তৃণমূল সমস্যায় কক্সবাজার

শিপন পাল :
তৃণমূল সমস্যায় জর্জরিত কক্সবাজার। একের পর এক সমস্যা লেগে রয়েছে পর্যটন নগরী কক্সবাজারের পেছনে। রাষ্ট্রবিরোধী তৃণমূল সমস্যার কারণে কক্সবাজার জেলার ভাবমূর্তি ও জেলার জনসাধারণের অপরাধমূলক কর্মকান্ডের সাথে সম্পৃক্ততা ফুটে উঠছে বলে ধারণা করছেন সংশ্লিষ্ট মহল। যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য হুমকিস্বরূপ বলে মন্তব্য করা হচ্ছে।
গত কয়েক মাস আগেও অপ্রতিরোধ্য ছিল মানবপাচার। বিনা খরচে মালয়েশিয়া যাওয়ার লোভনীয় প্রলোভন দেখিয়ে মুক্তিপণে সক্রিয় ছিল মানবপাচারকারী দল। একাজে সক্রিয় ছিল সুবিধাবাদী কয়েকটি দালালচক্র। দেশবাসীর ধারণা ছিল মানবপাচারের ক্ষেত্রে কক্সবাজারই একমাত্র নিরাপদ রুট। দালালচক্র শহরের নাজিরারটেক এলাকায় নামিয়ে দিয়েছিল মালয়েশিয়ার নাম করে। গ্রামের গরীব লোকদের সরলতার সুযোগ নিয়ে এমন ঘটনা ঘটিয়েছিল দালালরা। ওইসময় কক্সবাজার জেলার প্রায় কয়েকশ নিরাপদ রুট ছিল মানবপাচারের ক্ষেত্রে। বিশেষ করে সীমান্ত এলাকায় ছিল সর্বাধিক।
কক্সবাজারের জন্য তেমনি আরেকটি বিরাট ট্রাজেডি ইয়াবা। সহজে সোনার হরিন পাওয়ার লোভে ইয়াবা সমস্যায় জর্জরিত কক্সবাজার জেলা। জেলার ছোট-বড় যেকোন বয়সের এমনকি রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব, জনপ্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী, জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব ইয়াবা ব্যবসার সাথে সম্পৃক্ত। তাদের অনেকের নাম স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাতেও রয়েছে। যাদের অনেকের নাম কক্সবাজার জেলার সাধারণ মানুষের মুখে মুখে। সরকারের কঠোর পদক্ষেপে কিছু কিছু ক্ষেত্রে আইনী ব্যবস্থা নেয়া হলেও একেবারে রুখে দেয়া অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে। এমনকি অব্যাহত ক্রসফায়ারেও নির্ভয়ে মিয়ানমান থেকে অবাধে আসছে ইয়াবা। অনেকে রুট পরিবর্তন করেও এই ব্যবসা নির্দ্বিধায় চালু রেখেছে। যা সীমান্ত প্রহরী বিজিবির মাধ্যমে ইয়াবার চালান আটকে প্রতিয়মান হয়। ইয়াবা কক্সবাজার থেকে চালান হয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় গেলেও কক্সবাজারের যুব সমাজ এর নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
ভুক্তভোগী অনেকের মতে, এর ফলে জেলায় ইয়াবা সেবনের সাথে সম্পৃক্ত যুবকরা ব্লাড প্রেসারে ঝুঁকছে, অনিয়ন্ত্রিত হয়ে পড়ছে তারা, নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে ভয়ংকর পরিস্থিতির দিকে ধাবিত হচ্ছে, ইয়াবা ধকল সইতে না পেরে ভেঙ্গে পড়ছে যুব সমাজ। ইয়াবা থাবা থেকে মুক্তি না পেয়ে অনেকে অপ্রীতিকর ঘটনার জন্ম দিচ্ছে। ইয়াবার কারণে এমন পরিস্থিতি উদ্বুত হওয়ায় ভাবান্বিত হয়ে পড়ছে জেলার যুব সমাজের অভিভাবকরা।
