প্রাণের ক্যাম্পাস আল-ফুয়াদ!

mamn.jpg
॥  মমতাজ আহমদ ॥
মানুষের বয়স বাড়ার সাথে সাথে মেধা, চিন্তুা-চেতনা, আচার-আচরণ, স্থান-অবস্থান প্রভৃতি বদলায়। বিয়ে, শিক্ষা, কর্ম, আত্মীয়তা নামের দোলনায় ছড়ে বেশিরভাগ মানুষ আজ এখানে কাল ওখানে। কিন্তু প্রত্যেক স্থানে মানুষ কিছু না কিছু স্মৃতি রেখে যায়। আমার জীবনেও কিছু কিছু স্মৃতি এখনও আমাকে কাঁদায় আবার কখনও হাসায়। শিক্ষার কয়েকটি স্তর রয়েছে। সুস্থ মস্তিষ্কে শিক্ষা জীবনের ইতিহাস বিচরণ করলে স্মৃতিতে ভেসে উঠার কথা, যারা স্কুল জীবন পাড়ি দিয়ে কলেজ জীবনে পা দিয়েছে কিংবা কর্মযুগে পদার্পন করেছেন তাদের প্রত্যেকের কাছে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে কাটানো সময়টায় সবচেয়ে বেশি রাঙানো বা স্মৃতিময়। আমার বেলায়ও তার ব্যতিক্রম নয়। আমার প্রাণের বিদ্যালয় বা ক্যাম্পাসের নাম আল-ফুয়াদ একাডেমী। খুব অল্প বয়সেই আমার স্কুল জীবন শুরু হয়। শিশু শ্রেণী কিংবা প্রথম শ্রেণীতে আমার পড়া হয়নি। শিশু শ্রেণীতে ভর্তি হতে গিয়েছিলাম খুনিয়াপালং সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ে (আমার মনে নেই, বাবা বলেন)। কিন্তু আমার পিতারও শিক্ষক সব্বির আহমদ স্যার আমার কাছে কয়েকটা প্রশ্ন করার পর আমি উত্তর দিতে পারায় নাকি স্যার আমার পিতাকে পরামর্শ দেন আমাকে শিশু কিংবা প্রথম শ্রেণীতে ভর্তি না করিয়ে সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি করাতে। স্যারের পরামর্শে আমার উচ্চ আকাঙ্খাময়ী পিতা তাতে সম্মতি প্রকাশ করেন। তাই দ্বিতীয় শ্রেণী থেকেই আমার শিক্ষাজীবন শুরু। একদিকে অল্পবয়সে লেখাপড়া অন্যদিকে সরাসরি দ্বিতীয় শ্রেণীতে ভর্তি, সবমিলিয়ে প্রাথমিকে ফেলে আসা দিনগুলো আমার তেমন রাঙানো ছিল না। প্রাথমিক শেষ করেই ভর্তি হলাম খুনিয়াপালং ইউনিয়নের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ, ইউনিয়নের তথা পার্শ্ববর্তী কয়েকটি ইউনিয়নেরও অবহেলিত গ্রাম-গঞ্জের উচ্চ শিক্ষা বিলাসী হাজার হাজার ছাত্র/ছাত্রীর মাধ্যমিক পর্যায়ের একমাত্র পাঠশালা রাবেতা হাসপাতালস্থ আল-ফুয়াদ একাডেমীতে (উচ্চ বিদ্যালয়)। আর এ বিদ্যালয়ের প্রতিটি শিক্ষকের শিক্ষা, বড় ভাইদের স্নেহময়ী ভালবাসা, সহাধ্যায়ীদের বন্ধুসূলভ আচরণ সবমিলিয়ে পাঁচ বছরের সেই শিক্ষা ক্যারিয়ারে আল-ফুয়াদের ক্যাম্পাসটাই হয়ে উঠে আমার প্রাণের ক্যাম্পাস।
