সঠিক সময়ে মিলে না ময়নাতদন্ত ও চিকিৎসা সনদ সাড়ে ৩’শ মামলার পুলিশী তদন্ত বাধাগ্রস্ত

download-16.jpg

বিশেষ প্রতিবেদক :
২০১৭ সালের ৯ সেপ্টেম্বর খরুলিয়ার পূর্ব মোক্তারকুলে আবুল কাশেম (৬৭) কে পিটিয়ে হত্যা করে প্রতিবেশীরা। ওই ঘটনায় ৫ প্রতিবেশীকে অভিযুক্ত করে সদর থানায় হত্যা মামলা দায়ের করেন নিহতের ছেলে। এরপর কেটে গেছে ১০ মাস। এরইমাঝে এজাহাভুক্ত ৪ আসামীকে গ্রেফতার করে কারাগারে পাঠিয়েছে পুলিশ। বদল হয়েছে মামলার তদন্ত কর্মকর্তাও। দুই কর্মকর্তাই ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের জন্য কর্তৃপক্ষের কাছে মৌখিক ও লিখিত আবেদন করেছেন কয়েকদফা। কিন্তু তারপরও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দেয়নি সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই কারণে পুলিশও ওই মামলার তদন্ত প্রতিবেদন তৈরি করতে পারছে না।
মাহফিলে বসার স্থান নিয়ে ঝগড়াকে কেন্দ্র করে চলতি বছরের ৩১ মার্চ দক্ষিণ ডিককুলের গৈয়মতলী গ্রামের নিজাম মাষ্টারের বাড়ির সামনে মান্নান প্রকাশ খোকন (১৭)কে কুপিয়ে হত্যা করে একদল যুবক। সেদিনই তাকে হত্যার দায়ে ৮ জনের বিরুদ্ধে থানায় হত্যা মামলা দায়ের করে নিহতের বাবা আবদুস ছবি। ওই মামলার এজাহাভুক্ত ৪ আসামীকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে ঠিকই। কিন্তু ঘটনার ৩ মাস ১০ দিন পরও ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন হাতে পায়নি পুলিশ। তাই মামলার চুড়ান্ত প্রতিবেদন কিংবা অভিযোগপত্র তৈরি করতে পারছে না পুলিশ।
কেরাম খেলাকে কেন্দ্র করে গত বছরের ১৮ নভেম্বর পিএমখালী ইউনিয়নের মাছুয়াখালী গ্রামে সরওয়ার আলম নামের এক যুবকের আঙ্গুল ভেঙ্গে ফেলে কয়েকজন যুবক। ওই ঘটনায় ভিকটিম বাদী হয়ে সেদিনই থানায় মামলা দায়ের করে । আর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ১৮ নভেম্বর চিকিৎসা সনদের জন্য হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করে। এরপর কেটে গেছে প্রায় ৬ মাস ২২ দিন। কিন্তু মিলেনি চিকিৎসা সনদ। তাই পুলিশও তৈরি করতে পারেনি তদন্ত প্রতিবেদন।
শুধু আবুল কাশেম হত্যা মামলা বা খোকন হত্যা মামলা কিংবা সরওয়ারের আলমের মামলা নয় ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও চিকিৎসা সনদ সঠিক সময়ে না পাওয়ায় প্রায় সাড়ে ৩ শ মামলার পুলিশী তদন্ত বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে ন্যায় বিচার বঞ্চিত হচ্ছেন বিচারপ্রার্থী ও অভিযুক্তরা। অনেকক্ষেত্রে আদালত থেকে চিকিৎসা সনদ দেওয়ার তাগাদা দেওয়া সত্বেও দায়িত্বরতরা নানা অজুহাতে সনদ সরবরাহ করেনা।
এ বিষয়ে কক্সবাজার আদালতের ওসি দিদারুল আলম বলেন, চলতি বছরের ৩১ মে পর্যন্ত কক্সবাজার জেলার ৮ টি আদালতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন ও চিকিৎসা সনদের অভাবে প্রায় সাড়ে ৩ মামলার বিচারকার্য ব্যহত হচ্ছে।
এদিকে আবুল কাশেম হত্যা মামলার বাদী হাফেজ বজল আহমেদ বলেন, আমার বাবাকে হত্যার পরই পুলিশ ওই মামলার এজাহারভুক্ত আসামী রফিকা বেগম , আলী আহমদ, আমেনা খাতুন ও আবছারকে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। কিন্তু এখনো পুলিশ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করতে পারেনি। আমি প্রায় প্রতিদিনই আদালতে প্রতিবেদন দেওয়ার জন্য পুলিশকে তাড়া দেই।
