অতিথি কলাম : আইসিসিতে জেনারেলদের বিচার না হলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অসম্ভব

1-5.jpg

॥ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট ॥
বাংলাদেশের ইতিহাসে জাতিসংঘের মহাসচিব,বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্টসহ অনেক বিশ্ব নেতা একসাথে সফর করেননি। কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন ও নির্যাতিত রোহিঙ্গা নারী-পুরুষ-শিশু ভিকটিমদের জবানবন্দি শ্রবন শেষে জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস ও বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিমও যৌথ সংবাদ সম্মেলনও করেন। আন্তোনিও গুতেরেস বলেন, ’রোহিঙ্গাদের পূর্ণ মর্যাদা নিয়ে ফেরত যাওয়ার জন্য রাজনৈতিক সমাধান ও দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করতে হবে। রাজনৈতিক সমাধান খুব পরিস্কার। মিয়ানমার সরকার এবং সামরিক বাহিনীকে রাখাইনে একটি পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে,যাতে রোহিঙ্গারা ফেরত যেতে পারে। তাদের নাগরিকত্বও দিতে হবে।’ কক্সবাজারে রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ’আমার হৃদয় ভেঙ্গে গেছে। সেখানে আমি রোহিঙ্গাদের মুখ থেকে গণহত্যা,গণধর্ষণ ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা শুনেছি’। বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম তার বক্তব্যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশকে ৪৮ কোটি ডলার অনুদান দেওয়ার ঘোষণা দেন এবং বলেন, ’মানবিক সাহায্য এবং উন্নয়ন একই সঙ্গে হতে পারে। আমরা এ কাজটি বাংলাদেশে করছি। এ অর্থ শুধু রোহিঙ্গাদের জন্য ব্যবহার হবে না,কক্সবাজারের যারা অধিবাসী তাদের উন্নয়নেও ব্যবহৃত হবে।’ তিনি আরো বলেন, ’মিয়ানমারকে বিশ্বব্যাংকের কিছু বাজেট সহায়তা দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল। সেটি আমরা পিছিয়ে দিয়েছি। এখন সেখানে শুধু নিয়মিত প্রকল্প সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।’
মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গা ও তাদের আশ্রয়দানকারী কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের জন্য বৃহত্তর আন্তর্জাতিক সহায়তা ও সংহতির আহ্বান জানিয়েছে জাতিসংঘ। সংস্থাটির শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার ইউএনএইচসিআর এর প্রধান ফিলিপ্পো গ্র্যান্ডি এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ আহ্বান জানান। বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের জন্য গঠিত জাতিসংঘের যৌথ সাড়াদান পরিকল্পনার মাত্র ২৬ শতাংশ তহবিলে জমা পড়েছে। বাকীটা এখনও অনিশ্চিত।
জাতিসংঘের মানবাধিকার কমিশনের প্রধান জায়েদ রাদ আল হোসেন চার বছর দায়িত্ব পালনকালে তার দেখা নিপীড়নের মধ্যে রোহিঙ্গাদের ওপর সংঘটিত মানবাধিকার অপরাধকে স্বতন্ত্র বৈশিষ্টসম্পন্ন আখ্যা দিয়েছেন। তিনি মিয়ানমারের উদ্দেশ্যে বলেন রাখাইনে সংঘটিত নিপীড়ন হত্যাযজ্ঞসহ যাবতীয় মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য তাদের লজ্জা হওয়া উচিত।
সম্প্রতি রাখাইনের কয়েকটি এলাকা ঘুরে,লোকজনের সঙ্গে কথা বলে এবং কক্সবাজারের রোহিঙ্গা ক্যাম্প পরিদর্শন শেষে তাঁর প্রতিক্রিয়ার কথা ঢাকায় আইসিসি দপ্তরে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে রেডক্রসের প্রেসিডেন্ট পিটার মাউরা মন্তব্য করেছেন,বাংলাদেশে পালিয়ে আসা রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফিরে যাওয়ার মতো পরিবেশ তৈরী হয়নি। প্রত্যাবাসনের জন্য শুধু মানবিক কার্যক্রম ও পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণই যথেষ্ট নয়। আরও প্রয়োজন চলাফেরার স্বাধীনতা,মৌলিক সেবা পাওয়ার অধিকার,অর্থনৈতিক কর্মকান্ডের স্বাধীনতা,রাখাইনের বাজারে প্রবেশাধিকার এবং সর্বোপরি প্রত্যাবসন পরবর্তী নিরাপত্তাব্যবস্থায় রোহিঙ্গাদের আস্থা নিশ্চিতকল্পে কার্যকরী রাজনৈতিক পদক্ষেপ। তিনি আরো বলেন, আমি দাবী করি না যে রোহিঙ্গারা এখনও রাখাইনে আছে তারা খুব ভালো অবস্থানে আছে। মানবিক সংকটের এই চিত্র দেখে আজ মনে হচ্ছে ২০ বছর পরও কি ঠিক একই অবস্থা দেখতে হবে আমাদের? রেডক্রস প্রেসিডেন্টের এ হতাশা কিসের আলামত ?