ফুরফুরে মেজাজ ছিল ঠিকই তবুও মনে সংশয় ও প্রচুর ভয় নিয়ে প্রথম দিন যখন বিদ্যালয়ে প্রবেশ করি মনে হল নতুন এক ভুবনে মোর হল পদচলা। এই দু’চোখ যেন অদৃষ্টপূর্বে ডুব দিয়ে বসে আছে। সেই খেলার মাঠ থেকে শুরু করে বিদ্যালয় প্রাঙ্গন, বিদ্যালয়ের পিছনে সেই নদ (খাল), নিজ শ্রেণীতে বসে থাকা সহপাঠী (কয়েকজন ছাড়া), আধ ঘন্টা পর পর শিক্ষকদের ক্লাসে পদচারণা সবই যেন অচেনা মনে হয়েছিল সেদিন।
দিন-মাস-বছর পালাবদলের সাথে সাথে সহপাঠীদের সাথে বন্ধুত্বের বাধন সৃষ্টি ও শিক্ষকদের প্রাণখোলা ভালবাসার কথা আজও মস্তিষ্কের এক কোনায় জমাট বেধে থাকা স্মৃতির সাথে মনের তীব্র ঘর্ষণের ফলে অশ্রুতেই সমাপ্তি ঘটে। ভাবনার দুয়ারে এখনো হেসে-খেলে বেড়ায় সহপাঠীদের সাথে টেবিলের উপর কলম খেলা, আড্ডা দেয়া, গরমের সময় খালে ঝাঁপ দিয়ে গোসল করা, শ্রেণী বিভাজনে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেট-ফুটবল খেলা, দৌড় প্রতিযোগিতা, মাঝে মধ্যে বৃহষ্পতিবার সংগীতানুষ্ঠান, নিয়মিত এসেম্বলি ক্লাস ছাড়াও আরও কত কি? সবমিলিয়ে একটি প্রাণবন্ত ক্যাম্পাসের নামই ছিল আল-ফুয়াদ।
বর্তমানে সবই অতীত। প্রাক্তনের তকমা লেগে গেছে মুখমন্ডলে। সেই প্রাণের ক্যাম্পাসটিতে বার বার যেতে মন চাইলেও এখন আর তেমন যাওয়া হয় না। যখন বিদ্যালয় থেকে বিদায় নিয়েছিলাম তখন মনে হতো প্রতিদিনই আসবো। বিদ্যালয়তো রাস্তার পাশেই, গাড়ি থেকে নেমেই ডুকে পড়বো। এখনও ক্যাম্পাসটির পাশ দিয়ে কোথাও গমন করলে বার বার ফিরে ফিরে থাকায় এবং স্মৃতির সেই দিনগুলো দোলা দেয় এই মনে। কিন্তু ব্যস্ততা যে এভাবে প্রাণের ক্যাম্পাসটিতে যেতে বাধা হবে তা কল্পনাই ছিল না। তারপরও সময়-সুযোগে, শিক্ষকদের ডাকে সাড়া দিয়ে মাঝে-মধ্যে আসা-যাওয়া। ক্যাম্পাসটিতে গেলেই আজকের ক্যাম্পাস আর তখনকার ক্যাম্পাস নিয়ে পার্থক্য খুঁজে বেড়ায়।
হ্যা, তাইতো আজ যে ক্যাম্পাসটি চোখে পড়ে সে ক্যাম্পাস কিন্তু তখন ছিল না। বিদ্যালয়ে এখন নতুন ভবন। সবুজের সমারোহ। সবুজ গাছের সারির মাঝ দিয়ে বিদ্যালয়ের প্রবেশ পথ। ছায়ায় মাড়ানো বিদ্যালয় প্রাঙ্গন। যেন এ এক নতুন ক্যাম্পাস। সবুজ-ছায়ার কথার মাঝে আবদুল হক স্যারকে একবার স্মরণ করছি। তাঁকে এ কাজে সর্বপুরি সহযোগিতা করার জন্য আমার সময়ে থাকা (১৯৯৯-২০০৩) প্রধান শিক্ষক মোস্তাফা দিদার চৌধুরী স্যার, জাফর আলম স্যার, শামশুল আলম স্যার, আজিম উদ্দিন স্যার, এহেছানুল করিম স্যার, মোঃ ইসমাঈল স্যার, মোহাম্মদ সেলিম স্যার, সুলতান আহমদ স্যারদেরও শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করছি। কেননা বিদ্যালয়ের আজকের সৌন্দর্যমন্ডিত এ ক্যাম্পাসের পিছনে তাদের অবদান সত্যিই প্রশংসার দাবী রাখে।
