ভারী বর্ষণে জেলায় পানিবন্দি ৬ লক্ষাধিক মানুষ

ZahirChakaria413.06.2018.docx.jpg

কক্সবাজার রিপোর্ট :
প্রবল মৌসুমী বায়ুর প্রভাবে ভারী বর্ষণে জেলার অধিকাংশ এলাকা এখন প্লাবিত। চারদিকে পানি আর পানি। বৃষ্টি অব্যাহত থাকায় পানি আরো বাড়তে পারে বলে আভাস দিয়েছে আবহাওয়া অফিস। গেল ২৪ ঘন্টায় কক্সবাজারে রেকর্ড ১৫৫ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত হয়েছে বলে জানিয়েছে আবহাওয়া অফিস। বন্যায় বাড়িঘর পানিতে নিমজ্জিত হওয়ায় বানবাসি মানুষ আশ্রয় নিচ্ছে আত্মীয় স্বজনের বাড়ি কিংবা বিভিন্ন আশ্রয় কেন্দ্রে। ইতোমধ্যে বন্যার কারনে ঘর ছেড়েছে ২ লক্ষাধিক নি¤œাঞ্চলের মানুষ। বন্যার কারনে মানুষের চরম ভোগান্তি এবং খাদ্য – বিশুদ্ধ পানি সংকটের আশংকা হতে পারে। প্রবল বর্ষণ এবং পানির তীব্রতায় শহরের কলাতলীর লাইট হাউজ এলাকায় , সৈকতপাড়া, ঘোনারপাড়া ,লারপাড়া, ঝিরঝিরিপাড়া, এবং রামুর মিঠাছড়ির কাইম্যা ঘোনা, হিমছড়ির পাহাড়ে পাদদেশে বসবাসকরা লোকজনকে নিরাপদে সরে যেতে জেলা প্রশাসন তৎপরতা চালিয়ে যাচ্ছে। জোয়ারের পানি এবং পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলে বাঁকখালী ও মাতামুহুরীতে ভাঙ্গন এলাকা দিয়ে পানি প্রবেশ করে ৩ শতাধিক গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। উভয় নদীতে পানি বিপদসীমার উপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। বাকঁখালী নদীতে জোয়ারের পানি স্বাভাবিকের চেয়ে ৫ সেন্টিমিটার বৃদ্ধি পেয়েছে। বন্যার পানির ¯্রােতে বাকঁখালী নদীর রক্ষা বাধেঁর বিলীন হওয়া বিভিন্ন পয়েন্ট দিয়ে পুনরায় পানি প্রবেশের কারনে তলিয়ে গেছে বির্স্তিণ এলাকা। বন্ধ রয়েছে বাকঁখালী নদীর ড্রেজিং কাজ। প্রবল বর্ষনের কারনে প্রধান ও উপ সড়ক সমুহ আবারো ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। জনজীবনে নেমে এসেছে স্থবিরতা। গতকাল অফিস আদালতে কার্যক্রম ছিল সীমিত।
গতকাল কয়েকটি এলাকা ঘুরে দেখা গেছে বন্যার তীব্রতার চিত্র। সবচেয়ে বেশি পানি বন্যার কবলে পড়েছে কক্সবাজার সদর, রামু, চকরিয়া, কুতুবদিয়া, পেকুয়া, মহেশখালী এবং উখিয়া। সদরের পোকখালী, ইসলামপুর, চৌফলদন্ডী, ঈদগাও, জালালাবাদ, পিএমখালী, ঝিলংজা, ভারুয়াখালী। প্লাবিত হয়েছে রামুর ফতেখারকুল, রাজারকুল, মিঠাছড়ি, চাকমারকুল, জোয়ারিয়ানালা, কাউয়ারখোপ, রশিদ নগরের কিছু অংশ।
ঝিলংজা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান টিপু সুলতান ও পিএমখালীর চেয়ারম্যান মাস্টার আবদুর রহিম জানান, কক্সবাজার সদরের বাকঁখালী নদীর তীরবর্তী গ্রামসমুহ বিশেষ করে বাংলাবাজার ,পিএমখালী, খরুলিয়া, নয়াপাড়া, ঘাটকুলিয়াপাড়া, মুক্তার কুল, পাতলি, চাঁন্দের পাড়া, এসএমপাড়া, খুরুস্কুল,তেতৈয়া,ভারুয়াখালী, মুহসিনিয়াপাড়া, ধাওনখালী গ্রামে বন্যার পানি প্রবেশ করায় মৎস্য ঘের,নতুন করে গজানো