দেশ ও মাতৃভূমির টানে বাংলাদেশের আশ্রয় শিবির থেকে ৫৮জন রোহিঙ্গা গোপনে রাখাইনে ফিরে গিয়েছিল। তাদের নিজের বাড়ীঘরে যেতে দেওয়া হয় নাই। তাদের বাড়ীঘর যদি জ্বালিয়েপুড়িয়ে নিচিহৃ করে দিয়ে থাকে মিয়ানমার সেনাবাহিনী তাহলে কিভাবে তাদের বাড়ীঘরে যেতে দেবে? এখনও সেই ফিরে যাওয়া ৫৮জন রোহিঙ্গাকে কথিত অভ্যর্থনা কেন্দ্রে আটকিয়ে রাখা হয়েছে। সেই সংবাদ পেয়ে আর কোন রোহিঙ্গা ফিরে যেতে আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বরং গত সপ্তাহেও আরো নতুন করে ৫০জন রোহিঙ্গা বাংলাদেশে পালিয়ে এসেছে। তাই বাংলাদেশে পালিয়ে এসে আশ্রয় নেওয়া ও যথাযথভাবে তালিকাভুক্ত প্রায় ১১ লাখ রোহিঙ্গাকে ফিরিয়ে নেওয়ার ঘোষণা দিয়ে মিয়ানমারের চুক্তি সম্পাদন,আশ্বাস,সমঝোতা ’আইওয়াশ’ বলে কড়া সমালোচনা করেছে জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশন।
আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় সম্প্রতি সংবাদ প্রচার হয়েছে যে মিয়ানমারের সেনাপ্রধান ঠান্ডা মাথার খুনী জেনারেল মিন অং আবার ক্যু করে সকল ক্ষমতা দখল করা হবে বলে অং সান সুচিকে হুমকী দিয়েছেন। এখনও পৃথিবীর একমাত্র দেশ মিয়ানমার যেখানে সাংবিধানিকভাবে গণতন্ত্রের নামে সামরিক বাহিনীর শাসন চালু আছে। মিয়ানমারে সকল ক্ষমতার উৎস সেনাবাহিনী। সকল হত্যা,গণহত্যা, গণধর্ষণ, জাতিগত বিতাড়ন সকল কিছুর জন্যও সেনাবাহিনী দায়ী । দেরীতে হলেও ইউরোপীয় ইউনিয়নভুক্ত দেশগুলো,যুক্তরাষ্ট্র,যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলোও বুঝতে পেরেছে মিয়ানমারের সেনা জেনারেলরা গণহত্যা,গণধর্ষণ ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য দায়ী ও দোষী। তাই কতিপয় চিহিৃত জেনারেলের বিরুদ্ধে ভ্রমনে নিষেধাজ্ঞা জারী বা অন্য ধরনের অবরোধমূলক শাস্তি ঘোষণা করা হচ্ছে। তা মিয়ানমারের জংলী জেনারেলদের জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়।
রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী সমাধান করতে হলে আগেই মিয়ানমারের রোহিঙ্গা গণহত্যার সাথে জড়িত সকল জেনারেল,সাবেক জেনারেলদের আন্তর্জাতিক ক্রিমিনাল কোর্টে বিচার করে দন্ডিত করতে হবে। মিয়ানমারের জেনারেলদের পরিকল্পিত গণহত্যার কাজে সহায়তা ও সমর্থন করার অপরাধে সহযোগী আসামী হিসাবে চীনেরও বিচার করার উদ্যোগ নিলে রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধান সম্ভব হবে,রোহিঙ্গাদের নিজে দেশ আরাকান তথা রাখাইনে ফিরে যাওয়া সম্ভব হবে। অন্যথায় বিশ্বনেতাদের সকল উদ্বেগ,উদ্যোগ,চাপ,আহ্বান বিফলে যাবে। অরণ্যে রোধন করা হবে।
অং সান সুচির ক্ষমতাহীন সরকারের ওপর ভরসা করা যাবে না,কারণ এখনও মিয়ানমারের সকল ক্ষমতা সেনাবাহিনীর জেনারেলদের হাতে। মানুষের রক্তমাংসের স্বাদ পাওয়া মানুষ-খেকো বাঘকে যেমন বিশ্বাস করা যায় না, তেমনি মিয়ানমারের জেনারেলদের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন সংক্রান্ত সমঝোতা চুক্তি,আশ্বাস,ঘোষণা ইত্যাদিকে মোটেও বিশ্বাস করা যাবে না।
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Top