বাহারছড়া গোলচক্কর মাঠ উন্মুক্ত রাখা সকলের আইনী দায়িত্ব

1.jpg

॥ মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর, এডভোকেট ॥
যেহেতু মহানগরী, বিভাগীয় শহর ও জেলা শহরের এলাকাসহ দেশের প্রত্যেক পৌর এলাকার খেলার মাঠ, উন্মুক্ত স্থান, উদ্যান এবং প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণের জন্য বিধান করা সমীচীন ও প্রয়োজনীয় সেহেতু বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে মাঠ,উন্মুক্ত স্থান,উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার সংরক্ষণ আইন,২০০০ শিরোনামে গুরুত্বপূর্ণ আইনটি প্রণীত হয়েছিল।
উক্ত আইনের ৫ ধারায় উল্লেখ আছে, খেলার মাঠ,উন্মুক্ত স্থান,উদ্যান ও প্রাকৃতিক জলাধার হিসেবে চিহিৃত জায়গার শ্রেণী পরিবর্তন করা যাবে না বা উক্তরূপ জায়গা অন্য কোনভাবে ব্যবহার করা যাবে না বা অনুরূপ ব্যবহারের জন্য ভাড়া,ইজারা বা অন্য কোনভাবে হস্তান্তর করা যাবে না।
উক্ত আইনের ৮ ধারায় সাজা ইত্যাদি সম্পর্কে উল্লেখ করা হয়েছে যে, (১) কোন লোক অত্র আইনের কোন বিধান লংঘন করলে তিনি অনধিক ৫ বছরের কারাদন্ডে বা অনধিক ৫০,০০০ হাজার টাকা জরিমানা দন্ডে বা উভয় দন্ডে দন্ডনীয় হবেন। (২) ধারা ৫ এর বিধান লংঘন করে যদি কোন জায়গা বা জায়গার অংশবিশেষের শ্রেণী পরিবর্তন করা হয়,তবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ নোটিশ দ্বারা জমির মালিককে বা বিধান লংঘনকারী লোককে নোটিশে বর্ণিত জায়গার শ্রেণী পরিবর্তনের কাজে বাধা প্রদান করতে পারবে এবং নির্ধারিত নিয়মে অননুমোদিত নির্মাণকার্য ভেঙ্গে ফেলবার নির্দেশ দিতে পারবে এবং অন্য কোন আইনে যা কিছুই থাকুক না কেন,উক্তরূপ ভেঙ্গে ফেলার জন্য কোন ক্ষতিপূরণ প্রদেয় হবে না। (৩) অত্র আইনের বিধান লংঘন করে যদি কোন নির্মাণকার্য সম্পাদিত বা অবকাঠামো তৈরী হয়ে থাকে সে সমস্ত অবকাঠামো আদালতের আদেশে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের বরাবরে বাজেয়াপ্ত হবে।
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ২১ অনুচ্ছেদে উল্লেখ আছে, (১) সংবিধান ও আইন মান্য করা,শৃংখলা রক্ষা করা,নাগিরকদায়িত্ব পালন করা এবং জাতীয় সম্পত্তি রক্ষা করা প্রত্যেক নাগরিকের কর্তব্য। (২) সকল সময়ে জনগণের সেবা করার চেষ্টা করা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত প্রত্যেক ব্যক্তির কর্তব্য।
সম্প্রতি বাহারছড়া গোলচক্কর মাঠকে উন্মুক্ত রেখে উন্নয়নের দাবীতে কক্সবাজার জেলা শহরের বাহারছড়া,কলাতলী,নতুন বাহারছড়া,নুনিয়াছড়া ও সৈকত পাড়াবাসীর পক্ষে প্রতিনিধিত্বশীল ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিরা সভা,সমাবেশ,মিছিল ও মানববন্ধন করে জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে গৃহায়ন ও গণপুর্ত মন্ত্রণালয়ের মাননীয় মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপির বরাবরে স্মারকলিপি প্রদান করেছেন। বাহারছড়া