বীজতলা ডুবে গেছে। উপ সড়ক, কাচাঁ রাস্তা,অবকাঠামোসমুহ ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। বন্যার পানির প্রবল ¯্রােতের তোড়ে আগে তলিয়ে যাওয়া বাকঁখালী নদীর প্রায় ২০০ মিটার পর্যন্ত রক্ষাবাধঁ দিয়ে পানি প্রবেশ করায় মানুষ ঘর ছাড়তে শুরু করেছে। বন্যার কারনে ২শতাধিক চিংড়িঘের পানিতে তলিয়ে গেছে। বন্যার পানি বৃদ্ধির কারনে বিভিন্ন ইউনিয়নের উপ সড়ক দিয়ে যান চলাচল বন্ধ থাকায় শহরের সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।
এদিকে ধাওনখালী এলাকার চিংড়ি ঘের মালিক নুরুল আমিন ও রাশেদুল আলম জানান, ভারুয়াখালী নদীর রক্ষা বাঁধ তলিয়ে যাওয়ায় শতাধিক মৎস্য খামারের প্রায় কোটি টাকার মাছ পানিতে ভেসে গেছে। নতুন করে প্লাবিত হচ্ছে আরো মৎস্যঘের।
অপরদিকে প্রবল র্বষনের কারনে রামুর বির্স্তিণ এলাকা আবারো প্লাবিত হয়েছে। রামুর মিঠাছড়ি, চাকমারকুল, রাজারকুল, জোয়ারিয়ানালা, নন্দাখালী, ফতেখারকুল, লম্বরী পাড়া, শ্রী মুরাসহ বিভিন্ন গ্রামে পানি প্রবেশ করায় বন্যা চরম আকার ধারন করার আশংকা রয়েছে। রামু ও সদরের কৃষকের প্রাণখ্যাত বন্যার প্রবল ¯্রােতের কারনে মন্তার গুদা, রামুর গুল্যাছড়ির গুদা বন্যার প্রবল ¯্রােতের কারনে হুমকির মুখে পড়েছে।
এদিকে বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে কক্সবাজার-টেকনাফ সড়কের বিভিন্ন পয়েন্ট। আর এতে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে কক্সবাজার-টেকনাফ সরাসরি সড়ক যোগাযোগ। গত কয়েকদিনের টানা বর্ষন ও পাহাড়ী ঢলে মহাসড়ক তলিয়ে যাওয়ায় বুধবার সকাল ৭ টা থেকে যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
মিঠাছড়ি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ইউনুচ ভুট্টো জানান, গতকাল ভোর থেকে বাঁকখালী নদীতে প্রবল বন্যা নামলে কক্সবাজার-টেকনাফ মহাসড়কের চেইন্দা, বাংলাদেশ বেতারের কক্সবাজার কেন্দ্র গেইট, ও কাঁঠি রাস্তার মাথা পয়েন্টসহ কয়েকটি স্থানে প্রায় এক কিলোমিটার সড়ক কোমর পানিতে তলিয়ে যায়। এ ছাড়াও থাইনখালীতে রাস্তার উপর পানি প্রবাহিত হচ্ছে। এতে গতকাল সকাল সাতটা থেকে যাত্রীবাহী বাস চলাচল বন্ধ রাখা হয়। রাস্তা পানিতে নিমজ্জিত থাকায় উভয় পার্শ্বে শত শত যানবাহন আটকা পড়ে। অমাবস্যা তিথির প্রবল জোয়ার হওয়ায় বন্যার পানি নামতে পারছেনা। সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় ঈদে ঘরমুখো শতশত যাত্রী গাড়ীতে আটকা পড়ে। মালবাহী ট্রাক আটকা পড়ায় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী সরবরাহ করতে সমস্যা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। ট্রাক ড্রাইভার আবদুল হাকিম জানান, চট্টগ্রাম থেকে মালামাল নিয়ে টেকনাফ যাওয়ার পথে চেইন্দায় এসে ভোর থেকে বসে থাকতে হয়েছে। বাস ড্রাইভার কাজল জানায়, গতকাল ভোরে টেকনাফ থেকে ট্টিপ নিয়ে কক্সবাজারের উদ্যেশ্যে ছেড়ে এসে থাইনখালী পৌঁছার পর দেখা যায় সড়কের উপর পানি। ফলে সামনে আর অগ্রসর হতে না পেরে যাত্রীদের নামিয়ে দিতে হয়েছে।
