অতিথি কলাম : মাদকবিরোধী অভিযান চলুক, তবে হত্যা বন্ধ হউক

1-5.jpg

মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট :
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনার যায়ীদ রা’দ আল হোসেইন বুধবার বাংলাদেশকে সন্দেহভাজন মাদক কারবারীদের বিরুদ্ধে বিচারবহির্ভুত হত্যা অনতিবিলম্বে বন্ধের আহ্বান জানিয়েছেন। ১৫ মে থেকে মাদকবিরোধী অভিযানে এ পর্যন্ত ১৩০ (এখন ১৩৮জন) জনের বেশী ব্যক্তি নিহত হওয়ার খবরে জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক দপ্তরের প্রধান গভীর উদ্বেগ জানিয়েছেন। আইন-শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর চলমান মাদকবিরোধী অভিযানে ’ক্রসফায়ার’, ’বন্দুকযুদ্ধ’ বা ’দুই দল মাদক কারবারীর মধ্যে সংঘাতে’ সন্দেহভাজনদের মৃত্যুকে বিচারবহির্ভুত হত্যা হিসেবে দেখছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়। এ দিকে নিউ ইয়র্কভিত্তিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতিতে ফিলিপিন্সের অনুকরণে বাংলাদেশে মাদকবিরোধী অভিযানের সমালোচনা করে অনতি বিলম্বে এ অভিযান স্থগিত করার আহ্বান জানিয়েছে। এর আগে ৩১ মে মানবাধিকার নিয়ে কাজ করা বিশ্বের ১৮৪টি বেসরকারী সংস্থার (এনজিও) জোট ইন্টারন্যাশনাল ফেডারেশন ফর হিউম্যান রাইটস ও এর অন্যতম সদস্য ’অধিকার’ এক বিবৃতিতে মাদকবিরোধী যুদ্ধে হত্যা বন্ধের আহ্বান জানায়।
বাংলাদেশের শান্তিপ্রিয় সাধারণ মানুষ চায় বিনা বিচারে হত্যা বন্ধ হলেও মাদকবিরোধী অভিযান অব্যাহত থাকুক। মাদকব্যবসায়ীসহ মাদক সেবনকারীদেরও ব্যাপকভাবে গ্রেপ্তার করা হউক। ঘটনাস্থলেই মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে সর্বোচ্চ শাস্তি দেওয়া হউক। সে দিন প্রকাশ্যে আদালতে একজন সরকারী আইন কর্মকর্তা পুলিশকে উদ্দেশ্য করে বলেন ’আপনারাই টাকার বিনিময়ে কারাগারেও মাদক সরবরাহ করেন’। সেই ধরনের ’শরিষার মধ্যে ভুত’ আইন শৃংখলা রক্ষাবাহিনীর সদস্যদেরও সাথে সাথে দন্ডিত করা হউক। শুধু ইয়াবা ব্যবসায়ীদের আলিশান বাড়ীগাড়ী নয় তাদের টাকা দিয়ে ক্ষমতাসীনদের যারা বিগত ৭/৮ বছরে স্বনামে বিনামে আলিশান বাড়ীগাড়ী,ফ্ল্যাট এর মালিক হয়েছেন তাদেরকেও দ্রুত অনুসন্ধান ও বিচারের আওতায় আনতে হবে। ’মূখে শেখ ফরিদ বগলে ইট’ নিয়ে ইয়াবা বিরোধী বড় বড় কথা বলে যে কর্মকর্তারা অবৈধভাবে বছরের পর বছর একই পদে থেকে সবার ’চোখে ধুলা’ দিয়ে যাচ্ছেন তাদেরকেও অবিলম্বে চাকুরীচ্যুত করে বিচারের আওতায় আনতে হবে। সারা দেশে গোপনে মাদকব্যবসায়ীদের সাথে ’লাইন রাখা’ মাদক দমন ও বিচারের সাথে সংশ্লিষ্ট এবং চরমভাবে ব্যর্থ প্রমাণিত কর্মকর্তাদের ব্যাপক রদবদল করেই মাদক বিরোধী অভিযান করতে হবে। তাই সংগত কারণে সাংবাদিকরা প্রশ্ন করছেন, শতাধিক মানুষ মাদকবিরোধী অভিযানের ’বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলেও একজনও প্রকৃত ’গডফাদার’ কি তাদের মধ্যে আছে? যাদের নাম জনগণ সরকারের বিভিন্ন এজেন্সীর প্রতিবেদনের সুত্র দিয়ে পত্রপত্রিকায় বিগত ৭/৮ বছর ধরে প্রকাশিত সংবাদ থেকে জেনেছেন। ইচ্ছা থাকলে প্রথম রাতেই বা প্রথম সপ্তাহেই গডফাদারদের নির্মূল করা যেত বা ধৃত করা যেত। কেন হয় নি? সরকারের ভিতরেই গডফাদারদের অনুগত লাইনের মানুষ আছে যারা ঘরে বসেই নিয়মিত চাঁদা পায়। এখন