অতিথি কলাম : টেকনাফের ‘ইয়াবা বাড়ী’ রিকুইজিশন করা প্রসঙ্গে

1-5.jpg

॥ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট ॥

গত ২৬ জুন ২০১৮ আন্তর্জাতিক মাদক বিরোধী দিবসে কক্সবাজারে আয়োজিত আলোচনা সভায় প্রধান অতিথি জেলা প্রশাসক মোঃ কামাল হোসেন বক্তৃতায় বলেছেন,কক্সবাজারের টেকনাফ সীমান্তের ’ইয়াবা বাড়ীগুলো’ রিকুইজিশন করা হবে। সীমান্তে ইয়াবা ব্যবসায়ীদের অবৈধ আয়ের টাকায় নির্মিত এসব বাড়ীর তালিকা করার কাজ শুরু হয়েছে। সীমান্তে গত ৭/৮ বছরে নির্মিত কমপক্ষে দুই শতাধিক ইয়াবা বাড়ী গত মাসের মাদক নির্মূল অভিযান শুরু হওয়ার পর থেকে এসব বিলাস বহুল বাড়ী ফেলে আত্মগোপনে চলে গেছেন ইয়াবা ব্যবসায়ী হিসেবে এলাকায় চিহিৃত বাড়ীর মালিকরা। এ সব বাড়ী রিকুইজিশন করে রোহিঙ্গা শিবিরে কর্মরত সরকারী চাকুরীজীবীদের বসবাসের ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ সিদ্ধান্তের সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ার পর সাধারণ মানুষ এ ঘোষণাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে অনেকে প্রশ্ন করছেন শুধু টেকনাফ কেন? কক্সবাজার জেলার অন্যান্য উপজেলায় নির্মিত ইয়াবা বাড়ীগুলো বাদ যাবে কেন? ইয়াবা ব্যবসায়ের সমস্ত টাকা কি শুধু ইয়াবা ব্যবসায়ীরাই ভোগ করেন? সংবাদপত্রে প্রকাশিত বিভিন্ন প্রতিবেদন থেকে অনুমান করা যায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার কতিপয় লোভী কর্মকর্তা/কর্মচারীও ইয়াবা টাকার ভাগ পেয়ে থাকেন। অনেক সরকারী কর্মকর্তা/কর্মচারীকে,আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যকেও ইয়াবাসহ গ্রেপ্তার করার সংবাদও পত্রিকায় পড়ে জনগণ হতাশ হন। আবার আইন প্রয়োগকারী সংস্থার দায়িত্বশীলরা তাদের নিজেদের সহকর্মীকে ছাড় না দিয়ে ইয়াবাসহ হাতেনাতে গ্রেপ্তার করার সংবাদে আশাবাদী হন। শুধু টেকনাফ উপজেলা বা কক্সবাজার জেলা নয় সমস্ত বাংলাদেশে গত ৭/৮ বছরে নির্মিত বিলাসবহুল কোটি টাকার বাড়ী ও ফ্ল্যাট বৈধ আয়,সাদা টাকা দিয়ে নির্মিত বা ক্রয় করা হয়েছে কিনা এবং তা ক্রেতা বা নির্মাতার দৃশ্যতঃ বৈধ আয়ের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা তা আয়কর বিভাগের কর্মকর্তারা/দুদকের কর্মকর্তারা সব সময় প্রচলিত আইনে অনুসন্ধান করে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পারেন। কথিত মাদক ব্যবসায়ীদের বিনা বিচারে ’বন্দুকযুদ্ধে’ হত্যা করার চেয়ে মাদক ব্যবসা ও ঘুষ-দুর্নীতির মাধ্যমে দ্রুত অর্জিত বাড়ী/গাড়ী আইনানুগভাবে রিকুইজিশন বা বাজেয়াপ্ত করাকে জনগণ অধিক সমর্থনযোগ্য মনে করেন। অবৈধভাবে অর্জিত বাড়ী/গাড়ী,ধনসম্পত্তি পরিবারের সদস্যদের ভোগ করার সুযোগ বহাল রেখে শুধু মাদক ব্যবাসীয়দের হত্যা করলে মাদক পাচার,ব্যবসা বন্ধ হবে না। ইতোমধ্যে মাদকবিরোধী অভিযানে প্রায় দেড়শত মানুষ হত্যা করার পরও মাদক পাচার বন্ধ হয় নাই। টেকনাফের বিজিবি সুত্রে জানা যায় মার্চ মাসে ২১ লাখ ৬ হাজার ইয়াবা মূল্য ৬৩ কোটি ২০ লাখ টাকা, এপ্রিলে ৯ লাখ ৭৯ হাজার ৬৬৪ পিচ ইয়াবা মূল্য ২৮ কোটি ৩০ লাখ, মে মাসে ৭ লাখ ৪২ হাজার ৮১২ পিচ মূল্য ২১ কোটি ৫৫ লাখ টাকা উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে। জুন মাসেও প্রচুর ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। যে পরিমাণ জব্দ করা হয়েছে তার চেয়ে আরো ২০ গুণ পরিমাণ ইয়াবা দেশের অভ্যন্তরে পাচার করা হয়েছে তা অনুমান করা যায়। তা হলে কি বন্দুকযুদ্ধে প্রায় দেড় শত ইয়াবা ব্যবসায়ীকে হত্যা করার পরও ইয়াবা পাচার বন্ধ হয়েছে বলা যাবে? মাদক ব্যবহার ও মাদকের চাহিদা দেশের মধ্যে অব্যাহত থাকলে অবশ্যই মাদক আসবে। দেশের মধ্যে যারা ইতোমধ্যেই মাদকাসক্ত হয়ে পড়েছেন (গবেষকদের মতে ৭০ লাখ) তাদের পারিবারিকভাবে চিকিৎসা করিয়ে সুস্থ করতে হবে। পারিবারিক শাসনের বাইরে চলে গেলে তাদের মোবাইল কোর্টের মাধ্যমে দন্ডিত করে জেলে প্রেরণ করতে হবে এবং কারাগারের মধ্যেও যাতে দুর্নীতিবাজ কারারক্ষীদের সহায়তায় মাদক সেবন করতে না পারে সে ব্যাপারে কঠোর হতে হবে এবং সংশ্লিষ্ট কারারক্ষীদেরও মাদক পাচারে জড়িত প্রমাণিত হলে চাকুরীচ্যুত করে দুদক আইনেও তাদের বিরুদ্ধে মামলা করতে হবে। কারাগারের মধ্যেও মাদকাসক্তদের চিকিৎসা করে সংশোধন করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনার জন্য সরকারীভাবে ব্যবস্থা নিতে হবে।
মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের যুদ্ধ ঘোষণার পরও মাদক ব্যবসায়ীরা,মাদক সেবনকারীরা তাদের কারবার চালিয়ে যাওয়ার এত সাহস,মনোবল কোথায় পান? অভিজ্ঞ মহল মনে করেন একটি জেলায় ডিসি,এসপি,জেলা জজ ও পিপি শতভাগ সৎ,তাদের তদবির করে,টাকা দিয়ে কোনভাবেই ম্যানেজ করা যায় না সে সংবাদ অপরাধীরা জানলে তাদের মনোবল কমে যায়, ফলে অপরাধ স্বয়ংক্রিয়ভাবেই কমে যায়। একটি জেলার উল্লেখিত চার জন গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তার মধ্য থেকে মাত্র এক জন কর্মকর্তাকেও যদি ’লাইন’ করা সম্ভব মর্মে প্রকাশ পায় তবে অপরাধীদের মনোবল বেড়ে যায় অপরাধীরা বেপরোয়া হয়ে যায়। সরকারের একাধিক গোয়েন্দা সংস্থাকে দিয়ে এ সংক্রান্তেও অনুসন্ধান করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহন করা আবশ্যক বলে অভিজ্ঞ মহল মনে করেন।
বিগত ৭/৮ বছরে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের আমলেই বাংলাদেশে ঘুষ-দুর্নীতি,লুটপাট অব্যাহত থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের নজিরবিহীন,আশাতীত অর্থনৈতিক উন্নতি হয়েছে। দেশের মানুষ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় সকলে তা স্বীকার করেন। দেশে মাদকের আগ্রাসন এত বেশী ভয়াবহ হয়েছে যে যুব সমাজকে তথা দেশের ভবিষ্যৎকে রক্ষা করতে সরকার মাদকের বিরুদ্ধে ’জিরো টলারেন্স’ তথা প্রয়োজনে বিনা বিচারে বন্দুকযুদ্ধে হত্যার সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য হয়েছেন। দেশের এ অবস্থার জন্য কি বিরোধী দলকে দায়ী করা যাবে? সরকারের আশ্রয় প্রশ্রয়ে বা সরকারী লোকের জার্সি গায়ে দেওয়া প্রভাবশালীদের সহায়তায় মাদক বর্তমান ভয়াবহ রূপ নিয়েছে তা কিভাবে অস্বীকার করা যাবে? অস্বীকার করলেও জনগণ তা বিশ্বাস করবেন কেন?