এদিকে ইয়াবা, মানবপাচার সমস্যার মতো রোহিঙ্গা ট্রাজেডি বিরাট সমস্যার রূপ নিয়েছে। মিয়ানমার থেকে বিতাড়িত হয়ে মানবিকতার কারণে এদেশে স্থান দিলেও তা রোহিঙ্গাদের কাছে নগণ্য। রোহিঙ্গারা মনেই করেন না এদেশ তাদের প্রতি মানবিকতার নজির সৃষ্টি করেছে। ফলস্বরূপ এদেশের মানুষের জন্য বিষফোঁড়া হয়ে দাঁড়িয়েছে রোহিঙ্গা। এদের কারণে কক্সবাজার জেলার বাসিন্দারা অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। এরা নিয়মিত মারধর করছে স্থানীয়দের। দেদারচ্ছে পিঠাচ্ছে পুলিশ। বাড়িয়ে তুলেছে চুরি, ডাকাতি, ছিনতাইয়ের মতো ঘটনা। কিছু কিছু রোহিঙ্গা অনিয়ন্ত্রিত হওয়ায় জেলার বিভিন্ন জায়গায় অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটছে। উখিয়া, টেকনাফ, নাইক্ষ্যংছড়ি, বান্দরবান সহ কয়েকটি জেলায় এসব রোহিঙ্গারা ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে। তবে রোহিঙ্গাদের কারণে ইতিমধ্যে কক্সবাজার জেলাবাসী বঞ্চিত হয়ে পড়েছে বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা থেকে। যেমন বঞ্চিত হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদ থেকে জন্ম নিবন্ধন সনদ পাওয়া থেকে। ওয়ারিশী সনদ নিতে গেলে জমা দিতে হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র, বসত ভিটির কাগজপত্র, পূর্ব পুরুষের জাতীয় পরিচিতি পত্র সহ নানাবিদ কাগজ, রোহিঙ্গা ইস্যুর কারণে পাসপোর্ট করাতে গেলে ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে নানা বিষয় নিয়ে। রোহিঙ্গার কারণে নষ্ট হচ্ছে কক্সবাজার জেলাবাসীর সম্প্রীতি এবং সংস্কৃতি। দেশের পাশাপাশি বিদেশেও রোহিঙ্গাদের কারণে ভাল নেই কক্সবাজার জেলার প্রবাসীরা। এদের বিষয়ে কক্সবাজারবাসীর উদ্বেগ, এদের কঠোর হস্তে দমন করা না গেলে যেকোন সময় তারা অপরাধের সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে পারে। এমনকি আন্দোলনের ডাক দিতে পারে বলে ধারণা করছেন জেলার সচেতন মহল।
অন্যদিকে কক্সবাজারে অবৈধ দখল প্রক্রিয়ার কারণেও পীড়িত জেলাবাসী। অবৈধ দখল প্রক্রিয়ার কারণে জেলার সংশ্লিষ্ট এলাকার ঐতিহ্য হারাতে বসেছে। তেমনই বাঁকখালী নামক একটি নদীর ঐতিহ্য হারাচ্ছে কক্সবাজার। অবৈধ দখলের কারণে বাঁকখালী নদীর নাব্যতা হারিয়েছে। একইভাবে দখলে নেয়া হয়েছে কক্সবাজার সড়ক-উপসড়কের কিনারা, ড্রেন। নির্মাণ করা হয়েছে অবৈধ স্থাপনা। বাঁকখালী নদী ও ড্রেন দখলের কারণে প্রতি বৎসর জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। দখল করা হয়েছে কক্সবাজার শহরের লালদীঘি ও গোলদীঘি নামক দুটি পুকুর। বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধার পাশাপাশি পুকুর দুটির দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকায় বৈশ্বিয়িক পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। অবৈধভাবে বাঁকখালী দখলের সাথে জড়িতদের তালিকা তৈরি করা হলেও অদৃশ্য কারণে দীর্ঘ কয়েক বৎসরেও উচ্ছেদ করা সম্ভব হয়নি।
