শবে কদরের ফজিলত

2k-april-29-2018_34593.jpg

॥ হাফেজ মাওলানা মুহাম্মাদ নূরুল হক ॥
শবে কদরের ইবাদত হাজার মাসের ইবাদতের চেয়ে উত্তম। এ রাতে সিদরাতুল মুনতাহায় অবস্থিত অগণিত ফেরেশতাসহ হজরত জিবরাইল (আ.) দুনিয়ায় অবতীর্ণ হন এবং ফেরেশতারা দুনিয়ার সমস্ত অংশে ছড়িয়ে পড়েন। প্রত্যেক স্থানে স্থানে রুকুসিজদা করেন। মুমিন নরনারীর জন্য দোয়ায় মশগুল হন। (তাফসিরে ইবনে কাসির)। এই মহান রজনীতে আল্লাহ তাআলা অসংখ্য গুনাহগারকে মাফ করেন, তওবা কবুল হয়। এ রাতে মাতাপিতা ও আত্মীয়স্বজনের রুহের মাগফিরাতের উদ্দেশ্যে তাদের কবর জিয়ারত ও তাঁদের জন্য দোয়া করলে আল্লাহ কবুল করেন।
এ রাতে পড়ার জন্য রাসুল (সা.) যে দোয়া শিখিয়েছেন তার অর্থ হলো, ‘আল্লাহ আজকের রাতে আমাকে শবে কদরের ফজিলত দান করুন, আমার কাজকর্ম সহজ করে দিন, আমার অক্ষমতা মার্জনা করুন, আমার পাপসমূহ ক্ষমা করুন।’ পবিত্র ও মহিমান্বিত রাতে আল্লাহর রহমত ও মাগফিরাত থেকে যারা বঞ্চিত থাকবে: মদখোর, মাদকদ্রব্য ব্যবসায়ী; মাতাপিতার অবাধ্য সন্তান; আত্মীয়তার সম্পর্ক ছিন্নকারী, ইচ্ছাকৃত নামাজ ভঙ্গকারী, বিনা কারণে অপর মুসলমান ভাইয়ের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্নকারী। (তাফসিরে কাশফুল আসরার, প্রথম খ-, পৃষ্ঠা: ৫৬৪)।
উপরোক্ত দোষে যারা দোষী এ রাতের বরকত পাওয়ার জন্য প্রথমেই তাদের তওবা করতে হবে। তাদের তওবা আল্লাহ কবুল করার পরই তারা এই রাতের ফজিলত লাভ করবে। এ রাতে যারা নিজের অপরাধ ক্ষমা চেয়ে এবং আল্লাহর রহমত কামনা করে কাঁদবে, তাদের দোয়া কবুল হবে। শুধু নামাজের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এ রাতে তিলাওয়াতে কোরআন জিকির, ইস্তিগফার, তাসবিহ পাঠ, বেশি বেশি দরুদ শরিফ পড়া একান্ত করণীয়।
শবে কদরে উম্মতের বৈশিষ্ট্য:
শবে কদর উম্মতের জন্য আল্লাহ পাকের মহান দান। এটা কেবল এ উম্মতেরই বৈশিষ্ট্য। হজরত আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, আল্লাহ তাআলা শবে কদর আমার উম্মতকেই দান করেছেন; পূর্ববর্তী উম্মতকে নয়।
ইমাম মালিক (রহ.) সূত্রে বর্ণিত আছে, যখন রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সংবাদ দেওয়া হলো যে, আপনার উম্মতের বয়স অন্যান্য উম্মতের তুলনায় কম হবে, তখন তিনি আল্লাহর সমীপে নিবেদন করলেন, হে আল্লাহ! তাহলে তো পূর্ববর্তী উম্মতগণ দীর্ঘ জীবন পেয়ে ইবাদত ও সৎকর্মের মাধ্যমে যে স্তরে উপনীত হয়েছে, আমার উম্মত সে স্তর লাভ করতে পারবে না। এর পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তাআলা রাসুল আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে লাইলাতুল কদর দান করেন এবং এটাকে হাজার মাসের চেয়েও উত্তম বলে ঘোষণা দেন।
শবে কদর কোন রাতে?
এ সম্বন্ধে সাহাবায়ে কিরামের যুগ থেকে মতভেদ চলে আসছে। এ প্রসঙ্গে প্রায় চল্লিশটি বক্তব্য আছে। মুসলিম শ?িরফে হজরত উবায় ইবনে কাআব (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, শবে কদর হলো রমজানের ২৭তম রাত। হজরত আবদুল্লাহ ইবনে আব্বাস (রা.), হজরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) হজরত মুয়াবিয়া (রা.) প্রমুখ সাহাবি থেকেও অনুরূপ বক্তব্য বর্ণিত আছে। কোরআনহাদিসের সুস্পষ্ট বর্ণনাদৃষ্টে প্রতীয়মান হয় যে শবে কদর রমজান মাসে আসে; কিন্তু এর সঠিক কোনো তারিখ নির্দিষ্ট নেই। বুখারি শরিফ ও মুসলিম শরিফে বর্ণিত হাদিসের আলোকে বলা যায়, শেষ দশ দিনের বিজোড় রাতগুলোতে শবে কদর হওয়ার সম্ভাবনা বেশি।
হাদিসের আলোকে আরও জানা যায়, রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে যখন এর তারিখ ভুলিয়ে দেওয়া হয়, তখন তিনি বলেছিলেন, সম্ভবত এতে তোমাদের জন্য কল্যাণ নিহিত আছে। অর্থাৎ যদি এ রাত নির্দিষ্ট করে দেওয়া হতো, তবে অনেক অলস প্রকৃতির মানুষ শুধু এ রাতে ইবাদতবন্দেগিতে নিয়োজিত হতো। অবশিষ্ট সারা বছর ইবাদতবন্দেগি না করে আল্লাহ তাআলার রহমত হতে বঞ্চিত থাকত।
দ্বিতীয়ত, এ রাত নির্দিষ্ট করা হলে কোনো ব্যক্তি ঘটনাক্রমে রাতটিতে ইবাদত করতে না পারলে সে দুঃখ ও আক্ষেপ প্রকাশ করতে করতে অনেক সময় নষ্ট করে দিত।
এতে সে মাহে রমজানের বরকত থেকে বঞ্চিত হয়ে যেত। এ রাত যেহেতু নির্দিষ্ট করা হয়নি, সে জন্য এ রাতের সন্ধানে আল্লাহর সব বান্দা প্রতি রাতে ইবাদতবন্দেগি করে থাকেন এবং প্রত্যেক রাতের জন্য পৃথক পৃথক পুণ্য অর্জন করতে থাকেন।
আল্লাহ পাক আমাদের সবাইকে শবে কদরের কল্যাণ লাভ করার তাওফিক দিন, কোরআন পড়ার, কোরআন বোঝার, কোরআনমতো জীবন গড়ার তাওফিক দান করুন। আমিন, ছুম্মা আমিন! (সংকলিত)।

Top