বন্যার কারনে কুতুবদিয়া, মহেশখালী, চকরিয়া, টেকনাফের বিভিন্ন গ্রামে বন্যা হওয়ার কারনে সাধারণ মানুষের ভোগান্তির পাশাপাশি আর্থিক ক্ষতি হয়েছে ব্যাপক।
এদিকে মহেশখালীতে বন্যা পরিস্থিতি মারাত্বক আকার ধারন করেছে। চালিয়াতলিতে পাহাড়ি ঢলে প্রধান সড়ক কোমর পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় মহেশখালীর সাথে সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। এছাড়া কালারমারছড়া মিজ্জিরপাড়া প্রধান সড়কে একটি কালভার্ট ধসে পড়ায় সড়ক যোগাযোগ বন্ধ রয়েছে। মাতারবাড়ি সংযোগ সড়ক ও ঢুবে যাওয়ায় চলাচল বন্ধ রয়েছে। পানি আরো বৃদ্ধি পাচ্ছে।
এদিকে আমাদের চকরিয়া অফিস জানায়, চকরিয়ায় পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে মাতামুহুরী নদী থেকে লোকালয়ে তীব্র বেগে ঢলের পানি ঢুকে যাচ্ছে। মঙ্গলবার দিবাগত রাতে চকরিয়া উপজেলার কোনাখালী ইউনিয়নের কইন্যারকুম নামক এলাকায় ২টি ও বরইতলীর মুন্সি ঘোনা নামক এলাকায় ১টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে যায়। চকরিয়ার উজানের দিকে কয়েকটি ইউনিয়নে বন্যার পানি সামান্য কমে আসলেও উপকূলীয় এলাকার ৫টি ইউনিয়নে বন্যার পানি বাড়ছে।
সরজমিনে গিয়ে দেখা যায়; উপজেলার কোনাখালী কইন্যারকুম নামক এলাকায় মাতামুহুরী নদীর তীরের বেড়িবাঁধ ২টি স্থানে ভেঙ্গে গেছে। ওই ভাঙন দিয়ে মাতামুহুরী নদী থেকে তীব্র বেগে লোকালয়ে পাহাড়ী ঢলের পানি ঢুকে যাচ্ছে। এলাকাবাসি জানায়; ওই ভাঙন ২টি দিয়ে পানি ঢুকে বিএমচর, কোনাখালী, পূর্ববড়ভেওলা, পশ্চিম বড়ভেওলা, ঢেমুশিয়া ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় চলে যাচ্ছে। এ ছাড়াও বরইতলী ইউনিয়নের মুন্সির ঘোনা নামক এলাকায় ১টি স্থানে বেড়িবাঁধ ভেঙ্গে গেছে। কক্সবাজার পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের নির্বাহী প্রকৌশলী সাবিবুর রহমান জানান; কইন্যার কুমের ভাঙনটি আগে থেকে ঝুকিপূর্ণ ছিল। পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের শাখা কর্মকর্তা ও কর্মীরা এখনও সেখানে আরও ব্যাপক ভাঙন রোধে চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। এ ছাড়া বন্যার পানি মাতামুহুরী নদীর উজানের দিকে সুরাজপুর-মানিকপুর, কাকারা ও লক্ষ্যারচরে পানি কিছুটা কমেছে। তবে উপকূলীয় এলাকার দিকে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। মাতামুহুরী নদীর পানি বুধবারও বিপদসীমার প্রায় ১ফুট উপর দিয়ে প্রবাহিত হয়েছে। সুরাজপুর-মানিকপুর ইউপি চেয়ারম্যান আজিমুল হক জানান; তার ইউনিয়নের উত্তর মানিকপুর ও দক্ষিণ সুরাজপুরের ব্যাপক এলাকার বাড়িঘর থেকে এখনও পানি সরে যায়নি। ওই এলাকার সহ¯্রাধিক বন্যাদূর্গত