প্রত্যাবাসন নিয়ে শংকা : অসংখ্য রোহিঙ্গার ভার নিয়ে বিশ্ব শরনার্থী দিবস পালিত

Ukhiya-Cox-Rafique.-20.06.2018.doc-1.jpg

রফিকুল ইসলাম :
অসংখ্য রোহিঙ্গা শরনার্থীর ভার নিয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মত বাংলাদেশেও পালিত হয়েছে বিশ্ব শরনার্থী দিবস। দিবসটি উপলক্ষে বিশ্বের সর্ব বৃহৎ উদ্বাস্তু শিবির কুতুপালং ক্যাম্পে বিভিন্ন কর্মসূচীর মধ্য দিয়ে দিবসটি উৎযাপন করা হয়েছে। বিশ্ব শরনার্থী দিবসে কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পে গতকাল বুধবারও রোহিঙ্গারা মানব বন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে। বিশ্ব শরনার্থী দিবসে স্থানীয় লোকজন ও উদ্বাস্তু রোহিঙ্গারা প্রত্যাবাসন নিয়ে মিয়ানমারের টাল বাহানায় শংকা প্রকাশ করেছে।
২০ জুন গতকাল বুধবার বিশ্ব শরনার্থী দিবসকে সামনে রেখে প্রতি বছর জাতিসংঘ শরনার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরের গ্লোবাল ট্রেন্ডস একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। রিপোর্টে জোর পূর্বক বাস্তুচ্যুতির উপর ইউএনএইচসিআর, সরকার ও অন্যান্য সহযোগী সংস্থা কর্তৃক সংগৃহীত তথ্য তুলে ধরা হয়। মঙ্গলবার প্রকাশিত প্রতিবেদনে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রাষ্ট্রহীন উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের আন্তর্জাতিক সুরক্ষার প্রয়োজনীয়তার গুরুত্ব আরোপ করা হয়। গত বছরের আগষ্টে মিয়ানমারে নৃশংস সহিংসতা চলাকালে বিশাল সংখ্যাগরিষ্ট শরনার্থী বাংলাদেশে প্রবেশ করে। যা গত দুই দশকের মধ্যে এ অঞ্চলে সব চেয়ে বড় এবং দ্রুত তম শরনার্থী প্রবাহ ছিল। এ প্রেক্ষিতে উখিয়া ও টেকনাফের বিভিন্ন শরনার্থী শিবিরে জাতিসংঘ সহ একাধিক সেবা সংস্থা বিভিন্ন কর্মসূচী পালনের মধ্যে দিয়ে রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশ্ব শরনার্থী দিবসটি পালন করেছে বলে খবর পাওয়া গেছে।
ইউএনএইচসিআর এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৭ সালে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে নতুন করে আশ্রয় নেয়া ৬লাখ ৫৫ হাজার ৫শ রোহিঙ্গা নিবন্ধিত হয়েছে। যা শরনার্থী সংখ্যার মধ্যে বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম। আশ্রয় দাতা দেশের মধ্যে তুরস্ক নতুন শরনার্থী নিবন্ধের সংখ্যা সব চেয়ে বৃহত্তম। দেশটি সিরিয়ার ৬লাখ ৮১ হাজার অধিবাসীদের অস্থায়ী সুরক্ষা প্রদান করেছিল। উখিয়ার কুতুপালং ও বালুখালী এখন বিশ্বের বৃহত্তম এবং সব চেয়ে ঘন বসতিপূর্ণ শরনার্থী আশ্রয় স্থল। ঘন বসতিপূর্ণ শরনার্থী আশ্রয় স্থলে দুর্যোগময় আবহাওয়ার সময় বিশেষ করে মে থেকে সেপ্টেম্বরের মধ্যে বর্ষা মৌসুমে নিরাপত্তা জনিত ঝুঁকি বাড়ছে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে ২০১৭ সালে ২৭ লাখের অধিক শরনার্থী তাদের বাড়ি থেকে অন্য দেশে পালিয়ে যেতে বাধ্য হয়। যাদের অধিকাংশ দক্ষিণ সুদান, সিরিয়া ও মিয়ানমার থেকে পালিয়ে গেছে।
উখিয়া ও টেকনাফে বর্তমানে অবস্থান করছে ১১লাখের বেশী রোহিঙ্গা শরনার্থী। এসব রোহিঙ্গারা চার দফায় বাংলাদেশে প্রবেশ করে। তারা দীর্ঘদিন ধরে অবস্থান করায় বর্তমানে বাংলাদেশে জন্য শরনার্থী সমস্যা উল্লেখ যোগ্য বোঝা হয়ে দাড়িয়েছে। তাদের প্রত্যাবাসন বন্ধ রয়েছে প্রায় ১৩ বছর ধরে। নতুন করে রোহিঙ্গা সংকটও ১০মাস পার হয়েছে। নতুন আসা রোহিঙ্গাদের ফেরাতে মিয়ানমারের সাথে বাংলাদেশের সাথে সমঝোতা স্মারক চুক্তি স্বাক্ষর হয়েছে সাত মাস আগে। সম্প্রতি জাতিসংঘের সাথেও মিয়ানমার রোহিঙ্গা প্রতাবাসন নিয়ে আরো একটি সমঝোতা স্মারক চুক্তি করেছে। কিন্তু এ প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু নিয়ে দিন দিন অনিশ্চয়তা ও শংকা বাড়ছে। তাই দিন যত গড়াচ্ছে রোহিঙ্গা ক্যাম্প গুলোতে বাড়ছে খুন সহ নানা অপরাধ ও অস্থিরতা।
শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশন অফিস সূত্রে জানা যায় ১৯৯০ সালে অনুপ্রবেশ করা রোহিঙ্গাদের মধ্যে সব শেষ ২০০৫ সালে ৫ মেয়ে এক পরিবারের দুই জন সহ ৯২ জন নিজ দেশ মিয়ানমারে ফিরে যায়। ঐ সময় ২লাখ ৫০ হাজার ৮৭৭ জন রোহিঙ্গা উখিয়া ও টেকনাফে ১৯টি আশ্রয় শিবিরে আশ্রয় নিয়েছিল। ১৯৯২ থেকে ২০০১ সালের মধ্যে ২লাখ ৩৩ হাজারের মত রোহিঙ্গা শরনার্থীকে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো হয়েছিল। ঐ সময় তালিকাভুক্ত ও মিয়ানমারের ছাড়পত্র প্রাপ্ত আরো ৯ হাজারের বেশী রোহিঙ্গা আটকা পড়ে। এর পর প্রত্যাবাসন বন্ধ হয়ে যায়। ২০১২ তিন জুন মিয়ানমারে প্রাদেশিক রাজধানি সিত্তয়ে একটি সাম্প্রদায়িক ঘটনায় সেখানকার রোহিঙ্গা সুমলিমদের উপর সহিংসতা ছড়িয়ে পড়লে প্রাণ বাঁচাতে পালানো শুরু করে রোহিঙ্গারা।
এসময়ও বাংলাদেশে আশ্রয় নেয় তারা। ২০১৬ সালের ৯ অক্টোবর রাখাইন রাজ্যে সীমান্তে পুলিশ ছাউনিতে সন্ত্রাসীর হামলা ঘটনা ঘটে। তখন মিয়ানমার সরকার এ হামলার জন্য রোহিঙ্গা সন্ত্রাসীদের দায়ী করে পরদিন মিয়ানমারের সেনারা সন্ত্রাসী দমনের নামে রোহিঙ্গাদের উপর অমানবিক নির্যাতন শুরু করে। এসময় সেনাবাহিনী গ্রামের পর গ্রাম ঘিরে ধরপাকড়, হত্যা, ধর্ষন, বাড়ি ঘরের অগ্নিসংযোগ ও লুটপাট শুরু করে। ঐ সময় ৮৭ হাজার রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেয়। সর্বশেষ ২০১৭ সালে ২৪ আগষ্ট দিবাগত রাতে রাখাইনের আইন শৃংখলা ৩১টি নিরাপত্তা চৌকিতে একযোগে হামলার ঘটনা ঘটে। আবারও শুরু হয় অপারাধী দমনের নামে রোহিঙ্গাদের উপর মানবতাবিরোধী অপরাধ। পরদিন ২৫ আগষ্ট থেকে প্রাণ বাঁচাতে উদ্বাস্তুদের ঢল নামে।
এ সময়ে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের সংখ্যা নিয়ে জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে ভিন্ন মত রয়েছে। তবে এ যাত্রায় আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা সাত লাখের বেশী বলে জানা গেছে। উখিয়ার বালুখালী-১ রোহিঙ্গা ক্যাম্পে নেতা আবুল ফয়েজ ও কুতুপালং মধুর ছড়া ক্যাম্পের রোহিঙ্গা নেতা মাষ্টার জালাল উদ্দিন বলেন, আমরা নিজ দেশে ফিরতে চাই। তবে নাগরিক অধিকার সহ আমাদের নুন্যতম মানবাধিকার সহ পুণঃপ্রতিষ্ঠা করতে হবে। রাখাইনে অন্যান্য জাতিগোষ্টির ন্যায় রোহিঙ্গাদের যাবতীয় অধিকার নিয়ে চলাফেরা করার সুযোগ দিতে হবে। আমরা এভাবে আর বাস্তুহারা হয়ে থাকতে চাইনা। গতকাল বিশ্ব শরনার্থী দিবসেও উখিয়ার কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পে কয়েকশ রোহিঙ্গা মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে।
রোহিঙ্গা নেতা ডাক্তার জাফর আলম বলেছেন রোহিঙ্গাদের মধ্যে ৯৫শতাংশ অশিক্ষিত ও অজ্ঞ। তাদের মধ্যে কোন ধরনের সামাজিক বা অন্যান্য দায় দায়িত্ব নেই। হাতে গুনা যে কয়জন শিক্ষিত স্বজ্জন ব্যক্তি রয়েছে তাদেরও এসব উগ্রপন্থি রোহিঙ্গারা বেছে বেছে হত্যা ও অরাজকতা করছে। শরনার্থী ত্রাণ ও প্রত্যাবাসন কমিশনার আবুল কালাম বলেন, ২০০৫ সালের জুলাই থেকে রোহিঙ্গা শরনার্থী প্রত্যাবাসন কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। কোন কারন ছাড়াই মিয়ানমার এ কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে। মিয়ানমার সরকার রোহিঙ্গাদের নিজ দেশের নাগরিক হিসেবে স্বীকৃতি দিতে নারাজ। তিনি বলেন, নতুন সমঝোতা চুক্তির পরও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে মিয়ানমারের কাজ থেকে আশানুরুপ অনুকূল সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। প্রথম দফায় দেওয়া তালিকা মাত্র ৮শতাংশ অনুমোদন দিয়েছে ৮হাজার রোহিঙ্গার মধ্যে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের জন্য সর্বোচ্চ মানবিকতা দেখালেও তাদের জন্য স্থায়ী অবকাঠামো করা যাবে না। এ মুহুর্তে রোহিঙ্গাদের নিরাপদে স্বদেশ পাঠানো জরুরী বলে তিনি মনে করেন।

Top