কক্সবাজার শহরে সংশ্লিষ্ট সমস্যার পাশাপাশি আরেকটি বড় সমস্যার রূপ নিয়েছে টমটম। অপ্রাপ্ত বয়স্ক ও অদক্ষ চালকের কারণে জেলাব্যাপী কোন না কোন ভাবে আঘাতপ্রাপ্ত হচ্ছেন যাত্রীরা। অবৈধ টমটমের সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় কক্সবাজার শহর সহ সংশ্লিষ্ট এলাকায় যানজটের মূল কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে টমটম। সম্প্রতি সড়ক দূর্ঘটনা সহ যানজটের প্রধান কারণ হিসেবে টমটমকে চিহ্নিত করা হলেও তা যেন অপ্রতিরোধ্য হয়ে পড়েছে। অবৈধ টমটম কিংবা কারখানার বিরুদ্ধে অভিযান পরিচালনা করা হলেও তা পরবর্তীতে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসছে। এককথায় জেলায় ভয়াবহরূপ ধারণ করেছে টমটম। অতিষ্ট হয়ে পড়েছে জেলাবাসী। সম্প্রতি টমটমের ডানপাশে নেট দিয়ে বন্ধ করে দিয়ে দূর্ঘটনা প্রতিহত করার চেষ্টা করা হলেও অধিকাংশ টমটম তা মানতে নারাজ। কেউ কেউ এসব নেট লাগালেও তা ব্যবহার করছে দায়সারাভাবে। যা পর্যটন নগরী হিসেবে শ্রীহীন করে তুলেছে শহরকে।
জেলাব্যাপী বিরাট আকার ধারণ করেছে পাহাড়কাটা। ফলে পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। প্রতি বৎসর জেলার কোন না কোন এলাকায় পাহাড়ধসে নিহতের ঘটনা অব্যাহত রয়েছে। দীর্ঘ হচ্ছে মৃত্যুর ঘটনা।
কক্সবাজার সোসাইটির সভাপতি কমরেড গিয়াস উদ্দিন জানান, ইতিমধ্যে কক্সবাজার নিয়ে দেশ-বিদেশে নেতিবাচক ধারণা জন্ম হয়েছে। ইয়াবার সংশ্লিষ্টতার কারণে দেশেরও অনেকে মনে করেন কক্সবাজারের অধিকাংশ যুবক ইয়াবাসক্ত। বিষয়টি কারণে অনেক অভিভাবক কক্সবাজারের বাসিন্দাদের সাথে বৈবাহিক সম্পর্ক করতেও আপত্তি করে। যেটি আমাদের কক্সবাজারের জন্য প্রতিনিয়ত ট্রাজেডি বলা যায়।
মানবপাচারের বিষয়ে তিনি বলেন, সম্প্রতি ঘটে যাওয়া অনেক ঘটনা আমাদেরকে মর্মাহত করে। অনেক দালালচক্র সাধারণ গরীব মানুষকে ঠকিয়ে মালয়েশিয়া পাঠানোর নাম করে সর্বশান্ত করেছে অনেক পরিবারকে। অনেকে মালয়েশিয়া গেলেও আর ফিরে আসেননি। এখনো অবৈধভাবে মালয়েশিয়া যাওয়ার নামে মানবপাচার হচ্ছে বিচ্ছিন্নভাবে। আর রোহিঙ্গার বিষয়টি আমাদের কক্সবাজারের জন্য বোঝাস্বরূপ। যার কারণে আমরা জেলাবাসী বিভিন্ন সমস্যায় ভুক্তভোগী। রোহিঙ্গাদের কারণে জেলার সাধারণ জনগণ মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। জেলাবাসীর এমনই ভাগ্য খারাপ রোহিঙ্গার কারণে সাধারণ একটি জন্মনিবন্ধন সনদ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, কক্সবাজারে সর্বত্র অবৈধ দখলে নেমেছে দখলকারীরা। নালা-নর্দমা, বাঁকখালী নদী, ফুটপাত, গুরুত্বপূর্ণ ও স্মৃতি বিজড়িত পুকুর দখলের প্রতিযোগিতায় নেমেছে অবৈধ দখলকারীরা। পরিবেশের কথা চিন্তা না করেই তারা নিজের সম্পত্তি মনে করে দখল অব্যাহত রাখায় পরিবেশ বিনষ্ট হচ্ছে। ভুক্তভোগী হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষকে। আমরা বরাবরই এসব বিষয়ে আন্দোলন অব্যাহত রেখেছি। বিভিন্ন জায়গায় স্মারকলিপি সহ প্রতিবাদ জানিয়েছি। শীঘ্রই এসব বিষয়ে পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হলে পরিস্থিতি আরও খারাপ হতে পারে।

Top