg

রফিকুল ইসলাম :
৩ মে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠা বার্ষিকী অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা মাদকের বিরুদ্ধে তার অবস্থান তুলে ধরে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন। ৪ মে থেকে দেশ ব্যাপী মাদকের বিরুদ্ধে যুদ্ধের ঘোষনা দিয়ে বড় ধরনের অভিযান শুরু হয়ে এ পর্যন্ত এ যুদ্ধে শতাধিক মাদক পাচারকারী নিহত হয়েছে। মাদক বিরোধী অভিযান চলমান থাকায় দেশ ব্যাপী সরকারের প্রতি সাধারন মানুষের যে অসন্তোষ রয়েছে তাতে কিছুটা স্বস্তি ফিরে আসছে। তবে শর্ষে এখনো পুরনো ভূত ঘাপটি মেরে থাকায় রাজনৈতিক ভাবে সরকারের উদ্দেশ্য, লক্ষ্য ম্লান করতে ওরা নানা ফন্দি ফিকির আটছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে।
বাংলাদেশ অনেক দেরিতে মাদক বিরোধী যুদ্ধের ঘোষনা দিলেও দক্ষিণ, দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া সংলগ্ন বেশ কিছু দেশ এ যুদ্ধ চালাচ্ছে কয়েক বছর ধরে। বিশেষ করে গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল খ্যাত লাওস, থাইল্যান্ডে এ যুদ্ধ চলছে দীর্ঘদিন ধরে। সম্প্রতি বিশ্ব ব্যাপী এ যুদ্ধে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া জন্ম দিয়েছে ফিলিপিনের প্রেসিডেন্ট দুর্তাতো। ইতিমধ্যে গত দুই বছরে এ যুদ্ধে দেশটিতে আট হাজার তিন শ’র মত মাদক ব্যবসায়ী ও সংশ্লিষ্টরা প্রাণ হারিয়েছে। জেলে গেছে প্রায় ৫ হাজার। ইন্দোনেশিয়ায় মাদকের বিরুদ্ধে জরুরী অবস্থা জারি রয়েছে। গত সপ্তাহে মালয়েশিয়া উদ্ধার করেছে বিশ্বের উল্লেখ যোগ্য পরিমাণের ১২ শ কেজির মত ইয়াবা ট্যাবলেট। আটক করেছে সংশ্লিষ্ট ৬ জনকে। ইয়াবা গুলো আসছিল মিয়ানমারের ইয়াংগুন বন্দর হয়ে সোনালী রং এর চা প্যাকেটে করে।
গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল মাদক উৎপাদন ও বিপননকারী দেশের অন্যতম মিয়ানমার। গত কয়েক দশক ধরে দেশটির ক্ষমতাসীন সেনাবাহিনী তাদের নিজেদের সাম্রাজ্যবাদ টিকিয়ে রাখতে দেশ জুড়ে সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্টির জন্ম দেয়। দ্যা থাং ন্যাশনাল লিবারেশন আর্মি, আরাকান আর্মি, মিয়ানমার ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি, ইউনাইটেড ওয়া স্টেট আর্মি, ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স আর্মি, কাচিন ইনডিপেনডেন্ট আর্মি, সান স্টেট প্রোগেসেস পার্টি সহ অনেক সশস্ত্র বিদ্রোহী গোষ্টি গুলোর মাধ্যমে ইয়াবা, আফিম, হেরোইন, মরফিন সহ হরেক প্রকারের মাদক দ্রব্য দক্ষিণ পূর্ব এশিয়া সহ চীন, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, ভারত হয়ে পাকিস্তান, ইরান ও আফগানিস্তানের গোল্ডেন ক্রিসেন্ট হয়ে মধ্য প্রাচ্য ও পশ্চিমা বিশ্বে ছড়িয়ে দিচ্ছে। কিন্তু বিভিন্ন দেশ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে গেলেও বড় ধরনের মাদক উৎপাদন ও বিপননকারী দেশ মিয়ানমার মাদক নির্মূলে উল্লেখ যোগ্য তেমন কোন ব্যবস্থা নিচ্ছে না বলে জাতিসংঘের মাদক বিরোধী অপরাধ সংস্থার দাবি। মিয়ানমারে ৪৫টির বেশী কারখানায় ইয়াবা উৎপাদন ও বিপনন করা হচ্ছে দেশটির সেনা নিয়ন্ত্রণে।