দেশের সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বেই দেশের অসাধারণ উন্নতি হয়েছে। তাঁর পরিস্কার ঘোষণায় মাদক ব্যবহার,মাদকের ব্যবসা, পাচার বন্ধ হবে। আমাদের এ উপমহাদেশে তরুণ সমাজ নেতা-নেত্রী ও অভিনেতা-অভিনেত্রীকে পোষাকে-আশাকে,কথা-বার্তায়,আচার-আচরণে অনুসরণ,অনুকরণ করতে দেখা যায়। সুতরাং কোন অবস্থাতেই মাদকাসক্ত বা মাদক ব্যবসার সাথে প্রত্যক্ষ-পরোক্ষভাবে জড়িত ব্যক্তিকে নেতা হিসেবে দলীয় পদের জন্য বা নির্বাচনের জন্য মনোনয়ন দেওয়া যাবে না। মনোনয়ন দিলে দেশের/এলাকার কি মারাত্মক ক্ষতি হয়,যুব সমাজ কিভাবে বিপথগামী হয় তার স্বপক্ষে বর্তমান অসহনীয় পরিস্থিতিই সাক্ষ্য দেয়। পূর্বের দেওয়া মনোনয়নের ময়না তদন্ত করে আত্মসমালোচনা পূর্বক দেশের ও জনগণের স্বার্থে সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার এখনই উপযুক্ত সময়। মাদকাসক্ত কোন ছাত্র-ছাত্রী বিশ্ববিদ্যালয়-কলেজে ভর্তি হওয়ার জন্য অযোগ্য বিবেচিত হবেন। যতই মেধাবী ও যোগ্য হউন না কেন মাদকাসক্ত প্রমাণিত হলে সরকারী-বেসরকারী চাকুরীতে অযোগ্য বিবেচিত হবেন। কোন মাদকাসক্ত ব্যক্তি আওয়ামী লীগের বা অংগ সংগঠনের নেতা বা সদস্য হতে বা থাকতে পারবেন না। সংশ্লিষ্ট সবাইকে মাদকাসক্ত নন মর্মে ’ডোপ’ পরীক্ষা রির্পোট দাখিল করতে হবে।
বর্তমান সময়ে দেশের অদ্বিতীয়, অপ্রতিদ্বন্দ্বী নেতা মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বিভিন্ন সভায় উল্লেখিত বিষয়গুলো সম্পর্কে মন্তব্য করলেও জাতির উদ্দেশ্যে ভাষণ দিয়ে যদি মাদক সংক্রান্তে তাঁর ঘোষিত নীতি ব্যাপক প্রচার করা হয় সাধারণ মানুষ বিশ্বাস করেন মাদক ব্যবহার,মাদক ব্যবসা,মাদক পাচার বন্ধ হয়ে যাবে,ইনশাল্লাহ।

লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Top