রোহিঙ্গা ক্যাম্পে বিপর্যয়ের শংকা দেয়াল ধ্বসে শিশু নিহত

Ukhiya-Cox.-Rafique.-11.06.2018.doc-2.jpg

রফিকুল ইসলাম :
উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে গতকাল সোমবার সকালে মাটির দেয়াল চাপা পড়ে এক শিশু ঘটনা স্থলে নিহত হয়েছে। এ বছর সবেমাত্র শুরু হতে চলেছে বর্ষাকাল। বঙ্গোপসাগরে লঘু চাপের জন্ম না হলে বর্ষা আসতে আরো দেরি হতে পারতো। চাষবাস, কৃষি খামার প্রভৃতির জন্য স্থানীয় লোকজনের জন্য বর্ষাকাল আর্শীবাদ হলেও আশ্রয় নেয়া লক্ষ লক্ষ রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের জন্য বর্ষা মৌসুম অভিশাপের মত হচ্ছে। বর্ষার শুরুতে বড় ধরনের বিপর্যায় না ঘটলেও গত তিন দিনের টানা মাঝারি বৃষ্টিতে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির গুলোর অবস্থা ভর বর্ষায় কি ঘটতে যাচ্ছে যেন তার আভাষ দিতে শুরু করেছে। যে ভাবে পাহাড় টিলা, গাছ পালা কেটে সাবাড় করা হয়েছে তাতে স্থানীয় লোকজন ও সংশ্লিষ্ট বিশেষজ্ঞরা অনেক আগে এ ধরনের বিপর্যয়ের আশংকা করে আসছিল।
গতকাল সোমবার সকাল আটটার দিকে উখিয়র কুতুপালং ক্যাম্প-৭ এ ই-৩ ব্লকে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু আব্দুস শুক্কুরের ঘরের মাটির দেয়াল চাপা পড়ে তার তিন বছরের শিশু মোঃ ফারুক ঘটনা স্থলে নিহত হয়েছে। এ সময় শিশুটি ও তার মা ঘুমিয়ে ছিল। শিশুটি মারা গেলেও তার মা আহত হয়েছে বলে কুতুপালং অনিবন্ধিত রোহিঙ্গা শিবির ব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি সিরাজুল মোস্তফা জানিয়েছেন। ইতিপূর্বে রোববারের প্রবল বৃষ্টি ও দমকা হওয়ায় কুতুপালং ও বালুখালী মেগা ক্যাম্প সহ অন্যান্য আশ্রয় শিবিরে অন্তত তিন শত রোহিঙ্গার ঝুপড়ি ঘর মাটি ধ্বসে বিধ্বস্থ হয়। গতকাল সোমবার সকাল থেকে বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ার প্রকোপ কিছুটা কম ছিল।
উখিয়া ও টেকনাফের ৩০টি রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরের প্রায় সব গুলো পাহাড় ও টিলার উপরে, ঢালুতে ও নিচু ভূমিতে ঘরগুলো প্রতিষ্ঠা করা হয়। এসব রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির নির্মান করতে গিয়ে নির্বিচারে কাটা হয়েছে শত শত একর বন বিভাগের পাহাড় ও টিলা ভূমি। উজাড় করা হয়েছে লক্ষ লক্ষ বনায়নের গাছ। রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের আশ্রয় শিবির নির্মানে পরিবেশ বিধ্বংসী এ ধরনের কর্মকান্ডে সে থেকে স্থানীয় লোকজন ও বিভিন্ন ত্রাণ কর্মীরা মানবিক বিপর্যয়ের আশংকা করে আসছিল। অবশেষে তাদের আশংকায় সত্যি প্রমাণিত হল বর্ষার প্রথমে। গত তিন দিনের টানা বৃষ্টিতে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ভূমি ধ্বসের ঘটনায় তিন শতাধিক আশ্রয় স্থল বিধ্বস্থ ও কয়েক শতাধিক লোক আহত হয়েছে।