মাদকের প্রবেশ পথ ও সারাদেশে কোথায় কিভাবে মাদক পৌছে যাচ্ছে সে সম্পর্কিত সরকারী এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, মিয়ানমার সীমান্তের নাফ নদী জাদি মুরা থেকে নাফ নদী পর্যন্ত ১৪ কি:মিটার এলাকা উখিয়ার বালুখালী কাটা পাহাড়, ধামনখালী, রহমতেরবিল, আঞ্জুমান পাড়া, তুমব্রু সহ কয়েকটি পয়েন্ট এলাকা ইয়াবা পাচারের জন্য সব চেয়ে বেশী ব্যবহৃত ও পরিচিত রুট। বাংলাদেশে ইয়াবা প্রবেশ করার পর কক্সবাজার-টেকনাফ ৭৯ কি:মিটার সড়কে দুইটি পথ দিয়ে বিভিন্ন জায়গায় চলে যাচ্ছে। এ দুইটি পথের মধ্যে একটি টেকনাফ হয়ে উখিয়া ও অন্যটি টেকনাফ হয়ে মেরিনড্রাইভ ও এলজিইডি সড়ক। সম্প্রতি পার্বত্য এলাকা দিয়ে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া পর্যন্তু নতুন পাহাড়ি রুট দিয়েও ইয়াবা পাচার হচ্ছে বলে খবর পাওয়া যাচ্ছে। সমুদ্র পথে মিয়ানমারের ইয়ানগুন, আকিয়াব, মংডু সীমান্তবর্তী হতে চট্টগ্রাম বন্দর, আনোয়ারা, বাঁশখালী, নারায়নগঞ্জ, বরিশাল, পটুয়াখালী, ভোলা ও খুলনা এলাকায় পৌছে যাচ্ছে ইয়াবা।
প্রশ্ন উঠছে মাদক বড় বড় পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার হলেও পাচারকারীরা গ্রেফতার হচ্ছে না। এ ব্যাপারে দেশের ইয়াবা প্রবেশের প্রধান রুট টেকনাফ সীমান্তে নিরাপত্তায় নিয়োজিত ২বর্ডার গার্ড ব্যাটলিয়ান অধিনায়ক লেঃকর্ণেল মোঃ আসাদুদ জামান বলেন, বিজিবি সর্বদা মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে অভিযান পরিচালনা করে আসছে। নাফ নদী সংলগ্ন ৫৮ কি:মিটার নদী পথের পাহারা নিশ্চিত করতে বিজিবি চেষ্টা চালালেও যাতায়ত ও যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা বিশেষ করে রাতে অন্ধকারে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়। অনেক সময় রাতে অন্ধকারে নৌকাবর্তী ইয়াবা নিয়ে আসার খবর পেলেও ইয়াবা বহনকারী নৌকার কাছাকাছি বিজিবি পৌছার আগে পাচারকারীরা ইয়াবা নৌকা সহ ফেলে স্রোতের অনুকুলে পালিয়ে যায়। আর বিজিবিকে স্রোতের প্রতিকুলে ইয়াবা উদ্ধার করতে গিয়ে পাচারকারীকে ধরা কঠিন হয়ে পড়ে। তা ছাড়া পাচারকারীরা থাকে সর্বত্র সংঘবদ্ধ ও সশস্ত্র।
বিজিবি, কোস্ট গার্ড, পুলিশ সহ অন্যান্য আইন শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু দূর্নীতিবাজ সদস্যের রিরুদ্ধে ইয়াবা পাচারের অভিযোগ অনেক আগে থেকে। ২৮ মার্চ মোঃ আকায়েদ (২৫), কুমিল্লা ১০ বিজিবি সদস্যকে ৩৬০টি ইয়াবা নিয়ে ফিরোজ পুরে ঝালকাটি পৌর এলাকা থেকে আটক করে পুলিশ। চট্টগ্রাম গোয়েন্দা পুলিশের হাতে ইয়াবা নিয়ে আটক হন কোস্ট গার্ডের সদস্য লাট মিয়া ওরপে ইমন (২৮)। মার্চ মাসে উখিয়া থানার অয়াললেস অপারেটর সৌরভ বড়–য়া ১০ হাজার পিস ইয়াবা সহ উখিয়া থেকে চট্টগ্রাম মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের হাতে আটক হয়। একই