আমার শিক্ষা জীবনের (১৯৯৯-২০০৩) আগে-পরে হয়তো আরও অনেক শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী বিদ্যালয়টিকে আজকের এ অবস্থানে আনতে অতুলনীয় অবদান রেখে গেছেন, যা আমার জানা নাই। এ লেখাটিতে তাদের নাম অন্তর্ভুক্ত করতে না পারায় ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি। আমার পরবর্তী লেখায় অবশ্যই আমি তাদের অবদানের কথা তুলে ধরতে চেষ্টা করব। বিদ্যালয়টিকে ঘিরে আমার একটি বড় আকারের আর্টিকেল লেখার ইচ্ছে রয়েছে। ‘আল-ফুয়াদ ১৯৮৪-২০১৮’ নামের লেখাটিতে সকলের অবদানের কথা তুলে ধরার চেষ্টা করব। লেখাটি নিয়ে অনেকদূর এগিয়েছিও। বাকী শুধু শিক্ষকদের তথ্য নেয়া।
যাহোক, শেষ পর্যায়ে যেহেতু চলে এসেছি, আমার জীবনে বিদ্যালয়টিতে ঘটে যাওয়া দুটি সত্য গল্প বলে ইতি টানবো। এর একটি অকল্পনীয় আর একটি শিক্ষনীয়।
অকল্পনীয় ঃ প্রাথমিকের গন্ডি পেরিয়ে মাধ্যমিকে আল-ফুয়াদ একাডেমীতে (উচ্চ বিদ্যালয়) ভর্তি হয়েছিলাম। অবাক করার বিষয় এখানেই, এ বিদ্যালয়ের প্রথম দিনই আমার কাছে স্মরণীয় হয়ে রইল।
প্রথম দিনের প্রথম ক্লাসটা করালেন জাফর স্যার। সবার নাম ডাকা শেষেও আমার নামই ডাকল না স্যার। হয়তোবা আমি শুনি নাই। কিন্তু এরকম টানা ১৬ দিন (শুক্রবার ব্যতীত) আমার নাম ডাকা হয়নি। এটাও একটা রহস্য……….। এখানে লিখলাম না। আমার পিতাকে নিয়ে ১৭তম দিনে বিদ্যালয়ে হাজির হলাম। কারণ আমি নতুন ছিলাম স্যারদের কিছু বলতে ভয় লাগতো। আমার পিতার কথা শুনেতো বিদ্যালয়ে হাসির রুল পড়ে যায়। আমার রুল নম্বর ছিল ৯। আর এ রুল নাম্বারে অন্যজনের নাম ডাকা হতো। শেষ পর্যন্ত এদিন থেকেই আমার নাম ডাকা শুরু হয়।
শিক্ষনীয় ঃ ইসমাইল স্যার বাংলা দ্বিতীয় পড়াতেন। খুব শান্ত স্বভাবের ছিলেন বলে স্যারের পড়া খুব কম ছাত্র-ছাত্রীই শিখতেন। একদিন হঠাৎ ইসমাঈল স্যারের ক্লাসে ডুকে পড়লেন শামশু স্যার। সকল ছাত্র-ছাত্রীরা বলা শুরু করল, স্যার এখন আপনার ক্লাস না, এখন ইসমাইল স্যারের ক্লাস। স্যার বললেন, আমি এ ক্লাসই নিতে এসেছি। সবাইতো অবাক! ইসমাঈল স্যার ক্লাস নেয়ার জন্য দরজা পর্যন্ত আসলেন। কিন্তু শামশু স্যার ইসমাঈল স্যারকে বললেন, আজকে আপনার ক্লাসটি আমিই নিচ্ছি। এরপর শামশু স্যার একে একে সবার কাছে প্রশ্ন করা শুরু করলেন। কিন্তু কেউই একটি প্রশ্নেরও (বাগধারা) উত্তর দিতে পারে নি। তখন স্যার সবাইকে বুঝিয়ে দিলেন কোন বিষয় নিয়ে অবহেলা করতে নেই এবং সবাইকে মারলেনও। সবাই এরপর থেকে এ বিষয়টি নিয়মিত পড়তেন। কেননা যেকোন দিনতো শামশু স্যার ডুকে পড়তে পারেন।
