থাই গুহায় উদ্ধার অভিযানঃ জয় হয়েছে মানুষের

Progyananda.jpg
॥  প্রজ্ঞানন্দ ভিক্ষু ্॥
থাইল্যান্ডের চিয়াং রাই প্রদেশের থাম লুয়াং’ গুহায় প্রবেশের পর আটকা পড়া কিশোর ফুটবল দলের সব সদস্য ও তাদের কোচকে গুহা থেকে উদ্ধার করে আনা হয়েছে। উদ্ধার অভিযানের তৃতীয় দিন মঙ্গলবার চার কিশোর ও তাদের কোচকে গুহা থেকে বের করে আনেন ডুবুরিরা। পরে একে একে তিন ডুবুরি ও এক চিকিৎসকেও গুহা থেকে বের করে আনা হয়। এর মধ্যদিয়ে ১৭ দিনের ক্লান্তিকর, বিপদজনক এবং রোমাঞ্চকর এক অভিযান আনন্দের সঙ্গেই শেষ হলো। গুহার ভেতরে কিশোর ফুটবল দলটির সন্ধান পাওয়ার পর থেকে ওই তিন ডুবুরি ও এক চিকিৎসকও তাদের সঙ্গে ছিলেন। তার আগে রোববার চার কিশোর ও সোমবার চার কিশোরকে বের করে আনা হয়েছিল।
গত ২৩ জুন থাই কিশোর ফুটবল দলের ১২ সদস্য ও তাদের কোচ ওই গুহায় প্রবেশের পর আটকা পড়েছিল। ভারি বৃষ্টিপাতের কারণে আকস্মিক ঢলে গুহার ভেতর পানি ঢুকে তাদের বের হবার পথ বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। নিখোঁজ হওয়ার ১০দিনের মাথায় দুই ব্রিটিশ ডুবুরি গুহা থেকে প্রায় চার কিলোমিটার ভেতরে আংশিক ডুবে থাকা একটি চেম্বারের কর্দমাক্ত পাথরখন্ডের উপর ক্ষুধার্ত ও অন্ধকারের সঙ্গে লড়াইরত দলটিকে খুঁজে পায়।
গুহায় উদ্ধার অভিযানে ৯০ জন বিশেষজ্ঞ ডুবুরি বিভিন্নভাবে অংশগ্রহণ করেন। এদের মধ্যে ৪০ জন থাইল্যান্ডের এবং বিদেশি ডুবুরি ছিলেন ৫০ জন। সাঁতারে বিশেষ পারদর্শী একজন অস্ট্রেলীয় চিকিৎসক এবং পানির নিচে কাজ করতে পারা রোবট সঙ্গে আনা চীনা উদ্ধারকর্মীরা সাথে ছিলেন । ব্রিটিশ ডুবুরি ও মার্কিন বিমান বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন। থাইল্যান্ডে কাজ করা একজন বেলজিয়ান নাগরিকও থাই উদ্ধার কর্মীদের সঙ্গী হন বলে গণমাধ্যমের বরাতে জানা গেছে।
গত কয়েকদিন ধরে গোটা বিশ্বের নজর ছিল ওই গুহার দিকে। অবশেষে কোন ধরণের অঘটন ছাড়াই সবাইকে উদ্ধার করা হল। অবশ্য্ অভিযানের শুরুতে একজন অসীম সাহসী ডুবুরি প্রাণ হারিয়েছেন। আমি তার পারলৌকিক সদগতিকামনা করছি।
ওই আটকে পড়ার ঘটনা এবং মানবিক বিশ্বের আচরণ সবকিছু নিয়ে আমি আবেগতাড়িত হয়েছি তা স্বীকার করতেই হয়। তবে এই আবেগ শুধুই মানুষের মানবিকতা দেখে। আটকে পড়ার খবরটি চাউর হওয়ার পর থেকে দেশি-বিদেশি, জাতি, ধর্ম নির্বিশেষে যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়লেন তা হ্নদয় দিয়ে উপলব্দি না করলে কাউকে বুঝিয়ে মনের খোরাক পাওয়া যাবেনা।
দেশী-বিদেশী ৯০জন ডুবুরি জীবনের ঝুঁকি নিয়ে সরাসরি উদ্ধারকাজে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। আরো অনেকে প্রস্তুত ছিলেন। এত মানুষ জীবন বাজী রেখেছেন কেবল ১৩জন মানুষকে বাঁচাবেন বলে। অবশেষে বাঁচিয়েই ছাড়লেন। আমরা আগেও আরো অনেক উদ্ধার কাজের কথা জেনেছি এবং দেখেছি। কিন্তু আমি এই উদ্ধার কাজকে অন্য দশটি উদ্ধার কাজের সাথে গুলিয়ে ফেলতে পারছি না। নিশ্চিত মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে আসার এই অকল্পনীয় অথচ বাস্তবসত্য ঘটনা নিয়ে কৌতুহলী বিশ্বে একদিন বড় কোন প্রামান্যচিত্র কিংবা সিনেমা নির্মাণ যে হবে না একথা আপাতত নিশ্চিত করে বলতে পারবো না। যদি হয় তাহলে এই সৃষ্টি মানুষের অকৃত্রিম ভালোবাসায় ভাসবে বলে আমার বিশ্বাস।
মানুষের জীবন এতটাই দামী এবং মূল্যবান যে মানুষের প্রাণ বাঁচাতে মানুষই প্রাণ বাজী রাখে। মানুষ মানুষকে এতটাই ভালবাসতে জানে, যে ভালোবাসায় কোন শর্ত, দাবী এবং প্রাপ্তির প্রত্যাশা থাকে না; থাকে শুধু কিছু দেওয়ার এবং করার অনুপ্রেরণা।
আবার এমন দানবিকতা ও পাশবিকতাও আমরা আমাদের চারপাশে দেখি যেখানে প্রতিনিয়ত মানুষের পরাজয় হচ্ছে। মানবতা ভূলুণ্ঠিত হচ্ছে। মানুষ হয়ে মানুষকে নির্যাতন, শোষণ এবং নিপীড়ন করছে। মানুষ হয়ে মানুষকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিচ্ছে। মানুষ হয়ে মানুষকে মারার জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। মানবিক বিশ্ব আরেকবার জেগে উঠুক নিপীড়িত রোহিঙ্গাদের জন্য। তারা মানুষের নির্দয়তা দেখেছে কিন্তু মানুষের ভালবাসা কি রকম হতে পারে তা মানবিক বিশ্ব তাদেরকে দেখাক আরেকবার।
লেখকঃ সভাপতি, কক্সবাজার  জেলা  বৌদ্ধ  সুরক্ষা  পরিষদ। সহকারী পরিচালক, রামু কেন্দ্রীয় সীমা বিহার।
Top