মানুষ এখনও পাশের পাহাড়ে কোন রকমে আশ্রয়ে রয়েছেন। এদিকে বুধবার চকরিয়া পেকুয়া আসনের এমপি আলহাজ্ব মোহাম্মদ ইলিয়াছ কইন্যারকুম এলাকায় বেড়িবাঁধের ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করে জরুরী ভিত্তিতে বেড়িবাঁধের ভাঙন বন্ধ করার আশ্বাস দেন। এসময় বিএমচর ইউপি চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম, পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ঈমান আলী, শাখা কর্মকর্তা তারেক বিন ছগির উপস্থিত ছিলেন। পানি উন্নয়ন বোর্ড়ের শাখা কর্মকর্তা তারেক বিন ছগির বলেছেন; এসব ভাঙনগুলো ঈদের পরে বন্ধ করার ব্যবস্থা নেয়া হবে। বৃষ্টি অব্যাহত থাকলে চকরিয়ায় বন্যা পরিস্থিতি আরও অবনতি হওয়ার আশংকা রয়েছে।
॥ গর্জনিয়া-কচ্ছপিয়া ও নাইক্ষ্যংছড়িতে মরে যাচ্ছে ১ কোটি টাকার শসা ক্ষেত ॥
আমাদের নাইক্ষ্যংছড়ির স্টাফ রিপোর্টার জানান, নাইক্ষ্যংছড়ি,রামুর গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়া ইউনিয়নে ১ কোটির শসা ক্ষেত মরে যাচ্ছে রোববার থেকে টানা ৪ দিনের বর্ষণে । উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে তলিয়ে যাওয়া পানিতে দীর্ঘ সময় ডুবে থাকায় এ অবস্থার সৃষ্টি হয় শসা চাষের। ফলে ্এখানকার ৫ শত শসা চাষি চরম হতাশা ও ক্ষতির মুখোমূখিতে দিন যাপন করছে বর্তমানে।
শসা চাষি মো: জসিম জানান, এ বছর নাইক্ষ্যংছড়িতে শসা চাষির সংখ্যা আনুমানিক ১ শত। পাশাপাশি অপর চাষি জাফর আলম ও নুরুল হাকিম জানান,গর্জনিয়া ও কচ্ছপিয়ায় এর সংখ্যা প্রায় ৪ শত। এ দুটি ইউনিয়ন রামু উপজেলার। আবার এ দু ইউনিয়ন দুটিকে জেলায় শস্য ভান্ডারও বলা হয় দীর্ঘ দিন ধরে। কেননা এখানে জন সংখ্যার শতভাগই কৃষক। ্ঋতুভেদে কৃষকের চাষ পরিবর্তন হয়,মাঠে নামে পালাবদল করে তারা। আর এ সব ফলন হয় আশানূরূপ ও লাভের। বিশেষ করে প্রতিটি রমজানের সময়ে তাদের আগ্রহ সামান্য বেশী থাকে।
চলতি সনেও পবিত্র রমজানকে সামনে রেখে চাষিরা শসা চাষে নামে আগ্রহ ভরে। এতে ফলন হয় খুবই ভালো। যাথারীতি রমজানে শুরু হয় বেচা-বিক্রি । ব্যয়ের টাকা আসতে শুরু করে তাদের । এতে শসা চাষিদের ঘরে খুশির জেয়ার বইতেও শুরু করে। যদিও এ শসা চাষ করতে তাদের খরচ হয় দ্বিগুন টাকা আর তিন গুন শ্রম। কিন্তু শসা বিক্রি করে অতিরিক্ত লাভ গুনতে আশায় বুক বেঁধে ছিল আসন্ন ঈদুল ফিতরে পরিবার-পরিজনের ঈদ আনন্দ ভাগ করার । কিন্তু তাদের এ ভাগ্যে শনির দশা মেনে আসে টানা বষর্ণের সেই পানি। যে পানি গত মঙ্গলবার সকাল ৫ টা থেকে সন্ধ্যা ৮ টা পর্যন্ত ১৬ ঘন্টা তলিয়ে রেখে এলাকার ৫ শত কৃষকের সব শসা ক্ষেত । বুধবার দিন পানি কমে গেলে এ শসা চাষ মরে যেতে শুরু করে সর্বত্র।
সিকান্দর ও মো: হোসেন সহ অসংখ্য শসা চাষি জানান,ফুলে-ফলে ভরপূর তাদের শসা চাষ এখন মৃত্যু পূরী। সবই মরে যাচ্ছে-যাবে । এ অবস্থা দেখলে কান্না আসে তাদের। কেন বার এমন হয় তাদের ভাগ্যে।

Top