বিদ্যালয়টিকে ঘিরে স্মৃতির শেষ নেই। আরো যে কত স্মৃতি জড়িয়ে রয়েছে, ছড়িয়ে রয়েছে তার কোন ইয়ত্তা নেই। স্মৃতিময় সেই প্রাণের ক্যাম্পাসে যেতে চাই এরকম অনেক সাবেক শিক্ষার্থী রয়েছেন তারা চেষ্টা করেও ব্যস্ততার কারণে যেতে পারছেন না।
আর এ স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে বিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র/ছাত্রীরা অনেকবার চেষ্টা করেছেন একটা পুনর্মিলনীর আশায়। কিন্তু প্রতিবারই কোন না কোন কারণে তা সম্ভব হয়নি (জানা যায়, একবার ছোট্ট পরিসরে হয়েছিল, কিন্তু সেখানে তেমন উপস্থিতি ছিল না)। কিন্তু এবার হচ্ছেই! আগামী ১৮ জুন ঈদ পুনর্মিলনীর আয়োজন করেছেন প্রাক্তন ছাত্র/ছাত্রীরা। আর তাতে কঠোর পরিশ্রমও করে যাচ্ছেন প্রাক্তন ছাত্রদের মধ্যে কয়েকজন। তাদের নাম বলাটা আমার কর্তব্য। কিন্তু কয়েকজনের নাম বলতে গিয়ে একজন ত্যাগীর নাম বাদ পড়ে যাক তা আমি চাই না এবং এর দায়ও নিতে চাচ্ছি না। আয়োজক কমিটিও এব্যাপারে সম্মত রয়েছেন।
যারা পুনর্মিলনের আয়োজন করে একটি মহৎ উদ্যোগ নিয়েছেন তাদের সাধুবাদ জানানোর ভাষা হয়তো আমাদের জানা নেই। ভুল-ত্রুটি থাকতে পারে। তারপরও তাদের এ চেষ্টা যেন প্রশংসনীয়। অনেকে কিন্তু এখনও পর্যন্ত এ ব্যাপারে জানেনই না। কিন্তু তারপরও এখন পর্যন্ত প্রায় ৫০০ জনের মতো ছাত্র-ছাত্রী উক্ত দিনে পুনর্মিলনে উপস্থিত হতে রেজিষ্ট্রেশন সম্পন্ন করেছেন। সবারই একটি বাসনা একবার দেখে আসি সেই প্রাণের ক্যাম্পাসটিকে এবং অনেকদিন ধরে যেসব বন্ধুদের সাথে সাক্ষাত নেই তাদেরও একবার জড়িয়ে ধরে কুশল বিনিময় করি।
যারা এখনও রেজিষ্ট্রেশন করেন নি তাদের প্রতি অনুরোধ, সকল রাগ-ঢাক ভুলে গিয়ে মিলিত হয় সেই প্রাণের ক্যাম্পাসে আগামী ১৮ জুনে। তাই শীঘ্রই রেজিষ্ট্রেশন করে নিন। সবশেষে এ লেখায় কোন প্রকার ভুল থাকলে ক্ষমার চোখে দেখার অনুরোধ রইল।
এ লেখা সম্পর্কে কোন মন্তব্য থাকলে ও তথ্য দেয়ার থাকলে ইমেইলে জানাতে পারেন।
ই-মেইল : mamtaz.cox1990@gmail.com
এছাড়া এসএমএস পাঠাতে পারেন এ নাম্বারে-০১৭৬৭৮৮৫১২২।
লেখক ঃ প্রাক্তন ছাত্র, আল-ফুয়াদ একাডেমী।
Top