গ্রামের সাথে লাগোয়া গোলচক্কর মাঠটি কক্সবাজার গণপুর্ত বিভাগের মালিকানাধীন সম্পত্তি। কিন্তু এই মাঠের এক সময় মালিক ছিলেন বাহারছড়া গ্রামের কয়েক জন স্থায়ী বাসিন্দা। কক্সবাজারকে একটি স্বাস্থ্যকর নগরী হিসেবে গড়ে তোলার অভিপ্রায়ে কোন এক সময়ে সরকার গোলচক্কর মাঠের জমিটি গণপুর্ত বিভাগের নামে অধিগ্রহন করে। অধিগ্রহনের পর থেকে আজ অবধি মাঠটি খোলা আছে। এ মাঠে এলাকার মৃত ব্যক্তির জানাযা,বাৎসরিক ওয়াজ মাহফিল,ঈদের বড় জামাত আয়োজন করা হয়। এ ছাড়া বাহারছড়া সহ পার্শ্ববর্তী এলাকার শত শত ছেলে-মেয়ে খেলাধুলার স্থান হিসেবে এ মাঠটি ব্যবহার করে থাকে। সকালে ও বিকালে এ শহরের অসংখ্য নারীপুরুষ এ মাঠে হাটাহাটি করেন। এ মাঠটি বছরের প্রায় সময় প্রীতি ক্রিকেট টুর্ণামেন্ট,ফুটবল টুর্ণামেন্ট,ক্রিকেট লীগসহ নানা রকম খেলাধুলার আয়োজন করা হয়। কক্সবাজার জেলা শহরে খোলামেলা পরিসরে সাধারণ মানুষের জন্য একটু মুক্ত শ্বাস নেওয়ার এ মাঠটি ছাড়া দ্বিতীয়টি আর নেই। গণপুর্ত বিভাগ সুত্রে সংবাদ পাওয়া গেছে যে গণপুর্ত বিভাগ মাঠটির চার পার্শ্বে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করে পার্ক তৈরীর পরিকল্পনা গ্রহন করেছে। পার্ক তৈরীর অজুহাতে যদি চারি দিকে সীমানা প্রাচীর দেওয়া হয় মাঠটি আর মাঠ থাকবে না। মাঠটি শত বছর ধরে জনগণ যেভাবে ব্যবহার করে আসছিলো সে সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে, যা সম্পূর্ণ জনমত ও জনস্বার্থ পরিপন্থী। ঐতিহাসিক গোলচক্কর মাঠটির চারপাশে পিলার স্থাপন করে ২ ফুট দেওয়াল উপরে লোহার গ্রীল দিয়ে মাঠটি রক্ষণাবেক্ষণ করে খোলা মাঠ হিসেবে গণপুর্ত বিভাগের তত্ত্বাবধানে রেখে তা সর্বসাধারণের ব্যবহারের জন্য আগের মত উন্মুক্ত রাখার জন্য এলাকাবাসী আবেদন করেছে।
কক্সবাজার প্রধান সড়কে স্বরসতী বাড়ীর লাগোয়া পূর্ব পাশে এস,আলম গাড়ীর কাউন্টারে একটি বড় মার্কেট তৈরী করা হয়েছে। শত বছরের পুরানো বিখ্যাত স্বরসতী বাড়ীর পুকুরের ওপরই এই মার্কেটটি করা হয়েছে। যখন কক্সবাজারে টিউবওয়েল এর সংখ্যা খুব কম ছিল তখন মানুষ পাকাকুয়ার পানি পান করতো। এন্ডারসন রোডসহ এই এলাকায় বসবাসকারী মুসলমান,হিন্দু ও রাখাইন নারীপুরুষরা স্বরসতী বাড়ীর পুকুরেই গোসল করতো। আমি নিজেও এই পুকুরে ৬০ বছর আগে সাতার শিখেছিলাম। লালদীঘি যেমন পৌরসভা দেখভাল করে স্বরসতী বাড়ীর পুকুরটিও মিউনিসোপালটি বা পৌরসভার তত্ত্বাবধানে ছিল। পুকুরটি ব্যক্তি মালিকানাধীন তা আমরা কোন দিন শুনি নাই। ব্যক্তি মালিকানাধীন পুকুরও ভরাট করতে ফায়ার ব্রিগেড আইন অনুযায়ী স্থানীয় ফায়ার ব্রিগেড এর পূর্ব অনুমতি লাগে। পরিবেশ অধিদপ্তরের অনুমতিও প্রয়োজন হয়। কোন প্রভাবশালী নেতা যথাযথ অনুমতি ছাড়া পুকুরটি ভরাট করেছে? স্বরসতী বাড়ীর পুকুরটি কিভাবে ব্যক্তি মালিকানায় চলে গেল,কিভাবে এস,আলম গ্রুপের মালিকানাধীনে হয়ে গেল তা সুনির্দিষ্টভাবে কেউ জানে না। তবে অনেক প্রভাবশালী নেতার বিরুদ্ধে জনশ্রুতি আছে তারাই ভুয়া কাগজপত্র সৃজন করে ভূয়া মালিক সাজিয়ে এস,আলম গ্রুপকে ঐতিহাসিক স্বরসতী বাড়ীর পুকুরটি বিক্রী করে দখল হস্তান্তর করার ব্যবস্থা করেছে। পুকুরটি নিয়ে আমি দৈনিক কক্সবাজার পত্রিকায় অতিথি কলামে কয়েকবার লিখেছিলাম। নেতাদের ওপর সব সময় বিশ্বাস রাখা যায় না। ব্যক্তিস্বার্থে অনেক সময় বিশ্বাসভঙ্গও করে থাকেন। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় জনগণ একতাবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ,আন্দোলন না করলে জনগণের সম্পত্তি কিভাবে ধনশালী প্রাইভেট গ্রুপের হয়ে যায় স্বরসতী বাড়ীর পুকুরটি তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। সব অন্যায় অবিচার দুর্নীতির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে হবে। একটা দুর্নীতিকে নজির হিসেবে ব্যবহার করে অন্য একটি দুর্নীতিকে বৈধতা দেওয়া যায় না।
কোন ঘোষণা ছাড়াই হোটেল শৈবালে ওরিয়ন গ্রুপের সাইনবোর্ড লাগানো হলে খোঁজ খবর নিয়ে কক্সবাজারের জনগণ জানতে পারে যে তিন তলা বিশিষ্ট পর্যটন হোটেল শৈবাল, সুইমিংপুল, দিঘী এবং তৎসংলগ্ন ১৩০ একর অতি মূল্যবান জমি প্রাইভেট-পাবলিক-পার্টনারশিপের আওতায় মাত্র ৬০ কোটি টাকার বিনিময়ে ৫০ বছরের জন্য ওরিয়ন গ্রুপকে ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া চুড়ান্ত করা হয়েছে। জনগণ হিসাব করে দেখে প্রায় ৫ হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি মাত্র ৬০ কোটি টাকায় একটি বিতর্কিত প্রাইভেট গ্রুপকে দিয়ে দেওয়া হলে রাষ্ট্রের তথা জনগণের ৪৯৪০ কোটি টাকা ক্ষতি হবে। অবশ্য অতি গোপনে এ ইজারা দেওয়ার প্রক্রিয়া প্রায় সম্পন্ন করতে সংশ্লিষ্ট ক্ষমতাশালী নেতা বা আমলাদের কত কোটি টাকা ’স্পিডমানি’ দেওয়া হয়েছে তা শুধু ওরিয়ন গ্রুপের মালিকরাই জানেন। এতে মহা-দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের গন্ধ পাচ্ছে জনগণ। স্থানীয় জনগণের আন্দোলনের মূখে কর্তৃপক্ষ পিছু হটতে বাধ্য হয়েছে। ওরিয়ন গ্রুপের লাগানো সাইনবোর্ডও খুলে নিয়েছে। তবে আত্মতৃপ্তির অবকাশ নাই,জনগণকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।
ঐতিহ্যবাহী বাহারছড়া গোলচক্কর মাঠটি জনস্বার্থে উন্মুক্ত রাখার জনগণের দাবী সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব,যৌক্তিক ও আইনসম্মত। দেশে প্রচলিত আইন ও সংবিধান অনুযায়ী গোলচক্কর মাঠটি উন্মুক্ত রাখার জন্য শান্তিপূর্ণ আন্দোলন করা জনগণের আইনী ও নাগরিকদায়িত্ব এবং গণপুর্ত বিভাগের কর্মকর্তারা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিযুক্ত বিধায় প্রজাতন্ত্রের কর্মকর্তাদের তা সমর্থন করা সাংবিধানিক কর্তব্য।
লেখকঃ একজন কলামিষ্ট, সাবেক সভাপতি কক্সবাজার জেলা আইনজীবী সমিতি, সাবেক পাবলিক প্রসিকিউটার, বহু বইয়ের প্রণেতা এবং কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের একজন সিনিয়ার আইনজীবী।

Top