রোহিঙ্গা শিবির পরিদর্শন করলেন জাতিসংঘ মহাসচিব ও বিশ্বব্যাংক প্রেসিডেন্ট

guteres-jim-118942.jpg

রফিকুল ইসলাম :
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গূতেরেস বলেছেন, রোহিঙ্গা শরনার্থী সমস্যা সৃষ্টি ও এর দায় মিয়ানমারের। আর তাদের লোকদের নিরাপত্তা ও মর্যাদা দিয়ে মিয়ানমারকেই ফিরিয়ে নিতে হবে। সমস্যার সমধানে মিয়ানমারের উপর আন্তর্জাতিক চাপ অব্যাহত থাকবে। বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়াং কিম বলেছেন রোহিঙ্গা সমস্যায় নানা সংকটের পরও বাংলাদেশ যে উদার মানষিকতা দেখিয়েছেন তা বিশ্বে বিরল। রোহিঙ্গা সমস্যা মোকাবেলার পাশাপাশি বাংলাদেশে প্রতি বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগীতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। গতকাল সোমবার বিকেলে উখিয়ার কুতুপালং রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবিরে এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জাতিসংঘের মহা সচিব ও বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট উপরোক্ত কথাগুলো বলেন।
বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে কুতুপালং ডি-৫ নং ব্লকের একটি কমিউনিটি সেন্টার জাতিসংঘের মহা সচিব অ্যান্তোনিও গূতেরেস ও বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট কিম ইয়াং জিম অপেক্ষমান সাংবাদিকদের সাথে প্রেস ব্রিফিং এ মিলিত হন। প্রেস ব্রিফিং এ জাতিসংঘ মহা সচিব বলেন, বিশ্বের এত বড় মানবিক সংকটে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও স্থানীয় জনগণ যেভাবে উদারতা দেখিয়েছেন তার জন্য কৃতজ্ঞতা ও ধন্যবাদ জানাচ্ছি। তিনি বলেন বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের সম্পদিত চুক্তি অনুযায়ী উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা সহ মানবাধিকার নিশ্চিত করে তাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যেগ নেওয়া হবে। এ উদ্যোগে জাতিসংঘ কাজ করছে।
জাতিসংঘের মহা সচিব আরো বলেন, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের উপর যা ঘটেছে তা অমানবিক। আসলে যে পরিমাণে রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে তাদের জন্য বরাদ্ধ খুবই অপ্রতুল। এখানে রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির গুলোতে উল্লেখ যোগ্য সংখ্যক শরনার্থী ভূমি ও পাহাড় ধস, বন্যা জলাবদ্ধতা, স্বাস্থ্য ও পানীয় জলের সংকটে রয়েছে। তিনি এ সময় রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের জন্য আরো সাহায্য বাড়ানোর জন্য বিশ্ব সম্প্রদায়ের নিকট আহবান জানান। এর পূর্বে দুপুরে একটি টুইট বার্তায় জাতিসংঘের মহা সচিব বলেন, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরনার্থী শিবির গুলোতে শরনার্থীদের সাথে কথা বললে রাখাইনে তাদের উপর যেভাবে চরম নির্যাতন, নিপিডন চালিয়ে হত্যা, ধর্ষন সহ মানবতা বিরোধী অপরাধের অভিযোগ করেছে রোহিঙ্গারা। তারা এসব অভিযোগের বিচার চায়। যেটির জন্য তাদের দেশ ও সব কিছু ছেড়ে উদ্বাস্তু হতে হয়েছে সে নাগরিকত্ব ও নিরাপত্তা নিয়ে বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গারা মর্যাদার সাথে নিজ দেশে নিজ নিজ ভূমিতে ফিরে যেতে চায়।
ব্রিফিং এ বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট কিম ইয়াং জিম বলেন, বাংলাদেশের সামাজিক, অর্থনৈতিক সহ মানুষের জীবন মানের নানা সংকট বিদ্যামান থাকার পরও বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী ও দেশটির স্থানীয় ক্ষতিগ্রস্থ লোকজন বিপুল সংখ্যক উদ্বাস্তু রোহিঙ্গাদের আশ্রয় দিয়ে যে মানবিকতা দেখিয়েছে তা বিশ্বে বিরল ঘটনা। বাংলাদেশের জনগণের জীবন মান উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগীতা অব্যাহত থাকবে এবং এ সহযোগীতা উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাবে। তিনি বলেন, রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবির গুলোতে নানা ধরনের সংকট মোকাবেলায় ইতিমধ্যে বাংলাদেশকে ৪শ মিলিয়ন ডলারের বেশী অনুদান দেওয়া হয়েছে। এ অনুদান আরো বৃদ্ধি করে শ্রীগ্রই আরো তিন মিলিয়ন ডলার অনুদান প্রদান করা হবে। রোহিঙ্গাদের তাদের দেশ মিয়ানমার ফেরত না পাঠানো পর্যন্ত বিশ্ব ব্যাংকের সহযোগীতা অব্যাহত থাকবে বলে তিনি বলেন।