গডফাদাররা হয়ত আন্তর্জাতিক লবিস্ট ভাড়া করে আন্তর্জাতিকভাবে বাংলাদেশ সরকারের ওপরই মাদকবিরোধী অভিযান বন্ধ করার জন্য চাপ সৃষ্টি করতে সক্ষম হচ্ছে? এখন দেশে যেখানে সত্তর লক্ষ তরুণ-তরুণী মাদকাসক্ত হয়েছে বলে অনুমান করা হচ্ছে সেখানে সমাজের দায়িত্বশীল মানুষগুলো ঘরে বসে থাকতে পারেন না। মাদকাসক্তির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে। পরিবারের পিতামাতা মুরুব্বীদের দায়িত্ব নিয়ে দেখতে হবে সন্তানরা মাদকাসক্ত হয়েছে কিনা বা মাদকাসক্ত বন্ধুদের পাল্লায় পড়েছে কিনা। যদি মাদকাসক্ত হয়েই থাকে তবে না লুকিয়ে তাকে পারিবারিকভাবে চিকিৎসা করাতে হবে। প্রতি উপজেলায় সরকারীভাবে মাদক নিরাময় কেন্দ্র গড়ে তুলতে হবে। পরিবারের অবাধ্যদের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দন্ডিত করিয়ে হাজতে প্রেরণ করতে হবে। তবে আশংকার কথা হল হাজতেও টাকা দিলে ইয়াবাসহ অন্য মাদক পাওয়া যায়। সেই ব্যাপারে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে, মাদক পাচারের সাথে জড়িত কারারক্ষীকে শুধু চাকুরীচ্যুত করলে চলবে না তার বিরুদ্ধে নিয়মিত দুর্নীতির মামলাও করতে হবে। সর্বক্ষেত্রে দুর্নীতি বহাল রেখে মাদকবিরোধী যুদ্ধে জয়ী হওয়া অসম্ভব।
মাদকের বিরুদ্ধে সরকার ঘোষিত যুদ্ধ সাধারণ মানুষকে সচেতন করেছে, দায়িত্বশীল করছে। পত্রপত্রিকায় ও ফেসবুকে লেখালেখি পড়লে তা বুঝা যায়। গতকাল ফেসবুকের কসউবিয়ানে মোহিবুল মোক্তাদির তানিম কক্সবাজার হাইস্কুলের সাবেক ও বর্তমান ছাত্রদের মাদক নামক দানবের বিরুদ্ধে এক ঘন্টা হাইস্কুলে দাঁড়িয়ে প্রতীকী প্রতিবাদ করতে,মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা সৃষ্টি করতে ও মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াতে আহ্বান জানিয়েছেন। এ আহ্বানকে সমর্থন করে বিভিন্ন জন কমেন্টস করেছেন,নিজস্ব মতামত দিয়েছেন। সমাজে সচেতনতা সৃষ্টি হচ্ছে,দায়িত্বশীলতা বৃদ্ধি পাচ্ছে এটা তার প্রমাণ। প্রশাসনের ও ক্ষমতাসীনদের ক্ষুদ্র অথচ একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ ইয়াবা ব্যবসায়ীদের ব্যবসা চালিয়ে যাওয়ার পক্ষে আছেন। বাস্তবক্ষেত্রে এমনও অভিযোগ পাওয়া যায় যে যারা ইয়াবার বিরুদ্ধে কথা বলে তাদের মুখ বন্ধ করার জন্য কয়েক শ পিস ইয়াবা পকেটে দিয়ে প্রতিবাদকারীকেও আসামী করা চালান দেওয়া হয়েছে। আইন শৃংখলা বাহিনীর কতিপয় অসাধু সদস্য তাতে সক্রিয় সহায়তা করেছে। আমাদের সমাজের সচেতন মানুষগুলো যদি একতাবদ্ধ হন পরম শক্তিশালী ইয়াবার গডফাদারদের বিরুদ্ধে কিছুই করতে না পারলেও ইয়াবা বা মাদকের ব্যবহার পরিবারে,সমাজে কমাতে পারবেন,বন্ধ করতে পারবেন। মাদকের ব্যবহার না থাকলে, মাদক ক্রেতা না থাকলে, চাহিদা না থাকলে ঝুকি নিয়ে গডফাদাররা আর চোরাইপথে মাদক আমদানী করবে না। সমাজের সচেতন মানুষগুলো একতাবদ্ধ হয়ে যে যেভাবে পারেন ইয়াবা তথা মাদক ব্যবসায়ীদের ঘৃণা করার সাথে সাথে নতুন মাদকসেবী যাতে সৃষ্টি না হয়, আর ’এডিকটেড’ মাদক সেবনকারীদের সংশোধন করার জন্য শাস্তিপূর্ণভাবে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে পারেন এবং দেশের স্বার্থে, দেশের ভবিষ্যৎ বংশধরদের স্বার্থে তা করা আবশ্যক।
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Top