কুতুপালং ও বালুখালী মেগা ক্যাম্পের স্থানীয় বেশ কয়েকজন রোহিঙ্গা জানিয়েছেন রোহিঙ্গাদের আশ্রয় শিবির গুলো টিলা বা পাহাড়ের উপরে অথবা পাহাড়ের খাদে ও নিচে বাস করছে এসব রোহিঙ্গারা। রোহিঙ্গা শরনার্থীদের জন্য তৈরী করা হয়েছে ঘর। যে গুলো অস্থায়ী ত্রিপলের ছাউনি ও বেড়া দিয়ে নড়বড় ভাবে নির্মিত। জাতিসংঘ শরনার্থী বিষয়ক হাই কমিশন, অভিবাসন সংস্থা আইওএম, আন্তর্জাতিক রেডক্রস ও রেডক্রিসেন্ট সোসাইটি সহ বিভিন্ন ত্রাণ কর্মীরা অনেক আগে থেকেই দুই লক্ষের মত রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু ভূমি ধ্বস, পাহাড় ধ্বস, বন্যা ও জলবদ্ধতার কবলে পড়ে চরম ঝুঁকিতে রয়েছে বলে দাবি করে আসছে। সামান্য ঝড় বৃষ্টিতে বিপর্যস্থ হয়ে পড়ছে রোহিঙ্গা শিবিরের জীবন। তাদের আশংকা কেবলই বাংলাদেশে বর্ষাকাল শুরু হয়েছে যখন ভর বর্ষাকালে অবিরাম বৃষ্টিতে পাহাড়ি ঢল, নদী ও খালের ঢল সহ পাহাড় ধ্বসের ঘটনা শুরু হবে তখন এ বিপর্যয়কর অবস্থা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়বে। উখিয়ার পালংখালী ইউপি চেয়ারম্যান গফুর উদ্দিন চৌধুরী বলেন স্থানীয় লোকজন বার বার পাহাড়, টিলা, গাছপালা ও বন বাদুড় উজাড়ের ব্যাপারে উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। কিন্তু স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্থ লোকজনের সে উদ্বেগের কোন পাত্তা সংশ্লিষ্ট এনজিও গুলো না দেওয়ায় এ বর্ষার শুরুতে সামান্য হালকা বৃষ্টির পর যে অবস্থা শুরু হয়েছে তাতে ভর বর্ষা মৌসুমে কি ঘটবে তা সহজে অনুমান করা যায়। তবে এসবের জন্য দায়ী থাকতে হবে যেসব এনজিও বা সেবা সংস্থা গুলোকে যারা এখানকার পাহাড় টিলা গাছপালা উজাড় করছে তাদেরকে। গতকাল উখিয়ার বালুখালী, কুতুপালং, ময়নার ঘোনা, বার্মা পাড়া সহ কয়েকটি রোহিঙ্গা ক্যাম্প ঘুরে দেখা গেছে ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরিন যাতায়াত ব্যবস্থা খুবই নাজুক অবস্থায় পড়েছে। কোথাও হাঁটু পরিমাণ কাদা, সড়কগুলো পিচ্ছিল হয়ে পড়েছে। এসব কাদা ও পিচ্ছিলতা মাড়িয়ে লাখ লাখ উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের ত্রাণ, চিকিৎসা সহ যাবতীয় সাহায্য সহযোগীতা নিতে হচ্ছে। পাহাড় ও টিলা কেটে যত্রতত্র মাটি ফেলায় ক্যাম্পগুলোর অভ্যন্তরে নিচু জায়গা গুলোতে দেখা দিচ্ছে জলাবদ্ধতা। ক্যাম্পের সংলগ্ন খাল ও ছড়া গুলো ভরাট হয়ে পানি চলাচলের বিঘœতা সৃষ্টি হচ্ছে। পাহাড় ও টিলা কাটার লক্ষ লক্ষ টন মাটি ধুয়ে খাল ও ছড়া বেয়ে স্থানীয় লোকজনের আবাদি জমিতে পড়ছে।

Top