গতকাল সোমবার সকাল ১১টার দিকে জাতিসংঘের মহা সচিব অ্যান্তোনিও গূতেরেস, বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট জিম ইয়াং কিম সহ বৈশ্বিক উচ্চ পর্যায়ের কর্মকর্তারা সহ বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবুল হাসান মাহমুদ আলী ও পররাষ্ট্র সচিব শহিদুল হক উখিয়া টিভি কেন্দ্র সংলগ্ন কুতুপালং ট্রানজিট ক্যাম্প পরিদর্শনে আসেন। ট্রানজিট ক্যাম্পে থাকা রোহিঙ্গা নারী, পুরুষ ও শিশুদের সাথে তারা একান্ত কথা বলে মিয়ানমারে তাদের উপর চলা নির্যাতনের বর্ণনা শুনেন। প্রত্যাবাসনের জন্য তৈরীকৃত এ ট্রানজিট ক্যাম্পের বিভিন্ন স্থাপনা ও সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে খোঁজ খবর নেন এবং ঘুরে দেখেন।
এরপর সড়ক পথে মোটর বহর করে উখিয়ার থাইংখালী ময়নার ঘোনা ক্যাম্প হয়ে কুতুপালং ও বালুখালী মেঘা শরনার্থী ক্যাম্প ঘুরে দেখেন। যেটি বিশ্বের সর্ব বৃহৎ শরনার্থী আশ্রয় শিবির হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। এ মেঘা ক্যাম্পে প্রায় সাত লাখের বেশী রোহিঙ্গা শরনার্থী আবাস স্থল। এখানে ভূমি ও পাহাড় ধস, বন্যা, জলাবদ্ধতা সহ বিভিন্ন প্রাকৃতিক ঝুঁকিতে রয়েছে দুই লক্ষাধিক রোহিঙ্গা। তাদের নিরাপদ পুর্ণবাসনের জন্য ৪৫০ একর বন ভূমির উপর নতুন ভাবে মধুর ছড়ায় বর্ধিত ক্যাম্প-৪ পরিদর্শন করেন জাতিসংঘের মহা সচিব, বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট, বাংলাদেশে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সহ উর্ধতন কর্মকর্তারা। সেখান থেকে দুপুর দুইটার দিকে তারা কুতুপালং লম্বাশিয়া ক্যাম্পে জাতিসংঘের জনসংখ্য বিষয়ক তহবিল বা ইউএনএফপি এর মহিলা বান্ধব কেন্দ্র পরিদর্শন করেন এবং সেখানে বেশ কিছু রোহিঙ্গা মহিলার সাথে কথা বলেন।
বেলা পৌন ৩টার দিকে গুরুত্বপূর্ণ এসব ব্যক্তিবর্গ কুতুপালং ডি-৪ নং ব্লকে জাতিসংঘের পরিচালিত একটি হাসপাতাল পরিদর্শন করেন। পরিদর্শনকালে হাসপাতালের চিকিৎসাধীন রোহিঙ্গা রোগী ও কর্তব্যরত ডাক্তার কর্মচারীদের সাথে কথা বলে তাদের কুশলাদি জানেন। পরে কুতুপালং ডি-৫ নং ব্লকে পূর্ব নির্ধারিত আয়োজন অনুযায়ী পৃথক পৃথক ভাবে ২০জন মহিলা ও ২০ পুরুষ রোহিঙ্গা শরনার্থীর সাথে একান্ত কথা বলেন। প্রায় আধ ঘন্টা একান্ত আলাপ কালে মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্রপন্থি রাখাইনদের কর্তৃক হত্যা, ধর্ষন, ঘরবাড়ি ও অন্যান্য স্থাপনা জ্বালানো পুড়ানো সহ লোমহর্ষক ঘটনাবলির বিবরণ দেন ক্ষতিগ্রস্থ রোহিঙ্গা নারী ও পুরুষরা।
গতকাল সোমবার সকাল ৮টার দিকে বাংলাদেশ বিমানের একটি বিশেষ বিমানে করে জাতিসংঘ মহা সচিব ও বিশ্ব ব্যাংক প্রধান কক্সবাজার আসেন। সেখানে একটি হোটেলে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ও পররাষ্ট্র সচিবের সংক্ষিপ্ত ব্রিফিং শেষে সকাল ১১টার দিকে উখিয়ার কুতুপালং-বালুখালী মেঘা শরনার্থী শিবির পরিদর্শনে আসেন। বিকেল ৪টার পর তারা পরিদর্শন শেষে কক্সাবাজর উদ্দেশ্যে উখিয়া ত্যাগ করেন এবং সন্ধ্যায় ঢাকায় ফিরে যান। জাতিসংঘের মহা সচিব, বিশ্ব ব্যাংক প্রেসিডেন্ট সহ বৈশ্বিক নেতৃবৃন্দের উখিয়ার শরনার্থী শিবির পরিদর্শন কালে কক্সবাজার থেকে উখিয়ার ময়নার ঘোনা পর্যন্ত দীর্ঘ প্রায় ৪০ কি:মিটার সড়ক জুড়ে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়। বিপুল সংখ্যক পুলিশ, আমর্ড় পুলিশ, বিজিবি, এসএসএফ, র‌্যাব সহ সরকারী বিভিন্ন নিরাপত্তা বাহিনীর কয়েক শত কর্মী নিরাপত্তায় নিয়োজিত ছিলেন।

Top