মাসে উখিয়া থানা থেকে বদলি হওয়া এএসআই আনোয়ার চট্টগ্রাম গোয়েন্দা পুলিশের হাতে মোটা দাগের ইয়াবা নিয়ে আটক হয়। টেকনাফ-২ বিজিবি অধিনায়ক ইয়াবা পাচারের সাথে বিজিবি সদস্যদের সংশ্লিষ্টতার ব্যাপারে বলেন, কোন কোন ক্ষেত্রে এ ধরনের হয়ে থাকতে পারে। নিজস্ব লোকের ব্যাপারে বিজিবি কঠোর অবস্থানে থাকে সব সময়। চলতি মাসেও টেকনাফ বিজিবির উল্লেখ যোগ্য সংখ্যক সদস্যদের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। চট্টগ্রামের পুলিশের ডিআইজিও একই কথা বলেছেন।
গত বছরের ২৫ অক্টোবর টেকনাফ থেকে কক্সবাজার ফেরার পথে মেরিন ডাইভ রোডের শামলা পুর এলাকায় সেনাবাহিনীর তল্লাশি চৌকিতে একটি মাইক্রো বাস সহ আটক করা হয় কয়েকজন ডিবি পুলিশকে।
২৫ অক্টোবর কক্সবাজার শহর থেকে ডিবি পুলিশ টেকনাফের ব্যবসায়ী আব্দুল গফুরকে আটক করেছিল। তাকে ইয়াবা দিয়ে ক্রস ফায়ারে হত্যার হুমকি দিয়ে তার পরিবারের কাছ থেকে মোটা অংকের টাকা আদায় করে ঐ ব্যবসায়ীকে ছেড়ে দিয়েছিল। উক্ত টাকা নিয়ে কেটনাফ থেকে মেরিনড্রাইভ হয়ে কক্সবাজার ফেরার পথে কক্সবাজার ডিবি পুলিশের এসআই আবুল কালাম আজাদ, এএসআই মনিরুজ্জামান, এএসআই ফিরোজ, এএসআই মোস্তফা কামাল, এএসআই মোঃ আলা উদ্দিন, কনস্টেবল মোস্তফা আজমকে ১৭ লক্ষ নগদ টাকা সহ সেনাবাহিনীর তল্লাশি পোষ্টে দায়িত্বরত মেজর নাজির আহমদের নেতৃত্বে আটক করা হয়। এখনো ঐসব ডিবির কর্মকর্তারা জেল হাজতে রয়েছেন।
মাদক বিরোধী যুদ্ধে সফলতা তেমন উল্লেখ যোগ্য না হলেও টেকনাফের একরাম কমিশনারকে হত্যার মধ্যে দিয়ে সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে ষড়যন্ত্র চলছে প্রশাসনের ঘাপটি মেরে থাকা এক শ্রেণীর মাদক সংশি¯œষ্ট সুবিধা ভোগীরা। দেশের একাধিক তালিকা ভুক্ত গডফাদারদের আটক বা আইনের আওতায় আনার পরিবর্তে ঐ মহলটি তাদের নিরাপদে পালিয়ে থাকতে সহায়তা করছে বলে অভিযোগ উঠছে। যেমনটি এতদিন মাদক পাচার ও প্রসারে সহযোগীতা করে আসছিল তারা।
এসব অভিমত উখিয়া উপজেলা আওয়ামীলীগ সভাপতি অধ্যক্ষ হামিদুল হক চৌধুরী ও সহ-সভাপতি ও হলদিয়াপালং ইউপি চেয়ারম্যান অধ্যক্ষ শাহ আলম সহ উদ্বিগ্ন অভিভাবক মহলের। মাদক বিরোধী যুদ্ধ বানচাল করে সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাতীয় ও বৈষ্যিক অর্জন গুলো নস্যাৎ করতে জামায়াত-বিএনপি তাদের সমর্থিত সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের ঘাপটি মেরে থাকাদের দিয়ে ষড়যন্ত্র করছে। প্রশাসনের বিভিন্ন স্থরের এধরনের লোকজন দিনে ছাত্রলীগ, আওয়ামীলীগার আর রাতে তলে তলে বিএনপি জামাতের হয়ে কাজ করছে বলে তাদের অভিমত। কারন অভিযান চলাকালে ও বিভিন্ন স্থানে ইয়াবা পাচার ও আটকের ঘটনাও ঘটছে। গুটি কয়েক অসৎ দুর্ণীতিবাজ ও রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রকারীদের কাছে এ মহৎ যুদ্ধে পরাজিত হওয়া যাবে না। তাই যে কোন মূল্যে মাদক বিরোধী যুদ্ধে অবশ্যই বিজয়ী হয়ে দেশের আগামী প্রজন্মকে মাদক মুক্ত করে সুস্থ জাতি গঠন করতে হবে বলে তাদের অভিমত।

Top