এ বিষয়ে হত্যা মামলার তদন্তকর্মকর্তা সদর থানার এসআই দেব্রবত বলেন, আমার আগে এই হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ছিলেন ফারুক আহমেদ। তিনি বদলীর আগে হাসপাতালের কাছে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন চেয়ে চিঠি লিখেছিলেন। পরে আমি দায়িত্ব নিয়েও এবছরের ৭ ফেব্রুয়ারী প্রতিবেদন চেয়ে আবেদন করি। এছাড়া অনেকবার মৌখিকভাবে আবেদন করেছি কিন্তু এখনো পাইনি। অথচ মামলার বাদীপক্ষ প্রতিদিনই তদন্ত প্রতিবেদন আদালতে দাখিল করার জন্য তাগাদা দিচ্ছে।
এ বিষয়ে সদর থানার মারামারি মামলার ভিকটিম ও বাদী সরওয়ার আলম বলেন, হাসপাতালের ইন্টার্ণি চিকিৎসকদের উপর যখন দূবর্ৃৃত্তরা হামলা করেছিল তকন সদর হাসপাতাল থেকে ২৪ ঘন্টায় জখমী সনদ দেওয়া হয়েছিল। অথচ আমার উপর হামলা হয়েছে ৬ মাস আগে। কিন্তু সদর হাসপাতাল পারেনি তার জখমী সনদ দিতে।
কক্সবাজার সদর থানার ওসি (তদন্ত ) কামরুল আজম বলেন, চাইলে ২৪ ঘন্টায় একটি জখমী সনদ দিতে পারে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। কিন্তু অনেকক্ষেত্রে বারবার আবেদন অনুনয় বিনয় করেও মিলে না জখমী সনদ ও ময়না তদন্ত প্রতিবেদন। ৩১ মে’র আগ পর্যন্ত হাসপাতালের প্রতিবেদন না পাওয়ায় এই থানার প্রায় ৫০ টি মামলার তদন্ত আটকে আছে।
কক্সবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার আফরাজুল হক টুটুল বলেন, এটা সত্যি অনেকক্ষেত্রে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন কিংবা চিকিৎসা সনদ সঠিক সময়ে দিতে পারে না হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। এই কারণে মামলার তদন্ত কার্যক্রমও ব্যাহত হয়।
এবিষয়ে সদর হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক মোহাম্মদ শাহীন আবদুর রহমান বলেন, অনেকক্ষেত্রে ভিসেরা প্রতিবেদন সঠিক সময়ে না পাওয়ার কারণে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদন দিতে বিলম্ব হয়। এছাড়া চিকিৎসা সনদের বেলায় এমন জটিলতা না থাকলেও পুলিশ আবেদন না করা পর্যন্ত আমরা এটি দিতে পারিনা। অনেকক্ষেত্রে মামলার ভিকটিমের পরিচয়ের সাথে চিকিৎসারত’র পরিচয় মিলেনা কিংবা পুলিশ প্রয়োজনীয় কাগজপত্র পাঠায় না সেক্ষেত্রে জখমী সনদ তৈরি করার সুযোগ থাকেনা।
কক্সবাজারের সিভিল সার্জন ডা. আবদুস সালাম বলেন,ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনটি সরাসরি সদর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ দেখভাল করে । আর চিকিৎসা সনদ যখন হাসপাতাল আমাদেরকে সরবরাহ করে তখন আমরা সাথে সাথে পাঠিয়ে দেই। এইতো গেল সপ্তাহে প্রায় ২০ টি চিকিৎসা সনদ পুলিশকে পাঠানো হয়েছে।
তিনি আরো বলেন, চিকিৎসা সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে ভিকটিমকে যে চিকিৎসক সেবা দিয়েছে তাকে দরকার হয়। অনেকক্ষেত্রে দেখা যায় ভিকটিমকে চিকিৎসা দেওয়া ডাক্তার ছুটিতে কিংবা সরকারী কাজে কর্মস্থলের বাইরে থাকে । সেক্ষেত্রে একটু সময়ক্ষেপন হয়।

Top